বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী তাঁদের অন্যতম। তিনি যেমন ছিলেন একজন আলেম, তেমনি ছিলেন কৃষক-শ্রমিকের অকুতোভয় নেতা। তিনি যেমন ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী ছিলেন, তেমনি অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন। এই কারণেই ভাসানীর রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সমাজতন্ত্রের প্রশ্নটি অবধারিতভাবেই সামনে আসে।
সমাজতন্ত্র বলতে অনেকেই কেবল মার্ক্সবাদ কিংবা কমিউনিজমকে বোঝেন। কিন্তু ভাসানীর সমাজতন্ত্র ছিল ভিন্ন ধরনের। তিনি এমন একটি সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে সম্পদের ওপর কয়েকজন মানুষের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, কৃষক ও শ্রমিক তাদের ন্যায্য অধিকার পাবে, রাষ্ট্র হবে সাধারণ মানুষের কল্যাণের হাতিয়ার এবং শোষণ হবে অতীতের বিষয়।
ভাসানীর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল গ্রামীণ বাংলাদেশ। তিনি বুঝেছিলেন, কৃষকের দারিদ্র্য দূর না করে কিংবা শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না করে কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি বারবার ভূমি সংস্কার, ন্যায্যমূল্য, শ্রমিকের অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছেন। তাঁর রাজনীতি ছিল ক্ষমতার জন্য নয়, বরং বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।
অনেকে প্রশ্ন করেন, একজন ধর্মীয় নেতা কীভাবে সমাজতন্ত্রের কথা বললেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে। ভাসানী মনে করতেন, ইসলামের মূল শিক্ষা হলো ন্যায়, সাম্য, দরিদ্রের অধিকার এবং সম্পদের সামাজিক দায়বদ্ধতা। যাকাত, সদকা কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে শিক্ষা ইসলাম দেয়, তা শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। তাই তিনি ধর্মকে সমাজতন্ত্রের প্রতিপক্ষ নয়, বরং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার নৈতিক ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন।
তবে ভাসানীকে কঠোর অর্থে মার্ক্সবাদী বলা যায় না। তিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তির সম্পূর্ণ বিলোপ কিংবা একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন না। আবার সীমাহীন পুঁজিবাদ এবং ধনসম্পদের কেন্দ্রীভবনেরও বিরোধিতা করেছেন। তাঁর সমাজতন্ত্র ছিল মানুষের মর্যাদা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং সামাজিক সমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি মানবিক দর্শন।
আজকের বাংলাদেশে যখন ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়ছে, শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে এবং অর্থনীতিতে অসমতা প্রকট হচ্ছে, তখন ভাসানীর চিন্তাধারা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট, রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষও ভোগ করতে পারে। কেবল জিডিপি বৃদ্ধি বা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়, উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত মানুষের জীবনমান, অধিকার এবং মর্যাদা।
মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজতন্ত্র কেবল একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব নয়; এটি শোষণ, বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে একটি নৈতিক অবস্থানও হতে পারে। তাঁর সমাজতন্ত্র ছিল মানুষের জন্য, ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিবেদিত।
About the Author
RAJIN AHAMMED SAMI
মজদুরের নিয়মিত লেখকপ্রগতিশীল লেখক ও এক্টিভিস্ট
কলম ধরেছি অবহেলিতের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। নীরব মানুষের কথা বলাই আমার দায়িত্ব।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন