সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

বিদ্রোহের অন্তরালে প্রাণবন্ত নজরুল

বিদ্রোহী কবির বজ্রকণ্ঠের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক দুরন্ত, প্রাণোচ্ছল ও হাসিখুশি মানুষ। সাধারণ জীবনের ছোট ছোট ঘটনা আর রসিকতার মাধ্যমে তিনি মুহূর্তেই চারপাশকে আনন্দময় করে তুলতেন। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচাতে বা শিশুর কৌতুহলের উত্তর দিতে তাঁর জুড়ি ছিল না।

Firoz Hassan M.A.Shahan
Firoz Hassan M.A.Shahan মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 8 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 1 বার পড়েছে
বিদ্রোহের অন্তরালে প্রাণবন্ত নজরুল

কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা সাধারণত যে নামে সবচেয়ে বেশি চিনি, তা হলো ‘বিদ্রোহী কবি’। তাঁর কবিতার পংক্তিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণ, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু একজন মানুষকে কি কেবল তাঁর সৃষ্টির সবচেয়ে তেজস্বী দিক দিয়ে চেনা যায়? নজরুলের ক্ষেত্রে বোধ হয় যায় না। কারণ অগ্নিমুখর সেই কবির ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক দুরন্ত, প্রাণোচ্ছল, রসিক ও হাসিখুশি মানুষ। তাঁর জীবনের নানা ছোট ছোট ঘটনা সেই মানুষটিরই পরিচয় দেয়।

নজরুলের রসবোধ ছিল খুব স্বাভাবিক। তিনি যেন আলাদা করে হাসির পরিবেশ তৈরি করতেন না; বরং জীবনের সাধারণ ঘটনাগুলোর মধ্যেই হাসির উপাদান খুঁজে নিতেন। তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি ছিল তীক্ষ্ণ, কিন্তু সেই তীক্ষ্ণতার সঙ্গে ছিল এক ধরনের শিশুসুলভ সরলতা। তাই কখনো অপরিচিত মানুষের সঙ্গে, কখনো বন্ধুর সঙ্গে, আবার কখনো ছোট্ট কোনো শিশুর প্রশ্নের উত্তরেও তাঁর সেই রসিক সত্তাটি অনায়াসে প্রকাশ পেত।

একবার কাজী নজরুল ইসলাম ট্রেনে ভ্রমণ করছিলেন। পাশে বসা সমবয়সী এক অপরিচিত ভদ্রলোক হঠাৎ তাঁকে উদ্দেশ করে বলে উঠলেন, ‘এই শালা, তোর কাছে দেশলাই আছে?’

অপরিচিত একজন মানুষের মুখে এমন সম্বোধন শুনে কবি প্রথমে খানিকটা চমকে উঠেছিলেন, বিরক্তিও হয়তো হয়েছিল। কিন্তু নজরুল বেশিক্ষণ বিরক্ত হয়ে বসে থাকার মানুষ ছিলেন না। মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে পকেট থেকে দেশলাইয়ের বাক্সটি বের করে লোকটির মুখের দিকে ছুড়ে দিয়ে বললেন, ‘লে বে শালা।’

ব্যস, ইটের বদলে পাটকেল। অপরিচিত সেই ভদ্রলোকও হো হো করে হেসে উঠলেন। তিনি বললেন, পরিচয়ের কিছুক্ষণ পরেই তাঁরা এমন সম্বোধনে পৌঁছাতেন; তাই অনেক ভেবেই তিনি শুরুটা সেখান থেকেই করেছেন।

ঘটনাটি পড়লে নজরুলের স্বভাবের একটি বিশেষ দিক খুব সহজেই চোখে পড়ে। তিনি মানুষের আচরণের মধ্যে অস্বস্তিকর কিছু দেখলেও সেটিকে দীর্ঘক্ষণ নিজের মধ্যে জমিয়ে রাখতেন না। বরং বুদ্ধি আর রসিকতার মাধ্যমে মুহূর্তটিকে আনন্দে পরিণত করতে পারতেন। অপরিচিত একজন মানুষের সঙ্গে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই যে স্বচ্ছন্দতা তৈরি হলো, সেটিও নজরুলের সহজ-সরল মানবিকতার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত।

নজরুলের এই স্বভাবের কথা ভাবলে মনে হয়, তাঁর ভেতরে হয়তো মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার চেয়ে দূরত্ব ভেঙে ফেলার প্রবণতাই বেশি ছিল। আর সেই দূরত্ব ভাঙার অন্যতম সহজ অস্ত্র ছিল তাঁর হাস্যরস।

আবার একদিনের ঘটনা। তখন নজরুল গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। একদিন তিনি সেখানে দোতলায় বসে আছেন। এমন সময় একজন কর্মচারী এসে জানালেন, ‘কাজীদা, ইন্দুদি আপনাকে নিচে ডাকছেন।’

‘নিচে ডাকছেন’ কথাটি শুনেই কবি সস্নেহ কৌতুকে বলে উঠলেন, ‘আর কত নিচে নামব, ভাই?’

সাধারণ একটি বাক্য, অথচ নজরুলের মুখে এসে সেটিই হয়ে গেল হাসির বিষয়। তাঁর এই রসিকতার মধ্যে শব্দ নিয়ে খেলার যে প্রবল আনন্দ ছিল, তা খুব সহজেই বোঝা যায়। তিনি যেন কথার ভেতরেও খেলা খুঁজে পেতেন। তাঁর কাছে ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম ছিল না; ভাষা ছিল আনন্দেরও একটি জায়গা।

এমন মানুষদের সঙ্গে থাকলে হয়তো একটি সাধারণ বিকেলও অকারণে স্মরণীয় হয়ে যায়। কারণ তাঁরা বড় কোনো আয়োজন ছাড়াই পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারেন। নজরুলও ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।

আবার তাঁর গানের আসরে গেলে দেখা যায় আরেক নজরুলকে। গান, আড্ডা আর পান এই তিনটি যেন তাঁর জলসার পরিচিত অনুষঙ্গ। একদিন গানের ফাঁকে চা-মুড়ির পর্ব শেষ করে কবি পান মুখে দিতে যাচ্ছেন। এমন সময় একটি ছোট্ট মেয়ে এসে মিষ্টি হেসে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এত পান খাও কেন?’

একটি শিশুর সরল প্রশ্ন। নজরুলও উত্তর দিলেন শিশুর মতোই সরল অথচ মজার ভঙ্গিতে ‘গান গাই যে!’

এই ছোট্ট উত্তরটির মধ্যেও নজরুলের মানুষটিকে যেন খুব কাছ থেকে দেখা যায়। তিনি শিশুর প্রশ্নকে গুরুত্বহীন করে সরিয়ে দেননি; বরং শিশুটির কৌতূহলের সঙ্গে নিজের রসবোধকে মিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর হাসির মধ্যে এমন এক সহজতা ছিল, যা বয়সের ব্যবধানকেও যেন মুহূর্তের জন্য ভুলিয়ে দিত।

নজরুলের ব্যক্তিত্বের এই দিকটি আমার কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। কারণ একজন বড় কবি হয়েও তিনি নিজেকে সবসময় গুরুগম্ভীর করে রাখেননি। বরং জীবনের ছোট ছোট আনন্দকে উপভোগ করার ক্ষমতা তাঁর ছিল প্রবল। হয়তো সৃষ্টিশীল মানুষ হওয়ার একটি সৌন্দর্য এখানেই গভীর চিন্তার পাশাপাশি সামান্য আনন্দেও মন ভরে হাসতে পারা।

আরেকবার বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে তাঁর এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা তাঁর প্রাণখোলা হাসির চিত্রটিকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।

তখন কবি কৃষ্ণনগরে থাকেন। তাঁর বন্ধু মঈনুদ্দীন থাকতেন বেচু ঠাকুরের গলিতে, কারমাইকেল কলেজের হোস্টেলের পেছনে। একদিন তিনি নজরুলকে দাওয়াত করলেন। সন্ধ্যার সময় কবি বন্ধুর বাসায় পৌঁছালেন। খুব আহামরি কোনো আয়োজন নয়, তবে অন্যদিনের তুলনায় একটু ভালোই আয়োজন করা হয়েছিল।

নজরুল ঘরে ঢুকে চারপাশ দেখতে দেখতে একসময় বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কিরে?’

মঈনুদ্দীন বললেন, ‘রান্নাঘর।’

কবি আবার জানতে চাইলেন, ‘আর ওটা?’

বন্ধু বললেন, ‘ওটা হলো পায়খানা।’

নজরুল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘দূর শয়তান! পায়খানা কিরে? বল “যায়খানা”। খানাতো ওখান দিয়েই যায় রে!’

কথাটা বলেই তাঁর সে কী প্রাণখোলা হাসি! যেন সামান্য একটি শব্দ নিয়েই তিনি পুরো পরিবেশকে আনন্দে ভরিয়ে দিলেন। তাঁর হাসির শব্দে জানালার কার্নিশে বসে থাকা কবুতর পর্যন্ত পাখা মেলে উড়ে গিয়েছিল ঘটনাটি যেন সেই হাসিরই এক চিত্র হয়ে আছে।

এই ঘটনার মধ্যে নজরুলের বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যাঁদের সঙ্গে তিনি আপন হয়ে উঠতেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তায় কোনো আনুষ্ঠানিকতার দেয়াল থাকত না। বন্ধুকে ঠাট্টা করছেন, শব্দ নিয়ে খেলছেন, আবার নিজের কথাতেই প্রাণখোলা হাসছেন সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের সহজ স্বতঃস্ফূর্ততা।

নজরুলের হাসি যে শুধু তাঁর কাছের মানুষের কাছেই পরিচিত ছিল, তা নয়। তাঁর হাসির এমনই খ্যাতি ছিল যে একবার বন্ধুরা তাঁকে খুঁজতে গিয়ে হাসির শব্দ অনুসরণ করেই তাঁর সন্ধান পেয়েছিলেন।

এ বাড়ি, ও বাড়ি অনেক জায়গায় খোঁজা হচ্ছে কবিকে। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ দূরের কোনো একটি বাড়ি থেকে ভেসে এল অট্টহাসির শব্দ। সেই হাসি যেন তাঁর নিজেরই পরিচয়পত্র। বন্ধুরা বুঝে গেলেন নজরুল নিশ্চয়ই সেখানেই আছেন।

একজন মানুষকে তাঁর মুখ দেখে নয়, তাঁর হাসির শব্দ শুনে খুঁজে পাওয়া এটি নিঃসন্দেহে বিরল এক ব্যাপার। নজরুলের ক্ষেত্রে সেটিই যেন তাঁর ব্যক্তিত্বের এক মজার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। তিনি যেখানে থাকতেন, সেখানে তাঁর উপস্থিতি কেবল কথায় বা গানে নয়, হাসিতেও অনুভব করা যেত।

নিজের এই হাস্যরসপ্রিয় সত্তাকে নজরুল নিজেও অস্বীকার করেননি। বরং তাঁর একটি হাসির গানে যেন নিজেকেই মজার ছলে তুলে ধরেছেন -

‘আমি দেখব হাসি

আমায় দেখলে পরে হাসতে হাসতে পেয়ে যাবে কাশি।’

আরও বলেছেন -

‘আমি হাসির হাঁসলী ফেরি করি এলে আমার হাসির দেশে

বুড়োরা সব ছোঁড়া হয়, আর ছোঁড়ারা যায় টেঁসে।’

এই পংক্তিগুলো পড়লে মনে হয়, নজরুলের কাছে হাসি কেবল বিনোদনের বিষয় ছিল না; হাসি ছিল জীবনের এক ধরনের মুক্তি। বয়স, ক্লান্তি, দুঃখ কিংবা জড়তা—সবকিছুকে যেন হাসির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে যাওয়ার এক কল্পলোক তিনি তৈরি করেছিলেন।

তাই নজরুলকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ বলে থামিয়ে দিলে তাঁর মানুষটিকে পুরোপুরি জানা হয় না। যে মানুষটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে কথা বলেছেন, তিনিই আবার শিশুর সঙ্গে শিশুর মতো করে কথা বলেছেন। যে মানুষটি সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, তিনিই বন্ধুর সঙ্গে সামান্য একটি শব্দ নিয়ে হাসিতে ফেটে পড়েছেন। যে কবির কণ্ঠে ছিল আগুন, তাঁর হাসিতে ছিল শিশুর মতো নির্মল আনন্দ।

আমার কাছে নজরুলের এই দিকটি তাঁর বিদ্রোহী সত্তার বিপরীত নয়; বরং তারই আরেকটি মানবিক পরিপূরক। কারণ জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসা না থাকলে জীবনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে এত তীব্র প্রতিবাদও হয়তো জন্ম নিত না। যে মানুষ হাসতে জানেন, তিনিই হয়তো সবচেয়ে গভীরভাবে বুঝতে পারেন মানুষের কষ্ট; আর যে মানুষ মানুষের আনন্দকে অনুভব করতে পারেন, তিনিই মানুষের মুক্তির স্বপ্নও এত তীব্রভাবে দেখতে পারেন।

নজরুল তাই শুধু অগ্নিবীণার কবি নন, তিনি প্রাণেরও কবি। তাঁর জীবনে যেমন বিদ্রোহের আগুন ছিল, তেমনি ছিল আড্ডার উষ্ণতা; যেমন ছিল প্রতিবাদের ভাষা, তেমনি ছিল ঠাট্টার হাসি; যেমন ছিল গভীর বেদনা, তেমনি ছিল শিশুর মতো আনন্দ।

সম্ভবত এই বহুমাত্রিকতাই নজরুলকে এত আপন করে তোলে। তাঁকে যতই পড়ি, ততই মনে হয়—আমরা যে নজরুলকে চিনি, তারও আড়ালে আরেকজন নজরুল হাসছেন। সেই নজরুলের হাতে হয়তো অস্ত্র নেই, নেই কোনো বিদ্রোহের পতাকা; আছে শুধু এক প্রাণখোলা হাসি, কিছু দুষ্টুমি, কিছু রসিকতা আর মানুষের প্রতি এক অদ্ভুত সহজ ভালোবাসা।

আর সেই কারণেই বিদ্রোহের অন্তরালে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাণবন্ত নজরুলকে নতুন করে আবিষ্কার করাও আমাদের জন্য কম আনন্দের নয়।

#কাজী_নজরুল_ইসলাম #বিদ্রোহী_কবি #বাংলা_সাহিত্য #নজরুল #বাংলাদেশ #বাংলা_কবিতা #সাহিত্য_চর্চা #ব্যক্তিত্ব
Firoz Hassan M.A.Shahan

About the Author

Firoz Hassan M.A.Shahan

মজদুরের নিয়মিত লেখক

Student, Founder of The Team of Shiku (TTS), and Originator of Shikunism, an Emerging Philosophy.

Founder of The Team of Shiku (TTS), an organization dedicated to personality development, positive thinking, self-improvement, and peace-building. also the originator of Shikunism, an emerging philosophy that emphasizes character development, humanity, ethical values, personal growth, and the pursuit of peace. Through my work, I aim to inspire people to become better individuals and contribute positively to society and the world.

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast