একসাথে দীর্ঘ জীবন যাপিত হওয়ার পরও কেউ কেউ সামান্য অংশও জানতে পায় না কাছের মানুষটির। কেউ কেউ অবহেলায় পাশ কাটিয়ে যায় বিস্তৃত এক বস্তু জগতকে। আবার কেউ কেউ সামান্য পরিচয়ে, একদেখাতেই পড়ে ফেলতে পারে অবশিষ্ট জীবনটাকেও। মাটির কাছে, বায়ুর কাছে, জলের কাছে কিসের ঘ্রাণ খোঁজে সেই মানুষেরা!কেউ আঁচল বিছিয়ে, পুরুষ ছড়িয়ে হাত, কিসের আহ্বানে সাড়া দিতে ছোটে! দু’হাত উত্তর-দক্ষিণ অথবা পূর্ব-পশ্চিম প্রসারিত করে চোখ-নাকওয়ালা মুখটাকে অনন্ত নীলে সপে দিয়ে মুক্ত বাতাস নিতে নিতে যে মুক্তির স্বাদ অনুভব করে, সমস্ত জীবন-ব্যাপী হয়তো কখনোই সে মুক্তি তার মেলেনি; অথচ কি তৃষ্ণা! এই কি না পাওয়ার বেদনা? যাকে বিরহ বলে! অথচ, মানুষতো নিজেকে নিয়ে বেশ থাকে!
কেউ কেউ বলে এই যে জীবনকে ব্যবচ্ছেদ, এ শুধু শিল্পীরই কাজ! ডাক্তার যেমন মানব দেহের প্রতিটি অঙ্গ কাটা-ছেড়া করে দেখে নেয় দৈহিক যন্ত্রণাকে; বের করে আনে সকল অসুখ এ দেহের। তেমনি শিল্পীতো সেই, যে মানব জীবনটাকে অথবা প্রাণহীন বস্তুকে পরম যত্নে বিশ্লেষণ করে বের করে আনে জীবনের যতো যন্ত্রণা। যার হাত ধরেই জন্ম নেয় পৃথিবীর অদ্ভুত সব ভ্রুণের। কেউ কেউ মাটি চাপা দেয়, কেউ পেলে-পুষে বড় করে তোলে এক অজানা মোহময় সৃষ্টিকে। সৃষ্টির এই যে আনন্দ, এই আনন্দ বা ক’জন উপভোগ করে!
এই উপভোগকারী দলের একজন ‘জাহেদ’। একজন সাধাসিধে স্বাভাবিক জীবনের শিল্পী সত্তায় আবিষ্ট একজন শিল্পী- চিত্র শিল্পী। জীবনের নানা ধাপ-ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে যাকে জীবনকে চিনতে হয়নি; তার পূর্বেই সে শিল্পী হয়েছে। কিন্তু এও সম্ভব! ও’যে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পদবি! তাহলে, পূর্ণতা! কিন্তু, ‘স্ত্রিয়াশ্চরিত্রম দেব ন জানন্তি’- এই নিয়েইতো যতো গন্ডগোল। নারীকে যেন জানতেই হবে, দেবতারা না জানুক, তবু মর্তের পুরুষ জেনে নেবে ও জীবনকে। ভালোবাসবে, সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাবে, গড়ে তুলবে পরিবার, সেখানে আনন্দের খোরাক হবে নতুন আরো দু’একটি জীবন। শিল্পী এইসব বাঁধনে জড়াবে! তার আদর্শ কি বলে? মেনে নেবে তাকে তার বিবেক! কিন্তু ওই যে, ‘প্রেমই স্বর্গ প্রেমই মর্ত্য’!
জাহেদ ভালোবেসে ফেললো ‘ছবি’কে। শহুরে জীবনের ধাচ থেকে সরে থাকা এক গ্রাম্য গড়ণের নারী। যার ছন্দে ছন্দে ভালোবাসার লাবণ্যতা ছড়িয়ে পড়ে সারা ঘর-বাহির। প্রকৃতির সবুজ ঈর্ষায় ছুঁয়ে দেখে তাকে; আর, ‘ছবি’ ছুঁতে চায় কাকে? তার সেই চাওয়া’র কোথাও ‘জাহেদে’র নামটি কি আছে! যদি নাইবা থাকবে, তাহলে কেনো এতো ভয়, আবদ্ধ হতে বন্ধনে! কেনো বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে জীবনের শতো ক্ষত-দুঃখ মুছে দিলো জলে! একদিকে আত্মভোলা এক শিল্পীর বোন, যে শিল্পীরও তার স্ত্রী, সন্তানের সাথে যোজন-যোজন দূরত্ব, আর অন্যদিকে ভালোবাসা।
তবু, দু’জন দু’জনার হলো! ছবি আর জাহেদ; জাহেদ আর ছবি। শিল্পী তার কল্পনায় সাজানো সেই নারী মূর্তির প্রতিটি ভাজ আজ দৃষ্টিতে এঁকে নেবে বসিয়ে রাখা মনের ক্যানভাসে। সেখানে নারী’র একটি তিলও যেন বাদ না থেকে যায়। দেহের প্রতিটি রেখায় জাহেদ ছুঁয়ে দেখতে চায়। এই কয়েকমাসের ভালোবাসার কালে জাহেদতো এই চেয়েছে। সেতো মুজতবার মতো নয়, যে কিনা পতিতালয়ে ‘রাধা’র প্রতিটি লোমকূপেরও খবর রাখে। হয়তো মুজতবা অনেক বড় শিল্পী, হিংসুক, একরোখা, যার ট্রাঙ্ক ভর্তি উলঙ্গ নারীর প্রতিমূর্তি; কিন্তু সে জাহেদের ভালোবাসার কি বুঝবে! জাহেদতো শুধু এই জানে- ‘..নারীর দেহ বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি; কবিতার চিত্রে সঙ্গীতে ভাস্কর্যে তার স্তবগাথা মনে মায়াজালের বিস্তার করে।..’
অবশেষে ছবি সবকিছু খুলে বললো জাহেদকে। কিভাবে পেটে সন্তান এসেছিলো, কেনো অন্ধকার ছিঁড়ে সন্তানের ডাক শুনতো, চারপাশের দুনিয়া জুড়ে শুধু বাচ্চার প্রতিমূর্তিই কেনো, কেনো জাহেদকে সে সব কথা বলতে পারেণি; কেনো সেদিন ভালোবেসেও জাহেদের ভালোবাসায় সাড়া দেয়নি, কেনো সেদিন বলেছিলো, ‘মিলন হলে ভালোবাসা টেকে না।’ কেনো বলেছিলো- ‘তুমি যদি আমাকে বুঝতে না পারো?’
জাহেদের কি উচিত ছিলো? তার ভয়ঙ্কর-বর্বর পুরুষ চরিত্রটাকে সামনে নিয়ে আসা, না কি তার ভালোবাসাকে আরো বেশি ভালোবাসা, যে ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র খাদ নেই!
জাহেদ এঁকে ফেললো, টুলটুল আর ছবিকে। ছবির কোলে পরম আদরে শুয়ে আছে টুলটুল। হয়তো স্তন মুখে, নয়তো মুখ গুঁজে কোলে। ছবি’র এই ছবিটির নাম দেয়া হলো ‘বসুন্ধরা’ (মাদার আর্থ)। যে ছবিটি কিনা একজিবিশনে ফার্স্ট হয়েছিলো।
জোবেদা খালা, আড্ডার সেই বন্ধুরা, মগ’দের জীবন, ওমন এক মগ নারীকে ধোঁকা দেয়া মুজতবা, সেই পাগলী মগ নারী, যে কিনা সন্তান-স্বামী হারা, দেশে ফেরার কিছু আগে পরিচয় হওয়া সারা আহমেদ, করাচীর দিনগুলো, সবশেষে ফিরে আসা ‘ছবি’ আর টুলটুলের কাছে। কয়েকটি দিন যেন কত সহস্র বছরের কুঁড়ে খেয়েছে জাহেদ’কে। নিজের ভেতরে যেন বুক-গলা ঢুবে হাবুডুবু খাচ্ছিলো জাহেদ। তার ভালোবাসার কাছে যে ফিরতে হবে! আর কতোদূর! কতো দেরি! যে তাকে আগলে রেখেছে পরম যত্নে; তার ছবি, তার সেই ছবি, একান্ত নিজের ভালোবাসা দিয়ে যাকে আগলে রেখেছে এতোগুলো বছর, বাকী জীবন নিয়ে হয়তো জাহেদের কখনো দুঃশ্চিন্তা হয় না। ছবি’র মতো একজন প্রেমিকা থাকতে এতো ভাবে কেউ!
বসুন্ধরার শ্রেষ্ঠ কাহিনী হিসেবে, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত আধুনিক ক্লাসিক উপন্যাস ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্রে’ এই অমোঘ ভালোবাসার চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে, আগুন নেভাবার জল যেমন আছে, তেমনি আগুন জ্বালানোর অক্সিজেনও কম নেই। চিরাচরিত জীবন কাহিনীর সাথে এ অদ্ভুত টান-মমতাকে জুড়ে দেয়া হয়েছে পুরো বইটি জুড়ে।বইটির মুখবন্ধে ‘আলাউদ্দিন আল আজাদ’ নিজেই বলছেন-‘…জাহেদ চরিত্রে লেখকের আত্মাবিলুপ্তি ঘটেছে, জিনিসটি তখন বুঝতে পারিনি।’
[বইটি আলাউদ্দিন আল আজাদে’র প্রথম উপন্যাস। উপন্যাসটি প্রথম ছাপা হয়, ১৯৬০ সালে ‘পদক্ষেপ’ নামক একটি পত্রিকার ঈদ সংখ্যায়; পরবর্তীতে নওরোজ কিতাবিস্তান ১৯৬১ সালে বই আকারে প্রকাশ করে। ১৯৭৭ সালে ‘সুভাষ দত্তে’র পরিচালনায় নির্মিত হয়, এই বইয়ের উপর ভিত্তি করে ‘বসুন্ধরা’ চলচ্চিত্রটি। যেটা ছিলো নায়ক ‘ইলিয়াস কাঞ্চনে’র প্রথম সিনেমা। ১৯৭৭ সালে ‘পোত্রেৎ নমের দুবাতসাৎ ত্রি’ নামে, বুলগেরীয় ভাষায় বইটি অনুবাদ হয়; এছাড়াও আরো কয়েকটি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে বইটি।]
About the Author
Md. Belal Hosain Bidda
মজদুরের নিয়মিত লেখকLawyer
“জীবন যেখানে দ্রোহের প্রতিশব্দ, মৃত্যুই সেখানে শেষ কথা নয়।”
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন