প্রতিদিন সকালে জাদুর শহর ঢাকা ঘুম ভাঙায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে। কেউ মিরপুর থেকে মতিঝিল, কেউ উত্তরা থেকে কারওয়ান বাজার, কেউ আবার সাভার কিংবা নারায়ণগঞ্জ থেকে ছুটে আসে এ শহরে। সন্ধ্যা নামলে সেই মানুষগুলোই আবার ফেরা শুরু করে। শহরটি যেন কখনো ঘুমোয় না। দিনের আলোয় ঢাকা মানুষে পূর্ণ; রাতের অন্ধকারে সে ক্লান্ত। প্রশ্ন হলো—এই শহরে আমরা সত্যিই বাস করি, নাকি শুধু কাজ করি?
ঢাকার সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত যানজট নয়, বায়ুদূষণ নয়, জলাবদ্ধতাও নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো—এই শহর ক্রমশ মানুষের কাছ থেকে মানুষের সময় কেড়ে নিচ্ছে। যে শহরে প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা রাস্তায় কাটে, সেখানে বন্ধুত্ব বিলাসিতা হয়ে যায়, পরিবার একটি সপ্তাহান্তের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়, আর প্রতিবেশী কেবল পাশের ফ্ল্যাটের একটি নামফলক।
এই প্রবণতার আরেকটি দিকও লক্ষণীয়। নগরজীবনে সাফল্যের সংজ্ঞা ক্রমশ অর্থনৈতিক হয়ে উঠছে। ভালো চাকরি, বড় ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত গাড়ি—এসবই উন্নতির সূচক। কিন্তু খুব কমই আমরা জিজ্ঞেস করি, এই শহরে মানুষের কি সত্যিই বন্ধু আছে? প্রতিবেশী আছে? এমন কোনো জনপরিসর আছে, যেখানে কোনো আর্থিক লেনদেন ছাড়াই মানুষ শুধু মানুষ হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারে?
ব্রিটিশ নগর-সমাজতাত্ত্বিক রে ওল্ডেনবার্গ সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য তিনটি পরিসরের কথা বলেছিলেন—প্রথমটি বাড়ি, দ্বিতীয়টি কর্মক্ষেত্র এবং তৃতীয়টি এমন এক সামাজিক পরিসর, যেখানে মানুষ নিছক মানুষ হিসেবেই মিলিত হয়। চায়ের দোকান, পার্ক, পাঠাগার, কমিউনিটি সেন্টার, কফিশপ কিংবা পাড়ার আড্ডা—এসবই সেই ‘তৃতীয় স্থান’ (Third Place)। একটি সুস্থ নগরসভ্যতার জন্য এই তৃতীয় স্থান অপরিহার্য।
ঢাকার দিকে তাকালে দেখা যায়, এই তৃতীয় স্থান বলতে আদতে কিছুই নেই। ফলে বাড়ি ও অফিসের মধ্যবর্তী যে মানবিক ভূগোল, সেটিই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। ফলাফল? একই সঙ্গে ভিড় এবং নিঃসঙ্গতা।
একই শহরে লাখো মানুষের সঙ্গে বসবাস করেও একজন মানুষ অনুভব করতে পারেন, তিনি আসলে কারও সঙ্গে বাস করছেন না।
ঢাকার মানুষের জীবনকে যদি একটি বাক্যে সংক্ষেপ করা যায়, তবে সেটি সম্ভবত এমন হবে—এই শহরে সবাই কোথাও না কোথাও যাচ্ছে, কিন্তু খুব কম মানুষ কোথাও পৌঁছাচ্ছে। অর্থাৎ আমরা অবকাঠামো নির্মাণে যতটা আগ্রহী, সামাজিক সম্পর্ক নির্মাণে ততটা নই। এই পরিবর্তন কেবল স্থাপত্যের নয়; এটি অর্থনীতিরও গল্প।
গত কয়েক দশকে ঢাকা এমন একটি নগরে পরিণত হয়েছে, যেখানে শহরের প্রধান পরিচয় তার নাগরিক নয়, তার উৎপাদনক্ষমতা। মানুষকে এখানে প্রথমে কর্মী, পরে ভোক্তা এবং সবশেষে নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সকালে অফিস, বিকেলে যানজট, রাতে ক্লান্তি—এই চক্রের বাইরে সামাজিক জীবনের জন্য খুব সামান্য জায়গাই অবশিষ্ট থাকে।
সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট পুটনাম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Bowling Alone-এ দেখিয়েছিলেন, আধুনিক সমাজে মানুষের সামাজিক অংশগ্রহণ কমে গেলে শুধু ব্যক্তিগত একাকিত্বই বাড়ে না; দুর্বল হয়ে পড়ে গণতন্ত্র, নাগরিক আস্থা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতিও। একাকিত্ব তাই কেবল মানসিক অবস্থা নয়; এটি একটি নাগরিক সংকট।
ঢাকার বাস্তবতাও সেই দিকেই ইঙ্গিত করে। আমরা একই অ্যাপার্টমেন্টে বছরের পর বছর বসবাস করি, অথচ পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দার নাম জানি না। একই লিফটে প্রতিদিন দেখা হয়, কিন্তু কথোপকথন হয় না। শিশুদের খেলার মাঠের জায়গায় গাড়ির পার্কিং, পাড়ার লাইব্রেরির জায়গায় বাণিজ্যিক ভবন, আর বিকেলের আড্ডার জায়গায় অন্তহীন যানজট—এই পরিবর্তনগুলো কেবল নগর পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত নয়; এগুলো মানুষের সামাজিক অস্তিত্বকেও পুনর্গঠন করছে।
হয়তো এ কারণেই ঢাকা ক্রমশ এমন একটি শহরে পরিণত হচ্ছে, যেখানে মানুষের ঠিকানা আছে, কিন্তু আশ্রয় নেই; কর্মস্থল আছে, কিন্তু সম্প্রদায় নেই; অসংখ্য পরিচিত মুখ আছে, কিন্তু খুব কম পরিচয়
এই শহরে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়, কাঁধে কাঁধ লাগে, একই বাসে, একই মেট্রোরেলে, একই ফুটপাতে আমরা পাশাপাশি হাঁটি। তবু দিনের শেষে অনেকেই এমন একটি ঘরে ফেরেন, যেখানে অপেক্ষা করে না কোনো কথোপকথন; অপেক্ষা করে শুধু নীরবতা।
কবি গুরুর সেই আকুল উচ্চারণ—"মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই"—আজকের ঢাকা শহরে এসে যেন নতুন অর্থ পায়। কারণ এই শহরে মানুষ আছে, ভিড় আছে, শব্দ আছে, কর্মচাঞ্চল্য আছে; কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের থাকার অবকাশ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। প্রশ্নটি তাই কেবল আবেগের নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং জনজীবনের প্রশ্নও। ঢাকা কি সত্যিই একটি বসবাসের শহর, নাকি এটি ধীরে ধীরে কেবল কাজ করার একটি শহরে পরিণত হচ্ছে?
বিশ্বজুড়ে দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে একটি নতুন সামাজিক সংকটের কথা আলোচিত হচ্ছে—urban loneliness বা নগর-নিঃসঙ্গতা। একসময় নিঃসঙ্গতাকে ব্যক্তিগত সমস্যা মনে করা হতো। এখন সমাজবিজ্ঞানী, নগর-পরিকল্পনাবিদ এবং জনস্বাস্থ্য গবেষকেরা এটিকে একটি নগর-সংকট হিসেবে দেখছেন। কারণ শহর কেবল ভবন, সড়ক বা অবকাঠামোর সমষ্টি নয়; শহর মূলত মানুষের সম্পর্কের জায়গা। যেখানে সম্পর্ক দুর্বল হয়, সেখানে শহরও ধীরে ধীরে তার প্রাণ হারায়।
ঢাকার দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
আজকের ঢাকা এমন একটি শহর, যেখানে মানুষ প্রায়শই নিজের সময়ের ওপর নিজেরই অধিকার হারিয়ে ফেলছে। কর্মস্থলে পৌঁছাতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা, ফিরতে আরও দুই ঘণ্টা—দিনের উল্লেখযোগ্য অংশই চলে যায় যাতায়াতে। এই দীর্ঘ যাতায়াত কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; এটি মানুষের সামাজিক জীবন থেকেও সময় কেড়ে নেয়। সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময় কমে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ কমে যায়, বই পড়া বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অবকাশও সংকুচিত হয়।
একটি শহরকে বাসযোগ্য করে তোলে কেবল তার অর্থনীতি নয়; তার অবসর। যে শহরে মানুষ কাজের বাইরে মানুষের সঙ্গে দেখা করতে পারে, পার্কে বসতে পারে, হেঁটে বেড়াতে পারে, লাইব্রেরিতে যেতে পারে, পাড়ার চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে পারে, সেই শহরই প্রকৃত অর্থে বাসযোগ্য। ঢাকা কি সেই সুযোগগুলো ধরে রাখতে পেরেছে?
দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তরটি খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
শহরের খোলা জায়গা কমছে, ফুটপাত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পথচারীর জন্য নয়, যানবাহনের গতি মানুষের হাঁটার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শিশুদের খেলার মাঠ নেই, পাড়ার আড্ডা উধাও হচ্ছে, একসময়ের পরিচিত প্রতিবেশী-সংস্কৃতি ভেঙে পড়ছে। একই অ্যাপার্টমেন্টে বছরের পর বছর বসবাস করেও পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের নাম না জানাটা আজ আর অস্বাভাবিক নয়।
এটি কেবল সামাজিক পরিবর্তন নয়; এটি নগর-অর্থনীতিরও একটি প্রতিফলন।
ঢাকার অধিকাংশ মানুষ শহরটিকে ভালোবেসে নয়, প্রয়োজনের তাগিদে বেছে নিয়েছেন। শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি, ব্যবসা—সবকিছুর কেন্দ্রীভবন রাজধানীতে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে শহরটি মানুষের স্বপ্নের চেয়ে বেশি তাদের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ফলে শহরের সঙ্গে আবেগগত সম্পর্কের পরিবর্তে গড়ে ওঠে কার্যকরী সম্পর্ক। মানুষ শহরটিকে নিজের বাড়ি হিসেবে নয়, কর্মস্থল হিসেবে দেখতে শুরু করে। প্রতিদিন ভোরে হাজার হাজার মানুষ শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে যান। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ হাসপাতালে, কেউ করপোরেট অফিসে, কেউ আদালতে, কেউ কারখানায়। এই যাত্রা কেবল ভৌগোলিক নয়; এটি সামাজিকও। কারণ এই দীর্ঘ যাতায়াতের ভেতরেই মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ব্যক্তিগত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে।
শহরের অর্থনীতি যত বিস্তৃত হয়, মানুষের সামাজিক পরিসর তত সংকুচিত হতে থাকে—এটি আধুনিক নগর-সমাজতত্ত্বের একটি পরিচিত পর্যবেক্ষণ।
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী জর্জ সিমেল তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ The Metropolis and Mental Life-এ লিখেছিলেন, মহানগর মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর এমন এক অবিরাম চাপ সৃষ্টি করে যে আত্মরক্ষার জন্য মানুষ ধীরে ধীরে আবেগগতভাবে উদাসীন হয়ে পড়ে। তিনি একে বলেছিলেন blasé attitude—চারপাশের মানুষ, ঘটনা কিংবা যন্ত্রণার প্রতিও এক ধরনের অনুভূতিহীনতা। এটি নিষ্ঠুরতা নয়; বরং বেঁচে থাকার কৌশল।
ঢাকার দিকে তাকালে এই বিশ্লেষণ অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
রাস্তার পাশে অসুস্থ একজন মানুষ পড়ে আছেন, ফুটপাতে একটি শিশু ঘুমিয়ে আছে, পাশের বাসায় কে থাকেন আমরা জানি না—এসব দৃশ্য আমাদের আর বিস্মিত করে না। কারণ শহর আমাদের সংবেদনশীলতাকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে তোলে। আমরা দেখেও না-দেখার অভ্যাস গড়ে তুলি।
এই উদাসীনতা কেবল নৈতিক নয়; এটি নগরজীবনের কাঠামোগত ফল।
গত কয়েক বছরে ঢাকায় অসংখ্য ক্যাফে, কো-ওয়ার্কিং স্পেস, শপিং মল এবং রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। এগুলো শহরের প্রাণবন্ত অর্থনীতির লক্ষণ। কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও উঠে আসে—মানুষের জন্য এমন কতগুলো জায়গা তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রবেশের শর্ত টাকা নয়?
একটি শহরের গণতন্ত্রকে বিচার করা যায় তার জনপরিসর দিয়ে। যেখানে পার্কে বসা যায়, লাইব্রেরিতে সময় কাটানো যায়, নদীর ধারে হাঁটা যায়, সংস্কৃতি চর্চা করা যায়, সেখানে নাগরিকত্বেরও চর্চা হয়। কিন্তু যখন শহরের প্রায় প্রতিটি অবসর বাণিজ্যিক হয়ে যায়, তখন সম্পর্কও ধীরে ধীরে ভোক্তা-সম্পর্কে পরিণত হয়।
বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলেও আমাদের একটি বিল দিতে হয়। কথা বলতে গেলেও একটি টেবিল ভাড়া নিতে হয়।
এখানেই ঢাকা একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ায়। এই শহর কি নাগরিক তৈরি করছে, নাকি শুধু ভোক্তা?
নগরজীবনের আরেকটি বড় বৈপরীত্য হলো—প্রযুক্তি যত বাড়ছে, প্রতিবেশী তত দূরে সরে যাচ্ছে।
একসময় পাড়ার মুদি দোকান, চায়ের টং, স্থানীয় মাঠ কিংবা ক্লাব ছিল সামাজিক সম্পর্কের প্রাকৃতিক কেন্দ্র। আজ সেই জায়গা দখল করেছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। আমরা প্রতিবেশীর দরজায় কড়া নাড়ি কম, কিন্তু দূরের মানুষের পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানাই বেশি।
এই পরিবর্তনকে শুধুই প্রযুক্তির দোষ বলে ব্যাখ্যা করা সহজ, কিন্তু যথেষ্ট নয়।
প্রকৃত কারণ আরও গভীরে। আধুনিক নগরজীবন মানুষের সময়কে এমনভাবে ভাগ করে ফেলেছে যে সম্পর্ক রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অবসরই আর অবশিষ্ট থাকে না। বন্ধুত্বও শ্রমসাধ্য। পরিবারও সময় চায়। সম্প্রদায়ও উপস্থিতি দাবি করে। অথচ আমরা এমন এক অর্থনৈতিক ছন্দে বাস করছি, যেখানে উপস্থিত থাকার চেয়ে উৎপাদনশীল হওয়াকেই বেশি মূল্য দেওয়া হয়।
এই কারণেই আজ অনেক মানুষ সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাজ করেন, কিন্তু মাসের পর মাস কোনো বন্ধুর সঙ্গে নির্ভার হয়ে কথা বলেন না।
তবে ঢাকার সংকটকে কেবল অবকাঠামোর সংকট বললে ভুল হবে।
এটি একই সঙ্গে কল্পনার সংকট।
আমরা এমন একটি শহরের স্বপ্ন দেখি, যেখানে উড়ালসেতু থাকবে, মেট্রোরেল থাকবে, স্মার্ট প্রযুক্তি থাকবে। কিন্তু খুব কমই আলোচনা করি—এই শহরে কি হাঁটার জায়গা থাকবে? বয়স্ক মানুষ কোথায় বসবেন? শিশুরা কোথায় খেলবে? তরুণরা কোথায় বিনা খরচে আড্ডা দেবে? শিল্পী, পাঠক, কবি, শিক্ষার্থীদের জন্য শহরের কোথায় উন্মুক্ত নাগরিক পরিসর তৈরি হবে?
একটি শহরের উন্নয়ন কেবল কংক্রিটের পরিমাণ দিয়ে মাপা যায় না। উন্নয়নকে মাপতে হয় মানুষের মুখে হাসি, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক, হাঁটার নিরাপত্তা এবং নাগরিক আস্থার মানদণ্ডেও।
যদি একটি শহর মানুষকে কেবল দক্ষ কর্মীতে পরিণত করে, কিন্তু সুখী নাগরিকে পরিণত করতে না পারে, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
কোনো শহরের প্রকৃত পরিচয় তার আকাশচুম্বী ভবনে নয়; বরং তার মানুষের সম্পর্কের গভীরতায়। একটি শহর শেষ পর্যন্ত রাস্তা, সেতু বা ভবনের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের একসঙ্গে থাকার শিল্প। সেই অর্থে একটি শহর যতটা স্থাপত্যের সৃষ্টি, তার চেয়েও বেশি সামাজিক কল্পনার সৃষ্টি।
ঢাকার সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই শহরকে অর্থনীতির চোখে দেখেছি, মানুষের চোখে নয়। কোথায় নতুন ফ্লাইওভার হবে, কোথায় আরও উঁচু ভবন উঠবে, কোথায় বাণিজ্যিক এলাকা সম্প্রসারিত হবে—এসব নিয়ে পরিকল্পনা হয়েছে। কিন্তু খুব কমই প্রশ্ন উঠেছে, এই শহরে মানুষ কোথায় হাঁটবে? কোথায় বই পড়বে? কোথায় কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই বসে থাকবে? কোথায় একজন বৃদ্ধ প্রতিদিন বিকেলে এসে পরিচিত মুখের সঙ্গে গল্প করবেন? কোথায় বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ-তরুণী একান্তে সময় কাটাবে, কোনো কফির বিল না দিয়েই?
সভ্যতার ইতিহাস আমাদের শেখায়, গণতন্ত্রের জন্ম সংসদে যতটা, তারও আগে জনপরিসরে। গ্রিক আগোরা, ইউরোপের টাউন স্কয়ার, উপমহাদেশের চায়ের দোকান, পাড়ার মাঠ কিংবা পাঠাগার—এসব ছিল এমন জায়গা, যেখানে মানুষ কেবল মত বিনিময় করত না; তারা সমাজও নির্মাণ করত। নাগরিকত্বের অনুশীলন আসলে শুরু হয় একসঙ্গে থাকার অভ্যাস থেকে।
ঢাকা সেই অভ্যাসটি ক্রমশ হারাচ্ছে।
বর্তমান প্রজন্ম মাঠের চেয়ে স্ক্রিন বেশি চেনে, প্রতিবেশীর নামের চেয়ে ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড বেশি জানে। একই ছাদের নিচে বসবাস করেও আমরা পরস্পরের জীবন থেকে অনুপস্থিত। বহুতল ভবন যত বেড়েছে, ততই যেন কমেছে পরস্পরের দরজায় কড়া নাড়ার সংস্কৃতি। যে শহরে মানুষ নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভির ওপর নির্ভর করে, কিন্তু প্রতিবেশীর ওপর ভরসা করতে শেখে না, সেই শহরের সংকট কেবল প্রশাসনিক নয়; গভীরভাবে সামাজিক।
কিন্তু এই সংকটের সমাধান কি কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব?
নগর পরিকল্পনা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আরও উন্মুক্ত পার্ক, পাঠাগার, হাঁটার পথ, কমিউনিটি স্পেস, বিকেন্দ্রীকৃত কর্মসংস্থান—এসব একটি বাসযোগ্য শহরের অপরিহার্য শর্ত। কিন্তু একই সঙ্গে নাগরিকদেরও নিজেদের সম্পর্কের স্থাপত্য নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। পরিবারে একসঙ্গে খাওয়ার সময়, বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা, পাড়াভিত্তিক সাংস্কৃতিক উদ্যোগ, পাঠচক্র, স্থানীয় গ্রন্থাগার, নাগরিক সংগঠন—এসব কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো একটি সুস্থ নগরজীবনের অবকাঠামো।
সম্ভবত আমরা উন্নয়নের আলোচনায় একটি বিষয় খুব সহজেই ভুলে যাই—একটি শহর কেবল আয় বাড়ানোর জায়গা নয়; জীবন গড়ারও জায়গা।
যদি এমন হয় যে একটি শহর মানুষকে কর্মসংস্থান দেয়, কিন্তু বন্ধুত্ব দেয় না; আয় দেয়, কিন্তু অবসর দেয় না; মাথার ওপর ছাদ দেয়, কিন্তু অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি দেয় না—তবে সেই শহর অর্থনৈতিকভাবে সফল হলেও মানবিকভাবে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ইংরেজ নগরচিন্তাবিদ জেন জেকবস লিখেছিলেন, "Cities have the capability of providing something for everybody, only because, and only when, they are created by everybody." একটি শহর সবার জন্য কিছু দিতে পারে তখনই, যখন শহরটি সবার অংশগ্রহণে নির্মিত হয়। এই কথাটি ঢাকার জন্যও সমান প্রাসঙ্গিক। নাগরিকের অংশগ্রহণ ছাড়া, কেবল অবকাঠামো দিয়ে বাসযোগ্য শহর তৈরি করা যায় না।
আবারো ফিরে আসি রবীন্দ্রনাথের কাছে।
তিনি লিখেছিলেন, "মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।" এই আকাঙ্ক্ষা আসলে শুধু একজন কবির নয়; প্রতিটি নগরবাসীরও। মানুষ স্বভাবতই সামাজিক প্রাণী। তার বেঁচে থাকার জন্য কেবল অক্সিজেন নয়, সম্পর্কও দরকার; কেবল আশ্রয় নয়, আপনজনও দরকার; কেবল কর্মস্থল নয়, একটি শহরও দরকার—যে শহর তাকে চিনবে, ধারণ করবে, তার নিঃসঙ্গতাকে আরও ঘনীভূত করবে না।
ঢাকা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
আমরা চাইলে এটিকে আরও দ্রুতগতির, আরও উঁচু, আরও ব্যস্ত একটি শহরে পরিণত করতে পারি। আবার চাইলে এটিকে এমন একটি শহরও বানাতে পারি, যেখানে উন্নয়নের মানদণ্ড হবে কেবল জিডিপি নয়, মানুষের সামাজিকভাবে বেঁচে থাকা!
About the Author
Saker Hossain Efaz (সাকির হোসেন ইফাজ)
মজদুরের নিয়মিত লেখকResearch Assistance, Public Hosting, Public Speaking
সাকির ইফাজ; উপস্থাপক, বাংলাদেশ বেতার। শিক্ষার্থী ও গবেষক, ইতিহাস বিভাগ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। Intern, Applied Democracy Lab; Dhaka University
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন