সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

কিউবান বিপ্লবকে রক্ষা করো!

কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির ঘোষিত অর্থনৈতিক সংস্কার কিউবান বিপ্লবের অর্জিত সাফল্যগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চাপে ব্যক্তিগত মালিকানা ও বিদেশি পুঁজির অনুপ্রবেশ বিপ্লবের মূল ভিত্তি পরিকল্পিত অর্থনীতিকে ভেঙে ফেলছে।

Sankalpa
Sankalpa মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 6 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 64 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 2 জন পাঠক পড়েছেন
কিউবান বিপ্লবকে রক্ষা করো!

কিউবার "কমিউনিস্ট পার্টি"র “সংস্কার” প্রতিবিপ্লবের দরজা খুলে দিচ্ছে

(স্পার্টাসিস্ট-এর বিশেষ পরিশিষ্টর সংক্ষিপ্ত তরজমা)

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রবল চাপের মুখে কিউবার "কমিউনিস্ট পার্টি" (পিসিসি) একগুচ্ছ অর্থনৈতিক সংস্কারের ঘোষণা করেছে, যা কার্যকর হলে কিউবান বিপ্লবের অর্জনগুলিই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যেতে পারে। জাতীয় পরিষদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত এই পদক্ষেপগুলি পরিকল্পিত অর্থনীতির যা কিছু অবশিষ্ট রয়েছে তা ভেঙে দিয়ে প্রায় অবাধ ব্যক্তিগত মালিকানা ও সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির অনুপ্রবেশকে বৈধতা দেবে। কিউবান বিপ্লবের সমর্থকদের অবশ্যই এই পদক্ষেপগুলির তীব্র বিরোধিতা করতে হবে, কারণ এগুলি সাম্রাজ্যবাদ-সমর্থিত প্রতিবিপ্লবের দরজা খুলে দেবে।

পিসিসি নেতা দিয়াস-কানেল দাবি করছেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়ে “সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার” জন্যই এই সংস্কার প্রয়োজন। না, এটি আদপেই সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ। এই দ্বীপে যে “বিনিয়োগকারীরা” আসবে তারা হবে হেজ-ফান্ডের শকুন এবং ১৯৫৯ সালে উৎখাত হওয়া মায়ামিভিত্তিক গুয়াসানো গোষ্ঠী; তারা কিউবার শিল্প ও সম্পদ নিজেদের মুনাফার জন্য দখল করবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো ক্ষেত্রে বিপ্লবের অবশিষ্ট অর্জনগুলিও তারা ধ্বংস করবে এবং শেষ পর্যন্ত যেনতেন প্রকারে পিসিসিকে ক্ষমতাচ্যুত করবে।

পিসিসি নেতৃত্ব বলছে তারা চীন-ভিয়েতনামের “মডেল” অনুসরণ করছে, যেখানে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বাজারব্যবস্থা ও সাম্রাজ্যবাদী বিনিয়োগ চালু করা হয়েছিল। কিন্তু আজ কিউবায় যা ঘটছে, তা চীন-ভিয়েতনামের মডেল নয়; বরং সেই নীতিই, যা মার্কিন শাসকশ্রেণি আমেরিকা মহাদেশের একমাত্র শ্রমিকরাষ্ট্রকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে কিউবার ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। এর মোকাবিলায় পিসিসি নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষির মরীচিকার ওপর নির্ভর করেছে। ফল হয়েছে ট্রাম্প ও রুবিওর ক্রমবর্ধমান আক্রমণ। মার্কিন অবরোধ এবং আমলাতান্ত্রিক অপশাসনের ফলে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হওয়ার পর এখন পিসিসি নেতৃত্ব বিপ্লবকেই বিক্রি করে দেওয়ার পথে এগোচ্ছে।

আজকের পরিস্থিতির প্রকৃত ঐতিহাসিক তুলনা চীন বা ভিয়েতনাম নয়, বরং ১৯৮০-এর দশকের শেষের সোভিয়েত ইউনিয়ন। মিখাইল গর্বাচভের অধীনে ব্যাপক বেসরকারিকরণ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রতি ছাড়ের নীতি বিশ্বের প্রথম শ্রমিকরাষ্ট্র ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করেছিল, যা ছিল আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির জন্য এক মহাবিপর্যয়। মিথ্যাচার, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অপব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সোভিয়েত শাসকেরা জনসাধারণের বৃহৎ অংশকে দক্ষিণ দিকে ঠেলে দিয়েছিল এবং প্রতিবিপ্লবকে শক্তিশালী করেছিল। আজ কিউবার আকাশেও সেই একই প্রতিবিপ্লবী বিপদের ছায়া ঘনিয়ে এসেছে।

পিসিসি নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হও!

বিপ্লব ধ্বংসের এই পথের বিরুদ্ধে কিউবার শ্রমজীবী জনগণকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে পিসিসি নেতৃত্বের বামপন্থী বিরোধিতা গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিদিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট, খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট এবং অর্থনৈতিক পতনের বর্তমান অবস্থা যে চলতে পারে না, তা সবাই জানে। কিউবার সামনে আজ দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত পথ খোলা আছে: হয় পুঁজিবাদী প্রতিবিপ্লব ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অবাধ শাসন; নইলে আমলাতন্ত্রমুক্ত, শ্রমিক গণতন্ত্র ও বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের সংহতির ভিত্তিতে প্রকৃত সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম। দ্বিতীয় পথটি সহজ নয়, কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ সেটিই। বিনা সংগ্রামে বিপ্লবকে ধ্বংস হতে দেওয়া চলবে না।

আমরা পিসিসি ও যুব কমিউনিস্ট ইউনিয়নের ভিন্নমতাবলম্বী সমর্থক, স্বাধীন বামপন্থী কর্মী এবং অন্য সকলকে সংগ্রামী সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাই। প্রথম কাজ হলো সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সব আপসের নীতি পরিত্যাগ করা এবং বিশ্বের শ্রমিকদের কিউবার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো। ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থেকে ২০২৮ সালে একটি “প্রগতিশীল” মার্কিন প্রশাসন ক্ষমতায় আসবে এই প্রত্যাশা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও অচল। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, আর ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের মতোই বহু দশক ধরে অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখে বিপ্লবের শত্রু হিসেবে নিজেদের চরিত্রের প্রমাণ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনোসহ শ্রমিকরাই পুঁজিবাদী আক্রমণের শিকার; প্রকৃত মিত্রদের খুঁজতে হবে তাদের মধ্যেই।

ওয়াশিংটনের তেল অবরোধ কার্যকর হয়েছে কেবল এই কারণে যে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের শাসকগোষ্ঠী তা বাস্তবায়ন করেছে। শুধু দেলসি রদ্রিগেসের ভেনেজুয়েলা নয়, মেক্সিকো ও ব্রাজিলের তথাকথিত “প্রগতিশীল” সরকারগুলিও। এই সরকারগুলির প্রতি পিসিসির অবিরাম প্রশংসার বদলে দাবি তুলতে হবে যে তারা মার্কিন অবরোধ ভেঙে কিউবায় জ্বালানি পাঠানো শুরু করুক পুনরায় এবং তার পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি করুক। এর অর্থ হলো ওই দেশগুলির শ্রমজীবী মানুষকে নিজেদের শাসকদের থেকে স্বাধীনভাবে, প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো। এতে কেবল কিউবাই সাহায্য পাবে না, সমগ্র লাতিন আমেরিকায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামও গতি পাবে। একইসঙ্গে বামপন্থী বিরোধীদের চীনের "কমিউনিস্ট পার্টি"র কাছে দাবি তুলতে হবে যে তারা সাম্রাজ্যবাদের প্রতি নিজেদের আপসের নীতি পরিত্যাগ করে কিউবার অবকাঠামো পুনর্গঠনে বিপুল সাহায্য ও কর্মী পাঠাক। অতুলনীয় সামাজিক শক্তির অধিকারী চীনা শ্রমিকশ্রেণিকেও একই দাবি তুলতে হবে। সামান্য শস্য বা মানবিক সাহায্য যথেষ্ট নয়; কিউবা যদি লড়াইয়ের প্রস্তুতি দেখায়, তবে তা চীন ও সমগ্র "গ্লোবাল সাউথের" শত শত মিলিয়ন মেহনতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

বিদেশের সেইসব বামপন্থীদের উদ্দেশে, যারা কিউবার পক্ষে প্রতিবাদ আন্দোলনে নেমেছেন কিন্তু পিসিসি নেতৃত্বের নীতিকেও সমর্থন করেছেন, আমাদের আহ্বান— এই পথ পরিত্যাগ করুন। আজ আর সন্দেহের অবকাশ নেই যে কিউবান বিপ্লবকে রক্ষা করার অর্থ হলো দিয়াস-কানেল সরকারের সাম্রাজ্যবাদের কাছে প্রকাশ্য আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা (যে নীতিকে রাউল কাস্ত্রোও প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন)। কিউবার অভ্যন্তরে বামপন্থী বিরোধীদেরকে শ্রমিক ও কৃষকদের সামনে বিকল্প পথ তুলে ধরতে হবে। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের বহু কিউবান পিসিসির সেই নীতিগুলিকে ঘৃণা করে, যা বৈষম্য ও দুর্দশা বাড়িয়েছে; কিন্তু তাদের সামনে কোনো বিকল্প পথ তুলে ধরা হচ্ছে না। সাম্রাজ্যবাদীদের জন্য কিউবার দরজা খুলে দেওয়া আরও গভীর বৈষম্য সৃষ্টি করবে এবং ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের প্রকৃত অর্জনগুলিকে ধ্বংস করবে। সমস্যা পরিকল্পিত অর্থনীতি নয়; সমস্যা আমলাতান্ত্রিক অপব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। আর প্রকৃত সমাজতন্ত্রের জন্য দরকার শ্রমিক গণতন্ত্র, ভিন্নমতাবলম্বী সমাজতান্ত্রিক মতের দমন ও বৈধ প্রতিবাদের ওপর দমন-পীড়ন নয়।

আগামী কয়েক সপ্তাহেই বোঝা যাবে পিসিসি নেতৃত্বের এই বিপর্যয়কর পথের বিরুদ্ধে প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক বিরোধিতা গড়ে ওঠে কি না। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাই ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে প্রকৃত কমিউনিস্টদের অবশ্যই কিউবান বিপ্লবের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে এবং সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে।

#কিউবান_বিপ্লব #সমাজতন্ত্র #রাজনীতি #কিউবা #লাতিন_আমেরিকা #শ্রমিক_শ্রেণি #সাম্রাজ্যবাদ #অর্থনীতি
Sankalpa

About the Author

Sankalpa

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষার্থী

বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast