সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

চা বাগানের ছবির আড়ালে যে জীবন

পৃথিবীর সবচেয়ে তিতা স্বাদ সম্ভবত চা-পাতার নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে তিতা স্বাদ হলো অপেক্ষা। যে অপেক্ষায় একজন মা সারাজীবন কাটিয়ে দেন, আর যার কোনো শেষ খবর কখনো আসে না।

Nusrat Rusha
পড়তে 4 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 409 বার পড়েছে
চা বাগানের ছবির আড়ালে যে জীবন

অনেক দিন ধরেই কিছু লিখতে ইচ্ছে করে না। কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। এমনকি ক্যামেরাটা হাতে নিলেও মনে হয়, ছবি তুলে আর কী হবে? পৃথিবীর এত সৌন্দর্য দেখেও তো মানুষের দুঃখের শেষ দেখি না।

আজ দুপুরে নব্বইয়ের দশকের একটি নাটক দেখছিলাম। শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানে শুটিং করা। পর্দাজুড়ে সবুজ ঢেউ, কুয়াশার মতো আলো, দূরের টিলা আর নির্জন পথ। নাটক দেখতে দেখতে হঠাৎ বহু বছর আগের একটি বিকেল মনে পড়ে গেল।

তখন কলেজে পড়ি। পড়াশোনার চাপ, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা আর অকারণ এক বিষণ্নতায় একদিন চলে গিয়েছিলাম মৌলভীবাজারে। লাউয়াছড়ি, রাবার বাগান ঘুরে বিকেলের দিকে খুঁজতে বের হলাম একটি অচেনা জায়গা। কোনো ভ্রমণ বইয়ে তার কথা পড়েছিলাম। তখনও জায়গাটি পর্যটকদের কাছে পরিচিত নয়।

মানুষকে জিজ্ঞেস করতে করতে যখন লেকটির কাছে পৌঁছালাম, মনে হলো হঠাৎ কোনো স্বপ্নের ভেতরে ঢুকে পড়েছি।

নির্জন একটি লেক। চারদিকে চা-বাগান। টিলা ঘেরা শান্ত জল। জলের বুকজুড়ে শাপলা। বাতাসে অদ্ভুত এক নীরবতা। পৃথিবীর সমস্ত শব্দ যেন সেখানে এসে থেমে গেছে।

আমি একা বসে ছিলাম লেকের ধারে। ঠিক তখনই একটি কিশোর এসে বলল,

— আপুআমি গাইড। আপনাকে জায়গাটা ঘুরে দেখাই?”

তার নাম তখন জানতাম না।

সে আমাকে একটি উঁচু টিলায় নিয়ে গেল। দূরে আঙুল তুলে দেখাল আসামের পাহাড়। তারপর চা-বাগানের ভেতরের আরো অনেক অচেনা পথ। সেদিন আমাদের তেমন কোনো কথা হয়নি।

তারপর কেটে গেল তিন বছর।

আবার একদিন ফিরে গেলাম সেই লেকের কাছে। আশ্চর্যের বিষয়, আবারও দেখা হয়ে গেল সেই ছেলেটার সঙ্গে। এবার তার নাম জানলাম সবুজ

সবুজের মা চা-বাগানে কাজ করেন। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চা-পাতা তোলেন। দিন শেষে মজুরি পান ৮০ টাকা। সবুজ গল্প করতে করতে বলছিল তাদের জীবনের কথা।

সেদিন প্রথম বুঝলাম, যে চা আমরা আরাম করে কাপভর্তি পান করি, তার পেছনে কত মানুষের ঘাম, ক্ষুধা আর দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে থাকে।

সবুজ বলল, তার মা প্রতিদিন দশ কিলোমিটার হেঁটে কাজে যান। সবসময় ভাতের সঙ্গে কচি চা-পাতা আর লবণ মেখে খেয়েই দিন কাটে।

কথা বলতে বলতে সে কয়েকটি কচি চা-পাতা ছিঁড়ে এনে হাতে মাখল।

— খান আপুআমরা এভাবেই খাই।

আমি মুখে দিলাম।

প্রচণ্ড তিতা।

মুহূর্তেই ফেলে দিতে ইচ্ছে হলো।

কিন্তু তখন মনে হলো, এই তিতা স্বাদই তো তাদের জীবন। যে স্বাদ তারা প্রতিদিন গিলে খায়, আমরা শুধু গল্প হিসেবে শুনি।

পরে আরেকজন শ্রমিক এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। তিনি অনেক ঘটনা বললেন। তার মধ্যে একটি ঘটনা আজও ভুলতে পারিনি।

একজন শ্রমিকের পা বাগানের ট্রাক্টরের নিচে চলে গিয়েছিল। হাসপাতালে নিতে হয়েছিল ৭৮ কিলোমিটার দূরে। তার চিকিৎসার জন্য শ্রমিকদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার জন্য মাত্র ১৪ হাজার টাকা দিয়েছিল, তা দিয়ে চিকিৎসা সম্ভব হয়নি।

শেষ পর্যন্ত মানুষটি একটি পা হারিয়েছিলেন।

দূরে তখনও তাকে ভিক্ষা করতে দেখা যেত।

আমি অসহায় হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম,

— আপনারা শহরে চলে যান না কেনঅন্য কাজ করেন না কেন?”

তারা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন।

তারপর একজন ধীরে ধীরে বলেছিলেন,

— মাজীবনে গাড়িতে উঠিনি। শহরে গেলে কোথায় যাবকী করবআমরা তো এই বাগান ছাড়া কিছু চিনি না।

সেদিন ফেরার পথে চা-বাগান আগের মতোই সুন্দর ছিল। সূর্যের আলো পাতার ওপর পড়ে ঝলমল করছিল। দূরে টিলাগুলো নীল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

কিন্তু সেই সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে আমার আর ভালো লাগছিল না।

কারণ বুঝতে পেরেছিলাম, প্রকৃতি কখনো কখনো মানুষের দুঃখকে খুব সুন্দর করে ঢেকে রাখে।

বহু বছর পর আবার সেখানে গেলাম।

এবার আর সেই নির্জনতা নেই।

চারদিকে দর্শনার্থীর ভিড়। সেলফি, হাসাহাসি, চিৎকার। যে লেক একদিন নিঃসঙ্গ ছিল, সে আজ বিখ্যাত।

আমি অনেকের কাছে সবুজের খোঁজ করলাম।

অবশেষে জানতে পারলাম, সে নাকি কাজের সন্ধানে চট্টগ্রামে চলে গেছে। তারপর আর কেউ তার খবর জানে না।

শুধু তার মা আছেন।

বয়স এখন আশির কাছাকাছি।

তবুও প্রতিদিন চা-পাতা তোলেন।

একই বাগানে।

হয়তো আজও তিনি অপেক্ষা করেন, কোনো একদিন তার ছেলে ফিরে আসবে।

পৃথিবীর সবচেয়ে তিতা স্বাদ সম্ভবত চা-পাতার নয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে তিতা স্বাদ হলো অপেক্ষা।

যে অপেক্ষায় একজন মা সারাজীবন কাটিয়ে দেন, আর যার কোনো শেষ খবর কখনো আসে না।

লেখা: নুসরাত রুষা, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

#চা_বাগানের_জীবন #চা_শ্রমিক #জীবনসংগ্রাম #মৌলভীবাজার #শ্রীমঙ্গল #বাস্তবতা #মানবিক_গল্প #চা_বাগান
Nusrat Rusha

About the Author

Nusrat Rusha

Student Activist

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast