সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

এরা কারা, কী এদের পরিচয়?

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ব্যানারে উগ্র সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও বিতর্কিত দাবির আড়ালে গভীর ষড়যন্ত্রের ছক স্পষ্ট হচ্ছে। জুলাই কন্যা থেকে শুরু করে চৈতালি চক্রবর্তীর মতো ব্যক্তিদের বিতর্কিত বক্তব্য কেবল সামাজিক অস্থিরতাই বাড়াচ্ছে না, বরং প্রকৃত সংখ্যালঘু আন্দোলনের লক্ষ্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

mustafa kemal atarturk
পড়তে 7 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 163 বার পড়েছে
এরা কারা, কী এদের পরিচয়?

যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, ঠিক তাই ঘটছে। ‘আজাদ পার্টি’ নামের একটি নতুন ভূঁইফোড় রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে গতকাল ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে যে মিছিল এবং ঘেরাও কর্মসূচি করা হলো, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত ঘটনা। শুরু করা যাক জুলাই কন্যাকে দিয়ে; গতকাল তিনি ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিতে গিয়েছিলেন। সেখানে মিডিয়ার সামনে তিনি যা বললেন তার সারাংশ হলো, ভারতে যদি মুসলমানরা নামাজ পড়তে না পারে, নির্যাতিত হয়, তাহলে এখন থেকে বাংলাদেশে হিন্দুদের মন্দিরে পূজা করতে দেওয়া হবে না, প্রতিবাদ করতে দেওয়া হবে না।

এটা পড়ে যদি আপনি ভাবেন এই মানুষ আসলে কী বলছেন, তাহলে উত্তর হলো, তিনি মূলত একটি কূটনৈতিক সংকটকে ‘কমিউনিটি পণবন্দী’ সংকটে রূপান্তর করছেন। ভারতে দিলীপ ঘোষ রাস্তায় নামাজ পড়ার বিরোধিতা করে কথা বলেছিলেন, যা অবশ্যই আপত্তিকর। কিন্তু তার জবাবে বাংলাদেশের হিন্দুদের মন্দিরকে জিম্মি ঘোষণা করাটা কোন যুক্তিতে কূটনীতি, সেটা জুলাই কন্যা ছাড়া আর কেউ বোধহয় বুঝবেন না।

কিছুদিন আগেই পশ্চিমবঙ্গের এক মুসলিম বিধায়ক খোদ বাংলাদেশিদের অনুরোধ করেছিলেন যেন আমরা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলাই। কিন্তু গোল্লায় যাওয়া এই জুলাই কন্যাকে থামাবে কে! তিনি বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের উদ্ধার না করে দম নেবেন না বলেই পণ করেছেন। এই বক্তব্য এমন সময় এলো যখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ভারত সফর নিয়ে নানান পক্ষ নানান ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। ফলে আগুনের ওপর ঘি ঢালার কাজটা বেশ সফলভাবেই হয়ে গেল। হাজার হাজার শেয়ার, অসংখ্য স্ক্রিনশট, উগ্রতার মহোৎসব। জুলাই কন্যার সৌভাগ্য যে তিনি খুব বেশি দিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারেননি।

উগ্রতাকে টেক্কা দিতে এবার মাঠ কাঁপাতে হাজির হলেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী চৈতালি চক্রবর্তী , যিনি নিজেকে সনাতনীদের স্বঘোষিত রক্ষাকর্তা ভাবেন। দিদি রংপুরে রাম মূর্তি নির্মাণ স্থগিত করার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ভাবলেন এই সুযোগে একটু লাইমলাইট পাওয়া যাক এবং বাংলাদেশি মুসলিমদের একটু ভয় দেখানো যাক। ব্যাস! তিনি মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে হুংকার দিলেন, বাংলাদেশে হিন্দুদের জন্য আলাদা প্রদেশ করতে হবে। দাঙ্গা বাধলে মুসলিমরা যদি দুইটা মারে, তবে দিদিরা নাকি একটা হলেও মারবেন!

দিদি মুহূর্তেই ভাইরাল হলেন বটে, তবে নেটিজেনরা কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে আস্ত কেউটে সাপ বের করে আনলেন। দেখা গেল ৫ই আগস্টের পর থেকে দিদি ক্রমাগত উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। তিনি কখনো বলছিলেন ‘শেখ হাসিনা আসলেই বাংলাদেশ হাসবে’, কখনো আবার বলছিলেন দেশের অচলাবস্থা কাটাতে শেখ হাসিনাকেই দরকার। এমনকি কলকাতায় বিজেপি জেতার পর শুভেন্দু অধিকারী নাকি তাকে কথা দিয়েছিলেন যে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরিয়ে আনবেন। অথচ সেই দিদিই কালকে হঠাৎ আবদার করে বসলেন বাংলাদেশের বুক চিরে হিন্দুদের জন্য আলাদা প্রদেশ বানাবেন! তিনি একই সাথে আওয়ামী লীগ, বিজেপি, ভারত এবং শুভেন্দু অধিকারীর অন্ধ ভক্ত।

দিদির এই অদ্ভুত আবদার শুনে খোদ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই বিভক্তি দেখা দিয়েছে। একদল যারা তার অন্ধ সমর্থক তারা অবলীলায় যুক্তি দিচ্ছেন যে প্রদেশ কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র নয়, তাই দিদি কোনো দেশভাগের কথা বলেননি। অন্যদিকে প্রকৃত সচেতন হিন্দু সমাজ স্পষ্ট ভাষায় বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে যে এই নারী বাংলাদেশের সনাতনীদের প্রতিনিধিত্ব করেন না। দেশের সার্বভৌমত্ব এবং সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো বক্তব্য দেশের সনাতনী সমাজ সমর্থন করে না। তাদের আসল আন্দোলন ছিল রামচন্দ্রের অবমাননার বিরুদ্ধে এবং যারা এই অবমাননা করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবির পক্ষে। কিন্তু চৈতালি দিদির এই বিতর্কিত এবং উস্কানিমূলক বক্তব্যের কারণে তাদের মূল আন্দোলনের গতিপথটাই নষ্ট হয়ে গেল।

দ্বিতীয় দলটা অনেক বেশি বুদ্ধিমান, কারণ তারা বুঝেছেন দিদি আসলে কী ক্ষতিটা করে ফেলেছেন। বাংলাদেশে এমন কোনো জেলা বা বিভাগ নেই যেখানে হিন্দুরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা সারা দেশে ছড়িয়ে আছেন। তাহলে এই আলাদা প্রদেশটা কোথায় হবে? কোটি মানুষকে কি পুনর্বাসন করা হবে? বাস্তবে এটা অসম্ভব। কিন্তু এই অসম্ভব দাবিটা তুললে একটা কাজ খুব ভালো হয়। র‍্যাডিকাল গোষ্ঠীগুলো নতুন অস্ত্র পায়। তারা এখন বলতে পারবে, "দেখুন, হিন্দুরা দেশ ভাগ করতে চায়।"

আর এখানেই একটা অদ্ভুত মিল চোখে পড়ে। এগুলো অবশ্যই ভারতের সরকারি নীতি নয়। তবে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী থিংক ট্যাংক (যেমন : Swarajya Magazine) বা প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ভরত কর্ণাড বহুদিন ধরে বলে আসছেন, রংপুর এবং চট্টগ্রামের একাংশে হিন্দুদের আলাদা আবাসভূমি তৈরি করে ভারতের সাথে যুক্ত করলে শিলিগুড়ি করিডোরের (চিকেনস নেক) নিরাপত্তা সংকট মিটবে। দিদিও ঠিক একইভাবে বিদেশি সাহায্য নিয়ে আলাদা প্রদেশের কথা বলছেন। বক্তব্যের ভেতরে তিনটা জিনিস হুবহু মিলে যাচ্ছে: আলাদা অঞ্চল, বিদেশি সাহায্য এবং নির্যাতিত হিন্দুদের জন্য নিরাপদ এলাকা। দিদি নিশ্চয়ই ইউটিউবে এই থিংক ট্যাংকের ভিডিওগুলো নিয়মিত গিলছেন, তা না হলে এত সুন্দর করে মিডিয়ার সামনে মনের ভাব প্রকাশ করলেন কীভাবে? তাছাড়া তিনি একজন পরিচিত আওয়ামী লীগ সমর্থক হওয়ায় মানুষের মনে এই ধারণাই পোক্ত হলো যে এরা আসলে ওপারের নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়।

এবার আসা যাক রংপুরের সেই রাম মূর্তির কথায়, যা এই পুরো ঝামেলার কেন্দ্রে। রংপুরের পলাশপুরে প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল রাম মূর্তি নির্মাণের কাজ চলছিল। নির্মাণ শুরু হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। প্রায় দুই বছর উল্লেখযোগ্য বিরোধিতা ছাড়াই কাজ চলেছে। তারপর হঠাৎ করে ২০২৬ সালে বিষয়টি উত্তপ্ত হয়ে উঠল। প্রতিবাদ হয়েছে ‘গাইবান্ধা পলাশবাড়ীর সাধারণ জনগণ’ ব্যানারে, কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলছেন পেছনে শিবির আর হেফাজত ছিল, শুধু ব্র্যান্ডিং এড়াতে ওই ছদ্মবেশী ব্যানার ব্যবহার হয়েছে;আন্দোলনকারীরা দাবি করেন তারা শুধু মূর্তি নির্মাণে বাধা দিয়েছেন, মন্দির নির্মাণে নয়।

কিন্তু এই পুরো প্রজেক্টের টাইমিং এবং এর পেছনে থাকা কমিটির রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে বিশাল বড় প্রশ্ন থেকে যায়। ২০২৪ সালের আগস্টে যখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলো , ঠিক সেই উত্তাল সময়ে শিলিগুড়ি করিডোর থেকে মাত্র একশো কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে এত বড় প্রজেক্ট কার অনুমতিতে এবং কার অর্থায়নে শুরু হলো তার কোনো স্বচ্ছ সরকারি তথ্য নেই।

সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুলটা হলো এই প্রজেক্টের সাথে বাংলাদেশের মূলধারার কোনো সংখ্যালঘু রাজনৈতিক নেতৃত্বকে যুক্তই করা হয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী কিংবা প্রভাবশালী হিন্দু নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নিপুণ রায়, অথবা মতুয়া সম্প্রদায়ের সংরক্ষিত নারী এমপি সুবর্ণা ঠাকুর এদের কাউকেই এই মূর্তির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। অথচ এই ধরনের বড় ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষেত্রে সুরক্ষার জন্য সরকারের ভেতরের মানুষদের যুক্ত করাটা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

রাজনৈতিক টাইমিংয়ের দিক থেকে এই ঘটনাটি বর্তমান বিএনপি সরকারকে উভয় সংকটে ফেলে দিয়েছে। মূর্তি নির্মাণ চলতে দিলে উগ্রপন্থীরা খেপে যায়, আর বন্ধ করলে ভারত এবং দেশের হিন্দুরা বলবে এই সরকার সংখ্যালঘু বিরোধী। এই প্রজেক্টের তদন্ত হওয়া উচিত। যদি সব ঠিকঠাক থাকে, অনুমতি ও অর্থায়ন স্বচ্ছ হয়, তবে নির্মাণ হতেই পারে। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো না করে শুধু "হিন্দু নির্যাতন" বললে যেমন পুরো ছবি দেখা যায় না, তেমনি শুধু "বিদেশি ষড়যন্ত্র" বললেও প্রমাণ ছাড়া কথা বলা হয়।

দুর্ভাগ্যবশত এই ধরনের উগ্রতা এবং সাংস্কৃতিক বাধা কেবল সনাতনীদের সাথেই ঘটছে না, বরং সাধারণ মানুষও প্রতিদিন এর শিকার হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমা প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়া কিংবা ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে হট্টগোল তৈরি করা এখন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সমস্যা নয়, বরং একটি জাতীয় সংকট। আর এই সংকটের জন্য দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলই দায়ী। কারণ তারা চিরকালই এসব উগ্র গোষ্ঠীকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে তোষণ করে এসেছে। একটি প্রকৃত সেক্যুলার এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো ছাড়া এই উগ্রতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

#সাম্প্রদায়িক_উস্কানি #বাংলাদেশ_রাজনীতি #চৈতালি_চক্রবর্তী #রংপুর_রাম_মূর্তি #বাংলাদেশ #রাজনৈতিক_বিশ্লেষণ #সামাজিক_সংকট
mustafa kemal atarturk

About the Author

mustafa kemal atarturk

Financial analyst

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast