সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

আমি মাস্টার্স পাশ করেছি, এখন বাস চালাই

মাস্টার্স ডিগ্রিধারী রাবেয়া খাতুনের বাস চালানোর ঘটনাটি কেবল সাহসের গল্প নয়, বরং দেশের ভঙ্গুর কর্মসংস্থান ব্যবস্থার এক কঠোর বাস্তবতা। উচ্চশিক্ষিত তরুণরা এখন বাধ্য হয়ে নিম্নপদের চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতাকে সামনে এনেছে।

mustafa kemal atarturk
পড়তে 4 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 3 বার পড়েছে
আমি মাস্টার্স পাশ করেছি, এখন বাস চালাই

পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য না। আবার কেউ বলছেন উন্নত দেশে তো মানুষ ড্রাইভিং করতে লজ্জা পায় না, ভিসা নিয়ে বিদেশে গিয়ে অনেকেই এই পেশায় ঢুকে যান, সমস্যা শুধু বাংলাদেশেই কেন। কথাগুলো শুনতে ভালো লাগলেও বিষয়টা এতো সহজ না ।

প্রথম কথা হলো, রাবেয়া আপা যা করছেন সেটা তার নিজের দক্ষতা এবং সাহসের ফসল। এই সাহসকে সম্মান জানানো উচিত। যারা দীর্ঘদিন ধরে বাস চালান, তাদের শরীরে যে ধকল যায়, যে রোগবালাই জমে, সেটা একজন নারীর জন্য আরও কঠিন। এই কাজটা যে কেউ করতে পারে না, বিশেষ করে আমাদের সমাজে যেখানে বাসচালকদের আচার আচরণ নিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। যারা এই পেশায় টিকে থাকতে পারেন তাদের সালাম জানানো উচিত।

প্রশ্ন থেকে যায় অন্য জায়গায়। রাবেয়া আপা একজন সরকারি কর্মী, বিআরটিসির আওতায় চাকুরি করেন। পিংক বাসের বেশিরভাগ চালক বিআরটিসি ইনস্ট্রাক্টর। এই চাকুরি করার ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল এইচএসসি পাশ। ধাপে ধাপে ১৬তম গ্রেড থেকে ১৪তম গ্রেডে প্রমোশন পাওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল জেএসসি পাশ। অথচ যিনি এই পদে কাজ করছেন তিনি অনার্স মাস্টার্স পাশ। এটা শুধু রাবেয়া আপার গল্প না, এটা দেশের হাজার হাজার অনার্স মাস্টার্স পাশ তরুণ তরুণীর গল্প।

চাকরির বাজারে এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছে যেখানে তুলনামূলক নিচু পদের জন্যও ক্রমশ উঁচু ডিগ্রি লাগছে। বিশতম গ্রেডের চাকুরির পরীক্ষায় এখন এসএসসি পাশ করে চাকরি পাওয়া যায় না। যারা চাকরি পাচ্ছেন তারা প্রায় সবাই অনার্স মাস্টার্স পাশ। কয়েক বছর আগে একটা খবরে দেখেছিলাম অনার্স মাস্টার্স পাশ করা তরুণেরা রেলের খালাসির চাকরি করছেন। এই প্যাটার্নটা প্রতিবছর আরও বাড়ছে ।

এর পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যায়, যেখানে সেখানে কলেজ খুলে অনার্স মাস্টার্স ডিগ্রি বিতরণ করা হয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। কলেজ খোলার কারণে অনেকে শিক্ষক হিসেবে চাকরি পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু যখন সরকার এমন সিদ্ধান্ত নেয় তখন তার ফলাফলের দিকেও নজর দেওয়া দরকার। শুধু ডিগ্রি বিতরণ করলেই তো আর কর্মসংস্থান তৈরি হয় না।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অনার্স চতুর্থ বর্ষে থাকতে কিছুদিন বিজনেস ম্যাথ পড়িয়েছিলাম। আমাদের কোচিংয়ের একজন কম্পিউটার অপারেটর ছিলো , সে এখন সরকারি চাকরিতে টাইপিস্ট পদে ভালো অবস্থানে আছে। কোচিংয়ে টাইপিং শিখেই চাকরিটা পেয়েছিলো। একদিন সে অনুরোধ করে তার কিছু বন্ধুকে বিজনেস ম্যাথ পড়িয়ে দিতে, যাদের বেসিক প্রায় শূন্যের কোঠায়। অল্প ফি নিয়ে পড়াতাম তাদের। করোনার সময় কোচিং সেন্টার বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর একদিন মা বললেন, আমার এক ছাত্রকে নাকি রাস্তার পাশে কাপড় বিক্রি করতে দেখা গেছে। শুনে অবাক হয়েছিলাম। মা তখন প্রশ্ন করলেন, এত পড়াশোনা করে আজকাল ছেলেমেয়েরা দেশে চাকরি পাচ্ছে না কেন। আমি শুধু বলেছিলাম, চুরি তো করছে না, পরিশ্রম করে জীবিকা চালাচ্ছে। এই কথাটা মায়ের মনঃপুত হয়নি পুরোপুরি, কিন্তু বাস্তবতা এটাই।

রাবেয়া আপা নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলেছেন, এটা প্রশংসার যোগ্য নিঃসন্দেহে। কিন্তু তার গল্পটা যতটা না ব্যক্তিগত সাফল্যের, তার চেয়ে বেশি একটা সিস্টেমের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে উচ্চশিক্ষিত তরুণ তরুণীদের নিম্নপদের চাকরিতে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে, সেখানে প্রশ্ন তোলা উচিত শিক্ষাব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থান নীতির দিকে। দেশে শিক্ষার যে অবমূল্যায়ন চলছে, সেদিকে নীতিনির্ধারকরা কবে সত্যিকারের দৃষ্টি দেবেন ?

ফটোকার্ড ক্রেডিট: বাংলাদেশ টাইমস

#মাস্টার্স_পাশ_করে_বাস_চালক #কর্মসংস্থান_সংকট #বাংলাদেশের_শিক্ষাব্যবস্থা #রাবেয়া_খাতুন #বিআরটিসি #বাংলাদেশ #বেকারত্ব #উচ্চশিক্ষা
mustafa kemal atarturk

About the Author

mustafa kemal atarturk

Financial analyst

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast