বিপ্লবী কার্ল হাইনরিখ মার্ক্স (১৮১৮–১৮৮৩) প্রুশিয়ার ট্রিয়ার শহরে একটি ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ট্রিয়ার (Trier) হলো জার্মানির একটি প্রাচীন শহর। বর্তমানে এটি Trier শহর হিসেবে পরিচিত এবং জার্মানির পশ্চিম অংশে, লুক্সেমবার্গ সীমান্তের কাছে অবস্থিত। প্রুশিয়া (Prussia) ছিল একটি ঐতিহাসিক জার্মান রাজ্য ও পরবর্তীতে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র, যা আজ আর অস্তিত্বে নেই। ১৮১৮ সালে যখন কার্ল মার্ক্স জন্মগ্রহণ করেন, তখন ট্রিয়ার শহরটি Kingdom of Prussia-এর অংশ ছিল। তাঁর জাগরণী চিন্তাধারা ও মতামতের কারণে শোষক গোষ্ঠী তাঁকে নির্বাসন দেয়। প্রথমে তিনি প্যারিসে, তারপর ব্রাসেলসে এবং সর্বশেষে সে সময়ের ইউরোপের সবচেয়ে সহনশীল দেশ ইংল্যান্ডে আশ্রয় নেন, যেখানে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করে যান।
সমাজ সম্পর্কে মার্ক্সের তত্ত্বকে সমাজবিজ্ঞানের (Sociology) অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মার্ক্সের কাজ শুধু সমাজবিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক নয়; বরং তা সমাজবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মার্ক্স ধর্ম এবং অধিবিদ্যা (metaphysics) প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং মানব অস্তিত্ব ও ইতিহাসের একটি বস্তুবাদী (materialistic) ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ধর্ম বা বিমূর্ত ধারণার (religion or abstract ideas) চেয়ে বস্তুগত ও অর্থনৈতিক (material or economic) অবস্থাই মানব ইতিহাসকে গঠন ও পরিচালনার প্রধান শক্তি। তাঁর মতে, মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক কারণ সে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার উপায় বা জীবিকা (means of existence) উৎপাদন করতে সক্ষম। অন্যদিকে, অন্যান্য প্রাণী প্রকৃতি যা প্রদান করে, তা-ই কেবল ভোগ করে। উদাহরণস্বরূপ, সিংহ বা বাঘ তাদের খাবার উৎপাদন করে না। তারা কেবল শিকার করে এবং তা ভক্ষণ করে। কিন্তু মানুষ তাদের খাবার কৃষি কাজের মাধ্যমে উৎপাদন করে।
তিনি বলেন: মানব ইতিহাসের এক পর্যায়ে মানুষ খাদ্য উৎপাদন এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরির কাজ শুরু করে। এর মাধ্যমেই মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে স্বতন্ত্র পরিচয় লাভ করতে শুরু করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার ফলে উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পায়।
উৎপাদনের উপায় (means of production) পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমবিভাজন (division of labour) ও ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। সমাজ যত বড় ও জটিল হয়ে ওঠে, মানুষ তত বিভিন্ন বিশেষায়িত কাজে নিযুক্ত হতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি রুটির পেছনে অনেক মানুষের শ্রম জড়িত থাকে। একজন কৃষক গম চাষ করেন, একজন মিলার সেই গম থেকে আটা তৈরি করেন, একজন ড্রাইভার তা পরিবহন করেন, একজন বেকার রুটি প্রস্তুত করেন এবং একজন দোকানী তা বিক্রি করেন।
মার্ক্স উৎপাদনের উপায় (means of production) সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন যে সমাজ কীভাবে ধাপে ধাপে আদিম উপজাতীয় সমাজ (tribal society) থেকে সামন্ততান্ত্রিক সমাজে (feudal society) এবং পরবর্তীতে শিল্পভিত্তিক বা পুঁজিবাদী সমাজে (industrial/capitalist society) বিকশিত হয়েছে।
প্রাচীন উপজাতীয় সমাজে (tribal society) মানুষ শিকার এবং খাদ্য সংগ্রহের মাধ্যমে জীবনধারণ করত। সেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির (private property) ধারণা ছিল না এবং উপজাতীয় সমাজের আইন ও নিয়মকানুন (law and order) ছিল তাদের সরল জীবনযাত্রার (simple life) প্রয়োজনের ভিত্তিতে গঠিত।
যখন কৃষি উৎপাদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন সামন্ততান্ত্রিক সমাজ (feudal Society) বিকশিত হয়। জমির মালিক ছিল সামন্ত প্রভুরা (feudal landlords), আর সেই জমি চাষ করত প্রজারা বা বর্গাচাষিরা (tenants)। শহর ও নগরাঞ্চল সাধারণত রাজ্যের (state) নিয়ন্ত্রণে থাকত।
মার্ক্সের মতে, প্রকৃত ব্যক্তিগত সম্পত্তির (true private property) উদ্ভব ঘটে কেবল শিল্পযুগে। পুঁজিবাদী শ্রেণির (capitalist class) উত্থান ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিস্তার ও বিকাশকে ত্বরান্বিত করে।
মার্ক্স বলেছিলেন: সমাজে শ্রমবিভাজন (division of labour) প্রথমে কৃষিকাজকে শিল্প ও বাণিজ্য থেকে পৃথক করে। এর ফলে গ্রাম ও শহরের মধ্যে একটি ব্যবধান সৃষ্টি হয় এবং তাদের স্বার্থের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়। পরবর্তীতে শিল্প ও বাণিজ্যও একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে যায়। শ্রমবিভাজন যত বৃদ্ধি পায়, মানুষ তত বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হতে থাকে এবং সমাজে তাদের অবস্থান নির্ভর করে কাজ কীভাবে সংগঠিত হয়েছে তার ওপর। এই সংগঠন বিভিন্ন রূপ নিতে পারে, যেমন: পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা (patriarchy), দাসপ্রথা (slavery), সামন্ততান্ত্রিক এস্টেট ব্যবস্থা (estate system) অথবা শ্রেণিভিত্তিক ব্যবস্থা (class system)। একই ধরনের ধারা বিভিন্ন দেশের মধ্যকার সম্পর্কেও দেখা যায়। সর্বোপরি, সমাজে শ্রমবিভাজনের যে স্তর বিদ্যমান থাকে, সেটিই সম্পত্তির মালিকানার ধরন নির্ধারণ করে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে, তা গঠন করে।
উৎপাদনের উপায়ে (means of production) পরিবর্তন ঘটলে শ্রমবিভাজন (division of labour) এবং বিশেষায়ন (specialization) আরও বৃদ্ধি পায়।
বাজার তত্ত্ব (market theory) অনুযায়ী, বিশেষায়ন (specialisation) এবং শ্রমবিভাজন (division of labour) নিঃসন্দেহে একটি ভালো বিষয়। কারণ এর ফলে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং ফলস্বরূপ আরও বেশি পরিমাণে, উন্নত মানের এবং তুলনামূলকভাবে সস্তা পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়। মার্ক্স এই সুবিধাকে স্বীকার করেছিলেন। তবে তিনি যুক্তি দেন যে, শ্রমবিভাজন অনিবার্যভাবে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যেখানে কিছু গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে শোষণ করে। তাঁর মতে, এই প্রক্রিয়ার ফলে সম্পত্তি ও পুঁজি ক্রমশ অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে থাকবে। অন্যদিকে, সম্পত্তিহীন ও শোষিত শ্রমিকদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে। মার্ক্স এই শ্রমিক শ্রেণিকে প্রলেতারিয়েত (proletariat) নামে অভিহিত করেন। মার্ক্স বিশ্বাস করতেন যে, এর ফলে এই শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে বিচ্ছিন্নতা (alienation) সৃষ্টি হবে এবং শেষ পর্যন্ত শ্রেণি-সংঘাত (class conflict) দেখা দেবে।
মার্ক্স যথার্থভাবেই পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে, একটি সমাজের আইন মানুষের জীবিকা অর্জনের পদ্ধতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। তাঁর মতে, প্রতিটি সামাজিক ব্যবস্থার দুটি অংশ রয়েছে: ভিত্তি (base) এবং উপরিকাঠামো (superstructure)।সমাজের অর্থনৈতিক সম্পর্কসমূহ ভিত্তি (base) গঠন করে। আর আইন, রাষ্ট্র এবং মানুষের প্রচলিত চেতনা বা ধারণা (popular consciousness) মিলে উপরিকাঠামো (superstructure) গঠন করে।ভিত্তি ও উপরিকাঠামো পরস্পর নির্ভরশীল। ভিত্তি থেকে উপরিকাঠামোর উদ্ভব হয় এবং উপরিকাঠামো আবার ভিত্তিকে রক্ষা ও শক্তিশালী করে। ভিত্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উপরিকাঠামোরও পরিবর্তন ঘটে। প্রাচীন উপজাতিদের সংগঠন, আইন ও বিশ্বাস (অর্থাৎ তাদের উপরিকাঠামো) তাদের শিকার ও খাদ্যসংগ্রহনির্ভর জীবনযাত্রার (ভিত্তি) প্রতিফলন ছিল। কৃষির বিকাশ সামন্ততান্ত্রিক রাজতন্ত্র এবং সামন্ত আইনব্যবস্থার জন্ম দেয়। সামন্ত আইনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজকে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করা। এই স্তরগুলোর মধ্যে ছিল রাজতন্ত্র, ভূমির মালিক অভিজাত শ্রেণি (aristocracy) এবং প্রজারা (tenants)। যদিও তাদের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থবিরোধ (conflict of interest) বিদ্যমান ছিল এদের মধ্যে পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য বিদ্যমান ছিল। শিল্প ও বাণিজ্যভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার আবির্ভাব আইন, রাষ্ট্র ও বিশ্বাসব্যবস্থায় আরও ব্যাপক পরিবর্তন আনে। চুক্তি আইন (Contract Law), সম্পত্তি আইন (Property Law) এবং শ্রম আইন (Labour Law) সহ সমগ্র আইনব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয় যাতে বাণিজ্য ও শিল্পের বিকাশ সহজ হয়। সামন্ততান্ত্রিক স্তরভিত্তিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয় এবং তার পরিবর্তে সমাজ বিভিন্ন শ্রেণিতে (classes) বিভক্ত হয়ে যায়: যেমন পুঁজির মালিক, শিল্পশ্রমিক, বাণিজ্যিক কর্মচারী ইত্যাদি। মার্ক্সের মতে, উপরিকাঠামো শুধু আইন নয়; এর মধ্যে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের আদর্শিক চিন্তাধারাও (ideology) অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্র ও আইন, উপরিকাঠামোর অংশ হিসেবে, এমন পরিবেশ নিশ্চিত করে যার মাধ্যমে পুঁজি সঞ্চিত হয় এবং বাণিজ্য ও শিল্প পরিচালিত হয়। সংক্ষেপে, মার্ক্সের মতে রাষ্ট্র পুঁজিবাদী শ্রেণির রক্ষক এবং শ্রমিক শ্রেণির ওপর আধিপত্য ও দমন-পীড়নের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়।
মার্ক্স শুধু অতীতের ব্যাখ্যাকারীই ছিলেন না। তিনি ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। মার্ক্সের ইতিহাস তত্ত্ব অনুযায়ী, শিল্পসমাজ ও পুঁজিবাদের আবির্ভাব ছিল অনিবার্য। একইভাবে, যদি মার্ক্সের তত্ত্ব সঠিক হয়, তবে পুঁজিবাদী সমাজের পতনও অনিবার্য।মার্ক্স ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, পুঁজি ক্রমশ একটি ক্ষুদ্রতর শ্রেণির (owners of production) হাতে কেন্দ্রীভূত হবে এবং এর ফলে প্রলেতারিয়েত (proletariat) বা শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে উঠবে যে তারা স্বাভাবিকভাবেই বিদ্রোহে ফেটে পড়বে। তারা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উৎখাত করবে এবং শ্রমিকদের একনায়কত্ব (dictatorship of the workers) প্রতিষ্ঠা করবে। তবে এই শ্রমিক একনায়কত্ব স্থায়ী হবে না। এটি হবে কেবল একটি অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায় (transitory phase), একটি লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম মাত্র। এর উদ্দেশ্য হবে পুঁজিবাদ ও শ্রেণিভেদ বিলুপ্ত করা এবং এমন একটি সাম্যবাদী বা কমিউনিস্ট সমাজ (communist society) প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে উৎপাদন ও বণ্টনের উপায়সমূহ (means of production and distribution) হবে সবার যৌথ মালিকানাধীন।মার্ক্সের মতে, যখন সমাজে আর কোনো শ্রেণি বা শ্রেণিসংঘাত থাকবে না এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষারও প্রয়োজন হবে না, তখন রাষ্ট্র তার প্রয়োজনীয়তা হারাবে এবং ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে (wither away)।
কমরেড মার্ক্সের এই সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের কেন্দ্রীয় ধারণা হলো শ্রেণি-সংঘাত (class struggle)। মার্ক্সের মতে, সমাজের ইতিহাস মূলত বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে সংঘাতের ইতিহাস। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো বা ভিত্তি (base) সমাজের আইন, রাষ্ট্র, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক শৃঙ্খলাকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ, মানুষের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ ও আইনকানুন কোনো স্বাধীন শক্তি নয়। বরং এগুলো বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিফলন। মার্ক্সের মতে, প্রতিটি যুগে শাসক শ্রেণি তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য আইন ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ব্যবহার করে। তাই আইনকে তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বা সর্বজনীন ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে দেখেননি। উদাহরণস্বরূপ, পুঁজিবাদী সমাজে সম্পত্তি আইন, চুক্তি আইন এবং শ্রম আইন এমনভাবে গড়ে ওঠে যাতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পুঁজির সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। ফলে আইন অনেক ক্ষেত্রে পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোকে বজায় রাখে। নৈতিকতা (morality) সম্পর্কেও মার্ক্সের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একই রকম। তাঁর মতে, নৈতিক মূল্যবোধ কোনো চিরন্তন বা অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়; বরং তা সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এক যুগে যা নৈতিক বলে বিবেচিত হয়, অন্য যুগে তা অনৈতিক বলে গণ্য হতে পারে। তাই নৈতিকতাও শাসক শ্রেণির প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। ন্যায়বিচার (justice) সম্পর্কে মার্ক্স মনে করতেন যে পুঁজিবাদী সমাজে প্রচলিত ন্যায়বিচারের ধারণা প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। কারণ উৎপাদনের উপায় ও সম্পদের মালিকানা অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। ফলে আইনগত সমতা থাকলেও অর্থনৈতিক বৈষম্য অব্যাহত থাকে। প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি শ্রেণিহীন সমাজের কথা বলেন, যেখানে শোষণ ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে। সামাজিক শৃঙ্খলা (social order) সম্পর্কেও মার্ক্সের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, সমাজে বিদ্যমান শৃঙ্খলা মূলত ক্ষমতাসীন শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। রাষ্ট্র, আইন এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলে যা বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখে। তবে যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন শ্রেণি-সংঘাত তীব্র হয় এবং সামাজিক পরিবর্তন বা বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং, মার্ক্সের সমাজ ও শ্রেণি সংগ্রাম (society and class struggle) তত্ত্ব আইন, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক শৃঙ্খলাকে সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও শ্রেণিগত সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করে। তাঁর মতে, এসব প্রতিষ্ঠান ও ধারণা সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং সেগুলো সেই কাঠামোকেই প্রতিফলিত ও সংরক্ষণ করে। তাই সমাজকে বুঝতে হলে প্রথমে তার অর্থনৈতিক ভিত্তি ও শ্রেণিগত সম্পর্ককে বুঝতে হবে।
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন