ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় একটা অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করেছিল। শতবর্ষের ঐতিহ্য, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৌদ্ধিক কেন্দ্র – এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে প্রত্যাশার শেষ ছিল না। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই উত্তেজনা একটা ধীর হতাশায় রূপ নিতে শুরু করে। এটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা নয় – এটা একটা কাঠামোর গল্প, যে কাঠামো বারবার শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে থামিয়ে দেয়।
পরীক্ষার্থী বানানোর কারখানা
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে প্রথম যে জিনিসটা মাথায় ঢোকে – এখানে শিক্ষার মূল লক্ষ্য জ্ঞান নয়, পরীক্ষা। কয়েক বছরের প্রশ্ন সমাধান করে, লেকচার হুবুহু মুখস্থ করে এখানে ভালো ফলাফল করা যায়। বহু বিভাগ এখনো পুরোনো ইয়ার সিস্টেমে চলছে, যেখানে একটিমাত্র ফাইনাল পরীক্ষায় ৭০% নম্বর। সারা বছরের পড়াশোনা, কৌতূহল, গবেষণার আগ্রহ – সব কিছু সেই একটি রাতের মুখস্থের কাছে গিয়ে ঠেকে।
Outcome-Based Education চালু হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষকদের সত্যিকারের সম্পৃক্ততা ছাড়া, কোনো গভীর পর্যালোচনা ছাড়া। নামটা বদলাচ্ছে, কিন্তু ভেতরের দর্শন সেই আগের মতোই।
পুরোনো মানচিত্র দিয়ে নতুন দুনিয়া চেনার চেষ্টা
কারিকুলামের কথা বলতে গেলে একটু খারাপই লাগে। এমন সিলেবাস পড়ানো হচ্ছে, যা দিয়ে না একাডেমিয়ায় টিকে থাকা যাবে, না ইন্ডাস্ট্রিতে। রিসার্চ মেথডোলজি শেখানোর কোনো কাঠামো নেই। প্রোগ্রামিং বা আধুনিক কম্পিউটেশনাল টুলসের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। MATLAB-এর মতো মৌলিক সফটওয়্যারের লাইসেন্সটুকুও নেই।
ফলে যে শিক্ষার্থী গবেষণায় আসতে চায়, সে দরজায় পৌঁছানোর আগেই হোঁচট খায়।
গবেষণার সুযোগ; কিন্তু শুধু "যোগ্যদের" জন্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের মাত্র ২% গবেষণায় যায়। এই সংখ্যাটা নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়।
আর থিসিসের সুযোগ? সিজিপিএ ৩-এর নিচে হলে নেই। পৃথিবীর বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পূর্বশর্ত হলো আগ্রহ, দক্ষতা, আর প্রাসঙ্গিক পটভূমি। কিন্তু এখানে একটা সংখ্যাই শেষ কথা। অনেক মেধাবী, আগ্রহী শিক্ষার্থী শুধু এই কারণে গবেষণার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এটা অপচয়, এবং এটা অন্যায্যও।
Turnitin, Springer, Elsevier, IEEE Xplore, APS Journals – এসব প্ল্যাটফর্মে প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাক্সেস নেই। মানে একজন শিক্ষার্থী দুনিয়ার জ্ঞানভাণ্ডার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গবেষণা করার চেষ্টা করছে। কোনো রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ নেই, ফেলোশিপ নেই। তাই টিউশন করেই বাঁচতে হয়, আর গবেষণার সময়টুকু সেই ফাঁকেই খুঁজতে হয়।
ফর্ম পূরণেই যায় সুযোগ
প্রশাসনিক জটিলতার কথা না বললেই নয়। একটা ফর্ম ঠিক করতে কত দপ্তরে যেতে হবে, কতদিন অপেক্ষা করতে হবে – এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই গোলকধাঁধায় পড়ে আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ হাতছাড়া হওয়ার ঘটনা বিরল নয়। এটা শুধু একজন শিক্ষার্থীর ক্ষতি নয়। এটা দেশের মানবসম্পদের অপচয়।
৫৯টি রিসার্চ সেন্টার, কিন্তু শিক্ষার্থীর দরজা বন্ধ
কাগজে-কলমে ৫৯টি রিসার্চ সেন্টার আছে। কিন্তু বাস্তবে এগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে কতটা উন্মুক্ত? কতজন শিক্ষার্থীকে ফেলো নিয়োগ দেয়া হয় এখানে? এতগুলো রিসার্চ সেন্টার থেকে কতগুলো আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা বের হয়? গবেষণা মানে শুধু প্রতিষ্ঠান নয় – মানে আউটপুট, পিয়ার রিভিউড জার্নালে পাবলিকেশন, এবং শিক্ষার্থীদের সত্যিকার অংশগ্রহণ। সেটা এখানে খুব কম।
তাহলে কী করতে হবে?
কিছু সংস্কার আছে যেগুলো কঠিন নয়, শুধু সদিচ্ছা দরকার:
- গবেষণায় বরাদ্দ কমপক্ষে ১০%-এ নিয়ে যেতে হবে, বিভাগ ও ইন্সটিটিউটভিত্তিক বাজেট ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
- থিসিসে সিজিপিএ-র বাধা তুলে দিতে হবে; আগ্রহ ও দক্ষতাকে মূল্যায়নের কেন্দ্রে আনতে হবে।
- একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার ট্রেনিং সেন্টার চাই, যেখানে আধুনিক টুলস শেখার সুযোগ থাকবে।
- আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাক্সেস – এটা বিলাসিতা নয়, প্রয়োজনীয়তা।
- RA ও TA পদ চালু করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা টিউশন ছেড়ে গবেষণায় সময় দিতে পারে।
- একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার, যেখানে স্কলারশিপ, উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন সহজে পাওয়া যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রীর দোকান নয়। এটা হওয়ার কথা ছিল নতুন জ্ঞান তৈরির জায়গা, মানুষ গড়ার কেন্দ্র। কিন্তু যখন একটা বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে বিসিএস কোচিং সেন্টারে পরিণত হয়, তখন তার গবেষণামূলক আত্মাটা হারিয়ে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পথ দুটো। কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে গড়া, অথবা আস্তে আস্তে প্রাসঙ্গিকতা হারানো। এই সংকট লুকানোর সুযোগ নেই। এখন দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষতা, এবং শিক্ষার্থীকে মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা।
About the Author
Fatin Ishraque
সহ- সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন