১৯৪৬ সালের ৪ঠা জুলাইয়ের এক স্তব্ধ তপ্ত দুপুর। ভারতবর্ষের এমন এক রক্তক্ষয়ী কাণ্ড ঘটে গেল, যা ছিল সমকালীন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আড়াল করা রহস্য। তৎকালীন হায়দ্রাবাদ রাজ্যের ওয়ারঙ্গল জেলার কাদাবেন্দি গ্রামের আকাশ সেদিন আচমকায় কেঁপে উঠেছিল জমিদারের লেলিয়ে দেওয়া বন্দুকের গুলিতে। কোনো নামকরা বীর বা রাজা নন, বরং খালি গায়ে ধূলিমলিন তপ্ত মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন এক অতি সাধারণ তরুণ কৃষক, নাম ছিল তার ডড্ডি কোমারাইয়া।
জমিদাররা ভেবেছিল, এই একটি খুনেই সব প্রতিবাদ ঠান্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু এই একটি লাশের কৈফিয়ত নিতে প্রাণ গেছে আরও ৪,০০০ এরও অধিক প্রাণ। বিনিময়ে ৩,০০০ এর বেশি গ্রাম হয়েছিল স্বাধীন। আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল একেবারে আদিম যুগের অস্ত্র দিয়ে। লাঠি, বল্লম, গুলতি আর তীর-ধনুক ছিল হাতিয়ার। জমিদারদের বন্দুকধারী বাহিনীর বিরুদ্ধে শোষিত কৃষকরা শুরুতে গুলতি দিয়ে পাথর ছুড়ে যুদ্ধ করত। একটি লাশ, এই নাটকীয় মৃত্যুই সাধারণ মানুষের বুকে চেপে থাকা শতাব্দীর পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে এক রাতের মধ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহে বদলে দেয়।
আন্দোলনের শেষের দিকে এই কৃষকরাই নিজাম ও ব্রিটিশ বাহিনীর কাছ থেকে আধুনিক রাইফেল, রিভলভার এবং স্টেনগান পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়ে নিজস্ব 'গেরিলা স্কোয়াড' তৈরী করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই হয়তো একমাত্র গেরিলা যুদ্ধ, যা তীর-ধনুক দিয়ে শুরু হয়ে আধুনিক স্টেনগানে শেষ হয়েছিল! এই বিদ্রোহের আগুন নিভেছিল দীর্ঘ পাঁচ বছর পর, কোটি কোটি একর জমি শোষকদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে।
যদি আমরা এই আন্দোলনের ভেতরের আসল সত্য খুঁজতে যাই, তবে দেখব এর মূল চালিকাশক্তি ছিল চরম দাসত্ব থেকে নিজেদের আত্মমর্যাদা আর অস্তিত্ব ফিরে পাওয়ার এক আদিম আকাঙ্ক্ষা। সেই সময়ে তেলেঙ্গানার সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল মূলত 'ভেত্তি' নামক এক কুৎসিত ও বাধ্যতামূলক বিনা মজুরির দাসত্ব প্রথার কারণে, যেখানে নিম্নবর্ণের মানুষদের জানোয়ারের মতো খাটানো হতো কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই। এর সাথে ছিল কুখ্যাত 'জাগিরদারি' প্রথা, যার মাধ্যমে ফসল বা জমি যখন-তখন কেড়ে নেওয়া হতো এবং কৃষকদের পরিণত করা হতো ভূমিহীন চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকে।
সবচেয়ে নারকীয় ছিল জমিদারের মহলে দরিদ্র কৃষক পরিবারের যুবতী মেয়েদের জোরপূর্বক দাসী কিংবা উপপত্নী বানিয়ে রাখার সামাজিক লালসা। কিন্তু এই নিকষ অন্ধকারের বিপরীতে যখন অন্ধ্র মহাসভা এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার হাত ধরে রবি নারায়ণ রেড্ডির মতো নেতারা মুক্তির অমোঘ ডাক দিলেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন, জীবন তো এমনিতেই যাচ্ছে, তবে বীরের মতো লড়াই করেই কেন নয়!
ঠিক যখন দাক্ষিণাত্যের এই কৃষকেরা গর্জে উঠছিলেন, ঠিক সেই সময়েই অবিভক্ত বাংলায় তেভাগা আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছিল জোতদারদের আঙিনায়। দুই প্রান্তের এই সংগ্রামের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মিল ছিল রণক্ষেত্রে নারীদের অবিশ্বাস্য রণচণ্ডী রূপ।
বাংলাদেশে জুলাইয়ে যেমন মেয়েরা স্টিলের স্কেল, লাঠি, দা, বঁটি পাশাপাশি শাড়ির আঁচলের নিচে বা জামার পকেটে শুকনো মরিচের গুঁড়ো নিয়ে অকুতোভয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তেলেঙ্গানার বুকেও ঠিক একইভাবে জন্ম নিয়েছিল এক 'লঙ্কা গুঁড়ো ব্রিগেড'। জমিদার ও রাজাকারের লাঠিয়ালরা গ্রামে ঢুকলে নারীরা বঁটি, গরম পানি আর মরিচের গুঁড়ো দিয়ে আক্রমণ করত এবং শত শত পুলিশ-রাজাকার চোখে মরিচের গুঁড়ো খেয়ে অন্ধপ্রায় হয়ে পালাত। এই নারীরা অবশ্য পরবর্তীতে ঘরে পাঠানোর ফাঁদে পড়েনি, পরবর্তীতে শুধু রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ না করে রীতিমতো রাইফেল চালানো শিখে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেননারীরা।
সেখানে চাকালি ইলাম্মার মতো নিম্নবর্ণের এক সাহসী নারী যখন জমিদারের সশস্ত্র গুণ্ডাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের ফসল ও ভিটেমাটি আগলে রাখার সিংহনাদ করেছিলেন, তখন তা কেবল একখণ্ড জমির লড়াই থাকেনি, তা হয়ে উঠেছিল প্রতিটি শোষিত নারীর অস্তিত্ব রক্ষার মরণপণ সংগ্রাম।
অবশ্য এর পেছনে জমিজমার আন্দোলনের সাথে মিশে ছিল এক রক্তক্ষয়ী ভাষার লড়াই ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। হায়দ্রাবাদের কুখ্যাত শাসক নিজাম মীর ওসমান আলী খানের রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ তেলুগুভাষী সাধারণ জনগণের ওপর উর্দুকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে।
১৯৪১ সালের এক অবিশ্বাস্য সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো রাজ্যের শিক্ষার হার ছিল মাত্র ৪.৮ শতাংশ, আর তেলুগুভাষীদের ক্ষেত্রে তা নেমে গিয়েছিল মাত্র ৩.৩ শতাংশে, কারণ তাদের নিজের ভাষায় শিক্ষা বা প্রশাসনিক কাজের কোনো অধিকার ছিল না। উর্দুকরণের এই নগ্ন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তেলুগু চাষীদের সেই প্রতিরোধ আমাদের ১৯৪৮ এবং ১৯৫২ সালের অমর ভাষা আন্দোলনের প্রতিচ্ছবিকেই যেন মনে করিয়ে দেয়, যেখানে মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে বাঙালির রক্ত পিচঢালা রাজপথ লাল করেছিল।
একই সাথে ভৈয়া রাজা রামের মতো বিপ্লবী চারণ কবিদের লোকসঙ্গীতের সুর ও কবি দাশরথি কৃষ্ণমাচারিয়ার সেই বিখ্যাত কালজায়ী গর্জন 'আমার তেলেঙ্গানা কোটি রত্নের বীণা' ঠিক আমাদের দেশের মুকুন্দ দাস কিংবা একাত্তরের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গণসঙ্গীতের মতোই সাধারণ মানুষকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জ্বালানি জুগিয়েছিল।
১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট যখন ভারতবর্ষ স্বাধীনতা পেল, তখন নিজাম চরম হঠকারিতা দেখিয়ে ভারতের অংশ হতে অস্বীকার করেন এবং নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কাসিম রাজভির নেতৃত্বে লেলিয়ে দেন এক চরমপন্থী আধা-সামরিক বাহিনী, যাদের নামও ছিল 'রাজাকার'।
এই রাজাকারেরা গ্রামে গ্রামে ঢুকে যে নির্মম গণহত্যা, লুণ্ঠন আর নারীনির্যাতনের বীভৎসতা চালিয়েছিল, তা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের আলবদর-রাজাকারদের পৈশাচিক বর্বরতাকেই মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু শোষকের এই দানবীয় রূপ সাধারণ চাষীদের দমিয়ে রাখতে পারেনি, বরং তারা নিজেদের প্রায় ৪,০০০ গ্রামে নিজাম ও রাজাকারের অস্তিত্ব মুছে দিয়ে গড়ে তোলেন এক অভূতপূর্ব সমান্তরাল স্বাধীন প্রশাসন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল -গ্রাম রাজ্যমঃ
★জমিদারদের শোষণের ১০ লাখ একর জমি সাধারণ মানুষের মাঝে বণ্টন।
★ঋণগ্রস্ত কৃষকদের সমস্ত জালিয়াতির দলিল পুড়িয়ে দিয়ে ঋণমুক্ত ঘোষণা।
★নিজস্ব গণ-আদালতের মাধ্যমে দ্রুত ও সমতাবাদী বিচার ব্যবস্থা।
প্রায় ১০,০০০ স্বতঃস্ফূর্ত গ্রাম প্রতিরক্ষা কর্মী আর ২,০০০ দুর্ধর্ষ প্রশিক্ষিত guerrilla যোদ্ধার বাহিনী নিয়ে তারা জমিদারদের থেকে প্রায় ১০ লাখ একর জমি কেড়ে নিয়ে ভূমিহীনদের মাঝে বিলিয়ে দেন, জালিয়াতির সমস্ত ঋণের দলিল পুড়িয়ে দেন এবং নিজস্ব গণ-আদালতের মাধ্যমে শুরু করেন এক নতুন সমতাবাদী সমাজ ব্যবস্থা।
কিন্তুইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত মোড় আসে ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে... ১৯৪৮ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী হায়দ্রাবাদকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে 'অপারেশন পোলো' নামক এক ঝটিকা সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় নিজাম ও তাঁর কুখ্যাত রাজাকার বাহিনী বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ করে। যে কৃষকেরা একটু আগেই নিজামের বিরুদ্ধে লড়ছিল, ক্ষমতার নির্মম দাবার চালে তারা হঠাৎ নিজেদের দেশেরই সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়।
মার্কিন প্রশাসনকে কমিউনিস্টদের নিশ্চিহ্ন করার প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে ভারতের তৎকালীন সরকার নিজামের পতনের পর ভারতীয় সেনাবাহিনীকেই লেলিয়ে দেয় তেলেঙ্গানার এই মুক্ত গ্রামগুলোর ওপর। যে বুলেটে কদিন আগেও রাজাকারের বুক ঝাঁঝরা করা হয়েছিল, এবার সেই বুলেটের মুখ ঘুরে গেল খোদ নিজের দেশেরই সেনাবাহিনীর দিকে, যার ফলে প্রায় ২,০০০ বিপ্লবী প্রাণ হারান এবং ৫০,০০০-এর বেশি মানুষকে কারাবন্দী করে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়।
অবশেষে দীর্ঘ রক্তপাতের পর ১৯৫১ সালের ২৫শে অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে এই সশস্ত্র আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটলেও তেলেঙ্গানার কৃষকদের এই সুমহান সংগ্রাম বৃথা যায়নি। এই প্রচণ্ড গণবিস্ফোরণের ফলেই সরকার পরবর্তীতে 'জাগিরদারি' প্রথা উচ্ছেদ করতে এবং কঠোর ভূমি সংস্কার আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়, যা সামন্তবাদের শেষ স্তম্ভটিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল।
আজ কর্পোরেট আগ্রাসন আর নব্য শোষণের এই যুগে দাঁড়িয়ে তেলেঙ্গানার কৃষকদের সেই মুষ্টিবদ্ধ হাতের লড়াই আমাদের দেশের অধিকারহীন মানুষকে এক ধ্রুব সত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়: অধিকার কেউ কখনো রুপোর থালায় সাজিয়ে দেয় না, তা বুক চিতিয়ে ছিনিয়ে নিতে হয়।
অনেকেই বলেন, এমন অশিক্ষিতদের দেশে সমাজতন্ত্র আসবে না। তাদের জন্য এই যুদ্ধ একটা শিক্ষা। যদিও এরচেয়ে বড় শিক্ষা রাশিয়া এবং চীনেই রয়েছে। সোভিয়েত বিপ্লবের আগে রাশিয়ার অঞ্চলগুলো ছিল তৎকালে পৃথিবীর অন্যতম অশিক্ষিত এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চল, চীনের বিপ্লবের পূর্বে চীনের অবস্থাও ছিল তাই। সমাজতন্ত্র কখনোই শিক্ষিতদের গলার হার ছিল না, সমাজতন্ত্র বরাবরই মানবমুক্তির একমাত্র পথ। যেখানে যত বেশি শোষণ, সেখানে সমাজতন্ত্রের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
About the Author
কাজী সফিকুল ইসলাম রাব্বী 🔴
মজদুরের নিয়মিত লেখকJournalism & Teaching
Activist
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন