০৪. ০৭. ১৯৮২
সাবাত, বৈরুত
প্রিয়তমা রাইসা,
কেমন আছো? আমি ভালো আছি। যুদ্ধ শুরু হয়েছে দু বছর হলো। এই প্রথম তোমাকে চিঠি লেখা। প্রতিদিন তোমাকে মনে পরে। যখন সূর্য উদিত হয় আবার যখন সূর্য অস্ত যায়। মনে পড়ে আমাদের বৈরুত এর কথা। যেখানে আমরা স্কুল থেকে ফিরতাম। একসাথে বৃষ্টিতে ভিজতাম । এরপর দাদিমা আমাদের বকতো। কেন বৃষ্টিতে ভিজি। বৃষ্টি অনেকদিন পর পর হয়। তাও দাদিমা আমাদের ভিজতে দিত না। কেন বল তো? হয়তো আমাদের শরীরে অসুখ হবে বলে। কিন্তু যে অসুখের ভএ আমাদের তিনি বৃষ্টিতে ভিজতে দিতেন না। সেই বৃষ্টিতে প্রতিদিন ভিজে কত শিশুকে চোখের সামনে মারা যেতে দেখি তা বলার ভাষা নেই।
বাচ্চাগুলো মাএর কোলে মাথা রেখে জ্বরের ঘোরে আবোল তাবোল বকে। এরপর কথার গতি ধিরে ধিরে কমে যায়। এরপর শেষ নিশ্বাসও তারা গ্রহণ করে। এখানে আমি কোন আদর্শ খুঁজে পাই না। ছোট ছোট শিশুগুলো তো বড় হয়ে চাইলেই নিজ ইচ্ছাতে খ্রীষ্টান অথবা মুসলিম হতে পারে। কিন্তু তাও তাদের মরতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
মনে আছে রাইসা? তোমার বাবা যখন ফিলিস্তিন থেকে ফিরে এসে দেখলো তোমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমি হলাম খ্রীষ্টান। তখন তিনি খেপে গেলেন। সেদিন খুব ভএ পেয়েছিলাম। কিসের ভয় জানি না। হএতো তোমাকে হারানোর ভয়। কিংবা এই জীবনে প্রথম বিচ্ছেদ এর ভএ। তাও আমরা গোপনে বন্ধু ছিলাম। ক্লাস নাইনে উঠে তা হএ দারালো প্রণএ। আমি তোমাকে পেলাম তুমি আমাকে পেলে। কিন্তু আজ আমরা বিচ্ছিন্ন। আমি স্বপ্ন দেখি আমাদের বিএ হবে স্বাধীন ফিলিস্তিনে। যেখানে হাইফার রাস্তায় ক্রিকেট খেলবে আমাদের ছেলে।
ইদানিং আমার অনেক একাকী লাগে। যুদ্ধের ময়দানে বন্দি এক ইহুদি সাইক্রেটিসট দেখিয়েছি। তিনি বলছেন আমার মনের অবস্থা বেশি ভালো না। যুদ্ধ আমাকে দিন দিন কঠোর করে দিচ্ছে। কোন কারণ ছাড়াই রেগে যাচ্ছি। জানি না কেনো। হয়তো প্রতিদিন রাস্তায় শিশুদের মাথার খুলি থেকে বের হয়ে যাওয়া মস্তিষ্ক দেখি বলে। লাশের গন্ধ শুকতে শুকতে আমার শ্রবণ শক্তি কমে যাচ্ছে।
গতকাল আমরা একটি ভবনে অভিযান পরিচালনা করি। সেখানে ৫ জন এর একটি স্নাইপার টিম ঘাটি গেরে বসেছিল। প্রাএ ৮ টি অভিযান চালিয়েও পতন ঘটানো যাএনি সে ঘাটির। কারন সে ঘাটির কাছাকাছি আসতেই পাওয়া যায় লাশের গন্ধ। পচে যাওয়া লাশ। তারা প্রাএ দুই মাস ধরে এখানে অবস্থান করছিল। তাদের সামনের পথ দিয়ে যেই যেত তার মস্তিষ্কে খুব সুন্দর টার্গেট করে তারা হত্যা করতো। আমি সেখানে ২ মাস এর শিশুর এমনও মাথা দেখেছি যার এক দিকে গুলির পেছন ও অন্য দিকে গুলির সামনের অংশ লেগে আছে। সেই নরপশুদের আমরা শেষ করেছি।
সাবাত ক্যাম্পে খাবার অনেক কম। মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে। আমরা দিনে দুই টুকরো রুটি ও লাশ পচা পানি খেএ দিন কাটাচ্ছি। এই খাবার নিয়েও তামাশা করছে খ্রীষ্টান সেনারা। তারা রাতের বেলা সূরঙগ দিএ বিষ মেশানো টিনের খাবার ফেলে যায় সেই খাবার খেয়ে কোন শিশুই বাঁচতে পারে না। তাও তারা সেই খাবার খেতে চাএ। কারন তাদের খুধার চাইতে মৃত্যু ভালো। আমাদের সেই খাবার ধংস করতে গিয়ে জনতার উপর লাঠিচার্জ পর্যন্ত করতে হয়েছে। জানি না আমরা আর কতদিন এভাবে বাঁচবো। দূর থেকে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। কমান্ডার এর কাছে এই মাত্র খবর এসেছে দক্ষিণ-পশ্চিম বৈরুত এর একটি ভবন এখন আমাদের দখলে।
প্রিয়তমা, এই চিঠি পাঠানোর আগের ৩ ঘন্টা আগ পর্যন্ত আমি জানতাম না যে তুমি বেচেঁ আছো। যে ছেলেটি তোমাকে চিঠিটি দেবে তার নাম সালাম। তাকে তুমি একটু ভর পেট খাইএ দিও।ছেলেটা ভালো। বাবা মা নেই।
প্রিয়তমা, তোমার কথা অনেক মনে পড়ে। মনে পড়ে তোমার সাথে করা খুনসুটিগুলো। বিকেলবেলা দেখা করার সময় তোমার কানে গোলাপ গুঁজে দিতাম। সেই গোলাপ থেকে এক অনবদ্য সুবাষ বের হতো। সেই গোলাপ এর সুবাষ কি পাবো?
প্রিয়তমা, তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করো। আমি তোমার কাছে আসবো। নিশ্চই আসবো। এবং মনে রেখো আমার জন্য কিন্তু সাচ্চা পোলাও রান্না করে রাখতে হবে।
তোমার প্রিয়তম,
জর্ডান
নাম : একটি চিঠি
ধরন : চিঠি বা ছোট গল্প
লেখক : সাদাত রামীন আহমেদ
বএস : ১৩
About the Author
Sadat Rameen Ahmed
একজন অ্যানারকো কমিউনিস্ট বিপ্লবী । এছাড়া নগন্য পরিচয় : ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, লেখক ও কবি
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন