আরএসএসকে শুধু একটি নির্বাচনী দল বা “হিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন” হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায় না। ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদী আন্দোলনগুলির সাংগঠনিক মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ গড়ে উঠেছিল রাষ্ট্র ও সংসদ-বহির্ভূত, ক্যাডার-ভিত্তিক প্রতিক্রিয়াশীল পেটি বুর্জোয়া সমাবেশ হিসেবে। রাষ্ট্রের পরোক্ষ মদত ও শাসকশ্রেণির প্রশ্রয়ে সমাজের ভিতরে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি গড়ে তোলাই ছিল তাদের প্রধান কৌশল। শাখা, শারীরিক প্রশিক্ষণ, সুশৃঙ্খল ক্যাডার গঠন, সাম্প্রদায়িক প্রচার, ইতিহাস বিকৃতি, মুসলমানবিদ্বেষ এবং “প্রাচীন হিন্দু সমাজ”-এর গৌরব নির্মাণের মাধ্যমে তারা বহু দশক ধরে সমাজে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি বিস্তার করেছে।
এই অতি-দক্ষিণপন্থী শক্তির বিকাশকে নিছক আদর্শগত প্রচার হিসেবেও দেখা যায় না। ভারতীয় পুঁজিবাদের বিকাশ, মধ্যবিত্তের সম্প্রসারণ, পরে তার সংকট, এবং পেটি বুর্জোয়া স্তরগুলির অনিশ্চয়তা ও অবক্ষয়ের সঙ্গে এই রাজনীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত নব্বইয়ের দশকের উদারীকরণের পর স্থায়ী চাকরির পতন, চুক্তিভিত্তিক শ্রমের বিস্তার, কৃষি সংকট, শহুরে অনিশ্চয়তা, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও বেকারত্ব কোটি কোটি যুবকের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। কিন্তু এই ক্ষোভ স্বাধীন শ্রমিকশ্রেণির রাজনীতির দিকে সংগঠিত হয়নি। দীর্ঘ শ্রমিক পশ্চাদপসরণ, ট্রেড ইউনিয়ন আমলাতন্ত্রের আপসকামী ভূমিকা এবং সংসদীয় বামপন্থার দেউলিয়াপনা সেই শূন্যতা তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি নিজেদের “জাতীয় বিকল্প” হিসেবে হাজির করতে পেরেছে। মধ্যবিত্তের বিভিন্ন স্তর ও বড় পুঁজির সমর্থনে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা, ইতিহাস বিকৃতি ও মুসলমানবিদ্বেষ বহুদিন ধরেই মেহনতি মানুষের ঐক্য ভাঙতে এবং শ্রেণিসংগ্রামকে বিভক্ত করতে ব্যবহৃত হয়েছে।
ভারতীয় জনতা পার্টি এই বৃহত্তর সংঘ পরিবারের সংসদীয় শাখা। কিন্তু এই শক্তির প্রভাব শুধু নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক দশকে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পুলিশ, মিডিয়া, বিচারব্যবস্থা, এনজিও ক্ষেত্র এবং তথাকথিত “সিভিল সোসাইটি”-র ভিতরেও দীর্ঘ অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ফলে হিন্দুত্ববাদ ক্রমশ কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, সমাজের দৈনন্দিন সাধারণ জ্ঞানের অংশে পরিণত হচ্ছে। মুসলমান সমাজকে “অনুপ্রবেশকারী”, ভিন্নমতকে “দেশদ্রোহিতা”, এবং সংখ্যাগুরুবাদী আধিপত্যকে “জাতীয় ঐক্য” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা ক্রমেই শক্তিশালী হয়েছে।
বাবরি মসজিদ ধ্বংস, গুজরাত দাঙ্গার মাধ্যমে গণআন্দোলন সমাবেশিত করায় মদত দিয়ে, এখন সরকারি মাধ্যমে NRC-SIR, অগ্নিবীর, অপারেশন কাগার, নয়া শিক্ষানীতি, শ্রম কোড, ক্যাম্পাসে দমনপীড়ন, নজরদারি ও UAPA এনে শাসক শ্রেণি জল মাপছে, পুঁজিবাদের সংকটকে সাধারণ পুলিশি রাষ্ট্রের উপায়ে কতদিন ধারণ করা যায়। কিন্তু ফ্যাসিবাদী সংঘ পরিবারও প্রস্তুত হচ্ছে, সরকারি প্রশ্রয় নিয়েই তারা লাভ জিহাদ, গোরক্ষা, রাম নবমীতে স্থানীয় মসজিদ আক্রমণ, অনুপ্রবেশের জুজু দেখিয়ে ভয়ের সঞ্চার ও একই সাথে এলাকায় এলাকায় শাখা খুলে, আদিবাসী জনজাতির মধ্যে প্রবেশ করে, সরস্বতী বিদ্যালয় চালিয়ে, দুর্গা বাহিনী গড়ে তুলে, অস্ত্র শিক্ষায় ক্যাডারদের মজবুত করে চলেছে। সাম্প্রাদায়িক আক্রমণ শাণিত করছে এলাকায় এলাকায়, হাতে খড়ি হচ্ছে আগামীর ফ্যাসিবাদী সেনাপতিদের। আজ তারা বুলডোজার চালিয়ে ঘরবাড়ি পোড়াচ্ছে, গণপিটুনি ও গণধর্ষণ চালিয়ে খুন করে শক্তি প্রদর্শন করছে। কাল তাদের মিলিশিয়া-বাহিনী আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে পথদাঙ্গায় নামবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে।
ভারতীয় শাসকশ্রেণির একাংশ এখনও সংসদীয় কাঠামো বজায় রেখেই সংকটকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কারণ নির্বাচন, সাংবিধানিক বৈধতা ও “স্থিতিশীল গণতন্ত্র”-এর মুখোশ আন্তর্জাতিক পুঁজি ও কর্পোরেট স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয়। তাই আনুষ্ঠানিক সংসদীয় কাঠামো বজায় থাকলেও রাষ্ট্র ক্রমাগত আরও কর্তৃত্ববাদী চরিত্র নিচ্ছে।
এই জায়গাতেই উদারপন্থী বিরোধিতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। তারা প্রায়শই হিন্দুত্ববাদকে শুধু “সংবিধানের বিচ্যুতি” হিসেবে দেখে, কিন্তু যে পুঁজিবাদী সংকট, সামাজিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণের ভিতরে এই রাজনীতি বেড়ে উঠছে, তাকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়। ফলে তাদের ধর্মনিরপেক্ষতা প্রায়শই আদালতের আবেদন, নির্বাচনী জোট বা নৈতিক নিন্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াকে স্থায়ীভাবে পরাজিত করা সম্ভব নয়, যদি সেই সামাজিক ভিত্তিগুলি অক্ষত থাকে যার উপর তা দাঁড়িয়ে আছে।
এই কারণেই প্রশ্ন শুধু “গণতন্ত্র রক্ষা”-র নয়। প্রশ্ন হল কোন সামাজিক শক্তি সমাজকে পুনর্গঠন করবে। খণ্ডিত, বিচ্ছিন্ন, হতাশ মধ্যবিত্ত জনগণকে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সংগঠিত করবে, নাকি শ্রমিকশ্রেণির স্বাধীন রাজনীতি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের নেতৃত্ব দিতে পারবে।
আজকের ভারতীয় সমাজে মধ্যবিত্তের গভীর অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। একজন গিগ শ্রমিক জানেন যে কাল তার অ্যাকাউন্ট ব্লক হতে পারে, চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক জানেন তার চাকরি স্থায়ী নয়, কলেজপাশ যুবক জানেন ডিগ্রি থাকলেও কাজ নেই। এই অবস্থায় পুঁজিবাদী বাস্তবতায় গড়ে ওঠা একজন ব্যক্তি প্রথমে নিজের টিকে থাকা নিয়েই চিন্তা করবে, এটাই স্বাভাবিক। আর এই বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই ফ্যাসিবাদ অন্তর্ভুক্তি, শৃঙ্খলা ও সম্মিলিত পরিচয়ের এক প্রতিক্রিয়াশীল বিকল্প হাজির করে— “তুমি একা নও, তুমি বৃহত্তর হিন্দু জাতির অংশ।”
তাই শিক্ষার্থী-যুবদের কাজ কেবল প্রতীকী প্রতিবাদ বা অনলাইন প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংগঠন, ক্যাডার গঠন এবং শ্রেণিভিত্তিক সংহতি। কারণ ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি ধৈর্যের সঙ্গে নিজেদের সংগঠন ও প্রভাব বিস্তার করছে, অথচ তার বিরোধিতা প্রায়শই স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ বা নির্বাচনী মৌসুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
এই জায়গাতেই বিপ্লবী লেনিনবাদী-ত্রৎস্কিবাদী রাজনীতির প্রশ্ন আসে। স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ বা উদারপন্থী নাগরিক সমাজের সংহতি দিয়ে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনকে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন একটি বিপ্লবী শ্রমিক পার্টির, যা কারখানার প্রলেতারিয়েত ও বৃহত্তর শ্রমজীবী জনগণের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। কারণ শেষ পর্যন্ত উৎপাদন, পরিবহন, লজিস্টিক, বন্দর ও টেলিকম—সমাজের সামগ্রিক কাঠামো শ্রমিকশ্রেণির শ্রমের উপরই দাঁড়িয়ে।
কিন্তু এই কাজ শুধুই বিপ্লবী বুলি আওড়ে সম্ভব নয়। ভারতীয় শ্রমিকশ্রেণি আজ খণ্ডিত, অসংগঠিত এবং জাতপাত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনে আক্রান্ত। তাই প্রয়োজন ধৈর্যশীল রাজনৈতিক কাজ, অগ্রণী শ্রমিক ও রাজনীতি-সচেতন যুবকদের কেন্দ্র গড়ে তোলা, কর্মক্ষেত্রের দৈনন্দিন লড়াইয়ে অংশ নেওয়া, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে শ্রেণি ঐক্য নির্মাণ করা, এবং বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত সংগ্রামগুলিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা।
আজকের পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক বিপ্লবী উত্থানের নয়। কিন্তু সংকট ও মেরুকরণ ক্রমশ বাড়ছে। তাই সময়ের দাবি হল শ্রমিক-কৃষক-শিক্ষার্থী-যুবদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিপ্লবী সংগঠন নির্মাণের ধৈর্যশীল রাজনৈতিক কর্তব্যকে সামনে আনা।
প্রথম প্রকাশিত: নয়া দিশা পত্রিকা'র ফেসবুক পেজে
About the Author
Sankalpa
মজদুরের নিয়মিত লেখকশিক্ষার্থী
বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন