একটা ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে সবাই-ই তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে, অপরাধীর বিচার চায়। কেউ কেউ তো আইনের জন্য অপেক্ষা না করে নিজ হাতেই তাকে শাস্তি দিতে চায়। কিন্তু ধর্ষণ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এমন না যে কোনো কারণ ছাড়াই একদিন হঠাৎ করে একজন ব্যক্তি ধর্ষণ করে বসে। না, বরং এর পেছনে কাজ করে দীর্ঘ এক ধর্ষক তৈরির সংস্কৃতি।
প্রথমেই তাকানো যাক সমাজের ক্ষুদ্রতম এককের দিকে। একটি পরিবার তাদের মেয়ে সন্তানদের যে পরিমাণ শাসন করে, ছেলেদের ঠিক সেই পরিমাণই স্বাধীনতা দেয়। মেয়েরা এখানে যেতে পারবে না, ওটা করতে পারবে না, এই পোশাক পরতে পারবে না, আরও কতো বিধিনিষেধ! অথচ ছেলেদের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। তারা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে কিছুতেই পরিবারের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। বরং তারা কোনো অন্যায় করলে সেটাকে প্রশ্রয় দেয় অনেক পরিবার। ছেলেরা একটু বিশৃঙ্খল হবে সেটাই যেন সবাই আশা করে।
এর পাশাপাশি ছেলেদের মধ্য থেকে একজন মানুষের যেসব স্বাভাবিক কোমলতা থাকে সেসব ঝেড়ে ফেলা হয়। তাদের শেখানো হয় কান্না করা, নিজের চেহারার যত্ন নেয়া, সাজগোজ করা, নরম স্বভাবের হওয়া, ভালোবাসা প্রকাশ করা, লাজুক হওয়া—এসব ছেলেদের নয়, মেয়েদের কাজ। আর মেয়েদের মতো হওয়াটা তো খুবই লজ্জার একটা ব্যাপার! আর তাই আমাদের সমাজে ছেলেদের অপমান করতে তাদের মেয়েদের সাথে তুলনা করা হয়। এভাবে পরিবার ও সমাজ তাদের ছোটবেলা থেকেই নিষ্ঠুর হতে এবং মেয়েদের ঘৃণা করতে শেখায়।
একটা ছেলের সব কোমল আবেগগুলো যখন শক্ত হাতে দমন করা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই শুধু তার রাগ, হিংসা, অন্যের উপরে ক্ষমতা জাহির করতে চাওয়া ইত্যাদি কঠোর আবেগগুলোই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ধর্ষণ শুধুমাত্র যৌন আকর্ষণ থেকে নয়, বরং আরেকজন মানুষের উপরে নিজের শক্তি প্রয়োগ করার বাসনা থেকে হয়ে থাকে। কাজেই সমাজ যখন ছেলেদের কোমল আবেগগুলোকে পিষে ফেলে, পাশাপাশি মেয়েদের ঘৃণা করতে শেখায়, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই নারীদের প্রতি সহিংস হয়ে ওঠে।
তারপরে আছে ভিকটিমকে দোষ দেয়ার সংস্কৃতি। যার সাথে নিপীড়ন হয়, সমাজ তাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। সে কী পোশাক পরেছিলো, কোথায় গিয়েছিলো ইত্যাদি হাজারটা প্রশ্ন! অথচ নিপীড়ককে কেউ জিজ্ঞেস করে না কেন সে নিপীড়ন করলো, তাকে সামাজিকভাবে লজ্জিত করা হয় না। নিপীড়ক নিপীড়ন করে বুক ফুলিয়ে ভালো মানুষটি সেজে ঘুরে বেড়ায় আর একঘরে হয় ভিকটিম। নির্যাতককে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে ভিকটিমকে হেনস্তা করার এই সংস্কৃতি নিপীড়কদের প্রশ্রয় দেয়।
ধর্ষণ হলো যৌন সহিংসতার চূড়ান্ত রূপ। এর আগে অপরাধী অপেক্ষাকৃত ছোটখাটো নানা অপরাধ করে। সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া হলে সে একসময় ধর্ষণের মতো চূড়ান্ত সহিংসতা করার সাহস পায়। এরকম একটি অপরাধ হলো ইভটিজিং। সমাজে ইভটিজিংকে অনেক সময় “দুষ্টুমি”, “ছেলেমানুষী”, “ছেলেরা একটু ওরকমই হয়” ইত্যাদি বলে উড়িয়ে দেয়া হয়। অপরাধীদের শাসন করার বদলে উল্টো মেয়েদের শেখানো হয় চুপচাপ মাথা নিচু করে চলে যেতে, সেই সাথে দোষ দেয়া হয় তাদের পোশাক, চলাফেরা ইত্যাদির। মানে সম্পূর্ণ দায়টা কোনো না কোনোভাবে ভিকটিমেরই। যখন এই ইভটিজাররা দেখে তাদের কোনো শাস্তি তো হচ্ছেই না উল্টো তাদের ভিকটিমরাই শাস্তি পাচ্ছে, তখনই তারা আরও বড় অপরাধ করার সাহস পায়।
আবারও ফিরে আসি পরিবারে। অনেক পরিবার তাদের মেয়ে সন্তানদের নিরাপত্তার চাইতে নিজেদের তথাকথিত মান-ইজ্জত নিয়ে বেশি চিন্তিত। ফলে মেয়ের সাথে নির্যাতন হলে বিচার চাওয়ার বদলে তারা সেটাকে ধামাচাপা দেয়। সাথে আছে ক্ষমতাশালীদের ক্ষমতার অপব্যবহার যারা হয় নিজেরাই অপরাধ করে, আর না হয় অপরাধীদের রক্ষা করে। সাথে ভিকটিমকে ও তার পরিবারকে নানারকম হুমকিধামকি দিয়ে ও হেনস্তা করে চুপ থাকতে বাধ্য করে। ফলে ভিকটিম বিচার বা নিরাপত্তা কোনোটাই পায় না। উপরন্তু অপরাধীদের সাহস বাড়ে।
এবার একটু শিল্পসাহিত্যের আলোচনা করা যাক। আমাদের সাহিত্যিকদের লেখাগুলোতে নারীদেহকে বরাবরই যৌন আবেদনময়ী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নারীদেহের প্রতিটি অংশকে যেন আতশকাঁচ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখিয়েছেন তারা। একটা উপন্যাস পড়তে গেলে পুরুষ চরিত্র আর নারী চরিত্রের বর্ণনায় আকাশ-পাতাল তফাৎ দেখা যায়। পুরুষের শরীরের গঠন, গায়ের রং, চলার ধরণ এতোটা লাস্যময় করে উপস্থাপন করা হয় না যেমনটা নারীর ক্ষেত্রে করা হয়। এবং বিপজ্জনক কথা হলো অনেক সময় এই নারী চরিত্রগুলো হয় নিতান্তই কিশোরী।
বাংলা সাহিত্যে উদ্ভাবিত ভয়াবহ একটা শব্দ হলো “ষোড়শী”। এটা দিয়ে খুবই যৌন আবেদনময়ী একজন নারীকে বোঝানো হয়। অথচ ষোড়শী মানে যেই মেয়ের বয়স ষোলো। ষোলো বছরের একটা মেয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক। তার প্রতি কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের আকর্ষণ কাজ করা উচিত না। অথচ আমাদের সাহিত্যিকরা সেটাকেই স্বাভাবিক, এমনকি রোমান্টিক করে তুলেছেন! অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি আকর্ষণকে যেই সংস্কৃতিতে এভাবে রোমান্টিসাইজ করা হয়, সেই সংস্কৃতি থেকে কেন শিশুকামী তৈরি হবে না?
বিশ্বের সব উন্নত রাষ্ট্রে শিশুকামীতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু আমাদের দেশে তা নয়। এদেশে বাল্যবিবাহ অপরাধ, কিন্তু বাল্যবিবাহের নেপথ্যে থাকা শিশুকামীতা নয়। অথচ শিশুকামীতার ফলস্বরূপই ঘটে শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনা। যদি শিশুদের প্রতি বিকৃত যৌন আকর্ষণ শুরুতেই দমন করা যেতো, তবে ধর্ষণ পর্যন্ত ব্যাপারটা গড়াতে পারতো না। শিশু ধর্ষকদের শাস্তির জন্য সবাই আন্দোলন করলেও যেই শিশুকামীতা এর জন্ম দেয় তার বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নের দাবী কম মানুষই করে। উল্টো শিশুকামীতাকে অনেকে ভুলভাবে সমকামীতা আখ্যা দেয়। অথচ সমকামীতা হলো প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পর্ক। যেই মুহূর্তে কোনো এক পক্ষের সম্মতি থাকবে না, সেই মুহূর্তে সেটা হবে হ্যারেসমেন্ট কিংবা ধর্ষণ। এক্ষেত্রে অপরাধী বা ভিকটিমের লিঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ না, আর ভিকটিম শিশু হলে তো একেবারেই না—কারণ শিশুরা কনসেন্ট দিতে পারে না। কাজেই এহেন ভুল ভাষা প্রয়োগ করে ধর্ষণের অস্তিত্বটাই অস্বীকার করা হয়, বিচার তো দূর।
ফিরে আসি শিল্পসাহিত্যের কথায়। যৌন নিপীড়নকে আমাদের সাহিত্য ও ফিল্মে ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে কমই উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলা সিনেমাগুলোতে নারীদের নিপীড়িত হওয়ার দৃশ্যগুলো এমন যৌন উত্তেজকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা দেখলে পুরুষ দর্শক আনন্দ পাবে। বেশিরভাগ সময় ভিকটিম কেমন অনুভব করছে সেটা বিবেচনা করা হয়নি—তার ভয়টা, কষ্টটাকে ফুটিয়ে তোলা হয়নি। নারীকে ইভটিজিং করা হচ্ছে, তার পোশাক ধরে টান দেয়া হচ্ছে এগুলো নারীর প্রতি হওয়া খারাপ ঘটনার চাইতে পুরুষের হিরোগিরি ফলানোর সুযোগ হিসেবে বেশি উপস্থাপন করা হয়েছে। একদল মাস্তান নায়িকাকে হ্যারেস করবে আর নায়ক উড়ে এসে তাদের খুব মার দিয়ে অরা ফার্মিং করবে। মাস্তানদের কথা বাদ দিই, অনেক মুভিতে তো নায়ক নিজেই নানাভাবে নারীদের হ্যারেস করে। নারী চরিত্রের “না” শোনে না, রিজেকশন সত্ত্বেও পিছে লেগে থাকে, তাকে স্টক করে, নানাভাবে জ্বালাতন করে, তার বাউন্ডারিকে সম্মান করে না। কিন্তু মুভিতে এই আচরণগুলোকে হ্যারেসমেন্ট হিসেবে দেখানোর বদলে কিউট বা রোমান্টিক ব্যাপার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বরং ভাবখানা এমন থাকে যে নায়িকাই নায়ককে রিজেক্ট করে অনুচিত কাজ করেছে! এসব তরুণ সমাজকে কী ধরণের শিক্ষা দেয় তা বলাই বাহুল্য।
এই সবের সাথে আছে আমাদের সেক্স এডুকেশনের অভাব। সেক্স এডুকেশনের কথা উঠলেই জিনিসটা কী তা না জেনেই ধর্ম গেলো সমাজ গেলো রব তুলে একটি শ্রেণী এর বিরোধীতা করে। অথচ এটা বাচ্চাদের নিজেদের শরীর সম্পর্কে, গুড টাচ, ব্যাড টাচ সম্পর্কে জানায়। জানায় কখন তার সাথে খারাপ কিছু করার চেষ্টা করা হচ্ছে, আর সেক্ষেত্রে সে কীভাবে আত্মরক্ষা করতে পারে। সেক্স এডুকেশন মানুষকে কনসেন্ট, বডিলি অটোনমি, যৌন রোগ, অন্যের বাউন্ডারিকে সম্মান করা ইত্যাদি শেখায় যা যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকরই নয়, একেবারে অপরিহার্য।
যৌনতা মানবজীবনের একটা বড় অংশ। বাংলাদেশের ষোলো কোটি মানুষ যৌনতা ছাড়া তৈরি হয়ে যায়নি। তাহলে কেন এই বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষার কথা উঠলেই সবার চোখ কপালে উঠে যায়? এমন তো না যে যৌনতা সম্পর্কে কথা এদেশের মানুষ কথা বলে না। রাস্তাঘাটে পুরুষের যৌন অক্ষমতার চিকিৎসাস্বরূপ অমুকতমুক হারবালের বিজ্ঞাপনে দেয়াল ছেয়ে থাকে যা আবালবৃদ্ধবণিতা সবারই চোখে পড়তে বাধ্য। অর্থাৎ যৌনতা সম্পর্কে এদেশে রীতিমতো ঢোল পিটিয়ে কথাবার্তা ঠিকই হয় (যদিও সেটা শুধুই পুরুষকেন্দ্রিক), হয় অবৈজ্ঞানিক হাতুড়ে চিকিৎসাও—তাতে উপকারের চাইতে ক্ষতি বেশি হলেও আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষার কথা উঠলেই সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়!
নিজের শরীর ও যৌনতা সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষার অভাবে মানুষ সহজেই নানা রোগে আক্রান্ত হয় এবং অন্যের মধ্যে সেসব ছড়িয়ে দেয়। অনেকে, বিশেষ করে নারীরা, সামাজিক ট্যাবুর ফলে নানাবিধ যৌন রোগে চুপচাপ কষ্ট সহ্য করে যান। সঠিক শিক্ষার অভাবে না এসব প্রতিরোধ হয়, না হয় প্রতিকার। যৌন নির্যাতনও অনেকে শনাক্ত করতে পারে না পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবেই। বলা বাহুল্য এক্ষেত্রে শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কারণ সঠিক শিক্ষার অভাবে তারা গুড টাচ, ব্যাড টাচ চিনতে পারে না ফলে সহজেই নিপীড়কদের কবলে পড়ে। এবং একই কারণে শিশুর অভিভাবকও জানে না কীভাবে বাচ্চাকে রক্ষা করতে হয়। এজন্যই দিন দিন শিশু ধর্ষণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
সেক্স এডুকেশন না থাকলেও মানুষ যৌনতা সম্পর্কে ঠিকই জানে। কিন্তু যা জানে তা হয় অত্যন্ত ভুল ও বিকৃত। নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শিক্ষা না দিলে মানুষ, বিশেষত শিশুরা, নিজেরাই কৌতুহল মেটাতে নানা উল্টোপাল্টা জিনিস আবিষ্কার করে। তারা খুঁজে বের করে পর্নোগ্রাফির মতো বস্তু যা তাদের যৌনতা, কনসেন্ট, মানুষের শরীর সবকিছু সম্পর্কে অত্যন্ত বিকৃত ধারণা দেয়। এগুলো ঘন ঘন দেখতে থাকলে তারা একসময় হয়ে ওঠে যৌন নিপীড়ক। আর বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক পুরুষ খুব অল্প বয়স থেকে এসব দেখে বড় হয়। কাজেই তাদের যৌন নিপীড়কের মতো মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা মোটেও কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়, বরং স্বাভাবিক।
এই সবকিছুর সাথে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আছে ওয়াজ-মাহফিলের লাগাতার নারীবিদ্বেষী বয়ান। নারীকে তেঁতুল, চকোলেট, পেঁয়াজ, মরিচ কোনো কিছুর সাথে তুলনা করতেই বাকি রাখেননি এই ওয়ায়েজরা। নারী হলো ভোগ্যবস্তু, নারী হলো ফিতনা, নারী হলো ঢেকে রাখার বস্তু, হীরা, জহরত, মণি, মুক্তা। মানে মানুষ বাদে আর যা কিছু হওয়া সম্ভব সবই নারীকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে। নারীবিদ্বেষী ওয়াজ-মাহফিল মানুষকে শেখায় নারীরা স্বতন্ত্র মানুষ না বরং পুরুষের সম্পত্তি, ভোগ্যবস্তু। এভাবে তাদের উপরে পুরুষের অত্যাচার ও নিয়ন্ত্রণ জারি করাকে ধর্মের নামে বৈধতা দেয়া হয়। নারীদের এরূপ লাগাতার ডিহিউম্যানাইজেশনের ফলে সমাজে ধর্ষণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কারণ ধর্ষক হওয়ার প্রথম ধাপ হলো ভিকটিমকে মানুষ মনে না করে ভোগ্যবস্তু মনে করা। যখন ওয়াজ-মাহফিলগুলোতে নারীদের নানা বস্তুর সাথে তুলনা করা হয়, তখন এসব যারা নিয়মিত শোনে তারা নারীদের কী চোখে দেখতে শেখে তা বলাই বাহুল্য।
বাইরের নারীদের ধর্ষণ না করলেও এই মানুষগুলো নিজেদের স্ত্রীদের অবশ্যই ধর্ষণ করতে শেখে। কারণ ওয়াজ-মাহফিলে শেখানো হয় স্বামী যখন ডাকবে তখনই স্ত্রীকে সব কাজ ছেড়ে তার যৌন চাহিদা মেটাতে হবে। সে অসুস্থ হলেও, তার ইচ্ছা না করলেও তাকে নিজের শান্তি বিসর্জন দিয়ে স্বামীর চাহিদা মেটাতেই হবে। না হলে সে জাহান্নামী! যেন স্ত্রী তার স্বামীর যৌনদাসী। এখানে আরেকটা ইঙ্গিতও দেয়া হয় যে পুরুষ এমন এক জীব যে নিজের যৌন চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। চাহিদা উঠলেই তাকে কোনো না কোনোভাবে সেটা মেটাতেই হবে। স্ত্রী না মেটালে সে বাইরের নারীর দিকে নজর দেবে। আর এই যে নজর দিলো, সেটাও আসলে তার নিজের দোষ না, বরং স্ত্রীর দোষ। পুরুষ যেন মানুষ না, বরং এমন এক প্রজাতির ইতর প্রাণী যার নিজের উপরে সামান্যতম নিয়ন্ত্রণ নেই।
যৌন চাহিদা নারীদের কোনো অংশে কম থাকে না বরং কিছু ক্ষেত্রে বেশিই থাকে। কিন্তু তাই বলে নারীরা অহরহ পুরুষদের ধর্ষণ করে বেড়ায় না। তারা পরকীয়া করলে কোনো হুজুর তার স্বামীকে দোষ দেয় না যে সে স্ত্রীর চাহিদা মেটায়নি বলে বাইরের পুরুষের দিকে নজর দিয়েছে। অর্থাৎ পুরুষের জন্য যেটা গ্রহণযোগ্য, সেটাই নারীরা করলে বিরাট অপরাধ। ধর্মের নামে যেই সমাজে নারীদের ডিহিউম্যানাইজ করা হয়, পুরুষের সব কুকর্মকে জায়েজ করা হয়, একইসাথে তাদের সব অন্যায়ের জন্য নারীদের দোষারোপ করা হয়—সেই সমাজে ধর্ষক তৈরি হবে না তো কোথায় হবে?
ফিরে আসি বৈবাহিক ধর্ষণের কথায়। যখন একজন মানুষকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক বা মানসিক বলপ্রয়োগ করে কিংবা ভয় দেখিয়ে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হয়, তখন সেটাই ধর্ষণ। তা সে নিজের বিবাহিতা স্ত্রী হোক বা অন্য কেউ। বিবাহিত হলেই যেন একজন পুরুষ তার স্ত্রীর সাথে যা খুশি করার অধিকার পেয়ে যায় এমন একটা ভুল ধারণা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। এই ধরণের চিন্তা এই বার্তাই দেয় যে নারী পুরুষের সম্পত্তি—একটা আসবাব কিনলে মানুষ যেমন তার সাথে যা খুশি তা-ই করতে পারে, তেমনি বিয়ে করলেই স্ত্রীর সাথেও যা খুশি তা-ই করার অধিকার সে পেয়ে যায়, সেই নারীর তাতে কেমন অনুভূত হচ্ছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই মানসিকতার ফলেই কেউ যদি স্ত্রীর উপরে অত্যাচার করে আর অন্য কেউ তার প্রতিবাদ করতে যায়, তখন শুনতে হয় তার স্ত্রীর সাথে সে যা খুশি তা করবে তাতে বাইরের মানুষের নাক গলানোর অধিকার নেই। যেন স্ত্রী তার কিনে নেয়া কোন জড়বস্তু, তার সাথে সে যেমন খুশি আচরণ করার অধিকার পেয়ে গেছে!
বৈবাহিক ধর্ষণ প্রতিরোধে উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও আইন রয়েছে। অথচ আমাদের দেশে এই ২০২৬ সালে এসেও এ সম্পর্কিত আইন নেই। এমনকি আমাদের আইন বৈবাহিক ধর্ষণের অস্তিত্বই স্বীকার করে না। ফলে স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের উপরে যথেচ্ছা নিপীড়ন করে যায় কোনোরকম আইনী বাধা ছাড়াই। বাংলাদেশের হাজার হাজার নারী প্রতিদিন নিজ ঘরেই ধর্ষণের শিকার হয়ে চলেছেন। তাদের জন্য কারও কোনো সহানুভূতি নেই, নেই কোন প্রতিবাদ, আন্দোলন, বা আইন।
সর্বশেষ চেরি অন টপ হিসেবে আছে ইন্টারনেটে নারীবিদ্বেষী বক্তব্য প্রচার। এতোক্ষণ যেগুলো আলোচনা করলাম, সেই প্রতিটি সমস্যাজনক বিশ্বাস অহরহ ইন্টারনেটে প্রচার করা হচ্ছে। নারীদের ভোগ্যবস্তু বানানো থেকে শুরু করে স্লাটশেমিং, শিশুকামীতার পক্ষে প্রচারণা, বাল্যবিবাহে উৎসাহ, পুরুষের অপকর্মের জন্য নারীকে দোষারোপ করা, ভিকটিম ব্লেমিং, ধর্ষণকে বৈধতা দান ইত্যাদি সবই আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া সাইটগুলোতে প্রতিদিন প্রকাশ্যে করা হচ্ছে। এগুলোর বড় একটা অংশ রাষ্ট্রীয় আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও কোনো আইনী পদক্ষেপ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হচ্ছে না। ফলে এসব বিকৃত চিন্তাভাবনা দিনকে দিন সমাজে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এরকম চলতে চলতে হঠাৎ একদিন একটা যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটলে সবাই আবার খুব আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে—যেন এতোদিন তাদেরই চোখের সামনে, কিংবা অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই প্রত্যক্ষভাবে একে স্বাভাবিক করে তোলেনি!
এই যখন সমাজের অবস্থা, তখন ধর্ষণ এখানে কোনো দুর্ঘটনা নয় বরং স্বাভাবিক ঘটনা। আজকের যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলো আমাদের দীর্ঘদিনের অসুস্থ সংস্কৃতিরই ফলাফল। এই সংস্কৃতি ধর্ষক উৎপাদন করে তারপর আবার ন্যাকামি করে তার শাস্তি চায়। হ্যাঁ, অবশ্যই ধর্ষকের শাস্তি হতে হবে। কিন্তু গোড়ায় যখন গলদ তখন শুধু ডালপালা কেটে স্থায়ী সমাধান হবে না। সংস্কৃতিই যখন ধর্ষক তৈরির কারখানা, তখন আগে বদলাতে হবে সেই সংস্কৃতিকেই।
পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে ধর্ষক তৈরির সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় সেক্স এডুকেশন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভিকটিম ব্লেমিং ও শেমিং বন্ধ করতে হবে এবং অপরাধের জন্য অপরাধীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। মানুষের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে হবে। ওয়াজ-মাহফিল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীবিদ্বেষী সকল বক্তব্য প্রতিরোধে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। একইসাথে ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী আইন যুগের প্রয়োজনের সাথে তাল মিলিয়ে সংস্কার করতে হবে। বৈবাহিক ধর্ষণ ও শিশুকামীতার বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করতে হবে।
ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে আমাদের গোটা সমাজব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজাতে হবে। মূল সমস্যার সমাধান না করে ধর্ষককে যতো কঠিন শাস্তিই দেয়া হোক, লাভ আদতে কিছুই হবে না।
About the Author
Shama M
মজদুরের নিয়মিত লেখকStudent
I am losing my illusions, perhaps to acquire new ones.
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন