এরশাদ কেবল একজন সামরিক শাসক নন; তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র’ বিতর্ককে রাষ্ট্রীয় কৌশলে রূপ দেওয়া প্রথম শাসক। তার শাসন আমাদের দেখিয়েছে, উন্নয়ন ও ধর্মের ব্যবহার দিয়ে স্বৈরতন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী করা যায়, কিন্তু বৈধ করা যায় না। তাই এরশাদ কেবল একজন সাবেক সামরিক শাসক নন; তিনি বাংলাদেশের স্বৈরতন্ত্রের একটি কার্যকর মডেল।
মুক্তিযুদ্ধ ও ক্ষমতার মানসিক কাঠামোঃ একটি বিষয় একদমই আলোচনা হয় না। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তখন বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেননি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণের পক্ষে না দাঁড়ানোর এই ইতিহাস শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতা সম্পর্কে এরশাদের মানসিক কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। যে ক্ষমতা জনগণের সম্মতিতে জন্ম নেয় না, তার কাছে গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা সাধারণত গৌণ হয়ে পড়ে। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান এরশাদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করেন।
ক্ষমতা দখল ও সামরিক শাসনঃ শেখ মুজিব ও জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সময়ে এরশাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও গতিবিধি নিয়ে নানা প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশে ফেরার পর থেকেই কি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চিন্তা ছিল তার? রাষ্ট্রপতি সাত্তারের সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং পরবর্তীতে মার্শাল ল জারির ঘটনাগুলো ইতিহাসে স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ, সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। সংবিধান স্থগিত করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। এটি ছিল কেবল ক্ষমতা দখল নয়; সংবিধানকে কার্যত অপ্রয়োজনীয় করে তোলার ঘোষণা।
আন্দোলন, দমন ও নির্বাচনঃ শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র করে ছাত্রসমাজ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নামে। কিন্তু ক্ষমতা রক্ষায় এরশাদ রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তি প্রয়োগ করেন। ১৯৮৩ সালের শিক্ষা আন্দোলনে শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ড ছিল এর নগ্ন উদাহরণ।
১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে সামরিক প্রভাব ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করা হয়। এসব নির্বাচন জনগণের গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বরং নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণে খালেদা জিয়া সেই সময়েই আপোষহীন নেত্রী হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
উন্নয়ন বনাম বৈধতাঃ নির্বাচন বিতর্ক আড়াল করতে এরশাদ কিছু জনপ্রিয় পদক্ষেপ নেন। ১৯৮২ সালের ঔষধ নীতি দেশীয় ওষুধ শিল্পের ভিত গড়ে তোলে। উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, জনগণের সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বৈধতা কি এসব উদ্যোগ দিতে পারে?
এই সংস্কারের আড়ালেই চলতে থাকে বিরোধী কণ্ঠ দমন, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, সামরিক গোয়েন্দা ব্যবস্থার অপব্যবহার ও দুর্নীতি। ১৯৮৭ সালে পুলিশের গুলিতে নূর হোসেন নিহত হওয়ার পর আন্দোলনে নতুন গতি আসে।
ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারঃ ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা দিয়ে এরশাদ রাজনৈতিকভাবে আরও কিছুদিন টিকে থাকেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বাংলাদেশ আজও বহন করছে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার যে সংস্কৃতি, তার শিকড় এরশাদের শাসনামলেই গভীরভাবে প্রোথিত হয়।
পতন ও উত্তরাধিকারঃ ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ডা. শামসুল আলম মিলন নিহত হওয়ার পর আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়। জরুরি অবস্থা ও কারফিউ দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। সেনাবাহিনীর ভেতরেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এই সংকট সামরিক পথে সমাধানযোগ্য নয়।
৪ ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা এবং ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।
পরবর্তীতে একাধিক মামলায় কারাবন্দি হয়েও এরশাদ রাজনীতিতে প্রভাবশালী থেকে যান এবং একপর্যায়ে ‘কিংমেকার’ হয়ে ওঠেন। এটি আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার একটি স্থায়ী উদাহরণ।
এরশাদের শাসন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন কখনোই গণতন্ত্রের বিকল্প নয়। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের সম্মতির বদলে বন্দুক, প্রশাসন ও কৌশলের ওপর দাঁড়ায়, সেই সরকার শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাস সেই সত্য বারবার প্রমাণ করেছে।
(লিখটা পুরাতন, তবে আনপাবলিশড ছিল)
About the Author
কাজী সফিকুল ইসলাম রাব্বী 🔴
মজদুরের নিয়মিত লেখকJournalism & Teaching
Activist
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন