স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর সময় আমাদের মগজে সফলতার একটি সুনির্দিষ্ট বুর্জোয়া সংজ্ঞা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের পাঠ্যবই আমাদের শেখায় ভাস্কো দা গামা বা কলম্বাসের কথা, যারা আদতে ছিলেন ঔপনিবেশিক লুটেরা। আধুনিক পাঠ্যক্রমে আমরা পড়ি বিল গেটস বা স্টিভ জবসদের কর্পোরেট সফলতার গল্প।
কিন্তু ইতিহাস বইয়ের পাতা উল্টালে লাতিন আমেরিকার অবিসংবাদিত বিপ্লবী চে গুয়েভারা, কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, আফ্রিকার থমাস সানকারা কিংবা খোদ আমাদের নিজেদের ব দ্বীপের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। পাঠ্যপুস্তকে সমাজতান্ত্রিক বা বিপ্লবী নেতাদের এই অনুপস্থিতি কোনো সিলেবাস প্রণেতার অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়; এটি মূলত বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের অত্যন্ত সুকৌশলী এক কাঠামোগত রাজনীতি।
১. 'আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র' এবং মগজ ধোলাইয়ের বৈধতা
ফরাসি মার্ক্সবাদী দার্শনিক লুই আলথুসার রাষ্ট্রকে দুটি ভাগে ভাগ করেছিলেন, 'নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র' (পুলিশ, সেনাবাহিনী) এবং 'আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র' (শিক্ষাব্যবস্থা, মিডিয়া, ধর্ম)। আলথুসার দেখিয়েছিলেন, একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কেবল বন্দুকের জোরে টেকে না, বরং শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকদের মগজ নিয়ন্ত্রণ করে টেকে।
আমাদের দেশের এনসিটিবি (NCTB) বা শিক্ষাবোর্ডগুলো মূলত এই 'আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্রের' অংশ। রাষ্ট্র কখনোই এমন কোনো সিলেবাস তৈরি করবে না, যা তার নিজের শোষণের কাঠামোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। চে গুয়েভারা বা কার্ল মার্ক্সের জীবনদর্শন পড়লে একজন শিক্ষার্থীর মনে 'শ্রেণিসচেতনতা' (Class Consciousness) তৈরি হবে। সে প্রশ্ন করতে শিখবে, কেন একজন রিকশাচালক দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনির পরও গরিব থাকে, আর ব্যাংক লুটেরারা কেন সমাজে সম্মান পায়? এই 'কেন' প্রশ্নটি পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই রাষ্ট্রযন্ত্র সিলেবাস থেকে বিপ্লবীদের মুছে দিয়ে অনুগত কেরানি তৈরির পাঠ যুক্ত করে।
২. স্থানীয় ইতিহাসের রাজনীতি: মুছে ফেলা হয়েছে লাল পতাকার লড়াই
আমাদের জাতীয় পাঠ্যবইগুলোতে কেবল মূলধারার বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী বয়ানকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অথচ এই ব দ্বীপের প্রতিটি বড় লড়াইয়ের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন বামপন্থীরা।
তেভাগা ও ইলা মিত্র: রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল কিংবা দিনাজপুরে কৃষকদের অধিকার আদায়ের যে রক্তক্ষয়ী তেভাগা আন্দোলন হয়েছিল, তার নেত্রী ইলা মিত্রের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্র যে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়েছিল, তা আমাদের পাঠ্যবইয়ে সযতনে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
ভাসানী ও মণি সিংহ: ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের প্রধান রূপকার ছিলেন মওলানা ভাসানী। কাগমারী সম্মেলনে যিনি প্রথম সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, তাকে পাঠ্যবইয়ে একটি ছোট্ট পাদটীকায় (Footnote) আটকে রাখা হয়েছে। টঙ্ক বা নানকার বিদ্রোহের কমরেড মণি সিংহ বা সুহাসিনী দাসদের অবদান পাঠ্যপুস্তকে একেবারেই প্রান্তিক।
কারণ ইতিহাস সবসময় বিজয়ীরা লেখে, আর আমাদের ভূখণ্ডে ক্ষমতা সবসময় থেকেছে পুঁজিপতি ও উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণির হাতে।
৩. আন্তর্জাতিকতাবাদ বনাম উগ্র জাতীয়তাবাদ
চে গুয়েভারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের নেতা ছিলেন না। তিনি আর্জেন্টিনার নাগরিক হয়েও কিউবায় বিপ্লব করেছেন, কঙ্গো বা বলিভিয়ার সাধারণ মানুষের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। এটি হলো সমাজতন্ত্রের মূল নির্যাস, 'আন্তর্জাতিক সংহতি' (Internationalism)।
পুঁজিবাদ মানুষকে কাঁটাতার আর উগ্র জাতীয়তাবাদের গণ্ডিতে আটকে রাখতে চায়, যাতে এক দেশের শোষিত মানুষ আরেক দেশের শোষিত মানুষের সাথে একতাবদ্ধ হতে না পারে। পাঠ্যবইয়ে চে গুয়েভারাকে স্থান দিলে তরুণেরা শিখবে যে, ফিলিস্তিন হোক বা বলিভিয়া, শোষণ যেখানেই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে লড়াই করা সবার দায়িত্ব। এই আন্তর্জাতিক সংহতির চরম ভয় থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্র চে গুয়েভারাকে সিলেবাসের বাইরে রাখে।
৪. ইতিহাসের নির্বীজন (Sanitization of History)
পুঁজিবাদী শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো তারা অনেক সময় বিপ্লবীদের সিলেবাসে রাখলেও তাদের 'নির্বীজন' করে ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, পাঠ্যবইয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা বা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে পড়ানো হয় কেবল একজন 'শান্তিবাদী' নেতা হিসেবে। অথচ ম্যান্ডেলার সশস্ত্র সংগ্রাম বা মার্টিন লুথারের তীব্র পুঁজিবাদবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক দর্শনকে সম্পূর্ণ আড়াল করে তাদের একটি 'ভোঁতা' বা নিরীহ চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেন শিক্ষার্থীরা তাদের দেখে কোনো উগ্র আন্দোলনের অনুপ্রেরণা না পায়।
শেষকথা
পাঠ্যপুস্তকে চে গুয়েভারা, ফিদেল কাস্ত্রো বা ইলা মিত্রদের অনুপস্থিতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মূলত শাসকশ্রেণির পাহারাদার। তারা আমাদের চিন্তার জগতকে এমনভাবে শেকল পরিয়ে রাখতে চায়, যেন আমরা শোষণের শিকল ভাঙার কথা চিন্তাও করতে না পারি। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, বিপ্লবীদের নাম হয়তো বইয়ের পাতা থেকে মুছে ফেলা যায়, কিন্তু মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চিরকাল চাপা দিয়ে রাখা যায় না। প্রাতিষ্ঠানিক সিলেবাসের বাইরে গিয়ে, নিজেদের তাগিদেই আজ তরুণ প্রজন্মকে চে গুয়েভারা আর সমাজতন্ত্রের আসল পাঠ নিতে হবে; কারণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমাদের বড়জোর একটি 'পণ্য' বানাতে পারে, মুক্ত মানুষ নয়।
লেখক: আতিকুর রহমান | শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ | রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
About the Author
আতিকুর রহমান অন্তর
মজদুরের নিয়মিত লেখকলেখক এবং ডিজিটাল মার্কেটিং প্রফেশনাল
আমি আতিকুর রহমান অন্তর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী। রাষ্ট্র, সমাজ, লোকসংস্কৃতি, ধর্ম ও সাহিত্য নিয়ে মুক্তালাপ করতে আমি ভালোবাসি। প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করাই আমার লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন