আমরা যখন কোনো সমস্যার কথা বলি, তখন খুব সহজেই সেটাকে একটি নির্দিষ্ট খাতের সমস্যা বলে ধরে নিই। গণপরিবহন খারাপ হলে বলি এটা পরিবহন ব্যবস্থার ব্যর্থতা। বাড়িভাড়া বেড়ে গেলে বলি আবাসন সংকট। কৃষক ন্যায্য দাম না পেলে বলি কৃষি খাতের দুরবস্থা। কিন্তু সত্যিটা হলো, এই তিনটি সমস্যাকে আলাদা করে দেখার অভ্যাসটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। কারণ এগুলো একে অপরের সঙ্গে এত গভীরভাবে জড়িত যে, একটি সমস্যার শিকড় খুঁজতে গেলে শেষ পর্যন্ত অন্য দুটোর কাছেও পৌঁছে যেতে হয়।
একজন কৃষকের কথা ভাবুন। তিনি ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে কাজ করেন। জমি প্রস্তুত করেন, বীজ কিনেন, সার দেন, সেচ দেন, কখনো ঋণ নেন, কখনো পরিবারের সঞ্চয় ভেঙে চাষ করেন। কয়েক মাসের নিরলস পরিশ্রমের পর যখন ফসল ঘরে ওঠে, তখন তাঁর সবচেয়ে বড় চিন্তা থাকে, এই ফসলের ন্যায্য দাম তিনি পাবেন তো? কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দাম ঠিক করেন কৃষক নন। দাম ঠিক করে বাজার, আড়ত, পাইকারি চক্র আর মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব। ফলে অনেক সময় কৃষক এমন দামে ফসল বিক্রি করেন, যা তাঁর উৎপাদন খরচের সামান্য ওপরে, কখনো কখনো তারও নিচে।
অন্যদিকে শহরের একজন সাধারণ মানুষ যখন সেই একই পণ্য কিনতে বাজারে যান, তখন তাঁকে কয়েক গুণ বেশি দাম দিতে হয়। অর্থাৎ যে মানুষটি খাদ্য উৎপাদন করলেন, তিনি ন্যায্য মূল্য পেলেন না। আবার যে মানুষটি সেই খাদ্য কিনছেন, তিনিও স্বস্তিতে কিনতে পারছেন না। তাহলে লাভটা কার হলো? এই প্রশ্নটাই আমাদের সবচেয়ে বেশি করা দরকার। কারণ উৎপাদকও বঞ্চিত, ভোক্তাও বঞ্চিত, কিন্তু মাঝের স্তর ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এই একই চিত্র আমরা আবাসন খাতেও দেখি। একটি বাড়ি মানুষের নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা। এমন একটি জায়গা, যেখানে দিন শেষে মানুষ নিশ্চিন্তে ফিরতে পারে। কিন্তু আজ বাড়ি অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের থাকার জায়গার চেয়ে বিনিয়োগের সম্পদে পরিণত হয়েছে। ফলে বাড়িভাড়া নির্ধারণ হয় না একজন মানুষের আয়, জীবনযাত্রা কিংবা প্রয়োজন বিবেচনা করে। নির্ধারণ হয় বাজার কতটা আদায় করতে পারবে, সেই হিসাব অনুযায়ী। একজন কর্মজীবী মানুষ মাসের শুরুতে বেতন হাতে পান, আর মাসের শুরুতেই সেই আয়ের বড় একটি অংশ শুধু একটি ছাদের নিচে থাকার জন্য ব্যয় হয়ে যায়। তারপর বাকি অর্থ দিয়ে তাঁকে চালাতে হয় সংসার, চিকিৎসা, শিক্ষা, সন্তানের ভবিষ্যৎ, এমনকি নিজের স্বপ্নও।
গণপরিবহনের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ কাজে যায়, পড়াশোনা করতে যায়, চিকিৎসার জন্য বের হয়। তাদের কাছে গণপরিবহন কোনো বিলাসিতা নয়, এটি জীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু যখন এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য মানুষের সেবা না হয়ে শুধু আয় বাড়ানো হয়ে যায়, তখন যাত্রীরা ধীরে ধীরে নাগরিক থেকে গ্রাহকে পরিণত হন। অতিরিক্ত ভিড়, অনিরাপদ যানবাহন, দীর্ঘ যানজট, সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারা, এগুলো যেন স্বাভাবিক নিয়তিতে পরিণত হয়। অথচ এই নষ্ট হওয়া সময়েরও একটি অর্থনৈতিক মূল্য আছে। একজন মানুষ প্রতিদিন যদি দুই থেকে তিন ঘণ্টা রাস্তায় হারিয়ে ফেলেন, তাহলে তিনি শুধু সময়ই হারাচ্ছেন না, নিজের জীবন থেকেও একটি বড় অংশ হারাচ্ছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই তিনটি সমস্যাই একে অপরকে আরও জটিল করে তোলে। কৃষক ন্যায্য মূল্য না পেলে গ্রামের অর্থনীতি দুর্বল হয়। গ্রামে আয় কমে গেলে মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরে আসে। শহরে মানুষের চাপ বাড়লে বাড়িভাড়া বেড়ে যায়। জনসংখ্যার চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গণপরিবহনও ভেঙে পড়তে শুরু করে। আবার পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে কৃষিপণ্য বাজারে আনতেও বেশি খরচ হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। অর্থাৎ এটি একটি চক্র, যেখানে একটি সমস্যা অন্য সমস্যাকে জন্ম দেয়, আর সবকটি মিলেই বৈষম্যকে আরও গভীর করে।
তাই সমস্যাগুলোকে আলাদা করে দেখলে কখনোই স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে না। কারণ এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং একই অর্থনৈতিক কাঠামোর স্বাভাবিক ফলাফল। যে কাঠামোতে মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের চেয়ে মুনাফা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেখানে খাদ্যও ব্যবসা, বাসস্থানও ব্যবসা, এমনকি মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতও ব্যবসায় পরিণত হয়। তখন মানুষের জীবনমান নয়, লাভের পরিমাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়ায়।
একটি দেশের উন্নয়নকে শুধু উঁচু অট্টালিকা, বড় বড় সেতু কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে বিচার করলে অনেক সত্যই আড়ালে থেকে যায়। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, যে কৃষক দেশের মানুষকে খাওয়ান, তিনি কি নিজের পরিবারের মুখে নিশ্চিন্তে খাবার তুলে দিতে পারেন? যে শ্রমিক শহরের পর শহর গড়ে তোলেন, তিনি কি সেই শহরে সম্মানের সঙ্গে থাকার সামর্থ্য রাখেন? যে মানুষ প্রতিদিন কর দেন, কাজ করেন, অর্থনীতিকে সচল রাখেন, তিনি কি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণভাবে যাতায়াত করতে পারেন?
যেদিন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভয়ে "হ্যাঁ" বলা যাবে, সেদিনই বলা যাবে যে উন্নয়ন সত্যিই মানুষের জন্য হয়েছে। তার আগে পর্যন্ত আমাদের শুধু সমস্যার লক্ষণ নিয়ে নয়, সমস্যার শিকড় নিয়েও কথা বলতে হবে। কারণ শিকড় অক্ষত রেখে শুধু ডালপালা ছাঁটলে গাছের রূপ বদলায়, স্বভাব বদলায় না।
About the Author
চিত্রণ ভট্টাচার্য আদি
মজদুরের নিয়মিত লেখকছাত্রনেতা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট
সাধারণ সম্পাদক - সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, ময়মনসিংহ জেলা শাখা।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন