শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সেই প্রেক্ষাপটকে নির্দেশ করে যেখানে একজন নেতা প্রান্তিক এলাকা থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসে দেশের সর্বচ্চ আসনে। নিজের একটা অবস্থান এমন স্থানে নিতে পেরেছিলেন যেখান থেকে তার ডাকে জনগণ প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিলো। তবে তিনি যখন দেশের শাসন ক্ষমতায় বসলেন চতুর্দিকে "জ্বী হুজুর" টাইপের লোককে নিয়োগ দিলেন। এই বিষয়টাকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়ার জন্য তিনি জনগণের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া রাষ্ট্রের অত্যাবশ্যক উপাদান "গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান" কে সাংবিধানিক উপায়েই হত্যা করলেন এবং একনায়কতন্ত্র (বাকশাল) কায়েম করলেন। ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি সংবিধানকে সংশোধন করেছেন ৪ বার শুধুমাত্র তার অপশাসনকে বৈধতা দিতে। সারাদেশে যখন দুর্ভিক্ষ চলছে তখন তিনি মহাসমারোহে সন্তানের বিবাহ অনুষ্ঠান করতে ব্যস্ত ছিলেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করলেন। বিষয়টা অমানবিকতার সর্বনিম্ন স্তরে তার অবস্থান নামিয়ে দিয়েছে। ক্ষমতা ধরে রাখতে তার বড়ছেলে কামালের সবধরনের অপরাধকে প্রশ্রয় দিতেন। তার নিজের বক্তব্য অনুসারে, "মানুষের যখন পতন আসে তখন পদে পদে ভুল হয়।" মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ তার এ সমস্ত কার্যকলাপে সমর্থন না দিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবুও তিনি এতটা ডুবে ছিলেন যে তার দলীয় প্রতিক 'নৌকা" ডুবে গিয়েছিলো রাজনৈতিক সাগরের উত্তাল গভীরে। একজন শাসক স্বপরিবারে নিহত হলেন অথচ দেশের জনগণ তার জানাজা পর্যন্ত পড়ে নাই। একজন প্রতাপশালী রাষ্ট্রপতির দাফন হয়েছে রিলিফের কাপড়ে এই ঘৃণা যদি আওয়ামীলীগের থাকতো তাহলে হিংসার রাজনীতি করতো না। আর সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া আমাদের সকল নেতাদের অবদান স্বীকার করে নিতো।
আওয়ামীলীগের সবচেয়ে বড় কয়েকটি মিথ্যাচার হচ্ছে, "১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে একটিমাত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরাই ছিলাম" "শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষক" "মুক্তিযুদ্ধ মুজিব বাহিনী করেছে" কিন্তু বাস্তবিক দিক দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য গড়ে উঠে "বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন" (যারা আজ পর্যন্ত মজদুর, দিনমজুর ও নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে সব যৈক্তিক দাবি তুলে ধরেছে), বাংলাদেশের শ্রমিক, কৃষক, দিনমজুর, মুক্তিকামী সামরিক ব্যক্ত্বিত্ব, কবি-সাহ্যিতিক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সচেতন নারী-পুরুষ সকলে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। এখানে শেখ মুজিবের অবদান ছিলো।
হাসিনা শেখ মুজিবের অবদানকেই মুখ্য অবদান হিসেবে সবসময় দেখে এসেছে এবং জনগণকে জোর করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নামে "মুজিববাদ" গলঃধকরণ করিয়েছে। মুজিব শতবর্ষের নামে জনগণের রক্ত ও শ্রম অর্জিত ট্যাক্সের টাকা আর বৈদশিক ঋণের অর্থ আত্মসাৎ করেছে। একটা যৌক্তিক আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে কয়েকশ শিক্ষার্থী হয়তা করেছে। স্বজনপ্রীতি মারাত্মকভাবে প্রয়োগ করেছে। প্রতিটি স্থাপনায় নিজের পরিবারের সদস্যদের নাম বসিয়ে দিয়েছে।
২০২৪ এর প্রেক্ষাপটে যদি আমরা যাই তাহলে দেখতে পাবো, ৯ দফা দাবির মধ্যে ছাত্র-জনতার দাবীর বিরোধীতা করা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক, পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবাইদুল কাদের এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে প্রত্যাহারের দাবী ছিলো। কিন্তু হাসিনা সেই দাবী না মেনে গণহারে ছাত্র হত্যা শুরু করলো। তারপর যখন শিক্ষার্থীরা ১ দফা দিয়ে হাসিনার পদত্যাগের দাবী তুলে সেটাও তিনি মেনে নিতে নারাজ ছিলেন। তিনি পদচ্যুত হন এবং দিল্লিতে পালিয়ে যান। সাথে করে আওয়ামীলীগ, শেখ মুজিব এবং তার জোর করে অর্জিত সম্মানের শেষটুকুতে কালো রঙ দিয়ে যান।
জুলাই গণ-অভ্যুথান-২০২৪, এর শেষদিকে হাসিনার বিরুদ্ধে তার বাবার উক্তিগুলো (যেমনঃ তুমি রিয়েলিটি মাইনে ন্যাও, বারোটা তোমার বেজে গেছে) উচ্চারিত হতো। এমনকি স্লোগানের একটা উক্তি ছিলো "বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাই নাই।" তারপর এই আন্দোলনকারীরা সেই মুজিবের মূর্তি গুড়িয়ে দিলো দীর্ঘদিনের ক্ষোভে। এই ক্ষোভ তখন মুজিবের উপর ছিলো না, ছিলো আওয়ামীলীগের উপর। যখন হাসিনার নিষিদ্ধ করা বইগুলো বাজারে আসা শুরু হলো তখন থেকে মুজিবের নাম নেওয়া পাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ১৯৭১ পর্যন্ত যেই মুজিব বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে, সেই আবার ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে জালিমের ভূমিকা পালন করেছে। একসময় আগস্ট মাসে দেশব্যাপী জোর করে দুঃখ-শোকের গান বাজানো হতো। আর এখন মানুষ আগস্ট মাস আসলে ডিজে পার্টির মাধ্যমে উদযাপন করে।
এখন অনেক বুদ্ধিজীবীকে দেখি মুজিবের কৃতিত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করে তাকে সম্মান দেখানোর অনুরোধ করেন। যদি তাকে জাতির পিতা হিসেবে সম্মান করতে হয়, তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র ধংসকারী, বাকশাল নামক একনায়কতন্ত্রের প্রবর্তক, দুর্নীতিবাজ, স্বজনপ্রীতিকারী, অন্যায়ের প্রশ্রয়দাতাসহ আরো অনেক বিশেষণে বিশেষায়িত করে তাকে ঘৃণা করতে হবে। তাই গুণকীর্তন কিংবা নিন্দা না করে একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে ইতিহাসের ফ্রিজে রেখে দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। যেটাকে সাধারণ রাজনীতিবিদদের ভাষায় "রাজনৈতিক দাফন" বললে ভুল হবে না।
About the Author
মোফাজ্জেল হোসাইন বরকত
মজদুরের নিয়মিত লেখকশিক্ষার্থী
"জগতের যত মাজলুম আমরা তোমাদেরই কণ্ঠস্বর" আমি মোফাজ্জেল হোসাইন বরকত। জন্ম গোপালগঞ্জ জেলার মেরী গোপীনাথপুর গ্রামে। নিজেকে সবসময় ডানপন্থীদের রাজনীতির বাহিরে রাখতে চেয়েছি।কারণ রাজনৈতিক প্রহসনের রাষ্ট্রে সরাসরি ডানপন্থী রাজনীতিতে যোগদান করার অর্থ- স্বচক্ষে ভাইয়ের খুন হতে দেখার পরেও পুতুলের মতো বসে থাকা। একমাত্র সাংগঠনিক পরিচয় "আমি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একজন সদস্য।" বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন- ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া বিপ্লবীদের একটি সংগঠন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুথানে সর্বাত্মক সহযোগীতার পরেও অন্যান্য দলগুলোর মতো গোগ্রাসে গিলে ফেলেনি সাধারণের অধিকার। এই অনুপ্রেরণায় আমি এই সংগঠনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। নিয়মের বেড়াজালে আমাদের বন্দী করে, অন্যায়ভাবে যারা মাজলুমের ঘাড়ে কুঠারের আঘাত করে, তাদের বিরুদ্ধে সদা সর্বদা জাগ্রত আমরা। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জিন্দাবাদ
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন