সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

প্রেম চাই গো প্রেম!

প্রযুক্তির যুগে এআই গার্লফ্রেন্ড বা ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে প্রেম এখন কেবল আবেগ নয়, বরং মুনাফাভিত্তিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। সামাজিক হতাশা ও বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেতে তরুণরা এই কৃত্রিম সম্পর্কের জালে আটকা পড়ছে। সম্পর্কের নামে চলছে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যা শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস ও মানসিক অবসাদ ডেকে আনে।

অন্বেষ বন্দ্যোপাধ্যায়
অন্বেষ বন্দ্যোপাধ্যায় মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 5 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 1 বার পড়েছে
প্রেম চাই গো প্রেম!

AI এর যুগ যখন, তখন রোবট প্রেমিকা গড়তে বাধা কোথায়? ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে AI গার্লফ্রেন্ডের ঢালাও বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে। প্রেম বেচো, ব্যাপক মুনাফা। প্রেমের মতন লোভনীয়, মোহময়ী আর কে আছে?

তরুণ মনের একদিকে বিরুদ্ধতা, অন্যদিকে প্রেম। তাহলে কেমন হয়, যদি প্রেমকে বিরুদ্ধতার একটি সেফটি ভালভ হিসেবে কাজে লাগানো যায়? চারপাশে স্থবিরতা, বেকারত্ব, হতাশা, সামাজিক ডিপ্রেশনের মহামারী। যেকোনো মুহূর্তে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। কিছু কিছু জায়গায় ঘটছেও। তাই একটা চমৎকার ভেন্টিলেশন দরকার। সামাজিক হতাশা? কোনো চিন্তা নেই। ধ্বস্ত মনের চাই আশ্রয়, চাই মানসিক শান্তি, কঠোর কঠিন পৃথিবীতে চাই ভালোবাসার ছোঁয়া। আছে প্রেম। পুঁজিপতি প্রযুক্তির কারবারিরা খুব easy accessible প্রেমের মডেল ম্যানুফ্যাকচার করে বাজারে ছেড়ে দিয়েছে। প্রেমকে প্রমোট করতে এসে গেছে স্ন্যাপচ্যাট, টেলিগ্রাম, হাজারো ডেটিং অ্যাপ। কেবল প্রেম নয়, নিছক শারীরিক চাহিদা মেটানোর ভরপুর সুযোগ। Open to all, কোনো রেস্ট্রিকশন নেই। ভাঙাচোরা সময়ে সকলেরই প্রেম চাই। অতএব দেদার মুনাফা।

তবে, একটা কিন্তু আছে। AI তো সবেমাত্র লঞ্চ হয়েছে। এখনও অনেক আপডেট করতে হবে, উন্নত করতে হবে। সেটা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর রোবট প্রেমিকা কিন্তু মোটা খরচের বিষয়। বাজারে এসে গেছে ঠিকই। কাজও করছে। কিন্তু যতটা স্প্রেড হওয়া দরকার ততটা তো করা যাচ্ছে না। তাহলে উপায়?

তাহলে... বাস্তবের প্রেমিকাগুলোকেই নিজেদের মতন করে ডিজাইন করে নাও। অনেক খরচ বেঁচে যাবে। একই ছাঁচ যেহেতু, অতএব প্রোডাক্টও বেরোবে একই ধাঁচের। হোমোজেনাস, সমসত্ত্ব। সকল প্রেমিক প্রেমিকার একমুখী প্রত্যাশা। একমাত্রিক প্রত্যাশা। ঠিক রোবটের মতো। কেবল একবার ডেটিং অ্যাপ বা 'রিলেশনশিপ'মুখী সোশ্যাল মিডিয়ার ফাঁদে পা দেওয়ার অপেক্ষা। কমোডিটি ফেটিসিজমের অমোঘ হাতছানি তো আছেই। কেবল চাই চাই খাই খাই! আরও চাই, আরও চাই। চকচকে পোশাক, মোবাইল রিচার্জ, ক্যাফে ডেট, আজ এখানে বেড়ানো, কাল সেখানে ঘোরা। সংকীর্ণ, আত্মমগ্ন, বিমুখ বৃহৎ জগৎ হতে। কঠিন বাস্তব থেকে পালিয়ে থাকতে গিয়ে রিলেশনশিপের নামে সোনার সময়ের অপব্যয়। সীমাহীন চাহিদার পাকচক্র।

ফলাফল? অবিশ্বাস, সন্দেহ, সম্পর্কের অসুস্থতা। প্রেমিক আর প্রেমিকা একে অপরের ফোনে নজরদারি চালাচ্ছে, 'চেক' করছে! প্রতি মুহূর্তে 'লয়্যালিটি' প্রমাণ করতে হচ্ছে! কারণ চারিদিকে রঙিন লোভের দুর্বার হাতছানি। তাতে পা পিছলে যাবেই। তাই, অফুরন্ত সময় দিতে হবে! অফুরন্ত চাহিদা মেটাতে হবে! এদিকে মহামূল্যবান সময়গুলো পিছলে যাচ্ছে। টাকা নষ্ট হচ্ছে। তবু সম্পর্ক টিকছে না, লয়্যালিটি থাকছে না।

সামাজিক, পেশাগত, মনস্তাত্ত্বিক সংকট যত তীব্র হচ্ছে, ট্রমা, ডিপ্রেশন, হতাশা তত বেশি হারে বাড়ছে। আর ততই এই ম্যানুফ্যাকচার্ড সম্পর্ক টেকাতে আরও বেশি করে মরিয়া হয়ে উঠছে সবাই। রাজপথে আন্দোলন করে সাফল্য নাও আসতে পারে। তার চেয়ে প্রেমিকার বুকে মাথা রাখা অনেক বেশি 'সেইফ'। ফলশ্রুতিতে আরও চাহিদা, আরও প্রলোভন, আরও সন্দেহ। ভয়াবহ এক পাকচক্র! শান্তি নেই, রিলিফ নেই, অশান্তি অস্থিরতার ঘনঘটা। ফলে ১৮ বছরের স্পর্ধিত মন আজ মানসিক আশ্রয়ের খোঁজে নিজেরই সম্পর্কের জ্বালায় জর্জরিত, হতোদ্যম, ক্লান্ত। তার স্বভাবজাত মনের বিরুদ্ধতার আগুন জ্বলে ওঠার আগেই নিভে গেছে। ভূতের দেশে তেলহীন ঘানি ঘোরাতে ঘোরাতে সমস্ত তেজ তার নিঃশেষ হয়ে গেছে।

আসলে পুঁজিবাদী সমাজে সবকিছুই পণ্যে পরিণত হয়। প্রেম ও মানবিক সম্পর্কও এই বাণিজ্যিকীকরণ থেকে মুক্ত নয়। বুর্জোয়া সমাজে মানুষের উপযোগিতা ও আর্থিক মূল্যের ওপর ভিত্তি করে প্রেমের সম্পর্ক নির্ধারিত হয়। পুঁজিবাদ মানুষকে তার নিজের শ্রম এবং প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ মানুষের মানসিক জগৎকে একাকী ও স্বার্থপর করে তোলে। ফলে মানুষ প্রেমকে খোঁজে একাকীত্ব দূর করার উপায় হিসেবে। কিন্তু ধনতন্ত্রের কাঠামোগত শোষণের কারণে সেই প্রেমে প্রকৃত মানবিক গভীরতা থাকে না।

ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের মতে, বুর্জোয়া সমাজে প্রেম মূলত একটি 'অর্থনৈতিক চুক্তি'। বুর্জোয়া প্রেম অনেক সময়েই শ্রেণি অবস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেখে তৈরি হয়, যা আসলে এক ধরণের 'আইনসম্মত পতিতাবৃত্তি'। এঙ্গেলসের মতে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা মানুষের মনকে কলুষিত করে। বুর্জোয়া সমাজের প্রেমে 'আমার' বা 'মালিকানা'-র ধারণা মানসিকতা প্রবল থাকে। সঙ্গীকে ভালোবাসার চেয়ে তাকে নিজের সম্পত্তি হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতাই এখানে মুখ্য হয়ে ওঠে।

বর্তমান যুগে প্রযুক্তির কারবারিরা একহাতে যেমন আমাদের দিচ্ছে, তেমনি অন্য হাতে আমাদের হৃদয়, মন, মর্জি লুঠ করে নিজেদের মুনাফার পাহাড় আরও উঁচু করছে। তাই মুক্তি খুঁজতে হবে কঠোর সত্যের মধ্যেই। সত্য থেকে পালিয়ে গিয়ে নয়, সত্যকে গ্রহণ করে বাস্তব পারিপার্শ্বিককে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। তার জন্যে প্রচুর পড়তে হবে। যান্ত্রিক রিলেশনশিপ বা সোশ্যাল মিডিয়ার পেছনে দৌড়ে লাভ নেই। পড়তে পড়তে, জানতে জানতে, বুঝতে বুঝতেই একদিন হাতে চলে আসবে সমাধান, মুক্তির চাবিকাঠি। নিজের মুক্তি, অন্যদের মুক্তি, সমাজের মুক্তি। আজকের ফেসবুক সাহিত্যে প্রি-ডিজাইনড বসন্ত পলাশের ছড়াছড়ি। আমাদের চ্যালেঞ্জ হোক - এই পলাশের আগাছায় রক্তকরবীর ষড়যন্ত্র রপ্তানি করা।

#পুঁজিবাদী_সমাজে_প্রেম #এআই_গার্লফ্রেন্ড #সামাজিক_বিশ্লেষণ #মানবিক_সম্পর্ক #প্রযুক্তি_ও_সমাজ #মানসিক_অবসাদ #তরুণ_প্রজন্ম #বাস্তবতা
অন্বেষ বন্দ্যোপাধ্যায়

About the Author

অন্বেষ বন্দ্যোপাধ্যায়

মজদুরের নিয়মিত লেখক

Job as a content writer in a media house

গবেষক। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। আগ্রহের বিষয় : বাংলা সাহিত্য আন্দোলন, মার্কসবাদ, চার্বাক ও লোকায়ত দর্শন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র দলীয় সদস্য। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ এবং পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদের আজীবন সদস্য।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast