সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

আমি একজন কমিউনিস্ট

ভাইভা বোর্ডে নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অনৈতিক চাপ ও দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে এই অভিজ্ঞতায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ঘুষ বা উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করে এক অনন্য মানবিক তৃপ্তি পেয়েছেন লেখক। শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে মেহমান আপ্যায়নের প্রথাটি তাকে ব্যথিত করেছে।

Nadira Yeasmin
Nadira Yeasmin মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 5 মিনিট লাগতে পারে 6
এই লেখাটি 296 বার পড়েছে
আমি একজন কমিউনিস্ট

"এতদূর থেকে আসবেন?"

বিভাগীয় প্রধানের কণ্ঠস্বরে নিরুৎসাহ ভাব টের পেয়ে আমার উৎসাহ বরং বেড়ে গেল সেখানে যাওয়ার জন্য!

আমিও দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে উনাকে হতাশ করে বললাম,

"আপা, একদম চিন্তা করবেন না। এতদূর থেকে যেতে আমার কোন সমস্যা হবে না। শুনেছি সেখানে সরকারি রেস্ট হাউজ আছে। আপনি শুধু আগের রাতে সেখানে থাকার জন্য একটা ব্যবস্থা করে রাইখেন। আর কিছু করতে হবে না আমার জন্য।"

এইসব ভাইভায় সাধারণত কলেজের শিক্ষক এবং বাইরে থেকে যাওয়া শিক্ষক উভয় পক্ষেরই একটাই লক্ষ্য ও প্রচেষ্টা থাকে, ছেলেমেয়েরা নিজেদের নামটাও বলতে না পারুক তাতে কিছু আসে যায় না, তাদের ৮০ শতাংশের উপরে নম্বর দিতেই হবে। এইসব কারণে ছেলেমেয়েরা কলেজেও যায় না, ক্লাসও করে না। পড়াশোনার সাথেও তেমন কোন সম্পর্ক থাকে না সারা বছর। পরীক্ষার আগে কেবল গাইড বই কিনে পড়ে গৎবাঁধা কিছু লিখে পাতা ভরে দিয়ে আসে। এতেই অবশ্য কাড়ি কাড়ি নম্বর পেয়ে যায়! আমরাই শিক্ষকরাই সেই নম্বর দেই!

কলেজে পৌঁছেই বুঝলাম, আমাকে নিয়ে কিছুটা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে আছেন উনারা। ভাইভা শুরু করার আগেই আমার সাথে যাওয়া সিনিয়র সহকর্মী ৬০ এর নিচে দেওয়া যাবে না বলে সিলিং দিয়ে দিলেন। উনি আরেকটা মেজাজ খারাপ করা কাজ করে বসলেন! মার্ক শীটটা বিভাগীয় প্রধান আপার কাছে দিয়ে দিলেন!

"আপা, আপনিই নম্বর দিয়েন।"

এসবের জন্য কিছুটা প্রস্তুত ছিলাম।

"এতদূর থেকে এইখানে কি বা**ল ফালাইতাম আইছি?"

নিজেরে মনে মনে কইলাম!

মুহূর্তেই নিজেরে সামলে নিয়ে পাশে বসা আপাকে বললাম, "আপা, আপনি কষ্ট করতে যাবেন কেন? দেন, আমিই নম্বর দেই।"

বলে আলতো করে উনার হাত থেকে নম্বরপত্রটা তুলে নিলাম। এরপর এ ব্যাপারে আর কিছু বলেননি উনি।

ভাইভা শেষে ভাইভা নিতে যাওয়া আমরা দুজন, বিভাগের সব শিক্ষক ও অধ্যক্ষসহ ৮/১০ জনকে কলেজের পাশেই আগেই ব্যবস্থা করে রাখা একটা খাবার হোটেলে দুপুরের খাবারের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। খাবার খেতে অস্বস্তি লাগছিল! দূর থেকে যাওয়া মেহমান হিসেবে আবার না খাওয়াটাও ওদের জন্য অসম্মানজনক হবে ভেবে খেতে হলো। এমনিতেও কোথাও আয়োজন কিংবা দাওয়াত থাকলে মাছ ও মাংস দুইটারই ব্যবস্থা থাকলে সাধারণত মাছই খাই। মাংস খাওয়া হয় না! ওইদিন বুঝতে পারলাম, আমার এই স্বল্পাহার জিনিসটা কতোটা কাজের জিনিস! এজন্য মনে মনে নিজেই নিজেরে একটা ধন্যবাদ দিলাম।

উনারা সর্বোচ্চ যত্ন সহকারে আপ্যায়ন করলেন আমাদের। খাবার শেষে সবাই আবার কলেজে ফিরে গেলাম। কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে সবাই মিলে ছবি তুললাম। কিছুক্ষণ পরে বিভাগে ডেকে নিয়ে বিভাগীয় প্রধান আপা আমার দিকে একটা খাম এগিয়ে দিয়ে দিলেন।

"আপনার যাতায়াত খরচের জন্য সামান্য কিছু টাকা!"

"এই টাকা তো নিতে পারবো না, আপা!"

উনি অবাক হয়ে অসহায়ের মতো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে! চোখে মুখে দুঃশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।কক্ষে থাকা অন্য শিক্ষকদের চোখে মুখেও সেই দুঃশ্চিন্তার সংক্রমণ ঘটে গিয়েছে এরই মধ্যেই! সেটাও মুহূর্তের মধ্যেই টের পেলাম। পরে বিভাগের একজন জুনিয়র অতিথি শিক্ষকের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, এই টাকার অধিকাংশই শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে সংগ্রহ করা হয়েছে! কারণ তাদের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা খুব কম। আরও যেটা জানতে পারলাম, তাদের শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র ৩ জন এমপিওভুক্ত। আর বাকিরা অতিথি শিক্ষক। কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং অতিথি শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে আমার ভালোই ধারণা আছে।

দ্রুত উনাকে আশ্বস্ত করে বলতে হলো,

"প্রশ্নটা টাকার পরিমাণের না, আপা। প্রশ্নটা, এথিকসের। এখানে আসার জন্য আমাকে তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টিএ, ডিএ দেওয়া হবে। তাছাড়া ভাইভা নিতে আসা তো আমার চাকরিরই অংশ!"

এমন কথা যেন উনারা জীবনে এই প্রথম শুনলেন এমনভাবে অবাক হয়ে কক্ষে থাকা সবাই আমার দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন! সবার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে মনে হলো, সেখানে থাকা সবার মুখমণ্ডলে যেন মূহুর্তেই স্বর্গ এসে ভর করেছে। তাদের মুখমণ্ডলে ভর করা স্বর্গ আমাকেও রেহায় দেয়নি। এমন স্বর্গীয় আনন্দ আগে কবে পেয়েছি এবং কাউকে দিতে পেরেছি, মনে পড়ে না! এই সুখ অমূল্য! এই সুখ খামের সেই সামান্য টাকা তো দূর কি বাত, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দিয়েও কেনা সম্ভব নয়! সেদিনের সুখের রেশ আজও টের পাই বুকের গহীনে!

রাতের ট্রেনেই ফিরতে হলো। সেদিন হয়তো পূর্ণিমা ছিল। আকাশে ছিল ভরা চাঁদ! ভরা জোছনা! একা ট্রেনে পশ্চিম দিকে জানালার পাশে বসে বিস্তীর্ণ মাঠ ঘাট পারি দিতে দিতে মনে হচ্ছিল,আজকের চাঁদটা কেবল আমাকেই সঙ্গ দিতে উঠেছে আকাশে। পুরো পথজুড়ে ঝিরঝিরে মিষ্টি হাওয়া কেবল আমারই জন্য বইছে!

জামালপুরবাসী, চাঁদ, প্রান্তর, গাছপালা সবার সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়ে সকালে নরসিংদী ফিরে এলাম। ফেরার পথে বারবার মনে হয়েছিল, আমার পরিচয়টা দেয়া দরকার ছিল! সবার সেই বিহবল মুহূর্তে বলা দরকার ছিল,

"আমি একজন কমিউনিস্ট!"

৬ এপ্রিল, ২০২৪

#আমি_একজন_কমিউনিস্ট #শিক্ষকতা #শিক্ষা_ব্যবস্থা #ভাইভা_বোর্ড #সততা #নৈতিকতা #বাংলাদেশ #শিক্ষক
Nadira Yeasmin

About the Author

Nadira Yeasmin

মজদুরের নিয়মিত লেখক

Teaching

Women's rights activist, Writer, Aditor, Teacher

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

6
RAJIN AHAMMED SAMI ·

আপা, আপনার লেখাগুলো খুবই অসাধারণ লাগে। যদি কখনও সম্ভব হয় আপনার থেকে শিখতে চাই।

Nadira Yeasmin ·

ভালোবাসা নিও। আমি অতি সাধারণ একজন মানুষ। শেখার মতো তেমন কোন গুণ নেই আমার মধ্যে। এরপরও কখনো দেখা হলে, আলাপ হলে আমারও ভালো লাগবে।

Shama M ·

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষকরা নানা টালবাহানা করে প্রতিবছর অনেক টাকা নেয়। বিনিময়ে তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে না। ক্লাস নেয় না, অ্যাসাইনমেন্ট ঠিকমতো করায় না, আবার কোনো স্টুডেন্ট কিছু বলতে গেলে তাকে চরম বকাবকি করে। এদের কেউ জবাবদিহিতার আওতায় আনে না বলে যা ইচ্ছা তাই করে স্টুডেন্টদের সাথে। দিনশেষে বাজারের কিছু থার্ড ক্লাস গাইডবই পড়েই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসতে হয় কারণ পাস তো করতে হবে! ভাইভায় কোনো শিক্ষার্থী খারাপ করলে সেটা ৯০ শতাংশ ওই শিক্ষকদের দোষ। অনেক সম্ভাবনাবান শিক্ষার্থীকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয় এই বিশ্ববিদ্যালয় আর তার শিক্ষকরা।

Nadira Yeasmin ·

নরসিংদী সরকারি কলেজে এইভাবে ছাত্রদের থেকে টাকা নেওয়া বন্ধ করতে অনেক দিন লড়তে হয়েছে আমাকে। শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছিলাম। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ক্লাস হয় না সেজন্য ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েরই দায় রয়েছে। আমাদের বিভাগে আমরা শিক্ষকরা বসে থাকতাম ক্লাস নেওয়ার জন্য, কিন্তু ছেলে মেয়েরা আসতো না। এজন্য অবশ্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো সিস্টেমই দায়ী। বিশেষ করে ইনকোর্স ও উপস্থিতির নম্বর থাকায় পাশ করা অতি সহজ হয়ে যাওয়া এরজন্য অনেকাংশে দায়ী। আরও অনেক ব্যাপার আছে।

mustafa kemal atarturk ·

আপনি একজন মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ .

Nadira Yeasmin ·

ধন্যবাদ। আপনি হয়তো অনেক ভালো একজন মানুষ। সেজন্য আমার মতো সাধারণ একজনের মধ্যেও ভালো কিছু দেখতে পেয়েছেন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast