সঙ্কীর্ণতাবাদী সংগঠনদের বক্তব্য পড়লে প্রথমে খুব যুক্তিসংগতই মনে হতে পারে, একদিকে যারা কেরলে সরকার চালায়, নয়া শ্রম কোডের সাথে সমঝোতা করে, তাদের সঙ্গে আবার কী করে ঐক্যবদ্ধভাবে এই আইনের “বিরোধিতা” করা যায়? এটা কি নিছক ভণ্ডামি নয়?
কিন্তু এখানে ভুলটা নৈতিক জায়গায় নয়, রাজনৈতিক জায়গায়। প্রশ্নটা এই নয় যে শোধনবাদী নেতৃত্ব ভণ্ড কি না—ওটা শ্রমিকরাই হাড়ে হাড়ে জানে। প্রশ্নটা হলো, আজ বাস্তবে শ্রমিকশ্রেণি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। তারা এখনও বড় অংশে ওই দলগুলোর প্রভাবের মধ্যেই আছে, তাদের ইউনিয়নেই সংগঠিত। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে “স্বাধীন, লড়াকু, বিশুদ্ধ” অবস্থান নেওয়া মানে আসলে শ্রমিকদের থেকে নিজেকে আলাদা করে নেওয়া। একই সাথে বিরোধিতা আবার ঐক্য, এটা আত্মবিরোধ নয়। মালিকশ্রেণি ও তাদের আইনের বিরুদ্ধে কার্যগত ঐক্য, আর সেই ঐক্যের মধ্যেই শোধনবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম, এই দুটো একসাথেই চলে। শ্রম কোডের বিরুদ্ধে ধর্মঘটে নামা মানে কেরল সরকারের বা সিপিআই(এম)-এর চরিত্রে বিশ্বাস রাখা নয়। বরং লড়াইয়ের ভেতরেই দেখিয়ে দেওয়া যে এই নেতৃত্ব অর্ধেক পথ অবধি অগ্রসর হয়ে থেমে যাবে, আপস করবে, পিছিয়ে আসবে।
বাইরে দাঁড়িয়ে আগেই বলে দেওয়া, “ওরা বিশ্বাসঘাতক, তাই আমরা থাকব না”, এতে ওদের মুখোশ খোলে না, বরং ওদের প্রভাব আরও মজবুত হয়, নিরাপদ থাকে। কারণ তখন বৃহৎ লড়াইটা দুর্বল হয়, আর শ্রমিকরা ভাবে বিপ্লবীরা শুধু বড় বড় কথা বলে, কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে তাদের পাওয়া যায় না। শোধনবাদীদের আসল চরিত্র উন্মোচিত হয় তখনই, যখন তারা নিজেরা শুরু করা বা বাধ্য হয়ে করা আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ায়, শ্রমিকদের চোখের সামনে। এই জন্যই বিপ্লবীরা শ্রমিকদের কাছে আবেদন রাখতে পারে, এবং তা রাখতেই হয়। সেই আবেদনটা কোনো ভণ্ড ঐক্যের ডাক নয়, বরং এই সত্যের উপর দাঁড়িয়ে যে আমরা তোমাদের সাথে আছি শ্রেণিশত্রুর আইনের বিরুদ্ধে, কিন্তু আমরা তোমাদের মিথ্যা বলছি না। বর্তমান নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত তোমাদের লড়াইয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করবে, আর সেটা তোমরাই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে টের পাবে। তখন প্রশ্ন উঠবে নতুন নেতৃত্বের।
যারা এই পথকে “ধোঁকাবাজি” বলে, তারা আসলে রাজনীতিকে নৈতিক বিশুদ্ধতার জায়গায় নামিয়ে আনে। আর তাতে যা থাকে, তা বিপ্লবী শক্তি নয়, বরং একটা বিচ্ছিন্ন, আত্মতৃপ্ত ক্ষুদ্র গোষ্ঠী। বিপ্লবী রাজনীতি মানে নিজের পবিত্রতা রক্ষা করা নয়; এর মানে শ্রমিকশ্রেণির বাস্তব অবস্থান থেকে শুরু করে, লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই পুরনো, পচে যাওয়া নেতৃত্বের সীমা অতিক্রম করে বিপ্লবী দিশায় এগিয়ে চলা।
কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের চতুর্থ কংগ্রেস, কমিন্টার্নের কৌশল সংক্রান্ত থিসিসের পরিশিষ্ট, ইউনাইটেড ফ্রন্ট বিষয়ে থিসিস, (কার্যনির্বাহী কমিটি কর্তৃক গৃহীত, ডিসেম্বর ১৯২২):
যদিও জুহো, মেরেম ও তাদের নেতৃত্বাধীন শোধনবাদী কনফেডারেশন অব লেবার ফরাসি শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থ বিক্রি করে দিতে কখনও ব্যর্থ হবে না, তবুও ফরাসি কমিউনিস্টরা এবং ফরাসি শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী অংশকে প্রতিটি গণধর্মঘট, বিপ্লবী মিছিল বা অন্য যে কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন শুরু হওয়ার আগেই শোধনবাদীদের কাছে যেতে হবে এবং শ্রমিকদের উদ্যোগের পক্ষে দাঁড়াতে তাদের আহ্বান জানাতে হবে। একই সঙ্গে, যখনই তারা শ্রমিকদের বিপ্লবী সংগ্রামকে সমর্থন করতে অস্বীকার করবে, তখনই সেই অস্বীকৃতিকে ধারাবাহিকভাবে ও প্রকাশ্যে উন্মোচিত করতে হবে। পার্টির বাইরে থাকা বিপুল সংখ্যক শ্রমিকদের জয় করার জন্য এটাই হবে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর পথ। অবশ্যই, কোনো অবস্থাতেই এর ফলে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি তার রাজনৈতিক স্বাধীনতা ত্যাগ করতে পারে না [...]।
ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, “বামপন্থী" কমিউনিজম: একটি শিশুসুলভ ব্যাধি বইয়ের “বিপ্লবীদের কি প্রতিক্রিয়াশীল ট্রেড ইউনিয়নে কাজ করা উচিত?” শীর্ষক অধ্যায়ে লেখেন:
কমিউনিস্টদের প্রতিক্রিয়াশীল ট্রেড ইউনিয়নে কাজ করা উচিত নয়—এই হাস্যকর 'তত্ত্ব'টি 'বামপন্থী' কমিউনিস্টদের ‘জনগণকে প্রভাবিত করার’ প্রশ্নে কতটা তুচ্ছ ও ভাসাভাসা মনোভাব রয়েছে, তা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। একই সঙ্গে এটি দেখায়, তারা কীভাবে 'জনগণ' সম্পর্কে ফাঁপা হাঁকডাককে অপব্যবহার করে। যদি আপনি সত্যিই ‘জনগণকে’ সাহায্য করতে চান, যদি তাদের সহানুভূতি ও সমর্থন অর্জন করতে চান, তাহলে আপনাকে অসুবিধা এড়িয়ে চলার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে; ‘নেতাদের’ (যারা সুযোগসন্ধানী ও সামাজিক-উগ্রজাতীয়তাবাদী, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বুর্জোয়া ও পুলিশের সঙ্গে যুক্ত) কাছ থেকে পাওয়া খোঁচা, কূটচাল, অপমান ও নিপীড়নকে ভয় পেলে চলবে না। বরং আপনাকে অবশ্যই সেখানে কাজ করতে হবে, যেখানে বাস্তবে জনগণ উপস্থিত। জনগণ যেখানে আছে, সেখানে নিয়মিত, অবিচল, ধারাবাহিক ও ধৈর্যের সঙ্গে প্রচার ও আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যেতে হলে আপনাকে যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকতে হবে, সবচেয়ে বড় বাধাগুলোকেও অতিক্রম করতে সক্ষম হতে হবে। এমনকি সেইসব প্রতিষ্ঠান, সমিতি ও সংগঠনের মধ্যেও—যেগুলো সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল—যেখানে প্রলেতারীয় বা আধা-প্রলেতারীয় জনসমষ্টিকে পাওয়া যায়। ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিকদের সমবায় সংগঠনগুলোই (অন্তত কিছু ক্ষেত্রে) সেই প্রধান সংগঠন, যেখানে বাস্তবে এই জনগণকে পাওয়া যায়।
About the Author
Sankalpa
মজদুরের নিয়মিত লেখকশিক্ষার্থী
বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন