নারী। ঘৃণিত একটি শব্দ। সংস্কৃত থেকে সে এসে আজন্ম আমাদের লালন করেছে। সেই অপরাধের শাস্তি আমরা পুরুষজাতি তাদেরকে নানাভাবে দিয়েছি এবং দিয়ে চলছি। নারীর সংগ্রাম এক অলিখিত ইতিহাস। নারীর সংগ্রাম শুরু হয় মায়ের গর্ভে আসার সঙ্গে সঙ্গে। একটি ভ্রূণ, তার এখনো চেতনা আসেনি, সঠিক আকার পায়নি, ঠিক তখনই বাইরের জগতে থাকা নরপিশাচদের কাছ থেকে তার লিঙ্গ-পরিচয় লুকিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে হয়; পাছে সুন্দর ধরণীর মুখখানা না দেখতে পায়! তারপরে কোনোভাবে নয় মাস লিঙ্গ-পরিচয় গোপন করে রেখে যখন ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় আসে, তখন শুনতে পায় কেউ তাকে চায় না, কেউ তাকে পৃথিবীতে সাদরে অভ্যর্থনা জানাবে না। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে দেখতে পায় তাকে দেখে সবার হৃদয়ভার-পুত্রসন্তান হলো না কেন? এ বোঝা এখন কে বইবে? কালোমুখে মাতা-পিতা সব মেনে নেন। সন্তানকে তো আর তারা মেরে ফেলতে পারবে না!
দ্বিতীয় ধাপের সংগ্রাম শুরু হয় শিক্ষার অধিকার নিয়ে। একটি ছেলের মতো কন্যার পেছনে টাকা ঢালবে কিনা? যখন মেয়েটি এখানেও সফল হয়, তখন তাকে আবারও আন্দোলন করতে হয় বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে। পঞ্চম, অষ্টম, দশম, দ্বাদশ শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে অনেক ফুলই ঝরে যায়। যারা বেঁচে যায়, সমাজ তাদের দিকে অন্য নজরে তাকায়। ধর্মগুরুদের ফতোয়া, নরপিশাচদের লালসাপূর্ণ চোখ, একঘরে করার হুমকি এড়িয়ে নারীটি যখন উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে, তখন মাতা-পিতা আবেগের অপব্যবহার ঘটিয়ে বিয়ে দিতে চান। বিয়ে দিক, এতে আমার ন্যূনতম দ্বিমত নেই, কিন্তু এতে নারীর সম্মতি থাকা আবশ্যিক। আমাদের বাঙালি পরিবারে নারীর সম্মতি নেওয়ার কোনো বালাই নেই। যদি বা সম্মতি আছে কিনা তা জিজ্ঞেস করা হয়, তবে তার আগে নারীটিকে এমন চক্রব্যূহে রাখা হয় যেখান থেকে মুক্তি পেতে শুধু সম্মতির পথই খোলা।
যখন নারীটি শক্ত মনে অধিকারিণী হয় এবং এতসব নাকচ করে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করতে যায়, তখন কিছু রক্ষণশীল পিশাচ নারীটির পেছনে লাগে তাকে হেয় করার জন্য। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে যখন তারা হেরে খাবি খায়, তখন শারীরিকভাবে হেয় করার চেষ্টায় মত্ত হয়। নারীদের বেশি শত্রু নারীরাই-ইহা হাজারবার প্রমাণিত। যখন বাঙালি ঘরে কোনো নারী ভূমিষ্ঠ হয়, তখন পুরুষদের তুলনায় নারীদের নাক সিটকানোর হারই বেশি। অথচ এই নারীরা ওই সদ্য ভূমিষ্ঠ নারীরই আপনজন, যেমন দাদী/নানি, মাসী/পিসি ইত্যাদি। এর অবশ্য শক্ত কারণ রয়েছে। ওইসব নারীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নির্যাতিত হতে হতে দাসত্ব মেনে নিয়েছে, নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে সন্দিহান, নারী হয়েও নারীবিদ্বেষী। তারা মনে করে তাদের মতো আরেক অপদার্থ জন্মাল, যদি পুত্র হতো তবে তা পদার্থ হতো। ইহা অবশ্য শুধু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময়ে নয়, জীবনের প্রতিটি ধাপেই পুরুষতন্ত্রের তুলনায় নারীর শত্রু নারীরাই।
কোনো নারী চাকরি করছে? একটু গুজব ছড়িয়ে দাও, ও চাকরি ছেড়ে কেঁদে কেঁদে আত্মহত্যা করবে। কোনো নারী একটু ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে? শারীরিক অবমাননা করে দাও, ও আর জাগবে না। কোনো নারীর কথা ভালো লাগছে না কিংবা নারী অধিকার নিয়ে কাজ করছে কিংবা পুরুষতন্ত্রের দোষ উন্মোচন করছে? তাকে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কুরুচিকর গালিগালাজ করে দাবিয়ে দাও। ভাগ্যিস বেগম রোকেয়া শোনেননি যে তাঁর পেছনে তাঁর প্রতিপক্ষ রক্ষণশীল কাঠমোল্লারা কী কথা বলে, তা হলে তিনি আত্মহত্যাই করতেন। আজ ইন্টারনেটের সুবাদে যা দেখতে পাই, বেগম রোকেয়া তা দেখতে পাননি বলেই আজকে আমার বোনটি স্কুলে যেতে পারছে।
আমরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বেশিরভাগ পুরুষই নারীকে প্রেমদায়িনী, আনন্দদায়িনী, বাচ্চা উৎপাদনের কল, ভোগ্যবস্তু, খাদ্য ইত্যাদি আকারে দেখি, শুধু মানুষ হিসেবে দেখতেই ব্যর্থ। নারীর অপরাধ এই যে সে তার শরীরে জরায়ু, স্তন ও যোনির মতো অঙ্গ বহন করে। এটাই নারীর সকল সমস্যার কারণ। নারী যে সন্তান জন্মদানে সক্ষম-ইহা দেখিয়ে অনেক নারী গর্ববোধ করে, কিন্তু এই সকল অঙ্গ এবং এই ক্ষমতাই তার দুর্ভোগ বহন করে আনে। আমরা নারীকে বিছানায় পেতে, তাকে অবদমিত করে রাখতে, তার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সর্বদা উদগ্রীব থাকি। এর দায় সরাসরি পুরুষদের দিলে ভারী অন্যায় হবে। পুরুষদের পাশাপাশি দোষ রয়েছে পুঁজিবাদী সমাজের, বর্বরোচিত ধর্মের, অসচেতন মাতা-পিতার, সর্বোপরি আমাদের ধ্যান-ধারণার।
পাঠক, নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন আমি এখানে পুঁজিবাদকে টেনে আনছি কেন? এর দুটি প্রধান কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, পুঁজিবাদ বিজ্ঞাপনে নারী নয়, নারীর শরীরকে ব্যবহার করেছে। বর্তমানের বিজ্ঞাপন দেখলে মনেই হবে না যে জগতে পুরুষ বলে কোনো জীব রয়েছে। পুঁজিবাদ নারীর শরীরকে এতটাই সস্তা পণ্য বানিয়ে ফেলেছে যে আজকালকার তরুণ-যুবকেরা মনে করে নারীর শরীর এমনই সস্তা। দ্বিতীয়ত, বাংলা ফিল্ম ও নাট্যসংস্কৃতির অধঃপতন। বর্তমান বাংলা নাটকে অশ্লীল দৃশ্য, গল্প ও অশ্লীল কথোপকথনের সঙ্গে মিশে এক কুখাদ্য তৈরি করেছে, যা খেয়ে আমাদের যুবসমাজের মগজে, যকৃতে ও মনে পচন ধরেছে। বিজ্ঞাপনের ন্যায় নাটক ও ফিল্মেও নারীর শরীরকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এসব কলায় নারীবিদ্বেষ, নারীর প্রতি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অশ্লীল বাক্য, নারী অবমাননা ইত্যাদি খুবই স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা দর্শকের অবচেতন মনে নারীবিদ্বেষ, নারী অবমাননা, নারীর প্রতি সহিংসতা ও নারীকে বুদ্ধিতে নিচু দেখানোর ভাব জন্মায়।
বর্তমান বাংলা নাটক দুই ধরনের: এক, যা মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয় এবং দুই, যা ইউটিউব ও নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হয়। টিভি চ্যানেলে প্রচারিত নাটকগুলোতে যৌন সুড়সুড়ি না থাকলেও ইউটিউবে যেসব নাটক প্রচারিত হয় তা কুখাদ্যকেও হার মানায় এবং এই ধরনের নাটকেরই দর্শক বেশি। বলা হয়ে থাকে, এক হাতে তালি বাজে না। সুস্থ বিনোদনধারাকে অসুস্থ করতে দর্শক ও প্রযোজক-পরিচালক উভয়েরই হাত রয়েছে। দর্শক যেহেতু এসব যৌন সুড়সুড়িপূর্ণ নাটক ও সিনেমা পছন্দ করে, তাই নাটক ও সিনেমা প্রযোজক-পরিচালকরাও এমন কুখাদ্য নির্মাণ করে চলেছেন। ব্যবসায় ভরাডুবির ভয়ে কেউ এই প্রথা ভাঙছেনও না; কেননা প্রযোজক-পরিচালকরা বর্তমানে টাকাকেই সব বলে মনে করেন, যদিও সমাজের তরুণ ও যুবকদের সুস্থ ধারার বিনোদন দেওয়ার দায়িত্ব এসব প্রযোজক-পরিচালকদেরই। অন্য দিক দিয়ে দেখলে মনে হবে প্রযোজক-পরিচালকদেরও দোষ নেই, তারা ব্যবসা করতে এসেছেন। যদি কেউ অশ্লীলতার প্রথা ভাঙতে চায়, তবে দর্শকদের সমর্থন সেই নাটক/সিনেমার প্রতি কম পড়বে এবং লাভও কম হবে।{
"দর্শকদের এসব কুখাদ্য খাওয়ার রুচি কোথা থেকে এলো?" যারা এমন ভাবছেন, তাদেরকে আমি একটি প্রধান উৎসের কথা বলব-পর্নোগ্রাফি। বর্তমান যুগে ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার সহজলভ্য হওয়া এবং অভিভাবকদের অসচেতনতা-এই পর্নোগ্রাফি বা এক প্রকার ডিজিটাল মাদক শিশু-কিশোরদের কাছে ব্যাপক হারে পৌঁছানোর পেছনে ব্যাপকভাবে দায়ী। একজন শিশু বা কিশোর যখন এই পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন সে আশেপাশের সব ঘটনাকেই যৌনতার সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা করে। তারা সব নারীকেই পর্নোগ্রাফির অভিনেত্রীদের সঙ্গে তুলনা করে এবং বেশিরভাগই বড় হয়ে নারীর প্রতি বিদ্বেষ, নারীর প্রতি সহিংসতা, ইভটিজিং, নারীকে অনলাইনে বুলিং, বডি শেমিং, নারীর প্রতি কুনজর ও নারীকে পণ্য হিসেবে দেখার প্রবণতায় ভোগে। এই ভয়াল পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণকারী ও উৎপাদনকারীর সুতো ধরে টান দিলে খুঁজে পাওয়া যাবে সেই পুঁজিবাদকেই।
নারীর প্রতি পুরুষের এমন আচরণের আরেকটি কারণ হলো ধর্ম, যা পুঁজিবাদের পরেই আসে। মানব ইতিহাসের শুরু থেকে আজ অবধি ধর্মগুলো নারীর প্রতি ভালো দৃষ্টিতে তাকায়নি। কিছু কিছু ধর্ম দাবি করে তারা নাকি নারীকে সম্মান দিয়েছে, কিন্তু আবার তারা তা পেছন থেকে কীভাবে ফিরিয়ে নিয়েছে তা বলেনি।
হিন্দুধর্ম দিয়েই শুরু করি। হিন্দু ধর্মগ্রন্থে নারীকে শয়তান রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। মহাভারত অনুশাসন পর্ব: ৩৮-এ বলা হয়েছে-"তুলাদণ্ডের একদিকে যম, বায়ু, মৃত্যু, পাতাল, বাড়বানল, ক্ষুরধার বিষ, সর্প ও বহ্নিকে রেখে অপরদিকে নারীকে স্থাপন করলে ওজন সমান সমান হবে।" দেবীভাগবত ৯:১-এ বলা হয়েছে-"নারীরা জোঁকের মতো সতত পুরুষের রক্তপান করে থাকে, মূর্খ পুরুষ তা বুঝতে পারে না, কেননা তারা নারীর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে পড়ে। পুরুষ যাকে পত্নী মনে করে, সেই পত্নী সুখসম্ভোগ দিয়ে বীর্য এবং কুটিল প্রেমালাপে ধন ও মন সবই হরণ করে।" কিছু মানুষ বলবেন দেবীভাগবতের এই লাইনটি আক্ষরিক অর্থে নয়, রূপক অর্থে লেখা। রূপক হোক কিংবা আক্ষরিক, দিনশেষে তা নারীর প্রতি বিদ্বেষই পোষণ করে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রায়শই পুরুষ প্রথমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। বিয়ে পুরুষ করবে এগিয়ে এসে, সম্ভোগ পুরুষ করবে, আর দোষ হবে নারীর-যে তারা কুটিল প্রেমালাপে ধন ও মন সবই হরণ করে? ইহা নারীবিদ্বেষী মানবরচিত কথাবার্তা ছাড়া আর কিছু নয়।
মনুসংহিতায় (৯:১৫)-তে বলা হয়েছে-"পুরুষ দেখামাত্রই তারা মেতে ওঠে বলে চঞ্চলচিত্ত ও স্নেহশূন্য; তাই সুরক্ষিত রাখা হলেও তারা স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়।" নারীকে বশে রাখতে প্রয়োজন স্নেহ, ভালোবাসা বা প্রেম নয়; প্রয়োজন নির্দয় প্রহার-এ কথা হিন্দু শাস্ত্রবাক্যে উচ্চারিত হয়েছে। বৃহদারণ্যক উপনিষদে (১:৯:২:১৪) বলা হয়েছে-"লাঠি দিয়ে মেরে নারীকে দুর্বল করা উচিত, যাতে নিজের দেহ বা সম্পত্তির ওপর আর কোনো অধিকার না থাকে।" ইহা নারী নির্যাতনের এক প্রকাশ্য অনুমোদন। আজকালকার সভ্য সমাজে কেউ এই বর্বর ধর্মের বর্বর আইন প্রয়োগ করলে তাকে যে নারী নির্যাতনের ধারায় মামলা দেওয়া হবে, ইহা সবাই ভালোভাবে অবগত। তাই প্রায়ই ইন্টারনেট খুললে দেখা যায় ভারতের উগ্রবাদী হিন্দু মৌলবাদীরা 'অখণ্ড ভারত' বা 'হিন্দু রাষ্ট্র' প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেন এসব বর্বরোচিত ধর্মীয় আইনকে তারা রাষ্ট্রীয় আইনে পরিণত করতে পারে। এদের দেহ একুশ শতকে থাকলেও মন সেই আদিম যুগে পড়ে রয়েছে।
মনু নারীকে নির্গুণ বলে মনে করত। মনুসংহিতা ৯:২২-এ আছে-"নদী যেমন সমুদ্রের মিলনে নোনা হয়, নারীও তেমন; যার সঙ্গে বিয়ে হয়, তেমন পুরুষের গুণযুক্ত হয়।" কোনো নারী বিয়ে করবে কি করবে না, ইহা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু হিন্দুধর্ম এখানেও নাক গলিয়েছে। হিন্দু ধর্মীয় বিধানে নারীর অবিবাহিত থাকা নিষিদ্ধ। চূড়ান্ত ধর্মপালনও নারীর স্বর্গলাভের পক্ষে যথেষ্ট নয়। কিন্তু দ্বিচারিতা হলো, হিন্দু পুরুষদের স্বর্গে যেতে চিরকুমার থাকা কোনো বাধা নয়। হিন্দু পুরুষতন্ত্র নারীকে কখনো মানুষ হিসেবে দেখেনি। মনুসংহিতায় ৫:১৫৭-এ আছে-পতির মৃত্যুর পর পত্নী ফলমূলের স্বল্পাহার দ্বারা দেহ ক্ষয় করবে, তবু পর পুরুষের নাম নেবে না। যেহেতু আমি বহুবিবাহের বিরোধী, তাই এই কথাটির সঙ্গে আমি আংশিক একমত। কিন্তু পত্নী স্বল্পাহার করবে কেন? কেন তার প্রয়োজন অনুযায়ী আহার করবে না? এখানেও মনু সদ্য বিধবা হওয়া নারীটিকে নিচু দেখানোর ও নিচু করে রাখার হীন চেষ্টা করেছে। কিন্তু আবার ৫:১৬৮-এ বলা হয়েছে-"পত্নীর মৃত্যু হলে দাহ ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষে পুরুষ আবার বিয়ে করবে।" নারী ও পুরুষের জন্য এমন আলাদা নিয়ম কেন?
পরকীয়া ও লাম্পট্য আজকালকার সভ্য সমাজে ঘৃণিত এবং ইহা ঘৃণিতই থাকা উচিত। কিন্তু হিন্দু ধর্মে পুরুষের লাম্পট্যকে নীতিগতভাবেই গ্রহণ করা হয়েছে। মনুসংহিতা ৫:১৫৪-এ আছে: পতি সদাচারহীন, পরস্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কযুক্ত বা গুণহীন হলেও সতী স্ত্রী সেই পতিকে দেবতার মতোই পূজা করবে। কোনো সাধারণ মানুষই সাধারণ জ্ঞান দ্বারা পরকীয়া বা অর্ধাঙ্গীকে ঠকানো সমর্থন করবে না, কিন্তু ধর্ম তো তার পূর্ণ সমর্থন দিয়ে রেখেছে। এর মানে কি ধর্মগুলো যারা তৈরি করেছে, তাদের ঘটে আজকালকার সাধারণ মানুষের সাধারণ জ্ঞানের তুলনায়ও নিম্নমানের জ্ঞান ছিল? এছাড়া আরেকটি প্রশ্ন আছে, নারী মানেই বিনোদনদানকারী? শুধু পুরুষের যৌনকর্মের জন্য ব্যবহৃত বস্তু? বাস্তবে তা না হলেও ধর্ম ও তার উগ্র অনুসারীগণ ইহা বাস্তব করতে কোনো ত্রুটি রাখছেন না।
আমার বিবেচনামতে, নারীকে নিয়ে হিন্দুধর্মের সর্বনিকৃষ্ট আইন হলো মনুসংহিতা ৯:৪-যেখানে বলা হয়েছে-"নিঃসন্তান স্ত্রীকে বিয়ের দশ বছর পর ত্যাগ করা যায়, যে স্ত্রী শুধুমাত্র কন্যা সন্তানের জন্ম দেয় তাকে ত্যাগ করা যায় বারো বছর পর, মৃত সন্তানের জন্মদানকারী স্ত্রীকে ত্যাগ করা যায় পনেরো বছর পর।" শুধুমাত্র নিঃসন্তান হওয়ার জন্য যদি নারীটিকে ত্যাগ করা হয়, তবে প্রমাণ হয়ে যায় যে নারী শুধুমাত্রই সন্তান উৎপাদনের কল। স্ত্রী নিঃসন্তান শুধু তার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণেই হয় না, বরং পুরুষের কারণেও হয়। অনেক উগ্র নারীবাদী বলবেন, তাহলে পুরুষ যদি দায়ী হয় তবে পুরুষটিকে ত্যাগ করা উচিত। আমি মোটেই তা বলব না। বিয়ের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র জিন স্থানান্তরই নয়, বরং জুটির মধ্যে বিশ্বাস, ভালোবাসা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি স্থাপন করাও তার দায়িত্ব। যদি পুরুষটি বা নারীটি সন্তান জন্মদানে অক্ষম হয়, তা হলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাহায্য নিতে হবে। চিকিৎসা বিজ্ঞান ব্যর্থ হলে দম্পতিটি দত্তক নিতে পারে। কিন্তু কাউকে ত্যাগ করা কোনো সমাধান নয়।
মনুর সেই যুগে বিজ্ঞান এত উন্নত ছিল না, কিন্তু সন্তান দত্তক নেওয়ার আইন বলতেই পারত মনু, ত্যাগ না করে। মনু এই আইন এই কারণেই বলেনি, কারণ তার মনে হয়েছিল (যা পরে যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে)-যেহেতু নারী তার জরায়ুতে সন্তান ধারণ করে, তাই নারী যদি সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম হয় তবে সব দোষ নারীর। মনুর বোধহয় জানা ছিল না যে পুরুষের ঔরসে শুক্রাণু না থাকলে বা পর্যাপ্ত না হলেও ডিম্বাণু কাজ শুরু করবে না, অর্থাৎ ইভেন্ট ট্রিগার হবে না। পাঠক, একটু নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করুন তো, কথিত ঈশ্বর যদি সবই করতে পারেন ও জানেন, তাহলে কোথাও বললেন না কেন যে এই ক্ষেত্রে দোষটি সর্বদা নারীর নয়? মনুর আইনের প্রতি ঈশ্বরের এই চিরনীরবতা কি সম্মতির লক্ষণ? আমরা কি ধরে নেব যে ঈশ্বর নারীবিদ্বেষী এক পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দালালমাত্র? ঈশ্বর নারীবিদ্বেষী? নাকি ঈশ্বর বলে আদতে কোনো জিনিসই নেই, সবটাই বুজরুকি? থাকলেও ঈশ্বর কি মারা গেছেন? নাকি সাম্যের প্রতীক ঈশ্বর নারীর যন্ত্রণা দেখে জেফ্রি অ্যাপস্টিনের ন্যায় খুশি হন?
শুধুমাত্র কন্যাসন্তান জন্মদানের জন্য যদি স্ত্রী তার স্বামী কর্তৃক ত্যাগপ্রাপ্ত হয়, তবে তা অসভ্যতা ও নারীর প্রতি বর্বরতার সীমা অতিক্রম করে। বিজ্ঞান নানাভাবে প্রমাণ করেছে সন্তানের লিঙ্গনির্ধারণে নারীটির কোনো রূপ প্রভাব নেই। নারীর X ক্রোমোজোম ধ্রুব, পুরুষ যদি Y ক্রোমোজোম দিতে পারে তবে সন্তান ছেলে হবে, আর যদি পুরুষ X ক্রোমোজোম দেয় তবে মেয়ে। তথাকথিত সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান ঈশ্বর যদি এই সাধারণ বিষয়টি না জানেন, তবে তো তাঁর মুখে চুনকালি পড়ল। আর যদি জেনেও মনুর বর্বর আইনে সমর্থন দেন, তবে তো নারীর প্রতি অবিচার করলেন। দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের দেশের অধিকাংশ পুরুষ বিজ্ঞান পড়েন এক টুকরো কাগজের জন্য। তারা বিজ্ঞান পড়ে কাগজের টুকরো নিয়ে আদিমকালের বর্বর আইনের ওকালতি করতে শুরু করেন। আমার এক শিক্ষক বলতেন, ধর্ম আর বিজ্ঞান যেন কখনো না মেলাই। ধর্ম ও বিজ্ঞান হলো পজিটিভ ও নেগেটিভ তারের মতো, মেশালেই বিস্ফোরণ ঘটবে। তিনি ঠিকই বলেছিলেন, ধর্ম ও বিজ্ঞান মেশালে ধর্মই বিস্ফোরণ করে, বিজ্ঞান নয়। অবশ্য এসব অসভ্য নিয়ম দেখে বিজ্ঞান ও যুক্তি ব্যতীত আমি আর কোনো পথ দেখতে পাচ্ছি না।
একটি নারী মৃতসন্তান জন্ম দিতেই পারে-ইহা অসম্ভব ঘটনা নয়। ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা, অমরার সমস্যা, মাতৃস্বাস্থ্যজনিত কারণ, কোরিওঅ্যামনিওনাইটিস, অকাল প্রসব, জীবনযাত্রা ও পরিবেশগত কারণ, বড় কোনো ধাক্কা বা দুর্ঘটনা-এসব কারণে মৃতসন্তানের জন্ম হতে পারে। আগেই উল্লেখ করেছি, কারও কোনো রূপ অক্ষমতার কারণে তাকে ত্যাগ করা কোনো সমাধান নয়। কোনো নারীই যে স্বেচ্ছায় মৃতসন্তানের জন্ম দেয় না, ইহা অকর্মণ্য মনুর বোঝা উচিত ছিল। আমাদের এখন জানা দরকার, এই মানবতাবিরোধী ও নারীবিদ্বেষী মনু আসলে কে? হিন্দুধর্মমতে, মনু ব্রহ্মার দেহ থেকে উদ্ভূত। ফলে মনু ব্রহ্মপুত্র বলে বিবেচিত হন। মনুর ছেলে ও মেয়েদের থেকেই নাকি মানবজাতির বিস্তার হয়েছে। মানুষেরা মনুরই বংশধর বলে মানুষের নাম 'মানুষ'। হিন্দু আইনের বিধান ছিল ব্রহ্মার চিন্তার ফসল ও মনু এ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। নারীকে করেছে দাসী, গৃহপালিত পশু, আর পুরুষকে স্থাপন করেছে নারীর ওপরে প্রভু হিসেবে।
খ্রিস্টান ও ইহুদিরাও নারীকে শয়তানের মতো দেখিয়েছে। ইউরোপে মুক্তজ্ঞান চর্চায় খ্রিস্টানরা পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও দাবিয়ে রেখেছে। খ্রিস্টান ইতিহাসে নারীবিদ্বেষী মনোভাবের একটি নিদর্শন হলো হাইপেশিয়া অব আলেকজান্দ্রিয়ার হত্যাকাণ্ড। তাকে ৪১৫ খ্রিস্টাব্দে একদল খ্রিস্টান সন্ন্যাসী গির্জায় নিয়ে যান। সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে, ঝিনুকের খোলস বা মাটির টালি দিয়ে চর্মচ্ছেদ করে হত্যা করে। টারটুলিয়ান (দ্বিতীয় শতক) নারীদের শয়তানের দ্বার বলে অভিহিত করেন। সেন্ট জেরোম নারীকে শয়তানের দ্বার, দুষ্কর্মের পথ, সর্পের দংশন, বিপজ্জনক বস্তু বলেন।
মুসলিম বিশ্বে বিবাহ একটি চুক্তিমাত্র। একে দুটি মনের মিলনের তুলনায় চুক্তি বলাই ভালো হবে। এই চুক্তি সম্পাদনে পাত্র-পাত্রীর তুলনায় অভিভাবকদের মতামতই প্রাধান্য পায়। আগেই বলেছি, উপমহাদেশে বিবাহের ক্ষেত্রে নারীর মতামত কালেভদ্রে নেওয়া হয়। যদিও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এই প্রথা শুকিয়ে গিয়েছে, কিন্তু মরে যায়নি। মুসলমান জগতে বিবাহের পর স্বামী যখন বিছানায় পেতে চাইবে, স্ত্রীর তখনই আসতে হবে। অবশ্য স্ত্রী "না" বলতে পারে, কিন্তু তা কালেভদ্রেই মানা হয়। আবার, মুসলমান পুরুষ চার স্ত্রীর ওপর তার যৌন অধিকার ফলাতে পারে। স্বামী কোনো কারণ ছাড়াই তার স্ত্রীকে ইচ্ছেমতো তালাক দিতে পারে, মুখে "তালাক" বললেই তালাক হয়ে যায়। কিন্তু নারী যদি কোনো কারণে স্বামীকে তালাক দিতে চায়, তবে তা সহজে সম্ভব নয়। কিছু মুসলিম দেশ এতে সংস্কার এনেছে; সেখানে তালাক দিতে হলে আদালতে নিবন্ধন করতে হয় ও স্ত্রীকে অবহিত করতে হয়। তবে ইহা ধর্মীয় নয়, রাষ্ট্রীয় আইন।
দেনমোহর নিয়ে একটি বিতর্ক রয়েছে। অনেকে বলেন দেনমোহর নারীর আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা দেয়। বিবাহবিচ্ছেদ, স্বামীর মৃত্যু ইত্যাদি ঘটনার পর যেন স্ত্রী বিপাকে না পড়ে, সেজন্য দেনমোহর কার্যকর একটি নিয়ম। কিন্তু কে জানত এই দেনমোহরের শেকলে আবদ্ধ হয়ে নারী তার স্বাধীনতা হারিয়ে বসবে? মহাভারতে যেভাবে নারীকে যম, মৃত্যু, ক্ষুরধার বিষ, সর্পের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, তেমনি ইসলামে নারীকে শস্যক্ষেত্রের সঙ্গে। এখানেই নারী বরাবরের মতোই সম্পদ, দ্রব্য ও বাচ্চা উৎপাদনকারী হিসেবেই ফুটে উঠেছে।
নারী শুরু থেকেই যার সঙ্গে যুদ্ধ করে এসেছে, তার মধ্যে একটি হলো শারীরিক অবমাননা বা বডি শেমিং। এমন নারী খুঁজে পাওয়া কষ্টকর, যিনি জীবনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শারীরিক অবমাননার শিকার হননি। আমাদের সমাজ সুন্দরী নারীর একটি মানদণ্ড তৈরি করেছে। সুন্দরী নারী হওয়ার এক নম্বর শর্ত হলো ফর্সা হওয়া। জন্মের সময় থেকেই মেয়েদের চামড়ার রং নিয়ে মন্তব্য করা হয়। আদর্শ নারীকে হতে হবে পাতলা ও সুঠাম। পুঁজিবাদী সমাজের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপনে নারীর শরীর ব্যবহার করায় এই মানদণ্ডটি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। সুন্দরী নারী মানে মসৃণ ত্বক, গোলাপি ঠোঁট, উজ্জ্বল কালো চুল, সুগঠিত কপাল, পায়ের পাতা ও দাঁত, সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর, দৃঢ় ও লোমহীন বাহু ইত্যাদি। একজন নারী ঐ কাল্পনিক আদর্শ নারী থেকে যত দূরে চলে যায়, তার শারীরিক অবমাননার অভিজ্ঞতা তত পোক্ত হয়। যখন কন্যার বিয়ের জন্য পাত্রপক্ষ দেখতে আসে, তখন বাজারে মাছ যেমন ক্রেতা নেড়েচেড়ে দেখে, তেমনই ঐ পাত্রী নারীটিকে নেড়েচেড়ে পণ্যের মতো দেখা হয়। আসলে পাত্রপক্ষ নারী কিনতে আসে না বিয়ে করতে আসে, বোঝা মুশকিল। নারীটির মন-মানসিকতা পরখ করার তুলনায় তার চেহারা কষ্টিপাথরে ঘষে যাচাই করতে মনোনিবেশ করা হয়। যদি দেহেরই প্রয়োজন হয়, তবে পতিতালয়ই শ্রেয়। নারীকে পণ্যায়নের ইহা একটিমাত্র উদাহরণ।
বর্তমানে এই শারীরিক অবমাননা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যদি কোনো নারী ছবি পোস্ট করে এবং যদি তার উপস্থিতি ঐ কল্পিত নারীর চেয়ে দূরে থাকে, তবে তাকে তার শরীর নিয়ে এমন মন্তব্য করা হয় যে ভেবে কুল পাই না ঐ নারীটি পুনরায় মোবাইল ফোন হাতে তোলে কীভাবে! শারীরিক অবমাননার শিকার শুধু নারীরা নয়, পুরুষরাও। যদি কোনো পুরুষের দেহ নিখুঁত না হয়, তবে তাকেও নানা কথা বলে অবজ্ঞা করা হয়। শারীরিক অবমাননা এতটাই ভয়াবহ যে মানুষ আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে পারে। যদিও হঠাৎ করে ইহা থামানো যাবে না, তবে নতুন প্রজন্মকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদী ফল পাওয়া সম্ভব। আমাদের পুরুষতন্ত্রের বোঝা উচিত যে যারই অস্তিত্ব রয়েছে, সেটাই সুন্দর। "নারীর সৌন্দর্যের মানদণ্ড একটি কেন্দ্রীভূত মানদণ্ড না হয়ে প্রতিটি নারীর সৌন্দর্যের মানদণ্ড সে নিজে হওয়া উচিত"-এই কথাটি আগামী প্রজন্মের মনে গেঁথে দিতে হবে। একই কথা পুরুষদের জন্যও খাটে।
আমাদের দেশে নতুন এক প্রজাতির পুরুষদের আকস্মিক আবির্ভাব হয়েছে, যারা নারীর উচ্চশিক্ষায় শঙ্কিত হন। তারা ভাবেন নারীর কাজ শুধুমাত্র ঘরে থাকা, সন্তান লালন-পালন করা। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নারীরা নাকি যেকোনো জায়গায় তাদের সতীত্ব বিলিয়ে দেন! তাদের এই ধারণাকে আমি দুই ভাগে ভাঙব। প্রথমত, তারা নারীদের উচ্চশিক্ষায় শঙ্কিত। কেননা নারীরা যদি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে যোগ্যতা অর্জন করে চাকরির বাজারে আসে, তবে কিছু অযোগ্য পুরুষের চাকরির সুযোগ কমে যাবে এবং চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা হবে। ইহা অবশ্য ভালো; কেননা রুদ্ধ পরিবেশে অপশন যত বাড়বে, যোগ্যদের থেকেও যোগ্যরা ওপরে উঠে আসতে পারবে। দ্বিতীয়ত, উচ্চশিক্ষিত নারী অন্যায়ভাবে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া কিছু মেনে নেবে না। সন্তান লালন-পালন করা নারীর কাজ হতে পারে, কিন্তু শুধু একমাত্র কাজ নয়। পুরুষটি কি তবে সন্তান জন্ম দিয়েই খালাস? এদের এই মানসিকতার আরেকটি কারণ পর্নোগ্রাফি, যা আগেই বলেছি। কিছু লোক ক্ষুব্ধ হবেন যে আমি বারংবার পর্নোগ্রাফিকে কেন দোষ দিচ্ছি? পর্নোগ্রাফি তো সাধারণভাবে কেউ কাউকে জোর জবরদস্তি করে দেখায় না। তাছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোতেও তো পর্নোগ্রাফির প্রভাব রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্যে বলব: প্রথমত, পর্নোগ্রাফি ডোপামিনের চাহিদার জন্য জোর করেই দেখা হয়, তাই দেখা শেষে দর্শকের ভেতরে অনুশোচনা জাগ্রত হয়। দ্বিতীয়ত, ফ্রি-মিক্সিং ও পশ্চিমা ধাঁচের ফ্যাশন সেসব দেশে সাধারণ এবং একটি শিশু ছোটবেলা থেকেই তা দেখে অভ্যস্ত। তৃতীয়ত, সেসব দেশে আইন ও আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা আমাদের দেশের মতো পঙ্গু নয়। অন্যদিকে আমাদের দেশের শিশুরা ও তরুণরা খুবই রক্ষণশীলতার ভেতরে বেড়ে ওঠে এবং তারা যখন নিজেদের শরীর সম্পর্কে জানতে পারে, তখন যৌনতা নিয়ে তাদের আশ্চর্য ও আগ্রহের কোনো সীমা থাকে না।
নারীর জীবনচক্র নিয়ে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে-এরা বড়ই দুর্ভাগা। একটি মেয়ে একুশ বা বাইশ বছর তার পিতৃগৃহে শেকড় বৃদ্ধি ও শক্ত করে। তারপর হঠাৎ একদিন সেসব শেকড় কেটে অন্যত্র, অজানা-অচেনা জায়গায় রোপণ করে দেওয়া হয়। এ এক অমানবিক কাণ্ড! পুরুষগণ আর যাই করুক, দেহে ইস্ট্রোজেন নিয়ে এর কষ্ট বুঝবে না। আবার সন্তান জন্মদানের সময়ে যে নারীটি যমালয় থেকে, যমের মুখের সামনে থেকে যমকে ফাঁকি দিয়ে মর্ত্যলোকে ফেরে, ইহা অনেক পুরুষ ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ স্বীকার করতে চায় না। তাদের দাবি, পুরুষদের জীবিকা নির্বাহের পরিশ্রম নারীর সন্তান জন্মদানের পরিশ্রমের তুলনায় কিছুই নয়। সেই সব 'সু' ও বুদ্ধিমান পুরুষদের কাছে আমার অনুরোধ-নারীর সকল জৈবিক অঙ্গ ও অঙ্গাণু নিজের দেহে যুক্ত করে সন্তান ধারণ ও জন্মদান করবেন; এতে নারী এই সুখকর ও হালকা দায়িত্বটি আপনাকে দিয়ে আপনার কঠিন জীবিকা উপার্জনের দায়িত্ব দান করবেন। আপনিও ধন্য হবেন, নারীও ধন্য হবে। অবশ্য দশ মাসের পরে বাঁচবেন কিনা তা নির্ভর করবে আপনার দেহের ওপর।
নারীর নানা কথা নিয়ে নানা জন নানা যুগে নানা কথা বলেছে। নারীর কথা অবিরামভাবে সমাজের সামনে বলে যেতে নারীবাদ অতি গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গদেশে নারীবাদ নিয়ে রয়েছে নানা কথা-উপকথা, সাচ্ছা-গুজব, ভালো-খারাপ মতামত। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের বেশিরভাগ নারীবাদীও জানে না নারীবাদের অর্থ, সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য কী। নারীবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন এবং চিন্তাধারা, যার আসল উদ্দেশ্য হলো লিঙ্গবৈষম্য দূর করা এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকার, সুযোগ ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আমাদের দেশের কিছু নারীবাদী ও অ্যান্টি-নারীবাদী একে পুরুষবিদ্বেষের অংশ হিসেবে প্রচার করে। মূলত নারীবাদ শুধুমাত্র নারী নয়, পুরুষের সমস্যা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। অনলাইনে দেখা যায়, কিছু সিগমা, আলফা ইত্যাদি ধরনের মানুষ নারীবিদ্বেষ ছড়ায়, তাদের জবাব দিতে অনেক নারীবাদী পুরুষবিদ্বেষ ছড়াত; আর নারীবিদ্বেষীরা একেই লুফে নেয় নারীবাদকে দূষিত করার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে। তবে আশার কথা হলো এই যে, আমাদের নারীবাদীরা সঠিক পথে ফিরে আসছেন।
পতিতালয় সম্পর্কে বোধহয় খুব কম মানুষই কথা বলেছে। আমার দেখামতে পতিতা বা যৌনকর্মীদের পক্ষে একমাত্র বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন-
"সাধুর নগরে বেশ্যা মরিছে, পাপের হয়েছে শেষ,
বেশ্যার লাশ হবে না দাফন, এইটা সাধুর দেশ।"
আমাদের দেশ সাধু-সন্ন্যাসীর দেশ। এখানে কুকর্ম ধরা পড়ার আগে সবাই সাধু। পাঠক, একবার ভাবুন তো, আমাদের দেশে এত সাধু থাকতে বেশ্যালয় কীভাবে থাকে? এক হাতে তালি বাজে না। বেশ্যালয়ে যদি কেউ না যায়, তবে বেশ্যালয় বিস্তার করতে পারত না। সকালে যে বাবুরা বড় বড় রিপোর্ট লেখেন যে সমাজে বেশ্যালয় অশ্লীলতা ছড়াচ্ছে, কিন্তু রাত্রিতে তারাই খদ্দের হয়ে সেখানে যান। আমরা সবাই "বেশ্যালয়" শব্দটি শুনলে বক্তার দিকে তাকিয়ে এমন ভাব করি যেন বক্তা বিশাল অমার্জনীয় অপরাধ করে ফেলেছে। সবাই একে ট্যাবু হিসেবে ধরলেও কেউ এর সমাধান করে না বা করতে চায় না। আসলে দোষ বেশ্যার নয়; দোষ আমাদের, আমাদের মানসিকতার, আমাদের দেশের।
কোনো নারী কখনোই স্বেচ্ছায় তার সতীত্ব বিলিয়ে দিতে চায় না। কোনো বেশ্যার অতীত অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে বেশিরভাগ নারীই পাচারকৃত, বেশ্যালয় মালিকের নিকট কয়েদি, চরম অভাবী, কিংবা অন্য কোনো মারাত্মক কারণে নিষিদ্ধ এই গলিতে পা দিয়েছিল; এখন আর বের হওয়ার পথ দেখতে পাচ্ছে না। এসব বেশ্যা আমারই মতো কারও মা, কারও বোন। আমরা কখনো তাদের এই রাস্তা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেছি কি? আমরা শুধু তাদের দেখে দিনের বেলায় নাক সিটকে এসেছি, তাদের ঘৃণা করে এসেছি। আমাদের উচিত ছিল "বেশ্যা" পেশাকে ঘৃণা করা, যাতে বেশ্যালয় মালিকেরা নিকৃষ্ট এই ব্যবসা গোটাতে বাধ্য হয়। কিন্তু হায়! আমরা সেই দুর্বল নারীটির ওপর ঘৃণা প্রকাশ করে চড়াও হয়ে এসেছি-শক্তের ভক্ত ও নরমের যম হয়ে এসেছি। বেশ্যালয় উৎখাত ও বেশ্যা ব্যবসায় জড়িত নারীদের পুনর্বাসনের ব্যাপারে আজই আমাদের ভাবতে হবে।
প্রথমত, সরকার চাইলেই এর সমাধান করতে পারে। কিন্তু সংসদের সব আসন পুঁজিবাদীদের কেনা গোলাম দিয়ে ভরপুর; তারা তাদের প্রভুর গোলামি করতে অভ্যস্ত হয়ে পালিত কুকুরে পরিণত হয়েছে। কালেভদ্রেই সেখানে কাজের কথা হয়, সেটাও বড়লোকদের; বেশ্যা কোন ছাই! যে এলাকায় বেশ্যালয় আছে, সেখানকার সব প্রশাসন ওই মালিকের দাস। বেশ্যালয় মালিক অর্থ দিয়ে সব প্রশাসনকে অন্ধ দাস করে রাখে। ফলে সরাসরি বেশ্যাদের পুনর্বাসন ও বেশ্যালয় বন্ধ করা অসম্ভব ব্যাপার। আমাদের দেশে পতিতালয় চালানো ও যৌনকর্মীর আয়ে লাভবান হওয়া আইনত দণ্ডনীয়। The Suppression of Immoral Traffic Act 1933 অনুযায়ী পতিতালয় পরিচালনাকারীদের শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু ওসব আইন শুধু আইনের শিক্ষার্থীদের সিলেবাস বাড়ানোর জন্য, তারা এসব মুখস্থ করবে; বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে নয়।
দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন, যা অতি ধীর গতির। তবে এতে নারীবাদীরা আপাতত কিছু করতে পারেন; কেননা পতিতালয় মালিক ও খদ্দেররা সর্বোচ্চ নারী নির্যাতন ও নারী অবমাননাকারী।
শেষাংশে আমি এই পঙ্গু রাষ্ট্রটিকে নারী রক্ষায় কিছু প্রস্তাব বা উপদেশ দিতে চাই:
ক) দেশে পর্নোগ্রাফি নিষিদ্ধ করা: আমাদের দেশে পর্নোগ্রাফির নানা ওয়েবসাইট ব্লক করা, কিন্তু তাও দর্শকরা প্রযুক্তির সহায়তায় পর্নোগ্রাফি দেখতে পারে। সরকারের উচিত বাঘা বাঘা প্রকৌশলীদের নিয়ে একটি কনফারেন্স করা, যেন স্থায়ীভাবে এসব ওয়েবসাইট বন্ধ করা যায়।
খ) ১৮-দের ফোন না দেওয়া: ১৮ বছরের কম বয়সীদের সবার নজরের সামনে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দিতে হবে। যদি তাদের ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করতে না দেওয়া যায় তবে ভালো হয়।
গ) শিক্ষাকারিকুলামে পরিবর্তন: আইন যতই প্রণয়ন বা কার্যকর করা হোক না কেন, যদি পুরুষ ও নারীর মন-মানসিকতা পরিবর্তন না করা হয়, তবে দেশে নারী নির্যাতন বা নারী অধিকার লঙ্ঘিত হতেই থাকবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে যদি একটি স্বাধীন ও বাধ্যতামূলক বিষয় যুক্ত করা হয়, যেখানে বিপরীত লিঙ্গকে শত্রু হিসেবে না দেখিয়ে পরস্পরকে শ্রদ্ধা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি শেখানো হবে। তবে হ্যাঁ, শেখানো হবে, মুখস্থ করে পাশ করা নয়।
ঘ) দুষ্কৃতকারীদের শাস্তি: অত্যাচারী স্বামী, বাল্যবিবাহের উদ্যোক্তা, ধর্ষক, ইভটিজিংকারী, অ্যাসিড নিক্ষেপকারী পশু নারীর চিরকালীন শত্রু। এরা কখনো পুরুষত্ব কী তা দেখেনি। এদের প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে হবে; যা অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীকে হেনস্তা, ডিপফেক নির্মিত নারীর ছবি পোস্ট ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে নারীকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
ঙ) প্রচলিত আইনে বিচার: আমাদের দেশে নারীর অধিকার রক্ষা ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে নানা আইন রয়েছে, কিন্তু তার সুপ্রয়োগ নেই। দ্রুত বিচার না করলে রাষ্ট্রও নারীর অধিকার লঙ্ঘনের দায় এড়াতে পারে না।
চ) ফরেন্সিক ল্যাব স্থাপন: ধর্ষণ মামলার রায় DNA রিপোর্ট ব্যতীত দেওয়া অসম্ভব। আমাদের দেশে মাত্র দুটি ফরেনসিক ল্যাব রয়েছে যা রাষ্ট্র মালিকানাধীন-একটি সিআইডির কাছে ও আরেকটি ঢামেকের কাছে। হাজার হাজার মামলা শুধু এই ফরেনসিক ল্যাবের জন্য ঝুলে রয়েছে। তার যন্ত্রাংশও বোধহয় জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ছে। মামলার দ্রুত বিচারের জন্য দেশে আরও ১০-১২ টি ফরেনসিক ল্যাব দরকার এবং তা ২৪/৭ খোলা থাকা আবশ্যক।
ছ) বিচার বিভাগে নারীর সংশ্লিষ্টতা: এক নারীর দুঃখ সবচেয়ে ভালোভাবে আরেক নারীই বুঝতে পারে। সেজন্য বিচারবিভাগে নারী আইনজীবী ও নারী বিচারক নিয়োগ করতে হবে। তবে এও মনে রাখতে হবে তাদের যথেষ্ট বিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ থাকা আবশ্যক। কেননা আইনের অপব্যবহারের ইতিহাস বাঙালির খুব গর্বের!
জ) গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা: আমাদের সমাজে বহু বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ কিলবিল করছে। নারীর কর্মসংস্থানের সাথে সাথে গণপরিবহনে নারী হেনস্তাকারীদের সংখ্যাও বেড়েছে। এমতাবস্থায় ইহা প্রতিরোধে প্রধান বিভাগীয় শহরগুলোয় BRTC-এর অধীনে নতুন নারীবান্ধব বিশেষ বাস পরীক্ষামূলকভাবে চালু করতে হবে। পূর্বে জানিয়েছিল যে সরকার ইহা শুরু করবে, কিন্তু এখনো শুরু করতে পারল না। হয়তো তারা উচ্চপদে আসীনদের পা চাটতে ব্যস্ত। তবে ঢাকায় মেট্রোতে নারীর জন্য আলাদা বিশেষ বগি স্থাপন একটি ভালো উদ্যোগ, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। আর গণপরিবহনে নারী হেনস্তা প্রতিকারের বিশেষ ও আমার মতে সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হলো (গ) নং পয়েন্টটি। যদিও এসব উপদেশ কেউ দেখবে না এবং ইহা অসম্পূর্ণ, তবুও আমি সময়ে সময়ে ইহা হালনাগাদ করে যাব।
ঝ) সুস্থ বিনোদন: সব সিনেমা, নাটক, সাহিত্য ইত্যাদি কঠোরভাবে সেন্সর করা প্রয়োজন। নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক নাটক/সিনেমা, অশ্লীলতায় পরিপূর্ণ নাটক/সিনেমা ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি। আইন করতে হবে-কোনো প্রযোজক সেন্সরবোর্ড কর্তৃক অনুমোদন না পাওয়া নাটক যেন ইন্টারনেটে আপলোড করতে না পারে এবং সেই আইনের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নাট্যকলা ও সিনেমা সামাজিক কৃষ্টি-কালচারের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
একটা কথা প্রচলিত রয়েছে-"যাদের পুরুষত্ব কম তারাই নারীর পক্ষে কথা বলে বা নারীবাদের পক্ষে কথা বলে"। অত্যাচারিত নারীর পাশে দাঁড়ালে, তার পক্ষে কথা বললে যদি আমার পুরুষত্ব কমে যায়, তবে আমি সেই পুরুষত্ব চাই না যা মাথায় নিয়ে পুরুষরা কাপুরুষের মতো নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি কুরুচিপূর্ণ বুলি ও নারী হেনস্তা করে। এছাড়া ঢাবি, রাবি বা শাহবাগে নারীবাদ নিয়ে দুটি মঞ্চগরম বক্তব্য কখনোই নারীর ভাগ্য বদলাবে না। বদলাতে হবে আমাদের, আমাদের মানসিকতা; পুরুষতন্ত্রের কাপুরুষতা ছেড়ে পুরুষত্বকে ধারণ ও লালন করতে হবে।
একটি নারীর সংগ্রাম শুরু হয় মায়ের পেটে আসার সঙ্গে সঙ্গে আর শেষ হয় মৃত্যু ও দেহ সৎকারের পর। আশার বাণী হচ্ছে, আমাদের সমাজে গুটিকয়েক গোষ্ঠী ব্যতীত প্রায় সব পুরুষই নারীর প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে। এসব প্রকৃত পুরুষ মানুষ টিকে রয়েছে বলেই নারীরা টিকে রয়েছে।
কাজীদার একটি কবিতাংশ দিয়ে শেষ করলাম-
"বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।"
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন