অনেক সিনেমা সমালোচক ও দর্শকের মতে বাংলাদেশের সিনেমা ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী ও প্রভাবশালী সিনেমাগুলোর একটি হলো ‘জীবন থেকে নেয়া’। ১৯৭০ সালের এপ্রিলে যখন সিনেমাটি মুক্তি পায় তখন এদেশের মানুষ পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল। আর জহির রায়হান অত্যন্ত চতুরতা ও সাহসিকতার সাথে একটি সাধারণ পরিবারের গল্পকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেলুলয়েডে বন্দি করেছিলেন। ঘরের একনায়কতান্ত্রিক চাবির গোছা হাতে রাখা স্বৈরাচারী বড় বোন ছিল মূলত আইয়ুব খান বা পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রতীক, আর নির্যাতিত পরিবারটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। সিনেমার এই অনন্য রূপকধর্মী উপস্থাপন সাধারণ মানুষকে যেভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল তা বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসেও বিরল। তাই এটাকে শুধু একটা সিনেমা বললে অন্যায় হয়ে যাবে। এটা একটা রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো, এটাকে বলা যায় বাংলাদেশের জাতীয় জাগরণের দলিল।
সিনেমায় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ ঝগড়াঝাঁটি ও দাম্পত্য, পারিবারিক টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে কাহিনী গড়ে উঠলেও এর ভেতরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি শক্তিশালী রূপক প্রতিফলিত হয়েছে বলে সমালোচনায় দেখা যায়। বড় বোনের কর্তৃত্ববাদী ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ পরিবারকে এক ধরনের দমনমূলক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করে, যা অনেক ব্যাখ্যায় স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। আর পরিবারটি বৃহত্তর অর্থে বাঙালি জাতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপিত। ‘চাবির গোছা’ এখানে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীভূত রূপকে নির্দেশ করেছিল, যা দখলে রেখে কর্তৃত্ব বজায় রাখার ধারণাকে প্রকাশ করেছিল। আর সেই নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামকেই রূপকভাবে বাঙালির স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলনের প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। জহির রায়হান রূপকের মাধ্যমেই এই সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ইঙ্গিত করেছিলেন, যা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চেতনা এবং ১৯৬০ এর দশকের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পরবর্তী জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের পূর্বাভাস হিসেবে সিনেমাটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এই সিনেমাটির আরেক ঐতিহাসিক শক্তি ছিল এর সংগীতগুলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ এই সিনেমাটিতে ব্যবহৃত হওয়ার মাধ্যমে গানটি নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করে এবং পরবর্তীতে যা কিনা বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যা এই সিনেমার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। একইভাবে কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ওই লৌহকপাট’ চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক বক্তব্যকে আরও শক্তিশালী করে। আবার ছাদে বসে খান আতাউর রহমানের ‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে' এর মতো প্রগতিশীল গানগুলোকে জহির রায়হান অত্যন্ত সুকৌশলে সিনেমার পটভূমিতে যুক্ত করেছিলেন, যা সেই সময়ে সেন্সর বোর্ডের কর্তারা ঠিকঠাক বুঝতে পারেননি।
সিনেমাটির সেন্সরশিপের কাহিনী আরও অবাক করার মতো। জানা যায়, তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং সেন্সর বোর্ড ছবিটির অন্তর্নিহিত রূপক বা পলিটিক্যাল মেসেজ ধরে ফেলেছিল, তাই তারা সিনেমাটির তীব্র বিরোধিতা করেছিল। বিশেষ করে রাও ফরমান আলী জহির রায়হানকে বেশ কিছু দৃশ্য ও সংলাপ কাটার জন্য তীব্র চাপ সৃষ্টি করে, অন্যথায় সিনেমাটি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার হুমকি দেওয়া হয়। সিনেমাটির সেন্সর সার্টিফিকেট আটকে দেওয়ায় পূর্বনির্ধারিত সময়ে ছবিটি মুক্তি পেতে বাধা পায়। তবে জহির রায়হান সামরিক শাসকের সামনে কোনভাবেই মাথা নত না করে আইনগতভাবে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। সবশেষে, পাকিস্তানি সামরিক জান্তার তীব্র আপত্তি, দৃশ্য কাটার চাপ এবং সেন্সর সার্টিফিকেট আটকে দেওয়ার পরও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনতা ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের গণবিক্ষোভের মুখে সামরিক কর্তৃপক্ষ সিনেমাটিকে কোনো প্রকার কর্তন ছাড়াই মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল।
সিনেমার প্রায় শেষদিকের গণমিছিলের একটি দৃশ্য তৎকালীন রাজনৈতিক উত্তাপকে প্রতীকীভাবে পর্দায় প্রতিফলিত করে, যেখানে রাজ্জাকসহ অন্যান্য আন্দোলনকারীরা জনসমুদ্রে মিশে গিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে স্লোগান দিতে থাকে এবং চারপাশে অধিকার আদায়ের তীব্র ধ্বনি শোনা যায়। সেই দৃশ্যে শ্রমিক-জনতার ক্ষোভ এবং ছাত্রসমাজের রাজনৈতিক দাবির একটি যৌথ আবহ সৃষ্টি হয়। উক্ত মিছিলে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ এবং ‘১১ দফা মানতে হবে’ ধরনের স্লোগান সমকালীন গণআন্দোলনের প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। জহির রায়হান এই দৃশ্যের মাধ্যমে ব্যক্তিগত পরিসর অতিক্রম করে সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সিনেমায় ধারণ করেছেন, যা পূর্ব পাকিস্তানের গণআন্দোলনের চেতনার একটি শক্তিশালী রূপক উপস্থাপন হিসেবে বিবেচিত হয়। আর একদম শেষ দৃশ্যটি তো প্রতীকীভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর যখন আনোয়ার হোসেনসহ অন্যান্য আন্দোলনকারীরা জেল থেকে মুক্তি পান, তখন পুরো পরিবার তাদের বরণ করে নেয়। রোজী সামাদের নবজাতক সন্তান ‘মুক্তি’কে হাতে নিয়ে দৃঢ়ভাবে ‘মুক্তি’ বলাটা ছিল বাঙালি জাতির বহু আকাঙ্ক্ষিত মুক্তিরই এক প্রতীকী রূপ। এই অনাবিল আনন্দের মুহূর্তে যখন সাধারণ মানুষ ভালোবাসার অর্ঘ্য হিসেবে আনোয়ার হোসেনসহ অন্যান্যদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিতে এগিয়ে আসে, তখনই সিনেমাটি এক গভীর ভাবগাম্ভীর্য লাভ করে। আনোয়ার হোসেন সেই মালা ফিরিয়ে দিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে বলেন, ‘এই মালা তোমরা আমাদের গলায় দিও না, আমাদের মুক্তির জন্য যারা জীবন বিসর্জন দিয়েছে, দেশ ও তার মাটির জন্য যারা নিজের প্রাণকে তুচ্ছ মনে করেছে তারা এই মালাটির প্রাপ্য।’ এই একটি সংলাপের মাধ্যমে জহির রায়হান সিনেমার পারিবারিক খোলস পুরোপুরি ভেঙে ফেলে দর্শকদের নিয়ে যান বৃহত্তর জাতীয়তাবোধের আঙিনায়।
সবমিলিয়ে 'জীবন থেকে নেয়া' শুধু একটি সিনেমা হিসেবেই শেষ হয়ে যায়নি। এটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। সেলুলয়েডের ফিতা কীভাবে একটা আস্ত জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করতে পারে, 'জীবন থেকে নেয়া' তার এক শাশ্বত ও কালজয়ী উদাহরণ। যারা বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে গর্ব করতে চায়, তাদের জন্য এই সিনেমা অবশ্যদর্শনীয়। আজও এই সিনেমাটি দেখার সময় প্রতিটা দৃশ্যে, প্রতিটা সংলাপে তৎকালীন বাঙালির রক্তগরম করা আবেগের স্পন্দন টের পাওয়া যায়।
About the Author
Fazle Rabby Rashed
মজদুরের নিয়মিত লেখকActivist
ব্যক্তিগতভাবে আমি একজন শিল্প-সংস্কৃতিমনা, প্রগতিশীল, উদারপন্থী ও মুক্তচিন্তার মানুষ। আমি বিশ্বাস করি শিল্প-সংস্কৃতিই মানুষের আসল পরিচয়। রাজনীতি, সমাজ, শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আড্ডা আর কাটাছেঁড়া করতে ভালো লাগে। তবে চলচ্চিত্রের দুনিয়াটা আমার একটু বেশিই প্রিয়। তাই চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি, আলোচনা-সমালোচনা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন