মধ্যবিত্ত শব্দটা আমাদের কাছে খুব পরিচিত। চাকরি করে, মোটামুটি ভালো আয় করে, পরিবারের খরচ চালায়, ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করার চেষ্টা করে, সন্তানকে ভালোভাবে পড়াতে চায়, নিজের একটা বাড়ি বা গাড়ির স্বপ্ন দেখে। আমরা সহজেই তাকে মধ্যবিত্ত বলে দিই। কিন্তু রাজনীতির জায়গা থেকে প্রশ্ন করলে বিষয়টা এতটা সহজ থাকে না। একজন মানুষ কত টাকা আয় করে, শুধু সেটা দিয়ে তার শ্রেণিগত অবস্থান বোঝা যায় না। সে কীভাবে আয় করছে, তার শ্রমের ওপর তার কতটা নির্ভরতা আছে, উৎপাদনের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী এবং অন্যের শ্রমের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে কি না, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই। সে নিজেও অনেক সময় পুঁজির চাপে থাকে, আবার একই সঙ্গে পুঁজির অংশ হওয়ার স্বপ্নও দেখে। চাকরি হারানোর ভয় তার আছে, বেতন বাড়ে না, বাজারের দাম বাড়ে, বাড়িভাড়া বাড়ে, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ বাড়ে। কিন্তু তারপরও সে অনেক সময় এমন একটা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে যেখানে সে নিজেই একজন মালিক হবে। আজ সে অন্যের প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে, কাল নিজের প্রতিষ্ঠান করবে। আজ সে বেতন নিচ্ছে, কাল হয়তো সে অন্যকে বেতন দেবে। আজ সে চাকরির নিরাপত্তা চায়, কাল হয়তো সে নিজের ব্যবসার মুনাফা নিয়ে ভাববে। ফলে তার রাজনৈতিক অবস্থান অনেক সময় বর্তমান বাস্তবতার চেয়ে ভবিষ্যতে সে কী হতে চায়, তার ওপর বেশি নির্ভর করে।
এখানেই একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন আসে। আমরা কি আমাদের বর্তমান শ্রেণিগত অবস্থান থেকে রাজনীতি করি, নাকি ভবিষ্যতে যে অবস্থানে যেতে চাই, সেই কল্পিত অবস্থান থেকে রাজনীতি করি। একজন মধ্যবিত্ত মানুষ আজ নিজের কম বেতন নিয়ে ক্ষুব্ধ হতে পারে, কিন্তু একই মানুষ যখন শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর দাবি শুনে ব্যবসার ক্ষতির কথা বলতে শুরু করে, তখন তার অবস্থানের দ্বন্দ্বটা স্পষ্ট হয়ে যায়। সে নিজের জন্য বেশি আয় চায়, কিন্তু অন্যের আয় বাড়ানোর প্রশ্নে হিসাব শুরু করে। সে নিজের চাকরির নিরাপত্তা চায়, কিন্তু শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তাকে অনেক সময় ব্যবসার ওপর চাপ হিসেবে দেখে।
এটা শুধু ব্যক্তিগত ভণ্ডামির বিষয় নয়। এর পেছনে একটা সামাজিক বাস্তবতা আছে। পুঁজিবাদ মানুষকে শুধু শ্রম বিক্রি করতে শেখায় না, একই সঙ্গে তাকে ওপরে ওঠার স্বপ্নও দেখায়। তাকে বলা হয় আরও দক্ষ হও, আরও পরিশ্রম করো, নিজেকে উন্নত করো, একদিন তুমিও সফল হবে। এতে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। সমাজে এমন একটা ব্যবস্থা কেন আছে যেখানে সবার সফল হওয়ার সুযোগ সমান নয়। কেন একজন মানুষ জন্ম থেকেই সম্পদ, ভালো শিক্ষা এবং সুযোগ নিয়ে বড় হয়, আর অন্য একজনকে জীবনের শুরু থেকেই টিকে থাকার জন্য লড়তে হয়।
আমরা তখন সামাজিক সমস্যাগুলোকে ব্যক্তিগত সমস্যায় দেখতে শুরু করি। কেউ চাকরি পাচ্ছে না, আমরা বলি তার দক্ষতা কম। কারও বেতন কম, আমরা বলি তাকে আরও দক্ষ হতে হবে। কেউ ব্যবসা করতে পারছে না, আমরা বলি তার পরিকল্পনা ভালো নয়। কিন্তু খুব কম সময় আমরা প্রশ্ন করি, অর্থনীতির কাঠামোটা আসলে কাদের জন্য কাজ করছে। কেন একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য তাকে অন্য মানুষের সঙ্গে সারাক্ষণ প্রতিযোগিতা করতে হবে। কেন একজনের মুনাফা অনেক সময় অন্য একজনের কম মজুরির সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে।
এই জায়গায় এসে মধ্যবিত্তের রাজনীতিটা আরও পরিষ্কার হয়। দ্রব্যমূল্য বাড়লে মধ্যবিত্ত ক্ষুব্ধ হয়। বাড়িভাড়া বাড়লে ক্ষুব্ধ হয়। চাকরির নিরাপত্তা কমলে ক্ষুব্ধ হয়। চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ বাড়লে ক্ষুব্ধ হয়। কিন্তু শ্রমিক মজুরি বাড়ানোর আন্দোলন করলে সে হয়তো বলে ব্যবসা কীভাবে চলবে। কৃষক ন্যায্য দাম চাইলে বলে বাজারে দাম বেড়ে যাবে। হকার জীবিকার জন্য রাস্তায় বসলে বলে শহর নষ্ট হচ্ছে। গৃহকর্মী বেশি মজুরি চাইলে সেটাকে অনেক সময় নিজের পরিবারের অতিরিক্ত খরচ হিসেবে দেখা হয়।
তাহলে প্রশ্নটা আবার ফিরে আসে। মধ্যবিত্ত আসলে কার পক্ষে। নিজের বর্তমান জীবনের পক্ষে, নাকি এমন একটা ভবিষ্যতের পক্ষে যেখানে সে নিজেই একদিন মালিক হতে পারে। যদি তার রাজনৈতিক চিন্তা ভবিষ্যতে মালিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সে হয়তো এমন একটা ব্যবস্থাকেই রক্ষা করছে যে ব্যবস্থা আজ তাকে নিজের জীবন চালাতেই চাপের মধ্যে রাখছে।
তবে মধ্যবিত্তকে শুধু দোষ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ মধ্যবিত্ত নিজেও এই ব্যবস্থার ভেতরে থাকা নানা ধরনের অনিশ্চয়তার শিকার। ছোট ব্যবসায়ী বড় পুঁজির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে না। চাকরিজীবী যেকোনো সময় চাকরি হারাতে পারে। ছোট উদ্যোক্তা ঋণের চাপে পড়ে যেতে পারে। উচ্চশিক্ষিত তরুণ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকতে পারে। একটা বড় অসুস্থতা কয়েক বছরের সঞ্চয় শেষ করে দিতে পারে। অর্থাৎ বাইরে থেকে মধ্যবিত্ত যতটা নিরাপদ মনে হয়, বাস্তবে তার অবস্থান অনেক বেশি ভঙ্গুর।
সমস্যাটা হলো, এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও সে অনেক সময় শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে নিজের মিলটা দেখতে চায় না। কারণ সে ভয় পায় নিচে নেমে যাওয়াকে। সে শ্রমিক হতে চায় না। সে বরং একদিন মালিক হতে চায়। এই মানসিক অবস্থাটা বোঝা জরুরি। কারণ শ্রেণিচেতনা শুধু এই উপলব্ধি নয় যে আমি কষ্টে আছি। বরং প্রশ্ন হলো, আমি কেন কষ্টে আছি। আমার শ্রমের মূল্য কে নির্ধারণ করছে। আমি যে সম্পদ তৈরি করছি, তার ওপর আমার নিয়ন্ত্রণ কতটুকু। উৎপাদনের সিদ্ধান্ত কে নেয়। কেন শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলো মানুষের অধিকার না হয়ে বাজারের পণ্যে পরিণত হচ্ছে।
নিজের ব্যক্তিগত কষ্টকে যখন একজন মানুষ সমাজের বৃহত্তর অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে শুরু করে, তখন তার চিন্তার জায়গাটা বদলাতে শুরু করে। তখন আমার সমস্যা ধীরে ধীরে আমাদের সমস্যায় পরিণত হয়। তখন বেকারত্ব শুধু আমার চাকরি না পাওয়ার সমস্যা থাকে না। শ্রমিকের কম মজুরি শুধু শ্রমিকের সমস্যা থাকে না। কৃষকের ন্যায্য দাম শুধু কৃষকের সমস্যা থাকে না। এগুলো সমাজের উৎপাদন ও বণ্টনের প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
এখানেই মধ্যবিত্তের সামনে আসল রাজনৈতিক প্রশ্নটা দাঁড়ায়। সে কি এমন একটা সমাজ চায় যেখানে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাকে অন্য মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেই হবে। নাকি এমন একটা সমাজ চায় যেখানে মানুষের নিরাপত্তা অন্য মানুষের অনিরাপত্তার ওপর নির্ভর করবে না। যদি দ্বিতীয় সমাজটাই সে চায়, তাহলে শ্রমিকের মজুরি বাড়ার দাবি কেন তার বিরুদ্ধে যাবে। কৃষকের ন্যায্য দাম কেন তার সমস্যা হবে। সবার জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসা কেন তার বিরোধিতার বিষয় হবে।
আমার মনে হয় মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট হলো সে নিজের বাস্তব অবস্থানকে অনেক সময় নিজের কল্পিত ভবিষ্যতের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। সে আজ কী, সেটা দিয়ে নিজেকে বিচার না করে একদিন কী হতে চায়, সেটা দিয়ে নিজের স্বার্থকে বিচার করে। কিন্তু ইতিহাসে মানুষের শ্রেণিগত অবস্থান তার স্বপ্ন দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সে উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, তার সঙ্গে তার সম্পর্ক কী, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই প্রশ্নটা খুব সরল হলেও এর উত্তর সহজ নয়। মধ্যবিত্ত আসলে কার পক্ষে। পুঁজির পক্ষে, নাকি নিজের প্রকৃত স্বার্থের পক্ষে। আর যদি নিজের প্রকৃত স্বার্থের পক্ষে দাঁড়াতে চায়, তাহলে তাকে কি শেষ পর্যন্ত শ্রমজীবী মানুষের বৃহত্তর সংগ্রামের সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎকে যুক্ত করতে হবে না?
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো শুধু রাজনীতির বইয়ে পাওয়া যাবে না। প্রত্যেক মধ্যবিত্ত মানুষকে নিজের জীবন, নিজের চাকরি, নিজের পরিবার এবং নিজের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
About the Author
চিত্রণ ভট্টাচার্য আদি
মজদুরের নিয়মিত লেখকছাত্রনেতা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট
সাধারণ সম্পাদক - সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, ময়মনসিংহ জেলা শাখা।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন