সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

প্রথম সমাজতান্ত্রিক* সংবিধান

১৯১৮ সালের ১০ জুলাই গৃহীত এই সংবিধান কেবল একটি আইনগ্রন্থ ছিল না, বরং এটি ছিল ব্যক্তিগত মুনাফার পরিবর্তে মানবিক প্রয়োজনকে ভিত্তি করে এক নতুন সভ্যতা নির্মাণের কর্মসূচি। তৎকালীন গৃহযুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে বলশেভিকরা প্রলেতারীয় একনায়কত্বকে আইনি রূপ দিয়ে বুর্জোয়া রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙে ফেলেছিল।

Sankalpa
Sankalpa মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 11 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 82 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 2 জন পাঠক পড়েছেন
প্রথম সমাজতান্ত্রিক* সংবিধান

বর্তমান নিবন্ধটি পশ্চিম আফ্রিকার একটি পত্রিকা, সোশ্যালিস্ট অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ ওয়ার্ল্ড থেকে কিছু তাত্ত্বিক সংশোধনসহ তরজমা করা হয়েছে। পরিবর্তিত অংশগুলি স্থূলাক্ষরে লেখা হয়েছে।

অংশ ১

১৯১৮ সালের ১০ জুলাই ইতিহাসের প্রথম সমাজতান্ত্রিক* সংবিধান গ্রহণ করে সোভিয়েতগুলির পঞ্চম সর্ব-রুশ কংগ্রেস। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রুশ সোভিয়েত ফেডারেটিভ সমাজতান্ত্রিক* প্রজাতন্ত্র (RSFSR)-কে একটি শ্রমিকশ্রেণি শাসিত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই বিপ্লবী সংবিধানে প্রলেতারীয় একনায়কত্ব, শ্রমিক গণতন্ত্র এবং পুঁজিবাদী শোষণের বিলোপের নীতিগুলিকে আইনি রূপ দেওয়া হয়; এর মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও শ্রেণিশাসনের সমর্থনকারী বুর্জোয়া সংবিধানগুলির সঙ্গে এক মৌলিক বিচ্ছেদ ঘটানো হয়েছিল। এটি বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাকে পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রণীত কোনো সাধারণ আইনগ্রন্থ ছিল না; বরং সেই সমাজব্যবস্থার সম্পূর্ণ উচ্ছেদ এবং ব্যক্তিগত মুনাফার পরিবর্তে মানবিক প্রয়োজনকে ভিত্তি করে এক নতুন সভ্যতা নির্মাণের কর্মসূচি ছিল।

১৯১৮ সালের RSFSR সংবিধানের জন্ম হয় ১৯১৭ সালের মহান অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। সেই বিপ্লবে ভ্লাদিমির লেনিন ও লীয়ঁ ত্রৎস্কির নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি সাময়িক সরকারকে উৎখাত করে সোভিয়েত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু এই সংবিধানের প্রকৃত ঐতিহাসিক তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে এর জন্মলগ্নের বাস্তব পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। ১৯১৮ সালের জুলাই মাস নাগাদ নবগঠিত সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ চৌদ্দটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের অর্থ ও অস্ত্রে সজ্জিত শ্বেতবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে তাকে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছিল। বুর্জোয়া ইতিহাসচর্চা দাবি করে যে মিত্রশক্তির এই সামরিক হস্তক্ষেপ বলশেভিকদের কথিত "স্বৈরতন্ত্র"-এর প্রতিক্রিয়া ছিল। বাস্তবে বিদেশি মালিকানাধীন সম্পদ অধিগ্রহণ, জারতান্ত্রিক ঋণ অস্বীকার এবং বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনমূলক বিশ্ব-বিভাজনের গোপন চুক্তিগুলি প্রকাশ করে দেওয়ার ফলে এক সফল শ্রমিকরাষ্ট্রের উত্থানে বিশ্বপুঁজির আতঙ্কিত প্রতিক্রিয়াই ছিল এর প্রকৃত কারণ। ফলে এই সংবিধান রচিত হয় দুর্ভিক্ষ, সামরিক অবরোধ এবং বিপ্লবকে রক্ষার মরিয়া সংগ্রামের মাঝে। এই দলিল যেমন ছিল আন্তর্জাতিক প্রলেতারিয়েতের সংগ্রামের অগ্রদূত, তেমনি অস্তিত্বসংকটের মুহূর্তে প্রলেতারীয় একনায়কত্বকে সুসংহত করার একটি বাস্তব রাজনৈতিক হাতিয়ারও।

এই সংবিধান ছিল এক তীব্র শ্রেণিসংগ্রামের পরিণতি। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর বুর্জোয়া সাময়িক সরকার এবং শ্রমিক, সৈনিক ও কৃষকদের সোভিয়েতগুলির মধ্যে দ্বৈত ক্ষমতার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। প্রথমে উদারপন্থী কাদেতদের এবং পরে তাদের সঙ্গে সহযোগিতাকারী মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারিদের প্রাধান্যাধীন সাময়িক সরকার সংস্কারবাদের দেউলিয়াত্বকেই উন্মোচিত করে। ভূমির পুনর্বণ্টন কিংবা রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিপর্যয়কর অংশগ্রহণের (যে যুদ্ধ ইতিমধ্যেই লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ও কৃষকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল) অবসানের মতো মৌলিক পদক্ষেপ গ্রহণে তারা অক্ষম হয়। বুর্জোয়াদের সঙ্গে জোটের পথ বেছে নিয়ে মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারিরা যুদ্ধ অব্যাহত রাখা এবং জমিদারদের সম্পত্তি রক্ষার নীতির শরিক হয়ে ওঠে। এর ফলে শোষিত জনগণের মধ্যে গভীর মোহভঙ্গ ঘটে এবং তারা দ্রুত বাম দিকে অগ্রসর হয়। "শান্তি, ভূমি ও রুটি" স্লোগানকে সামনে রেখে বলশেভিকরা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো আপস প্রত্যাখ্যান করে এবং সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েতগুলির হাতে ন্যস্ত করার আহ্বান জানায়। ১৯১৭ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের মধ্যে তারা পেত্রোগ্রাদ, মস্কো এবং অন্যান্য প্রধান শিল্পকেন্দ্রগুলির গুরুত্বপূর্ণ সোভিয়েতগুলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন অর্জন করে। অক্টোবরের সশস্ত্র অভ্যুত্থান কোনো ষড়যন্ত্র (coup) ছিল না। বরং এই রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া কৃষকদের সঙ্গে জোটবদ্ধ শ্রমিকশ্রেণির সর্বাধিক সচেতন অংশের নেতৃত্বে, সোভিয়েতগুলির গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে হয়েছিল। ক্ষমতায় এসেই তারা ব্যাংক ও শিল্পের রাষ্ট্রায়ত্তকরণ, উৎপাদনক্ষেত্রে শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, ভূমি সংক্রান্ত ফরমানের মাধ্যমে বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি সম্পত্তির বিলোপ, এবং ১৯১৮ সালের মার্চে ব্রেস্ট-লিতভ্‌স্ক সন্ধির মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে প্রত্যাহারের মতো সমাজতান্ত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই সন্ধি ছিল জার্মান শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী উত্থান ব্যর্থ হওয়া এবং বিপ্লবের ঘাঁটি রক্ষা করার ঐতিহাসিক প্রয়োজন থেকে গৃহীত এক কঠোর ও প্রতিকূল শান্তিচুক্তি। ১৯১৮ সালের সংবিধান এই সমস্ত পরিবর্তনকে আইনি ভিত্তি প্রদান করে, রাষ্ট্রক্ষমতা যাতে শ্রমিকশ্রেণির হাতেই থাকে তা নিশ্চিত করে এবং পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম পদক্ষেপগুলিকে সংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়।

অংশ ২

সংবিধানটির প্রধান প্রধান ধারাগুলি এর গভীর গণতান্ত্রিক ও শ্রেণিসচেতন চরিত্রকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এতে রাশিয়াকে এমন একটি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যেখানে সমস্ত রাষ্ট্রক্ষমতা শ্রমিক, সৈনিক ও কৃষকদের হাতে ন্যস্ত। সংবিধানটি প্রলেতারীয় একনায়কত্বকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের একটি অপরিহার্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে প্রাক্তন শোষক, মুনাফাবাজ এবং পুরনো শাসনব্যবস্থার প্রতিনিধিদের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়; অপরদিকে, কেবলমাত্র যারা শ্রমের মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখে, তাদেরই পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার স্বীকৃত হয়। এর কারণ, শেষ বিচারে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে গণতন্ত্র সর্বদাই এক একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির গণতন্ত্র, এবং শ্রমিকশ্রেণির গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও তা অন্যথা নয়।

সংবিধানে বিপ্লবী সরকারের গৃহীত একাধিক ঐতিহাসিক ফরমানকে মৌলিক নীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ছিল ভূমি সংক্রান্ত ফরমান, শান্তি সংক্রান্ত ফরমান, শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ফরমান, এবং শ্রমজীবী ও শোষিত জনগণের অধিকারসমূহের ঘোষণা। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সংবিধানটি পুঁজিবাদী সম্পত্তি সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে ভূমি, কারখানা ও ব্যাংককে রাষ্ট্রায়ত্ত করে। নির্বাচনী ব্যবস্থাও ছিল মৌলিকভাবে ভিন্ন। ভৌগোলিক নির্বাচনী এলাকার পরিবর্তে উৎপাদন একককে ভিত্তি করে প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করা হয় এবং শহুরে শ্রমিকদের ভোটকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। বলশেভিকরা অকপটভাবেই এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার সপক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। তাদের মতে, সমাজতন্ত্রে উত্তরণের সময়ে শ্রমজীবী জনগণের সবচেয়ে কেন্দ্রীভূত, সংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর অংশ, অর্থাৎ শিল্পশ্রমিকদের নেতৃত্ব বিক্ষিপ্ত ও তুলনামূলকভাবে পশ্চাৎপদ পাতি-বুর্জোয়া গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উপর নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

সংবিধান প্রতিনিধিদের যে কোনো সময় প্রত্যাহারের অধিকারও নিশ্চিত করে। ফলে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের মতন নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত জনগণের নাগালের বাইরে থাকার সুযোগ পেতেন না; বরং সর্বদা নিজেদের নির্বাচনী ভিত্তির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকতেন। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের এই রূপটি বুর্জোয়া রাষ্ট্রগুলির নির্দিষ্ট মেয়াদভিত্তিক সংসদীয় প্রহসনের তুলনায় বহুগুণ উন্নত ছিল। একই সঙ্গে সংবিধান একটি সশস্ত্র শ্রমিকশ্রেণির নীতিকেও স্বীকৃতি দেয়। এর ভিত্তিতেই লাল ফৌজকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো পেশাদার স্থায়ী সেনাবাহিনী হিসেবে নয়, বরং শ্রমজীবী শ্রেণিগুলির মিলিশিয়া হিসেবে সংগঠিত করা হয় এবং শোষক শ্রেণির হাতে অস্ত্র বহন স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ১৯১৮ সালের সংবিধান ছিল বিশ্ববিপ্লবের এক সুস্পষ্ট আহ্বান। এটি সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী ঋণ এবং গোপন কূটনৈতিক চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে; পাশাপাশি ঘোষণা করে যে, জারতান্ত্রিক সরকার ও সাময়িক সরকারের যেসব আইন সোভিয়েত ফরমানগুলির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলি বাতিল ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। শ্রমের উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় বসবাসকারী বিদেশি শ্রমিকদেরও পূর্ণ নাগরিক অধিকার প্রদান করা হয়। বিশেষত, সংবিধানের ২০ নম্বর অনুচ্ছেদে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কারণে নিপীড়িত সকল বিদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়, যা প্রলেতারীয় আন্তর্জাতিকতাবাদের এক গভীর ও সুস্পষ্ট প্রকাশ।

লেনিন ও বলশেভিকরা কখনোই RSFSR-কে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখেননি। তাদের কাছে এটি ছিল বিশ্ববিপ্লবের এক অগ্রবর্তী দুর্গ। এমন একটি ভিত্তি, যার সাহায্যে আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণি নিজের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্ত হতে পারবে। সংবিধানটিও সেই দৃষ্টিভঙ্গিকেই ধারণ করে। এতে স্পষ্টভাবে মানবজাতিকে ফিনান্স পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে মুক্ত করার সংকল্প ব্যক্ত করা হয়। ফলে এটি কেবল পেত্রোগ্রাদ বা মস্কোর শ্রমিকদের উদ্দেশে রচিত কোনো দলিল ছিল না; একই সঙ্গে বার্লিন, প্যারিস, লন্ডনসহ সারা দুনিয়ার শ্রমিক ও শোষিত জনগণের প্রতিও এর আহ্বান ছিল প্রত্যক্ষ।

অংশ ৩

এই সংবিধানের উত্তরাধিকার সুদূরপ্রসারী, যদিও তাকে অবশ্যই সমালোচনামূলক ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করতে হবে। এটি ছিল অক্টোবর বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত শ্রমিকশাসনের প্রথম সাংবিধানিক রূপায়ণ এবং প্রলেতারীয় একনায়কত্বের গণতান্ত্রিক ভিত্তিগুলির প্রথম সুসংহত প্রকাশ। পরবর্তী ইতিহাসে সোভিয়েত রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক অধঃপতন এই সংবিধানের বহু মৌলিক নীতিকে ক্রমশ ক্ষয় ও বিকৃত করলেও, শ্রমিকশ্রেণির প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রতিনিধিদের প্রত্যাহারের অধিকার, উৎপাদনের উপর শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বিপ্লবের প্রতি অঙ্গীকার—এই মৌলিক নীতিগুলি আজও বিপ্লবী মার্কসবাদীদের কাছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। সর্বোপরি, এই সংবিধান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শ্রমিকশ্রেণির স্বমুক্তি ব্যতীত প্রকৃত মানবমুক্তি অসম্ভব।

আজ, ১৯১৮ সালের RSFSR সংবিধান একদিকে যেমন বিশ্ব শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক, তেমনি উদারপন্থী পুঁজিবাদের আত্মতৃপ্ত বিজয়োল্লাসের বিরুদ্ধেও এক জীবন্ত প্রত্যুত্তর। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ, চরম বৈষম্য, মুনাফার তাড়নায় ত্বরান্বিত জলবায়ু বিপর্যয় এবং বুর্জোয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান অবক্ষয়ের এই যুগে—যেখানে গণতন্ত্র ক্রমেই ধনীদের স্বার্থরক্ষার এক নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক প্রহসন হিসেবে উন্মোচিত হচ্ছে—এই সংবিধান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে শোষণমুক্ত সমাজ কোনো কল্পলোকের স্বপ্ন নয়; বরং মানবসমাজের বিকাশের এক বাস্তব ঐতিহাসিক সম্ভাবনা। এটি প্রমাণ করে যে, সোভিয়েত, শ্রমিক পরিষদ ও গণসংগঠনের মাধ্যমে সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণি পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেঙে দিয়ে সমাজকে নতুন ভিত্তির উপর পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিতে পারে। সেই কারণেই ১৯১৮ সালের এই সংবিধান আজও বিপ্লবী মার্কসবাদীদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক রেফারেন্স। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রটি নিজে থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় না। সংগঠিত শ্রেণিসংগ্রামের মধ্য দিয়েই তাকে ভেঙ্গে প্রলেতারীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়; এবং শোষিত-বঞ্চিত মানুষের সামনে এখনও জয় করবার জন্য একটি বিশ্ব অপেক্ষা করে রয়েছে।

ইতিহাসের প্রথম সমাজতান্ত্রিক* সংবিধানের স্মৃতি অমর হোক!

দুনিয়ার মজদুর এক হও!


[ “*” — এখানে ‘সমাজতান্ত্রিক’ বলতে কোনো পূর্ণাঙ্গ সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বা সম্পূর্ণ বিকশিত সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতিকে বোঝানো হয়নি। ১৯১৮ সালে গৃহীত শ্রমজীবী ও শোষিত জনগণের অধিকারসমূহের ঘোষণা-য় নবগঠিত সোভিয়েত রাষ্ট্রের ‘মৌলিক কর্তব্য’ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল ‘সমাজের সমাজতান্ত্রিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা এবং সমস্ত দেশে সমাজতন্ত্রের বিজয়’। অর্থাৎ, সোভিয়েত রাষ্ট্রকে শুরু থেকেই একটি আন্তর্জাতিক বিপ্লবী প্রক্রিয়ার অংশ এবং সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পথে অগ্রসরমান শ্রমিকরাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়েছিল, সম্পূর্ণ সমাজতন্ত্র অর্জনকারী রাষ্ট্র হিসেবে নয়। লেনিনও বারবার জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, একটি দেশে বুর্জোয়াদের উৎখাত ও প্রলেতারীয় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও, বিশেষত রাশিয়ার মতো অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশে, সমাজতান্ত্রিক উৎপাদনের পূর্ণ বিকাশ এবং সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য একাধিক উন্নত দেশের প্রলেতারীয় বিপ্লবের সহায়তা অপরিহার্য। অর্থাৎ একটি বিচ্ছিন্ন দেশে প্রলেতারীয় রাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজন ও বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতার কারণে পূর্ণাঙ্গ সমাজতান্ত্রিক সমাজের নির্মাণ আন্তর্জাতিক বিপ্লবের প্রসার ব্যতীত সম্পূর্ণ হতে পারে না। এই অর্থেই এখানে ‘সমাজতান্ত্রিক’ কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে—অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের পথে অগ্রসরমান একটি শ্রমিকরাষ্ট্র বা তার সংবিধান হিসেবে, পূর্ণাঙ্গ সমাজতান্ত্রিক সমাজের সংবিধান হিসেবে নয়।]


#প্রথম_সমাজতান্ত্রিক_সংবিধান #সোভিয়েত_ইউনিয়ন #মার্কসবাদ #লেনিন #রাশিয়া #শ্রমিকশ্রেণি #অক্টোবর_বিপ্লব #ইতিহাস
Sankalpa

About the Author

Sankalpa

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষার্থী

বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast