দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং নাৎসিদের হলোকাস্ট নিয়ে বিশ্বসিনেমায় অসংখ্য কাজ হয়েছে। তার মধ্যে রোমান পোলানস্কির 'The Pianist' আজও অন্য সব সিনেমার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং উঁচু জায়গায় অবস্থান করে। পোলানস্কি নিজেই ক্রাকো গেটো থেকে বেঁচে ফেরা একজন মানুষ ছিলেন। সেই যুদ্ধেই তিনি তার মাকে হারিয়েছিলেন। তাই এই সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে যে নিষ্ঠুরতা আর শূন্যতা উঠে এসেছে তা কোনো কাল্পনিক গল্প না, এটা পরিচালকের নিজের চোখে দেখা বাস্তবতারই প্রতিফলন। ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া তার এই সিনেমাটি মূলত একজন পোলিশ-ইহুদি পিয়ানোবাদক ভ্লাদিস্লাভ স্পিলম্যানের আত্মজীবনী অবলম্বনে নির্মিত। স্টিভেন স্পিলবার্গ যখন তার বিখ্যাত সিনেমা Schindler's List বানানোর সিদ্ধান্ত নেন তখন তিনি প্রথমে এটি পরিচালনার প্রস্তাব রোমান পোলানস্কিকে দিয়েছিলেন। কিন্তু পোলানস্কি তখন মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না। কারণ নিজের মায়ের মৃত্যুর ট্রমা ও ক্রাকো গেটোর স্মৃতি তখনো তার হৃদয়ে বড্ড তাজা ছিল। সেই কারণে পরবর্তীতে স্পিলবার্গ নিজেই সেটি পরিচালনা করতে বাধ্য হন। আর পোলানস্কি আরও কয়েক বছর সময় নিয়ে নিজের দেশের গল্প স্পিলম্যানের আত্মজীবনীর মাধ্যমে The Pianist সিনেমার মুক্তি দেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, এই সিনেমার শুটিং চলাকালীন ওয়ারশর রাস্তায় পোলানস্কি এমন একজনের দেখা পেয়েছিলেন যে কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোলানস্কি ও তার পরিবারকে বাঁচতে সাহায্য করেছিলেন। এভাবে নিজের অতীতকে সিনেমার সেটে পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি জীবন্ত ইতিহাসের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
সিনেমার শুরুটা হয়েছে চমৎকার এক শান্ত পরিবেশে। স্পিলম্যান নামের এক পিয়ানোবাদক রেডিও স্টেশনে বসে পিয়ানোতে সুর তুলছেন, আর তার পরপরই বাইরে শুরু হয় বোমাবর্ষণ। পোল্যান্ডের উপর জার্মান বাহিনীর সেই অতর্কিত হামলার দৃশ্যটি যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দেয় পুরো শহরকে। এরপর ওয়ারশ (Warsaw) শহর দখল করে নাৎসিরা ধীরে ধীরে ইহুদিদের উপর পদ্ধতিগত অমানবিক নির্যাতন শুরু করে। তারা প্রথমে ইহুদীদের বাহুবন্ধনী নিষিদ্ধ করে, তারপর রেস্টুরেন্ট, পার্ক, তারপর সংকীর্ণ গেটোতে গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য করে সবশেষে ট্রেন ভর্তি করে তাদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়। এতকিছুর মধ্য দিয়ে স্পিলম্যানও তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এভাবে সবকিছু হারিয়ে এক বুক হাহাকার আর একাকীত্ব নিয়ে ধ্বংসস্তূপের মাঝে পালিয়ে বেড়িয়ে নিজের জান বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে থাকে। স্পিলম্যান এখানে কোন প্রথাগত নায়ক ছিলেন না যে তিনি নাৎসিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ, তার চাইতেও তার বড় পরিচয় তিনি একজন শিল্পী, একজন পিয়ানিস্ট। আর এই পিয়ানিস্ট হিসেবে ভ্লাদিস্লাভ স্পিলম্যানের চরিত্রে অ্যাড্রিয়েন ব্রডির অভিনয় শুধু অভিনয় ছিল না, এটা ছিল এক ধরণের আত্মত্যাগ। এই চরিত্রের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা ফুটিয়ে তুলতে ব্রডি তার ফ্ল্যাট, গাড়ি বিক্রি করে দিয়ে সমাজ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে নিয়েছিলেন। তিনি প্রায় ১৪ কেজি ওজন কমিয়েছিলেন এবং প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পিয়ানো বাজানোও শিখতেন। এমনকি সিনেমার বেশিরভাগ পিয়ানো শট ব্রডি নিজেই খেলেছেন। ক্লোজ-আপ শটগুলোতে তার আঙুল চালানোও একদম নির্ভুল ছিল। যদিও সিনেমার সাউন্ডট্র্যাকে যে পিয়ানোর সুর শোনা যায় সেটি বাজিয়েছিলেন বিখ্যাত পোলিশ পিয়ানোবাদক জানুস ওলেজনিচাক। সিনেমার মার্জিত শিল্পী স্পিলম্যান যখন একসময় ক্ষুধার জ্বালায় ভাঙা দেয়ালের ওপাশ থেকে বাসি খাবারের ক্যান খুঁজে বেড়ায় তখন তার চোখের সেই শূন্যতা ও বেঁচে থাকার আকুতি স্তব্ধ করে দেয়ার মতো। আর এই রোলের জন্যই অ্যাড্রিয়েন ব্রডি কনিষ্ঠতম সেরা অভিনেতা হিসেবে রিচার্ড ড্রেফাস এর পুরাতন রেকর্ড ভেঙে ২৯ বছর বয়সে অস্কার জয়ের গৌরব অর্জন করে নতুন রেকর্ড তৈরি করেন। ২৩ বছর পার হয়ে গেলেও এখনো এই রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারেনি।
সিনেমার নাম যেমন 'দ্য পিয়ানিস্ট', তাই সঙ্গীতও এর অন্যতম প্রধান উপাদান। শোপ্যাঁ’র সুরগুলো এখানে কেবল বিনোদন হিসেবে ছিল না। এগুলো ছিল স্পিলম্যানের বেঁচে থাকার অক্সিজেন। যুদ্ধের সেই হাহাকারের মাঝেও যখন সে তার অবশ হয়ে যাওয়া আঙুলগুলো দিয়ে মনে মনে বা বাতাসে পিয়ানো বাজানোর অভিনয় করে তখন বোঝা যায় শিল্প মানুষকে কতটা শক্তি এবং বাঁচার অনুপ্রেরণা দিতে পারে। সিনেমার অন্যতম সেরা এবং মাস্টারপিস একটি দৃশ্য হলো, এতো ধ্বংসস্তূপের মাঝে খাবার খুঁজতে গিয়ে যখন স্পিলম্যানকে এক জার্মান অফিসার উইলম হোসেনফেল্ডের সম্মুখীন হতে হয়। নিজেকে পিয়ানিস্ট হিসেবে পরিচয় দেয়ার পর জার্মান অফিসারের আদেশে ভয়ে ভয়ে, প্রচণ্ড শীতে জমে যাওয়া আঙুল নিয়ে যখন সে কাঁপতে কাঁপতে পিয়ানোতে শোপ্যাঁ’র 'Ballade in G minor' বাজাতে শুরু করে, তখন সেই সুরের মূর্ছনায় জার্মান অফিসারের চোখের কোণে জল এসে চোখ ঝাপসা হয়ে কিছুক্ষণের জন্য নাৎসি ও ইহুদির ভেদাভেদও মুছে যায়। এই জার্মান অফিসার উইলম হোসেনফেল্ড কোন কাল্পনিক চরিত্র ছিলেন না। বাস্তব জীবনে এই ব্যক্তি স্পিলম্যান ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন পোলিশ ও ইহুদিকে যুদ্ধকালীন সময়ে লুকিয়ে থাকতে এবং খাবার দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। শেষমেশ ১৯৫২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক যুদ্ধবন্দী ক্যাম্পে মারা যাওয়ার ৫৪ বছর পরে ২০০৭ সালে ইসরায়েল সরকার তাকে মরণোত্তর ‘Righteous Among the Nations’ উপাধিতে ভূষিত করে। যেটা কিনা অ-ইহুদিদেরকে দেওয়া তাদের সর্বোচ্চ সম্মান। একজন জার্মান অফিসারের এরকম মানবিক দিকটি দেখিয়ে পোলান্সকি প্রমাণ করেছিলেন যে, যুদ্ধ সব সময় সব মানুষকে অমানুষ বানাতে পারে না। কিছু মানুষের ভেতরে তখনও বেঁচে থাকে মনুষ্যত্ব।
About the Author
Fazle Rabby Rashed
মজদুরের নিয়মিত লেখকActivist
ব্যক্তিগতভাবে আমি একজন শিল্প-সংস্কৃতিমনা, প্রগতিশীল, উদারপন্থী ও মুক্তচিন্তার মানুষ। আমি বিশ্বাস করি শিল্প-সংস্কৃতিই মানুষের আসল পরিচয়। রাজনীতি, সমাজ, শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আড্ডা আর কাটাছেঁড়া করতে ভালো লাগে। তবে চলচ্চিত্রের দুনিয়াটা আমার একটু বেশিই প্রিয়। তাই চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি, আলোচনা-সমালোচনা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন