বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৯৭১ সাল একাধারে চরম আত্মত্যাগ ও পরম অর্জনের বছর। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সেই নির্মম, পাশবিক দিনগুলোর এক জীবন্ত এবং অবিনাশী দলিল শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশার কালজয়ী উপন্যাস 'রাইফেল রোটি আওরাত'। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে জুন মাসের অবরুদ্ধ ঢাকার পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসটি কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়, বরং জল্লাদের উল্লাসের মুখে দাঁড়িয়ে এক ক্ষুরধার প্রতিবাদ।
যুদ্ধের ক্যানভাসে এক খণ্ড জীবন: কাহিনী সংক্ষেপ
উপন্যাসের মূল চরিত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক সুদীপ্ত শাহীন। তার চোখ দিয়েই পাঠক অবরুদ্ধ ঢাকা এবং ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাত্রির সেই নৃশংসতম গণহত্যা প্রত্যক্ষ করে। ২৫শে মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন সুদীপ্ত শাহীনের চেনা জগৎটা মুহূর্তেই ওলটপালট হয়ে যায়। চারদিকে শুধু রাইফেলের গর্জন, আগুনের লেলিহান শিখা আর আর্তনাদ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিকে কোয়ার্টারে থাকা সুদীপ্ত ও তার পরিবার অলৌকিকভাবে সেই রাতের গণহত্যা থেকে বেঁচে যায়। কিন্তু চারপাশের চেনা মানুষদের মৃত্যু, প্রিয় সহকর্মীদের লাশ আর চারপাশের চরম অনিশ্চয়তা তাকে এক গভীর মানসিক যন্ত্রণার মুখোমুখি দাঁড় করায়। উপন্যাসের নাম 'রাইফেল রোটি আওরাত' মূলত পাকিস্তানি মিলিটারিদের তিনটি মূল চালিকাশক্তি বা লালসার প্রতীক—'রাইফেল' (অস্ত্রের দম্ভ ও ক্ষমতার দাপট), 'রোটি' (লুটপাট ও ক্ষুধা) এবং 'আওরাত' (নারী নির্যাতন ও লালসা)। এই তিনটি দানবীয় উপাদানের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকে তৎকালীন ঢাকা তথা সমগ্র বাংলাদেশ। সুদীপ্ত শাহীন এই অবরুদ্ধ নরককুণ্ডে দাঁড়িয়ে একদিকে যেমন অবর্ণনীয় ভয় ও শঙ্কাকে অনুভব করেছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রতিরোধের অদম্য স্পৃহাকে অবলোকন করেছে। শেষ পর্যন্ত সমস্ত ভয় কাটিয়ে সুদীপ্ত এক বুক আশা নিয়ে মুক্তির স্বপ্ন বুনেছে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া ও গভীর মূল্যায়ন
'রাইফেল রোটি আওরাত' কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, এটি ইতিহাসের এক জ্বলন্ত প্রামাণ্যচিত্র। আনোয়ার পাশা যখন এই উপন্যাসটি লিখছিলেন, তখনো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে চরম জীবনঝুঁকি নিয়ে, প্রায় লুকিয়ে তিনি এই কালজয়ী লেখাটি শেষ করেন। ফলে এর প্রতিটি লাইনে মিশে আছে লেখকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, আতঙ্ক এবং নিখাদ দেশপ্রেম। দুঃখের বিষয়, একাত্তরের ডিসেম্বরে বিজয়ের ঠিক আগমুহূর্তে আলবদর বাহিনীর হাতে লেখক নিজে শহীদ হন, যা এই উপন্যাসটিকে এক ট্র্যাজিক ও পবিত্র রূপ দিয়েছে।
উপন্যাসের ভাষা অত্যন্ত সাবলীল, প্রাঞ্জল এবং তীব্র আবেগে ভরপুর। লেখক সুদীপ্ত শাহীনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, পাঠক নিজেকে সেই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির ভেতর আবিষ্কার করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা এবং তাদের দোসরদের বিশ্বাসঘাতকতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মহানুভবতা ও ত্যাগের চিত্র এখানে সমান্তরালভাবে চলেছে।
মানুষ মরে গেলেই তো শেষ হয়ে গেল না। মানুষ তো বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে, মানুষের ভালোবাসায়।
উপন্যাসের এই অন্তর্নিহিত দর্শনই পুরো গল্পকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এটি কেবল যুদ্ধের বিভীষিকা দেখায় না, বরং শত অন্ধকারের মাঝেও ভোরের আলোর অবশম্ভাবী আগমনকে স্বাগত জানায়।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, 'রাইফেল রোটি আওরাত' বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কতখানি রক্ত আর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। প্রত্যেক বাঙালির জন্য, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের জন্য, নিজেদের শিকড় এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে এই বইটি পড়া অপরিহার্য। এটি কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের লড়াইয়ের এক অবিনাশী স্মারক।
Asif Tanvir Arian
University of Chittagong
About the Author
Asif Tanvir Arian
Music, Tutoring
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) । প্রগতিশীল চিন্তাধারা থেকে সমাজ ও রাজনীতির নানান অসঙ্গতি নিয়ে লিখি। আর জীবনের বাকিটা জুড়ে আছে মিউজিক—গিটার আর পিয়ানোই আমার অবসরের সঙ্গী।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন