৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস, পরিবেশ রক্ষা আমাদের টিকে থাকার শর্ত। কিন্তু এই বড় কথার আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়, আমাদের প্রতিদিনের জীবনের পরিচ্ছন্নতা, সুশৃঙ্খল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কার্যকর ড্রেনেজ এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থাই একটি সুস্থ পরিবেশের ভিত্তি। বড় বড় আন্তর্জাতিক আলোচনার আগে, আমাদের নিজের আশেপাশের পরিবেশটিকেই আগে ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশের শহর ও মফস্বল এলাকায় ঘুরে তাকালেই একটি সাধারণ চিত্র চোখে পড়ে যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলা, অপর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। এই সমস্যাগুলো আলাদা আলাদা নয় বরং একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি জায়গায় সমস্যা তৈরি হলে তা দ্রুত অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত পুরো পরিবেশ ব্যবস্থাকে অচল করে দেয়। আমাদের নগর জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হলেও তা সঠিকভাবে সংগ্রহ, পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহার করা হয় না। অনেক জায়গায় নির্দিষ্ট ডাস্টবিনের অভাব থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে বা ড্রেনে ময়লা ফেলে। আবার যেখানে ডাস্টবিন আছে, সেগুলোও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না, ফলে সেগুলো উপচে পড়ে আশেপাশের পরিবেশ দূষিত করে। এই অব্যবস্থাপনার ফলে শুধু দুর্গন্ধই নয়, রোগজীবাণুর বিস্তারও ঘটে। ডাস্টবিন স্থাপন এবং তার সঠিক ব্যবস্থাপনা একটি মৌলিক কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রাস্তার মোড়, বাজার, স্কুল-কলেজ, অফিস এলাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক ডাস্টবিন স্থাপন করা জরুরি। তবে শুধু ডাস্টবিন বসালেই দায়িত্ব শেষ হয় না, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, পরিষ্কার রাখা এবং মানুষকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্জ্যকে জৈব ও অজৈবভাবে আলাদা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে তা পুনর্ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমাবে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার দিকে তাকালেও একই ধরনের অবহেলার চিত্র দেখা যায়। শহরের ড্রেনগুলো প্রায়ই প্লাস্টিক, পলিথিন ও কঠিন বর্জ্যে আটকে থাকে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায় এবং সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এই জলাবদ্ধতা শুধু যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় না, বরং মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে। পানিতে মিশে থাকা ময়লা ও জীবাণু বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, বিশেষ করে ডেঙ্গু ও পানিবাহিত রোগ। একটি কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে পরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ, নিয়মিত পরিষ্কার এবং কঠোরভাবে ড্রেনে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার এবং নাগরিক উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে। মানুষ যদি সচেতন না হয়, তাহলে কোনো উন্নত ব্যবস্থাই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা আরেকটি বড় সমস্যা। অনেক এলাকায় এখনো আধুনিক স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে ময়লা পানি খোলা ড্রেন দিয়ে প্রবাহিত হয়, যা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করে। নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করা একটি মৌলিক অধিকার, এবং এটি বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে এর সঠিক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে নাগরিকদের অংশগ্রহণও জরুরি। এই সমস্ত সমস্যার মূলে রয়েছে একটি সাধারণ বিষয় সচেতনতার অভাব। আমরা অনেক সময় নিজেরাই পরিবেশ নষ্ট করি, আবার সেই নষ্ট পরিবেশের জন্য অভিযোগও করি। এই দ্বিচারিতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রত্যেককে বুঝতে হবে, নিজের আশেপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা মানে নিজের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সচেতনতার শিক্ষা দিতে হবে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। একইসঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমেও সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহারও এই ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, স্মার্ট ডাস্টবিন, উন্নত ড্রেনেজ ডিজাইন এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহরগুলোকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। তবে প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হবে, যখন তা সঠিকভাবে ব্যবহৃত হবে এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। পরিবেশ রক্ষার এই লড়াইয়ে শুধু সরকার বা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান নয় বরং প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালন করি, তাহলে সামগ্রিকভাবে একটি বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। একটি পরিষ্কার রাস্তা, একটি সচল ড্রেন, একটি সঠিকভাবে ব্যবহৃত ডাস্টবিন এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশের ভিত্তি গড়ে তোলে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের মাঝে আত্মসমালোচনার একটি সময়ও তৈরি করে। আমরা কী করছি, কী করা উচিত এবং কীভাবে আমরা একটি ভালো ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার সময় এখনই। শেষ পর্যন্ত, পরিবেশ রক্ষা কোনো আলাদা কাজ নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অংশ। পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা এবং সচেতনতার মাধ্যমে আমরা একটি বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তুলতে পারি। আর সেই সমাজই হবে একটি নিরাপদ, সুস্থ ও টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি। পরিবেশের যত্ন নেওয়া মানে নিজের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
লেখক: শাহরিয়ার খান নাফিজ।
শিক্ষার্থী: জনাব আলী সরকারি কলেজ।
About the Author
Shahriar Khan Nafiz
মজদুরের নিয়মিত লেখকColumnist & Activist
Hi, I'm Shahriar Khan Nafiz. I am an activist driven by a deep commitment to social change. Through my writing, I strive to highlight pressing social issues, raise awareness and inspire thoughtful change in society.
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন