সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

সিনেমার ছদ্মবেশে একটুখানি সম্মানের খোঁজ: কিয়ারোস্তামির Close-Up

সিনেমার ক্যামেরা যখন মানুষের জীবনের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় তখন সত্য আর কল্পনার সীমানাটা আবছা হয়ে যায়। ১৯৯০ সালে ইরানি মাস্টারমেকার আব্বাস কিয়ারোস্তামি ঠিক এই জাদুটাই করেছিলেন তার ‘Close-Up’ সিনেমায়। একটি সত্য অপরাধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই সিনেমাটি প্রামাণ্যচিত্র ও কল্পকাহিনীর মধ্যকার চেনা দেয়ালটিকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

Fazle Rabby Rashed
Fazle Rabby Rashed মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 4 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 120 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 1 জন পাঠক পড়েছেন
সিনেমার ছদ্মবেশে একটুখানি সম্মানের খোঁজ: কিয়ারোস্তামির Close-Up

সিনেমার ক্যামেরা যখন মানুষের জীবনের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় তখন সত্য আর কল্পনার সীমানাটা আবছা হয়ে যায়। ১৯৯০ সালে ইরানি মাস্টারমেকার আব্বাস কিয়ারোস্তামি ঠিক এই জাদুটাই করেছিলেন তার ‘Close-Up’ সিনেমায়। একটি সত্য অপরাধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই সিনেমাটি প্রামাণ্যচিত্র ও কল্পকাহিনীর মধ্যকার চেনা দেয়ালটিকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

সম্পূর্ণ সিনেমাটি একটি সত্য ঘটনার উপর ভিত্তি করে তৈরি। তেহরানের এক দরিদ্র যুবক, হোসেইন সাবজিয়ান। যে কিনা একজন সিনেমার প্রচণ্ড ভক্ত। বিশেষ করে ইরানি পরিচালক মোহসেন মাখমালবাফ এর কাজের সে দারুণ অনুরাগী ছিল। তো একদিন বাসে এক ধনী পরিবারের এক মহিলার সাথে আলাপকালে সাবজিয়ান নিজেকে বিখ্যাত পরিচালক 'মোহসেন মাখমালবাফ' হিসেবে পরিচয় দেয়। এরপর সে ঐ পরিবারের বাড়িতে যাতায়াত শুরু করে এবং বলে যে তার পরবর্তী সিনেমায় সে ঐ পরিবারের মানুষদের অভিনয় করাবে এবং তাদের বাড়িটিও শুটিংয়ের জন্য ব্যবহার করবে। একদিন একপর্যায়ে পরিবারটি তাকে প্রতারক হিসেবে সন্দেহ করে এবং পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়।

কিয়ারোস্তামি যখন পত্রিকায় এই খবরটি পড়েন তখন তিনি চলমান আরেক সিনেমার কাজ থামিয়ে তৎক্ষণাৎ এই ঘটনার দিকে মনোযোগ দেন। তিনি আদালতের অনুমতি নিয়ে সাবজিয়ানের আসল বিচার প্রক্রিয়া ক্যামেরাবন্দী করেন এবং ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত মানুষদের নিয়েই পুরো সিনেমাটি আবার পুনর্নির্মাণ করেন। আরেক বড় বিষয় হলো, এদের কেউই পেশাদার অভিনেতা ছিলেন না। কিয়ারোস্তামি যেভাবে আসল আদালতের ট্রায়াল এবং পরে ফ্ল্যাশব্যাকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে সাজিয়েছেন তা এককথায় মাস্টারক্লাস। সিনেমার ক্যামেরা যখন আদালতের ভেতরে সাবজিয়ানের মুখের উপর ক্লোজ-আপ শটে স্থির হয় তখন যে কোন মানুষেরই অপরাধীর প্রতি ক্ষোভের বদলে তৈরি হয়ে যায় এক গভীর সমবেদনা। পরিচালক এভাবেই এই সিনেমায় ডকুমেন্টারি এবং ফিকশনের মধ্যকার দেয়ালটি পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে। এখানে অপরাধের চেয়েও অপরাধীর মনস্তত্ত্বকে বেশি খতিয়ে দেখিয়েছে। আদালতে সাবজিয়ানের একটি উক্তি, ‘আমি যে মাখমালবাফ সেজেছিলাম তা কোনো লোভ থেকে নয়। আমি যখনই নিজেকে সাবজিয়ান ভাবতাম, আমার মনে হতো আমি এক নিঃস্ব, গুরুত্বহীন মানুষ। কিন্তু মাখমালবাফ সেজে আমি মানুষের শ্রদ্ধা পেয়েছি। তারা আমার কথা মন দিয়ে শুনেছে’ পুরো সিনেমার প্রাণ হিসাবে দাঁড়িয়েছে। সিনেমাটি দেখায় কীভাবে একটি সমাজ কোন মানুষকে তার দারিদ্র্যের কারণে অবহেলা করে, আর কীভাবে শিল্প বা সিনেমার একটা ভুয়া পরিচয় একজন মানুষকে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও সম্মান বা আত্মমর্যাদা দেয়। এটি ছিল একটি মানুষের একাকীত্ব ও সমাজে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একপ্রকার আকুল আর্তনাদ।

শেষ দৃশ্যটি বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে এক অবিসংবাদিত দৃশ্য। জেল থেকে মুক্তির পর সাবজিয়ানের সামনে এসে দাঁড়ান আসল মহসেন মাখমালবাফ। এরপর মোটরসাইকেলের পেছনে সাবজিয়ানকে বসিয়ে তারা যখন সেই প্রতারিত পরিবারের দিকে রওনা হন, কিয়ারোস্তামি তখন দূর থেকে ক্যামেরা তাক করে রাখেন। অডিওর কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও সেই দৃশ্যটি অত্যন্ত বাস্তব এবং আবেগঘন হয়ে যাওয়ার কারণে যে কারোর চোখেই পানি চলে আসতে বাধ্য। জানা যায়, কিয়ারোস্তামি দৃশ্যটি অত্যন্ত বাস্তব এবং আবেগঘন করতে ইচ্ছাকৃতভাবেই অডিওতে একটু যান্ত্রিক ত্রুটি রেখছিল। জেনে রাখা উচিত, সাইট অ্যান্ড সাউন্ড ম্যাগাজিনের সমালোচকদের ভোটে কিয়ারোস্তামির এই সিনেমা সর্বকালের সেরা ৪৩টি সিনেমার তালিকায় স্থান করে নিয়েছিল। সব মিলিয়ে ‘ক্লোজ-আপ’ একটি পরম অনুভূতির নাম। ক্ষমা, মানবিকতা এবং পুনর্মিলনের এতো পরম সুন্দর দৃশ্য খুব কম সিনেমাতেই দেখা গেছে। সিনেমা যদি মানুষের আত্মাকে স্পর্শ, মানুষের অস্তিত্ব ও শিল্পের গভীর সম্পর্ককে অনুভব করার মাধ্যম হয় তবে কিয়ারোস্তামির এই ‘Close-Up’ সেই মাধ্যমের চূড়ান্ত একটি রূপ।

#Close_Up_সিনেমা #আব্বাস_কিয়ারোস্তামি #ইরানি_সিনেমা #হোসেইন_সাবজিয়ান #মোহসেন_মাখমালবাফ #বিশ্ব_চলচ্চিত্র #সিনেমা_বিশ্লেষণ #চলচ্চিত্র_সমালোচনা
Fazle Rabby Rashed

About the Author

Fazle Rabby Rashed

মজদুরের নিয়মিত লেখক

Activist

ব্যক্তিগতভাবে আমি একজন শিল্প-সংস্কৃতিমনা, প্রগতিশীল, উদারপন্থী ও মুক্তচিন্তার মানুষ। আমি বিশ্বাস করি শিল্প-সংস্কৃতিই মানুষের আসল পরিচয়। রাজনীতি, সমাজ, শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আড্ডা আর কাটাছেঁড়া করতে ভালো লাগে। তবে চলচ্চিত্রের দুনিয়াটা আমার একটু বেশিই প্রিয়। তাই চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি, আলোচনা-সমালোচনা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast