সম্প্রতি একজন সংসদ সদস্য প্রশ্ন তুলেছেন, "ছেলে-মেয়ের অধিকার সমান হলে ছেলেদের শিক্ষা কেন অবৈতনিক নয়?"—কথাটা আপাতদৃষ্টিতে শুনতে সুন্দর লাগলেও যুক্তিটি ত্রুটিপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে ছেলে-মেয়ের অধিকার এখনও সমান নয়। সমান হওয়া উচিত, কিন্তু বাস্তবে এখনও হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে এদেশের মেয়েরা অধিকারবঞ্চিত। পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, পড়াশোনার সুযোগ, অর্থ উপার্জন, বেতনের পরিমাণ, গৃহকর্মের চাপ, সন্তান লালনপালন ইত্যাদি অনেক দিক দিয়ে এদেশের নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি বৈষম্য এবং কম অধিকার ভোগ করেন।
বাংলাদেশের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ছেলে সন্তানের পড়াশোনার পেছনে পরিবার যতোটা খরচ করতে আগ্রহী থাকে, মেয়েদের বেলায় ততোটা থাকে না। ছেলেদের পেছনে খরচ করাকে ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ ভাবা হয় কারণ ছেলে বড় হয়ে পরিবারের হাল ধরবে এরকম একটা চিন্তা কাজ করে। পক্ষান্তরে মেয়েদের ভাবা হয় বোঝা। মেয়েরাও যে পড়াশোনা শিখে আত্মনির্ভরশীল হয়ে পরিবারের হাল ধরতে পারে তা অনেকে মানতে নারাজ। এমনকি মেয়েদের বেশি পড়াশোনা, অর্থ উপার্জনকে অনেক পরিবারে লজ্জাজনক ভাবা হয়। তাই মেয়েদের পড়াশোনায় বেশি সময় বা অর্থ ব্যয় করাকে সময় নষ্ট বা বাজে খরচ ভাবা হয়। বরং তাদের ক্ষেত্রে বিয়েকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়।
এখানে আরেকটা কথা বলে রাখা দরকার, পরিবার থেকে অর্থ না দিলেও ছেলেরা যতো সহজে নিজে অর্থ উপার্জন করে পড়াশোনা চালাতে পারে, মেয়েরা ততো সহজে পারে না। কারণ, যেটা উপরে বললাম, মেয়ে অর্থ উপার্জন করবে—এটা অনেক পরিবার মেনে নেয় না। আবার সামাজিক প্রতিকূলতারও ব্যাপার আছে। ছেলেদের সামনে যতো রকমের উপার্জনের পথ খোলা, মেয়েদের জন্য ততোটা নয়। অনেক কাজই এদেশের মেয়েদের করার সুযোগ নেই। ফলে পারিবারিক বাধার পাশাপাশি মেয়েদের পার্টটাইম উপার্জনের পথও সীমিত। আর সে বিবাহিত হলে তো বাধা আরও বেশি। যেখানে বাড়ির বউয়ের পড়াশোনাই অনেকে মেনে নিতে চায় না, সেখানে সে অর্থ উপার্জন করবে সেটা তো তাদের আরও অপছন্দ। তবে এতেই যে সবাই দমে যায়, পড়াশোনা বা উপার্জন করে না, তা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি এটাই বোঝাতে চাইছি যে মেয়েদের পড়াশোনা ও অর্থ উপার্জন করতে ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হয়।
ফিরে আসি বিয়ের কথায়। বয়স বেড়ে গেলে মেয়ের বিয়ে হবে না এরকম একটা দুশ্চিন্তা পরিবারের মধ্যে কাজ করে। মেয়েদের অবিবাহিত থাকাকে এদেশের সমাজ খারাপ চোখে দেখে। মেয়ে বিয়ে না করে আগে আর্থিক স্বাবলম্বীতা অর্জন করবে—এটি অনেক পরিবারের দৃষ্টিতে লজ্জাজনক, এমনকি বিপজ্জনক ব্যাপার। এককথায় বলতে গেলে, রাষ্ট্র মেয়েদের যতোই অধিকার দিক, অনেক পরিবার এখনও মেয়ের বিয়েটাকেই পড়াশোনা বা অর্থ উপার্জনের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তাই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে কবে চিন্তামুক্ত হবে সেই ভাবনায় তারা বিভোর থাকে।
ফলে অনেক মেয়ের পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। বিয়ের পর অল্পদিনেই মেয়েটি গর্ভবতী হয় (এটার পেছনেও কাজ করে সামাজিক চাপ)। গর্ভধারণের মাসগুলো তাকে চরম কষ্টে কাটাতে হয়। এই অবস্থাতেও অনেক মেয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। বাচ্চা পেটে নিয়েই পড়াশোনা করে, পরীক্ষা দেয়। এই বোঝা কখনো ছেলেদের বহন করতে হয় না। পেটের মধ্যে অবিরত বেড়ে ওঠা একটি সত্ত্বাকে ধারণ করে, বিভিন্ন হরমোনাল চেঞ্জের সাথে সংগ্রাম করে গৃহকর্ম, ক্লাস, পড়াশোনা, পরীক্ষা সবই করে থাকে এদেশের অনেক মেয়ে। আবার সন্তান জন্মের পর তার লালনপালন এবং গৃহকর্মের সিংহভাগও তাকেই করতে হয়। ফলে ঘর আর বাচ্চা সামলানোর চাপের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করে এই মেয়েদের পড়াশোনা করতে হয়।
এটা বিরল কোনো ঘটনা নয়। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি আমার মেয়ে ক্লাসমেটদের কী ব্যাপক হারে বিয়ে হয়েছে। তাদের অনেককে দেখেছি গর্ভবতী অবস্থায় স্কুলে আসতে, পরীক্ষা দিতে। অনার্সে ওঠার পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হওয়ার দরুণ ক্লাসমেট হিসেবে পেয়েছি পুরো বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থীকে। তাদের অনেককে নিজের চোখে দেখেছি, অনেকের মুখ থেকে সরাসরি শুনেছি কী পরিমাণ পরাধীনতার মধ্য দিয়ে তাদের জীবন কাটে, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে তাদের কতোটা যুদ্ধ করতে হয়। কলেজের বেতন, ফরম ফিলাপ ইত্যাদির জন্য যখন উপরমহল থেকে বিপুল পরিমাণ ফি নির্ধারণ করা হয়, তখন অনেক বিবাহিতা ক্লাসমেটকে এরকম বলতে শুনেছি যে তাদের বাড়ি থেকে এমনিতেই পড়াশোনা করতে দিতে চায় না, এখন এই টাকার কথা শুনলে আরও বেশি চাপ দেবে পড়াশোনা বন্ধ করার। মেয়েদের এই অবস্থা দেখার পাশাপাশি এটাও দেখেছি যে বিবাহিত ছেলে ক্লাসমেটদের ক্ষেত্রে এসব বাধা কতোটা কম, পড়াশোনা এবং অর্থ উপার্জনের দিক দিয়ে তারা সামাজিকভাবে মেয়েদের তুলনায় কতোটা অনুকূলতা ভোগ করে।
এরকম সবার সাথে না ঘটলেও এদেশের বিপুল সংখ্যক মেয়ের জীবনের এটি বাস্তবতা। অনার্স-মাস্টার্স পর্যন্ত কম মেয়েকেই আমি অবিবাহিতা থাকতে দেখি। আর বিয়ের পরে অনেকেরই পড়াশোনার ক্ষতি হয়, অনেকের তো একেবারে বন্ধই হয়ে যায়—হয় পরিবার চাপ দিয়ে বন্ধ করায়, আর নয়তো যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে সে নিজেই পড়াশোনা বাদ দিয়ে সংসারে মনোনিবেশ করে।
এদেশের একজন ছেলে পড়াশোনা এবং ক্যারিয়ারে ইনভেস্ট করার জন্য যে পরিমাণ সময়, সুযোগ, এবং স্বাধীনতা পায়, তার চাইতে অনেক কম পায় মেয়েরা। বিবাহিত ছেলেদের ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। ছেলেরা বিয়ের পরে সংসারের চাপে পড়াশোনা বাদ দিয়ে দেয় এই নজির কম। কারণ ঘর আর বাচ্চা সামলানোর যে চাপ, তা মেয়েদের উপরই বেশি বর্তায়। ছেলেরা বরং বিয়ের পরে একজন অবৈতনিক কাজের মানুষ পায় যে তার রান্নাবান্না, কাপড় কাচা, বাসন মাজা, পরিবারের সদস্যদের দেখভাল ইত্যাদির পাশাপাশি তার যৌন চাহিদাও মেটায়। ফলে বিয়ের পরে এদেশের ছেলেদের পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারে ইতিবাচক প্রভাবই পড়ে।
এমনকি অনেক ছেলে ইদানীং এসব উদাহরণ টেনে মানুষকে অল্পবয়সে বিয়ে করতে উৎসাহী করছে। তারা বলছে বিয়ের পরে তাদের জীবন কতোটা সহজ হয়েছে। অথচ কয়েনের উল্টো পিঠটা তারা দেখছে না। তারা দেখছে তারা সন্তানের বাবা হচ্ছে, দেখছে না যে দীর্ঘদিন সেই সন্তানকে চরম কষ্ট সহ্য করে কে পেটে ধারণ করলো। তারা দেখছে বউ তাদের জীবনকে সুখী করছে, দেখছে না যে এতে সেই মেয়েটাকে নিজের সুখ কতোটা ত্যাগ করতে হলো। তারা দেখছে পড়াশোনায় তারা বেশি মনোযোগ দিতে পারছে, দেখছে না যে সারাদিন সংসার সামলাতে গিয়ে তার স্ত্রীর কীভাবে পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে।
হ্যাঁ, ছেলেদের জীবন একেবারে বাধাহীন নয়। তবে ছেলেরা যেসব প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যায় সেগুলো জেন্ডার বৈষম্যের ফলে নয়। অর্থাৎ তাদের সাথে শুধু ছেলে হওয়ার দোষে বৈষম্য করা হয় না। আর এই প্রতিকূলতাগুলো যে অন্য জেন্ডারের মানুষদের মোকাবেলা করতে হয় না তা-ও নয় (বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদেরই বেশি মোকাবেলা করতে হয়)। কাজেই এখানে “ছেলেদের জীবনও কঠিন” এই ধরণের কথা বলে মেয়েরা যে জেন্ডার বৈষম্যের শিকার হয় তাকে হালকা করার সুযোগ নেই।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য অতীতে ছেলেদের পড়াশোনা করানো হলেও মেয়েদের হতো না। এই সমস্যা দূর হয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষাকে মেয়েদের জন্য অবৈতনিক করার পর। কিন্তু বিপত্তি বাধে মাধ্যমিকের পরে। তখন যেহেতু আর মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার সেই সুযোগটা নেই, কাজেই চিত্র পাল্টে যায়। অনেকের পড়াশোনা তখন আর হয় না বা হলেও সেটা হয় পরিবারের সাথে যুদ্ধ করে। কম মেয়েই বিয়ে, সংসার, বাচ্চা লালনপালন ইত্যাদির চিন্তা থেকে মুক্ত থেকে নির্বিঘ্নে পড়াশোনা শেষ করে আত্মনির্ভরতার পথ খুঁজতে পারেন।
এমতাবস্থায় সরকারের স্নাতক পর্যন্ত নারীশিক্ষা অবৈতনিক করতে চাওয়াটা প্রশংসনীয়। আশা করা যায় এতে করে নারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার জন্য করা এই সংগ্রাম অনেকটা সহজ হবে। মাধ্যমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, স্নাতক পর্যন্ত সেই সুবিধা বর্ধিত করলে সেই ইতিবাচক পরিবর্তন আরও বাড়বে।
যে ডুবে যাচ্ছে তাকে বাঁচাতে যদি লাইফ জ্যাকেট দেয়া হয়, তবে সেটা ডাঙ্গায় নিরাপদে বসে থাকা ব্যক্তির সাথে বৈষম্য নয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের চাপে ডুবতে বসা মেয়েদের বাঁচাতে সরকার যদি লাইফ জ্যাকেট হিসেবে অবৈতনিক শিক্ষার সুবিধা দেয়, তবে সেটা ডাঙ্গায় (লিঙ্গবৈষম্য থেকে) নিরাপদে বসে থাকা ছেলেদের প্রতি অন্যায় নয়।
হ্যাঁ, শিক্ষা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই হিসেবে শিক্ষা সবার জন্য অবৈতনিক করার দাবী তোলা যেতে পারে। কিন্তু অন্যান্য সময় এ ব্যাপারে চুপ থেকে শুধু নারীদের অবৈতনিক শিক্ষার কথা উঠলেই যদি কেউ এরকম দাবী তোলেন, এবং “নারী-পুরুষের অধিকার সমান হলে…” এই ধরণের ত্রুটিপূর্ণ যুক্তি দেন, তবে তার উদ্দেশ্য যথেষ্ট সন্দেহজনক। তখন তিনি আসলেই সকলের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা চান, নাকি ইনিয়েবিনিয়ে নারীশিক্ষার সুযোগ কমাতে চান সেটি খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা আছে।
About the Author
Shama M
মজদুরের নিয়মিত লেখকStudent
I am losing my illusions, perhaps to acquire new ones.
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
2আপনার লেখাটি খুব সুন্দর হয়েছে। সংহতি জানালাম। শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে, প্রশ্ন করতে শেখায়। নারীমুক্তির জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। মেয়েদের অবশ্যই শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ দিতে হবে। তাদের প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য অবিলম্বে দূর করতে হবে। পুরুষতন্ত্র দেশ ও সমাজের শত্রু। ছেলেদের উচিত পুরুষতন্ত্রের বিরোধিতা করা এবং সবসময় নারী অধিকারের পক্ষে থাকা। মেয়েদের প্রতি বৈষম্য করে একটি দেশ ও সমাজ কখনো এগিয়ে যেতে পারে না।
ধন্যবাদ :)
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন