সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

চেতনার অগ্নিগর্ভ থেকে এক কালজয়ী মহাকাব্য: ‘মা’

ম্যাক্সিম গোর্কির মা কেবল একটি উপন্যাস নয়, বরং শোষিত মানুষের জেগে ওঠার এক অবিনাশী ইশতেহার। নিপীড়িত নারী পেলেগেয়া ভ্লাসভের সাধারণ জননী থেকে বিপ্লবী হয়ে ওঠার রূপান্তর পাঠককে শিহরিত করে। জারের শাসনামলের রুশ সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে গোর্কি দেখিয়েছেন কীভাবে ভয় জয় করে সত্যের পথে দাঁড়াতে হয়।

Asif Tanvir Arian
পড়তে 4 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 45 বার পড়েছে
চেতনার অগ্নিগর্ভ থেকে এক কালজয়ী মহাকাব্য: ‘মা’

বিশ্বসাহিত্যে এমন কিছু উপন্যাস থাকে যা কেবল সময়ের গণ্ডিতে আটকে থাকে না, বরং যুগের পর যুগ পার হয়ে মানবচেতনার চিরন্তন বাতিঘর হয়ে দাঁড়ায়। রুশ সাহিত্যের এক জ্বলন্ত দলিল ম্যাক্সিম গোর্কির কালজয়ী উপন্যাস ‘মা’। এটি কেবল একটি বই নয়; এটি শোষিত মানুষের জেগে ওঠার ইশতেহার, ভাঙা বুকের ভেতর সাহসের বারুদ ঠুকে দেওয়ার গল্প। গোর্কি এখানে কোনো কাল্পনিক জগতের ফানুস উড়াননি, বরং তৎকালীন রুশ সমাজের জরাজীর্ণ বাস্তবতার বুক চিরে তুলে এনেছেন এক অবিনাশী সত্য।

১. অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোর মশাল: বৃত্ত ভাঙার আখ্যান

গল্পের শুরুটা রাশিয়ার এক নিভৃত কারখানার শ্রমিক বস্তিতে, যেখানে মানুষের জীবন মানেই হাড়ভাঙা খাটুনি আর মদের বোতলে ডুবে থাকা গ্লানি। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র পেলেগেয়া ভ্লাসভ (যিনি গল্পের ‘মা’) এমন এক নিপীড়িত নারী, যার জীবন কেটেছে স্বামী মিখাইল ভ্লাসভের অমানুষিক নির্যাতন আর ভয়ের সংস্কৃতিতে।

কিন্তু ট্র্যাজেডি যেখানে শেষ, বিপ্লবের শুরু ঠিক সেখান থেকেই। স্বামীর মৃত্যুর পর মা লক্ষ্য করেন তাঁর একমাত্র ছেলে পাভেলের ভেতরের এক অদ্ভুত রূপান্তর। পাভেল নিষিদ্ধ বই পড়ছে, ঘরে নিয়ে আসছে একঝাঁক স্বপ্নবাজ কমরেডদের। স্তব্ধ, ভীতু মা প্রথমে আঁতকে ওঠেন। কিন্তু ছেলের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর সত্যের তীব্র আলোয় মায়ের ভেতরের অবদমিত সত্তাটি জেগে ওঠে। যে মা একসময় খ্রিষ্টের মূর্তির সামনে ভয়ে কাঁপতেন, সেই মা-ই একসময় বুকে জড়িয়ে নেন সমাজতন্ত্রের লাল পতাকা।

২. এক সাধারণ জননী থেকে বিশ্বজনীন ‘মা’

গোর্কির এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় সার্থকতা লুকিয়ে আছে মায়ের এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরে। মা কেবল পাভেলের একার মা থাকেননি; তিনি হয়ে উঠেছেন শোষিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত প্রতিটি বিপ্লবীর আশ্রয়।

ভয়ের দেয়াল ভাঙা: মা যখন গোপনে নিষিদ্ধ ইশতেহার কারখানার ভেতরে পাচার করেন, তখন তিনি আর চার দেয়ালের বন্দি নারী নন, তিনি তখন এক নির্ভীক সৈনিক।

মে দিবসের রক্তিম সূর্য: মে দিবসের মিছিলে যখন জারের পুলিশ পাভেলকে গ্রেপ্তার করে, মায়ের বুক ভেঙে যায় না। বরং ছেলের ফেলে যাওয়া পতাকা মা নিজের হাতে তুলে নেন। এই দৃশ্যটি পাঠককে এক অদ্ভুত শিহরণে আচ্ছন্ন করে।

৩. গোর্কির কলমে জাদুকরী বাস্তবতা ও গভীর জীবনবোধ

ম্যাক্সিম গোর্কির নিজস্ব জীবনটাই ছিল এক সংগ্রামের ইতিহাস, তাই তাঁর লেখায় কোনো মেদ নেই, নেই কোনো কৃত্রিমতার ছোঁয়া। তিনি ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাবাদ’ (Socialist Realism)-এর যে ভিত্তি এই উপন্যাসে গড়েছেন, তা এককথায় অনবদ্য। উপন্যাসের প্রতিটি সংলাপ ধারালো তরবারির মতো, যা সরাসরি পাঠকের মগজে গিয়ে আঘাত করে। পাভেল, খুখল, সাশেনকাদের মতো চরিত্রগুলোর ত্যাগ ও আদর্শ পাঠককে নিজের ভেতরের মনুষ্যত্বকে নতুন করে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।

আমাদের মায়েদের কোনো কান্না নেই। আমাদের চোখে কেবল আগুন, যে আগুন সমস্ত অন্যায্যকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে। — এই গভীর জীবনবোধই পুরো উপন্যাসকে সাধারণ রাজনৈতিক প্রচারণার উর্ধ্বে নিয়ে এক শাশ্বত সাহিত্যের রূপ দিয়েছে।

৪. শতবর্ষ পরেও কেন ‘মা’ অনন্য ও প্রাসঙ্গিক?

আজকের পৃথিবীতে জারের শাসন নেই, রুশ বিপ্লবের সেই উত্তাল দিনগুলোও নেই। কিন্তু আজও কি শোষণের রূপ বদলে যায়নি? আজও কি এক শ্রেণির মানুষ অন্য শ্রেণির ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে না?

ঠিক এই জায়গাতেই গোর্কির ‘মা’ চিরন্তন। এই বই আমাদের শেখায়:

অন্যায়কে মুখ বুজে সহ্য করাও এক ধরনের অপরাধ।

প্রেম এবং অধিকার আদায়—দুটো সমান্তরাল লাইনে চলতে পারে।

শৃঙ্খল ভাঙার গান কখনো পুরোনো হয় না।

শেষ কথা: মুক্তির এক অনিবার্য দলিল

‘মা’ উপন্যাসটি শেষ করার পর পাঠক হিসেবে আপনার বুকের ভেতর একটা শূন্যতা তৈরি হবে, আবার একই সাথে এক বুক বারুদ জমা হবে। শেষ দৃশ্যে মায়ের ওপর জারের রক্ষীবাহিনীর নির্যাতন আর মায়ের সেই অবিনাশী চিৎকার—"রক্তের নদীতে সত্যকে ডুবিয়ে মারা যায় না!"—পাঠকের কানে বহুদিন প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।

যাঁরা জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে ভালোবাসেন, যাঁরা বিশ্বাস করেন মানুষের ভেতরের অমিত শক্তিকে, তাঁদের জন্য ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ এক অবশ্য পাঠ্য মহাকাব্য। এটি কেবল পড়ার বই নয়, এটি ভেতরে ধারণ করার মতো এক অনন্ত অনুপ্রেরণা।

#মা_উপন্যাস #ম্যাক্সিম_গোর্কি #রুশ_সাহিত্য #বিপ্লবী_সাহিত্য #বিশ্বসাহিত্য #সমাজতন্ত্র #বই_পর্যালোচনা #সাহিত্য_পাঠ
Asif Tanvir Arian

About the Author

Asif Tanvir Arian

Music, Tutoring

শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) । প্রগতিশীল চিন্তাধারা থেকে সমাজ ও রাজনীতির নানান অসঙ্গতি নিয়ে লিখি। আর জীবনের বাকিটা জুড়ে আছে মিউজিক—গিটার আর পিয়ানোই আমার অবসরের সঙ্গী।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast