সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানগত একটি দুর্দান্ত সুবিধা রয়েছে। ঠিক কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর অবস্থিত হওয়ায়, আমাদের দেশে সারা বছর জুড়েই অত্যন্ত চমৎকার ও প্রায় সমকোণে সূর্যের আলো পড়ে। এই বিশেষ উপক্রান্তীয় অবস্থানের কারণে আমরা বছরের একটি বড় সময় জুড়ে একদম পরিষ্কার ও রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া পাই (বছরে প্রায় ২৫০০ ঘণ্টা)।
এই সৌরশক্তি থেকে প্রতিদিন প্রতি বর্গমিটারে ৪.০ থেকে ৬.৫ কিলোওয়াট-আওয়ার (kWh) পর্যন্ত উচ্চ-ঘনত্বের সৌর বিকিরণ (Solar Insolation) আহরণ করা সম্ভব। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে শীতকালে সৌরশক্তির উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেলেও, আমাদের এই সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান বছরজুড়ে প্রায় একই রকম নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারে। এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে ক্ষুদ্র ও ব্যক্তি উদ্যোগকে যুক্ত করে একটি নতুন রূপরেখা দাঁড় করানো সম্ভব। এই রূপরেখাকে বলা যেতে পারে: "৫০-৫০ পার্টনারশিপ সোলার ফার্মিং মডেল"।
কী এই '৫০-৫০ পার্টনারশিপ মডেল'?
সৌরশক্তির এই বিশাল সম্ভাবনার সাথে আমি যুক্ত করতে চাইছি ক্ষুদ্র ও ব্যক্তি উদ্যোগকে। আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ খাস, পতিত বা অব্যবহৃত জমি রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) মতে, পতিত জমির পরিমাণ প্রায় ৪,৩১,০০০ হেক্টর।
অন্যদিকে, ক্লিন এনার্জি বা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে সবচেয়ে বড় বাধা হলো জায়গার অভাব এবং প্রাথমিক বড় বিনিয়োগ (CAPEX)। এই দুই সমস্যার একটি সমন্বিত সমাধান হতে পারে নিচের মডেলটি:
১. জমির লিজ: দেশের সাধারণ মানুষ বা ল্যান্ডহোল্ডাররা তাদের অব্যবহৃত বা পতিত জমি এই প্রকল্পের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (যেমন, ৬-১০ বছর) লিজ দেবেন।
২. বিনিয়োগ: সরকার বা বিদ্যুৎ বিভাগ সেখানে সোলার প্যানেল ও প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের সম্পূর্ণ খরচ বহন করবে।
৩. মুনাফা বণ্টন: উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এর ফলে অর্জিত মুনাফা বা বিদ্যুৎ সরকার এবং জমির মালিকের মধ্যে সমান ৫০-৫০ অনুপাতে বণ্টন হবে।
এগ্রিভোল্টাইকস (Agrivoltaics) এর সম্ভাবনা:
এটি শুধু পতিত জমিতে নয়, কৃষিজমিতেও করা সম্ভব, যাকে বলা হয় 'এগ্রিভোল্টাইকস' (Agrivoltaics)। বেশ কিছু গবেষণায় কৃষিজমিতে এর দারুণ সুফল পাওয়া গেছে। অনেকে ভাবতে পারেন, এতে কি কৃষিজমি নষ্ট হবে? উত্তর হলো, না।
আধুনিক প্রযুক্তিতে সোলার প্যানেল কিছুটা উঁচুতে স্থাপন করে নিচের জমিতে অনায়াসেই আদা, হলুদ বা বিভিন্ন ছায়াপ্রেমী ফসলের চাষ সচল রাখা সম্ভব। অর্থাৎ একই জমি থেকে বিদ্যুৎ এবং ফসল, দুই-ই মিলবে! এই উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সেচের বিদ্যুতের চাহিদাও মেটানো সম্ভব। আর প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে যাবে।
উৎপাদনের পরিসংখ্যান: সম্ভাবনা কতটুকু?
প্রশ্ন আসতে পারে, এভাবে আমরা কী পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারব?
আমাদের দেশের মোট অব্যবহৃত বা অনাবাদি জমির মাত্র ১ শতাংশ (১%) যদি এই মডেলের আওতায় আনা যায় (প্রায় ৪,৩১০ হেক্টর), তবে জাতীয় গ্রিডে প্রতি বছর প্রায় ১১.৮ টেরাওয়াট-ঘণ্টা (TWh) গ্রিন এনার্জি যোগ করা সম্ভব! বাংলাদেশের বিদ্যুতের বর্তমান মোট চাহিদা বছরে প্রায় ৮০ TWh। অর্থাৎ, মাত্র ১ শতাংশ পতিত জমি ব্যবহার করে আমরা সেই মোট চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ মেটাতে পারব।
যদি আমরা অনাবাদি বা পতিত জমির মাত্র ৫ শতাংশ ব্যবহার করতে পারি, তবে শুধু সৌরশক্তি থেকেই জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে ৫৯ TWh। এই হারটি যদি ১০ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তাহলে আমাদের উৎপাদন দাঁড়াবে ১১৮ TWh। এর সাথে এগ্রিভোল্টাইকস যোগ করলে সম্ভাবনা আরও বিশাল।
বাংলাদেশের মোট কৃষিজমির মাত্র ১০ শতাংশেও যদি আমরা এগ্রিভোল্টাইকস ব্যবহার করি, সেখান থেকে বার্ষিক প্রায় ৬৬৫ GWh সোলার এনার্জি ফার্মিং করা সম্ভব, যা কৃষিকাজে ব্যবহৃত মোট বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় অর্ধেক।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব:
এই মডেলে একই সাথে, সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা ও আয় বাড়বে, কারণ সরকার সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনবে। আমরা জ্বালানি আমদানির পেছনে বছরে যে প্রায় পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করি, এই মডেল বাস্তবায়িত হলে সেই আমদানির একটি বড় অংশ বেঁচে যাবে। দেশের টাকা দেশেই থাকবে। এই বিকেন্দ্রীভূত (Decentralized) পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ একদিকে যেমন হাজারো প্রান্তিক পরিবারকে স্থায়ী আয়ের উৎস দেবে, অন্যদিকে সরকারের জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে করবে শক্তিশালী।
খসরা আর্থিক রূপরেখা:
একদম খসড়া একটা আর্থিক খরচের এবং লাভের একটা খতিয়ান আমরা করতে পারি। আমরা ধরে নিতে পারি সরকার ১০ বছরে তার পুরো বিনিয়োগ তুলে আনতে চায়।
প্রতি হেক্টর (১ মেগাওয়াট সক্ষমতা) জমিতে সোলার প্যানেল ও অবকাঠামো বাবদ সরকারের প্রাথমিক মূলধন (CAPEX) লাগবে গড়ে প্রায় ৬ কোটি টাকা। বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ (O&M) খরচ হবে প্রায় ৯ লাখ টাকার মতো। এই পুরো খরচ ১০ বছরে তুলে আনতে জাতীয় গ্রিডে প্রতি ইউনিট (kWh) বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্য বা ট্যারিফ নির্ধারণ করা প্রয়োজন হবে মাত্র ৫.০৪ টাকা।
বর্তমানে সরকার বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র (IPP) থেকে কয়লা, এলএনজি বা তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কিনছে প্রতি ইউনিট ৮ থেকে ১১ টাকারও বেশি দামে। অর্থাৎ, এই মডেলে সরকার অর্ধেকেরও কম দামে গ্রিন এনার্জি কিনতে পারবে এবং ১০ বছরেই তার প্রাথমিক বিনিয়োগ শতভাগ তুলে আনতে সক্ষম হবে।
সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি ঘটবে এই মডেলের '৫০-৫০ অংশীদারিত্বের' কারণে। ৫.০৪ টাকা ইউনিট হিসেবে প্রতি হেক্টর থেকে বছরে মোট বিদ্যুৎ বিক্রি হবে প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকার। মুনাফা অর্ধেক ভাগ হওয়ার ফলে, সাধারণ একজন জমির মালিক কোনো মূলধন বিনিয়োগ ছাড়াই বছরে প্রায় ৬৯ লাখ টাকার একটি নিশ্চিত ও স্থায়ী আয়ের (Passive Income) সুযোগ পাবেন। এর পাশাপাশি তিনি প্যানেলের নিচে কৃষিকাজ তো চালিয়ে যেতে পারবেনই। যদি দেশের মাত্র ১ শতাংশ পতিত জমিতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে আগামী ১০ বছরে সরকার তার সম্পূর্ণ বিনিয়োগ তুলে আনার পরও গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রায় ২৯,৭৩৬ কোটি টাকার বিশাল পুঁজি সরাসরি প্রবেশ করবে।
বাস্তব কিছু উদাহরণ:
এই পরিকল্পনা শুনতে যতটা না আকাশকুসুম, বাস্তবে কিন্তু ততটা না। বিশ্বের অনেক দেশ সাধারণ নাগরিকদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহিত করে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করার সুযোগ দিয়ে অভাবনীয় সফলতা পেয়েছে। কিছু উদাহরণ যেমন:
ভিয়েতনাম: দেশটিতে 'ফিড-ইন-ট্যারিফ (FiT)' স্কিমের মাধ্যমে মানুষ তাদের বাসা বা কারখানার ছাদে সোলার বসিয়ে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে (EVN) বিক্রি করে। এই একটি নীতি দেশটিতে অভাবনীয় সোলার বিপ্লব ঘটিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়ায় 'নেট মিটারিং' মডেল অত্যন্ত জনপ্রিয়। সাধারণ নাগরিকরা তাদের অব্যবহৃত বা উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হন।
যুক্তরাজ্য: যুক্তরাজ্যে 'স্মার্ট এক্সপোর্ট গ্যারান্টি (SEG)' নামক স্কিম চালু আছে। এর মাধ্যমে নিজস্ব সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের উদ্বৃত্ত অংশ ন্যাশনাল গ্রিডে নির্দিষ্ট রেটে বিক্রি করে আয় করা যায়।
ভারত: ভারতে 'পিএম-কুসুম' (PM-KUSUM) প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার কৃষকদের অনাবাদি বা আবাদি জমিতে সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ সরকার কিনে নেয়।
জার্মানি ও ব্রাজিল: জার্মানিতে 'এনার্জি কো-অপারেটিভ' এবং ব্রাজিলে 'এনার্জি ক্রেডিট' ভিত্তিক স্কিম দারুণভাবে কাজ করছে, যেখানে মোট সৌরবিদ্যুতের একটি বড় অংশ আসে সাধারণ আবাসিক উদ্যোগ থেকে।
বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়নের জন্য বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের মোট চাহিদার বড় অংশ যে শুধু সৌরবিদ্যুৎ দিয়েই উৎপাদন সম্ভব, তা হয়তো স্বপ্নের মতো শোনাচ্ছে, কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশেই এটি এখন বাস্তব। সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও বিদ্যুৎ বিভাগ দেশের অর্থনৈতিক সুরক্ষার স্বার্থেই এমন একটি টেকসই এবং লাভজনক মডেল গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দেখতে পারেন।
মতামত
1এই লেখায় যেই হিসাব গুলো করা, এগুলো নিতান্তই আলোচনা শুরুর জন্য করা। অবশ্যই এর থেকে অনেক গভীর গবেষণা এবং আলোচনার প্রয়োজন আছে। কিন্তু, এখানে যেটা বলতে চেয়েছি সেটা হল, রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দিয়ে অনেক অনাবাদি জমিকেও আমরা এই সোলার ফারমিং এর জন্য তৈরি করতে পারি। এটাতে একই সাথে ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের লাভ সম্ভব। এই লেখায় ব্যবহার করা assumptions এবং ক্যাল্কুলেশন গুলো এখানে দেখতে পারেন - https://docs.google.com/document/d/1m-sLdRGG3e4lcSFHBbrzuFG21CCS2pHM4Ax_5xclrJw/edit?usp=sharing
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন