সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

যুব সমাজের প্রতি আবেদন

পুঁজিবাদী সমাজ তরুণ প্রজন্মের কাছে যে অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা আজ ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। এই সংকটময় সময়ে আইসিএল তরুণ র‌্যাডিকালদের শ্বেত-কলার পেশার মরীচিকা ত্যাগ করে উৎপাদন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো কৌশলগত খাতে শ্রমিক হিসেবে যোগদানের আহ্বান জানায়।

Sankalpa
Sankalpa মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 6 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 80 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 2 জন পাঠক পড়েছেন
যুব সমাজের প্রতি আবেদন

স্পারটাসিস্টদের উইমেন অ্যান্ড রেভলিউশনের ৪৭ নং সংখ্যায় প্রকাশিত একটি লেখার সংক্ষিপ্ত তরজমা—

মে ২০২৬-এ আন্তর্জাতিকতাবাদী শক্তিগুলির বৈঠকের জন্য ICL-এর প্রস্তাবনা। যুব সমাজের প্রতি আবেদন: বিপ্লবের জন্য লড়ো, শ্রমিক হও!

বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ তরুণ প্রজন্মের কাছে শিক্ষা, সামাজিক উত্তরণ ও অগ্রগতির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। এই সংকট বহু তরুণকে বামপন্থা ও বিপ্লবী রাজনীতির দিকে টানছে। কিন্তু দ্রুত সাফল্যের আশায় কমিউনিস্ট হওয়া আর আজীবন বিপ্লবী সংগ্রামের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া এক জিনিস নয়। তাই আইসিএল তরুণ র‌্যাডিকালদের প্রতি আহ্বান জানায় শ্বেত-কলার পেশার মরীচিকার পেছনে না ছুটে উৎপাদন, পরিবহন, লজিস্টিকস, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি কৌশলগত খাতে শ্রমিক হিসেবে কাজে যোগদান করতে। এতে কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক অবস্থান ও সামাজিক অস্তিত্বের মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠে এবং শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রাম তাত্ত্বিক ধারণার স্তর থেকে উত্তীর্ণ হয়ে দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হয়। একই সঙ্গে মার্কসবাদীরা শ্রমিক আন্দোলনে যে প্রভাব হারিয়েছে, তা পুনর্গঠনের জন্যও কমিউনিস্ট শ্রমিকদের এক নতুন প্রজন্ম অপরিহার্য।

গত কয়েক দশকে বাম রাজনীতির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। উদারপন্থী যুগে একাডেমিয়ায় বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের জন্য কিছু পরিসর ছিল এবং আজও ক্যাম্পাসগুলি কমিউনিস্ট সংগঠনের নিয়োগক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। কিন্তু মার্কসবাদীদের অতিরিক্ত বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিকতা আন্দোলনকে ক্রমশ উদারপন্থী ও পাতি-বুর্জোয়া অভিমুখে ঠেলে দিয়েছে এবং শ্রমিকশ্রেণির বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরিয়েছে। আইসিএল ক্যাম্পাস রাজনীতি পরিত্যাগের কথা বলে না; বরং অগ্রাধিকারের মৌলিক পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। বিপ্লবী দল গড়ে ওঠে শ্রেণিচ্যুত বুদ্ধিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণির অগ্রণী অংশের সংযুক্তির মাধ্যমে, আর সেই কারণে তরুণ র‌্যাডিকালদের একটি অংশকে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে প্রবেশ করতেই হবে।

আইসিএলের মতে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে যাওয়া শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বাস্তবতারও স্বীকৃতি। বেকার স্নাতকদের সংখ্যা বাড়ছে; কিছু মানুষ এখনও শ্বেত-কলার পেশার আশা করতে পারে, কিন্তু অধিকাংশের সামনে অপেক্ষা করছে নিম্নমুখী সামাজিক গতিশীলতা, কম মজুরির অফিসকাজ, অনিশ্চিত পরিষেবা খাত, বেকারত্ব বা সরাসরি প্রলেতারীয় কর্মসংস্থান। যদি এটাই অধিকাংশ তরুণের ভবিষ্যৎ হয়, তবে কেন বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বুর্জোয়া মতাদর্শে দীক্ষিত হওয়া ও বাজারে অপ্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করা? বরং এখনই একটি বাস্তব দক্ষতা অর্জন করে শ্রমিকশ্রেণির কৌশলগত খাতে প্রবেশ করা অধিক যুক্তিসঙ্গত। বিশেষত যখন বহু দেশে দক্ষ কারিগরি ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর ঘাটতি রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে তরুণ কমিউনিস্টদের সামনে প্রশ্ন দাঁড়ায়: তারা কি অধিকাংশ সমবয়সীদের মতো প্রলেতারীয় ভবিষ্যৎকে গ্রহণ করবে, নাকি সঙ্কুচিত মধ্যবিত্ত পেশার জগতে প্রবেশের আশায় স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটবে? দ্বিতীয় পথটি কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, কিন্তু শ্রমিকশ্রেণির নতুন প্রজন্মকে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করতে হলে প্রথম পথটি অপরিহার্য। সেই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনগুলির পুনর্গঠনও জরুরি। একদিকে আমলাতান্ত্রিক ও অকার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন, অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন ও সীমাবদ্ধ স্বতঃস্ফূর্ততা, আর বহু খাতে ইউনিয়নের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন তরুণ বিপ্লবী ক্যাডার, যারা ইউনিয়ন শক্তিকে পুনর্নির্মাণ করবে, আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়বে এবং একই সঙ্গে অতিবামপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদ ও প্রতিস্থাপনবাদের বিরোধিতা করবে। বর্তমান আপোষকামী নেতৃত্বের পরিবর্তে দরকার নতুন সংগ্রামী ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ব।

শ্রমিক হওয়া কোনো নৈতিক প্রশ্ন নয়; শ্রমিক হওয়া কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রেণিসচেতন বা উত্তম মানুষ বানায় না। কিন্তু এটি একজনের জীবনকে শ্রমিকশ্রেণির ভাগ্য ও সংগ্রামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত করে। শ্রমিকের ব্যক্তিগত অবস্থার উন্নতি সমগ্র শ্রেণির অবস্থার উন্নতির ওপর নির্ভরশীল, আর শ্রেণির পরাজয় তার নিজের পরাজয়ও বটে। কর্মক্ষেত্রের বাস্তব সমস্যার সমাধান না দিয়ে কোনো কমিউনিস্ট সহকর্মীদের প্রভাবিত করতে পারে না। শ্রমিকশ্রেণির বাস্তবতা ও চেতনার সঙ্গে এই সংযোগ ব্যক্তি কমিউনিস্টের জন্য যেমন জরুরি, তেমনি একটি কমিউনিস্ট দলের জন্যও অপরিহার্য।

মার্কসবাদীদের মতে সামাজিক অস্তিত্বই চেতনাকে নির্ধারণ করে। এর অর্থ এই নয় যে শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গে জৈবিকভাবে যুক্ত একটি দল সব প্রশ্নে সঠিক হবে; কিন্তু শ্রমিকশ্রেণির জীবন, অভিজ্ঞতা ও চেতনার সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্কহীন কোনো দল তাদের সংগ্রামে বাস্তব নেতৃত্ব দিতে পারে না। শ্রমিকদের যেমন নেতৃত্বের জন্য দলের প্রয়োজন, তেমনি দলকেও বস্তুগত বাস্তবতা ও প্রলেতারীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত থাকতে শ্রমিকদের প্রয়োজন। শ্রমিকদের বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে অতিদক্ষিণপন্থী প্রভাববৃদ্ধির মোকাবিলা করাও সম্ভব নয়; প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে তাদের কর্মক্ষেত্রেই রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে, আরামকেদারায় বসে নয়।

সবশেষে আইসিএল যুক্তি দেয় যে কমিউনিস্ট হওয়া কেবল একটি বৌদ্ধিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি বস্তুগত ও সামাজিক অঙ্গীকার। প্রত্যেক বিপ্লবীকেই নিজের পারিবারিক প্রত্যাশা, সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে হয়। কমিউনিস্ট শ্রমিক হওয়ার সিদ্ধান্ত জীবিকা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে একসূত্রে বেঁধে দেয়; এটি পাতি-বুর্জোয়া পেশাগত আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করে নিজের ভবিষ্যৎকে শ্রমিকশ্রেণির ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত। যারা সামাজিক উত্তরণের প্রত্যাশা নিয়ে বড় হয়েছে, তাদের কাছে অনেক সময় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার চেয়ে শ্রমিক হওয়া বেশি কঠিন। কিন্তু যদি শ্রমিকদের মধ্যে বাস করে কাজ করাই অসহনীয় মনে হয়, তবে সংকট, যুদ্ধ ও বিপ্লবের সময়ে তাদের জন্য সংগ্রাম করার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? আইসিএলের মতে আজকের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো সংগ্রামে পরীক্ষিত এক নতুন শ্রমিক-ক্যাডার বাহিনী, এবং শ্রেণিসংগ্রামের ভেতর মার্কসবাদ প্রয়োগের চেয়ে উত্তম বিপ্লবী শিক্ষা আর নেই।



#যুব_সমাজের_প্রতি_আবেদন #বিপ্লবী_রাজনীতি #শ্রমিকশ্রেণি #আইসিএল #মার্কসবাদ #শ্রেণিসংগ্রাম #ট্রেড_ইউনিয়ন #সামাজিক_সংকট
Sankalpa

About the Author

Sankalpa

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষার্থী

বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast