এর্নেস্তো চে গুয়েভারা বলেছিলেন মানুষ মরণশীল, কিন্তু তার কর্ম ও চিন্তা অমর। এই এক বাক্যেই যেন লুকিয়ে আছে মানুষের জীবনের সীমাবদ্ধতা আর আদর্শের সীমাহীন বিস্তার। মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু মানুষ তাদের কাজ, অবস্থান ও সংগ্রামের মাধ্যমে সময়ের সীমানা অতিক্রম করে যায়। চে গুয়েভারা সেই বিরল মানুষের একজন, যিনি ইতিহাসে প্রতিরোধ, ন্যায় এবং মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতীক। চে গুয়েভারা ছিলেন এক ব্যতিক্রমী সংমিশ্রণ। তিনি চিকিৎসক ছিলেন, আবার লেখক ও বুদ্ধিজীবীও। একই সঙ্গে ছিলেন গেরিলা নেতা, কূটনীতিবিদ এবং কিউবা বিপ্লবের অন্যতম প্রধান স্থপতি। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় সম্ভবত এটিই যে, তিনি নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পেশাগত স্থিতি এবং আরামদায়ক জীবনকে অতিক্রম করে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও তিনি দ্রুতই উপলব্ধি করেন যে, মানুষের রোগ কেবল শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের কাঠামো, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক শোষণও মানুষের অসুস্থতার বড় কারণ। এই উপলব্ধিই তাঁকে কেবল চিকিৎসার সীমিত পরিসর থেকে বের করে এনে বৃহত্তর সামাজিক সংগ্রামের দিকে ঠেলে দেয়। তাঁর জীবন তাই মানবিক সচেতনতার এক রূপান্তরের গল্প। চে বিশ্বাস করতেন, একজন মানুষের দায়িত্ব কেবল তার পেশাগত কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সে যে সমাজে বাস করে, সেই সমাজের অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধেও তার অবস্থান থাকা উচিত। এই বিশ্বাসই তাঁকে ইতিহাসে আলাদা করে দিয়েছে। আজও চে গুয়েভারা কেবল একটি ঐতিহাসিক চরিত্র নন। বিশ্বের নানা প্রান্তে, বিশেষ করে নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের প্রতিরোধের ভাষায় তাঁর মুখ একটি পরিচিত প্রতিচ্ছবি। ফিলিস্তিনের গাজার দেয়ালে আঁকা তাঁর ছবি যেন এই বার্তাই দেয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা কখনো মরে না, আর নিপীড়িত মানুষের স্বপ্ন কখনো নিভে যায় না। কিন্তু এই প্রতীকের আলোকে যখন আমরা বাংলাদেশের বাস্তবতার দিকে তাকাই, তখন একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায় এই আদর্শের প্রতিফলন আমাদের সমাজে কোথায়?বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজকে এককভাবে বিচার করা সহজ নয়, ন্যায্যও নয়। কারণ বাস্তবতা অনেক স্তরবিশিষ্ট এবং জটিল। দেশের অসংখ্য চিকিৎসক প্রতিদিন সীমাহীন চাপ, অপ্রতুল অবকাঠামো এবং মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে, চিকিৎসকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, আর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সুবিধার ঘাটতি তো আছেই। এই বাস্তবতায় একজন চিকিৎসককে শুধু পেশাদার হিসেবে নয়, এক ধরনের মানবিক যোদ্ধা হিসেবেও কাজ করতে হয়। অনেক চিকিৎসক আছেন, যারা সীমিত সুযোগের মধ্যেও নিষ্ঠার সঙ্গে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায় এমন চিকিৎসক আছেন, যাঁরা প্রায় একাই পুরো এলাকার স্বাস্থ্যসেবা সামলান। কখনো রাত, কখনো দিন তাঁদের জীবন একটানা দায়িত্বের মধ্যে আবর্তিত। এই অংশটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার এক শক্তিশালী দিক। কিন্তু এই ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে, যা অনেক সময় অস্বস্তিকর হলেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। স্বাস্থ্যখাতের ভেতরে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিকীকরণের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় উচ্চ ব্যয়, ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে কমিশনভিত্তিক সংস্কৃতি, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং অতিরিক্ত ফি এসব বিষয় সাধারণ মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক রোগী চিকিৎসাকে এখন আর নিছক সেবা হিসেবে নয় বরং একটি ব্যয়বহুল ও জটিল পণ্য হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতি একটি গভীর সংকট তৈরি করে যা বিশ্বাসের সংকট। চিকিৎসা পেশার মূল ভিত্তি হলো আস্থা। রোগী বিশ্বাস করে যে চিকিৎসক তার সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করবেন। কিন্তু যখন সেই আস্থায় ফাটল ধরে, তখন পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। এখানে প্রশ্ন আসে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? উত্তরটি একমাত্রিক নয়। কারণ এখানে ব্যক্তি এবং কাঠামো উভয়েরই ভূমিকা আছে। বাংলাদেশের একজন নতুন চিকিৎসকের বাস্তবতা অনেক সময় কঠিন। পেশায় প্রবেশের শুরুতেই তাঁকে মুখোমুখি হতে হয় কম বেতন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মানসিক চাপ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের। অনেক সময় তাঁকে একটি চলতি ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হয়, যেখানে কিছু অনানুষ্ঠানিক নিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এই পরিস্থিতিতে কেউ কেউ ধীরে ধীরে আপস করে ফেলেন, আবার কেউ কঠোরভাবে নিজের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখেন।এই পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার ভেতরে বিভিন্ন স্তর তৈরি করে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি এবং জবাবদিহিতার দুর্বলতা এসব মিলিয়ে একটি ভঙ্গুর ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এই দুর্বলতার সুযোগে অনিয়ম এবং দুর্নীতি জন্ম নেয়, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই ভোগ করতে হয়। তাই সমস্যাটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নৈতিকতার নয় বরং কাঠামোগতও। এই জায়গায় এসে চে গুয়েভারার উদাহরণ এক ধরনের নৈতিক আয়না হিসেবে কাজ করে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, পেশা কেবল জীবিকার মাধ্যম নয় বরং একটি সামাজিক দায়িত্বও। একজন চিকিৎসক যখন একজন গরিব রোগীর পাশে দাঁড়ান, যখন তিনি লাভের পরিবর্তে মানবিকতাকে অগ্রাধিকার দেন, তখন সেই মুহূর্তেই চে'র সেই ধারণা বাস্তব হয়ে ওঠে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেককে চে'র মতো বিপ্লবী হতে হবে বরং এর অর্থ হলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে ন্যায্যতা, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধ বজায় রাখা। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের দিকে তাকিয়ে তাই প্রশ্নটা অভিযোগের ভাষায় নয়, আত্মজিজ্ঞাসার ভাষায় করা উচিত। আমরা কি এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে চিকিৎসক মানবিক থাকতে পারেন? নাকি এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছি, যেখানে মানবিকতা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি, কারণ এটি কেবল চিকিৎসকদের প্রশ্ন নয়, এটি পুরো সমাজের প্রশ্ন। কারণ শেষ পর্যন্ত চে গুয়েভারা কোনো একক ব্যক্তি নন। তিনি দায়বদ্ধতার, ন্যায়ের এবং মানবিকতার। এই ধারণা ধারণ করার জন্য অস্ত্রের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নৈতিক অবস্থান, সাহস এবং দায়িত্ববোধ। বাংলাদেশের বাস্তবতায়, হয়তো অনেক চিকিৎসকের নাম ইতিহাসে লেখা হবে না। কিন্তু তাঁদের কেউ কেউ হয়তো একজন রোগীর জীবনে, একজন পরিবারের আশায়, কিংবা একটি গ্রামের নীরব পরিবর্তনে অমর হয়ে থাকবেন এবং সেই অমরত্বই হয়তো চে'র সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
এর্নেস্তো চে গুয়েভারার ৯৮ তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। শুভ জন্মদিন, চে গুয়েভারা।
লেখক: শাহরিয়ার খান নাফিজ
শিক্ষার্থী: জনাব আলী সরকারি কলেজ।
About the Author
Shahriar Khan Nafiz
মজদুরের নিয়মিত লেখকColumnist & Activist
Hi, I'm Shahriar Khan Nafiz. I am an activist driven by a deep commitment to social change. Through my writing, I strive to highlight pressing social issues, raise awareness and inspire thoughtful change in society.
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন