সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

জীবনের রেলগাড়ি

১৪ বছর বয়সে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়া এই বিপ্লবীর, বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে, পাকিস্তান, যুদ্ধকালীন সময়, যুদ্ধপরবর্তী দিনগুলোর নানা ঘটনা, আন্দোলনের খন্ড খন্ড সমষ্টি এই সংগ্রামী স্মৃতিকথা ‘জীবনের রেলগাড়ি’ বইটি।

Md. Belal Hosain Bidda
Md. Belal Hosain Bidda মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 4 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 58 বার পড়েছে
জীবনের রেলগাড়ি

“বৃটিশ শাসনামলেই আমার শ্রমিক আন্দোলনের হাতেখড়ি, ‘লাল ঝান্ডার’ মিছিলে। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত কতো সংগ্রাম, কতো আন্দোলন দেখলাম এ চোখেই। সেসব অভিজ্ঞতার কথা যে একদিন লিখে রাখবো, এ কথা ভাবিনি কখনো।.... আমার স্মৃতি জুড়ে আছে কেবল আন্দোলন, সংগ্রাম আর কারাগারের অন্ধকারময় জীবনের কথা। আছে বৃটিশ আর পাক শাসকদের নিপীড়নের ছবি। সেই সব পীড়নের ব্যথা এতদিন আমার অনুভবের মর্মেই গাঁথা ছিল। লিখে রাখবার মতো ভাষা আমার আয়ত্তে ছিল না।”

সেই সব পীড়নের ব্যথা লিখতে যেয়ে, তিনি বলছেন- “....কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার সারা শরীর আঘাতে রক্তারক্তি হয়ে গেলো। তারপর জেলার সাহেবের হুকুমে আমাকে কয়েদি ফাটকে নিয়ে এসে তোলা হলো সেলে। শুরু হলো অমানুষিক নির্যাতন। সমস্ত কাপড়-চোপড় খুলে নিয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে রাখা হলো। পায়ের নিচে মেঝেতে পানি ঢেলে দেয়া হলো। শীতের দিন। প্রচন্ড ঠান্ডা তার ওপর উদোম গা। হা হা করে কাঁপতে লাগলাম আমি। সারাটা দিনই গেলো এইভাবে। পেটে অসম্ভব ক্ষিদে। জ্বর জ্বর বোধ করতে লাগলাম। কোনো কিছু খেতে দিলো না। জেলারের নির্দেশে আমার দানাপানিও বন্ধ। সিদ্ধান্ত নিলাম, এই অমানুষিকতার প্রতিবাদ করতে হবে। সিদ্ধান্ত নিলাম অনশন করব। যতোক্ষণ না এর (কয়েদিদের দিয়ে জেলে ঘানি টানানো) প্রতিকার হয়, ততোক্ষণে ছোবো না দানাপানি।..... সারাদিন অভুক্ত রইলাম। খাবার ফিরিয়ে দিলাম। সবাই জেনে গেলো চার নম্বর সেলের কয়েদি জসীম মন্ডল অনশন করেছে। দিন গড়িয়ে রাত এলো, আমাকে রাখা হয়েছে তেমনি বিবস্ত্র অবস্থায়। রাত দুটো, আবার সেই যুবক সেপাইটির ডিউটি। আমাকে অনেক সাধ্য সাধনা করলো খাওয়ার জন্য। বললো, ‘রাতে কিছু খেলে তো আর কেউ দেখতে আসছে না। আপনাকে পাউরুটি এনে দিই, খেয়ে নিন। কেউতো জানছে না যে, আপনি মুখে কিছু তুলেছেন।’ বললাম, ‘তা হয় না। কমিউনিস্টরা জীবন গেলেও মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারে না।....”

জসীম মন্ডল স্মৃতিচারণ করছেন- “....কতো লোকের সাথে দেখা হচ্ছে পথে। কতো রকমের জিনিসপত্তর কাঁধে মাথায় করে ছুটছে তারা। দেখলাম, বাবলা গাছের ছায়ায় এক বুড়ি বসে আছে। কোলে কয়েকটা মুরগি আর হাতে একটি ছাগলের দঁড়ি ধরা। শেষ সম্বল যা ছিলো, তাই নিয়েই পথে নেমেছে। অথচ, এখন এতোগুলো প্রানী সঙ্গে নিয়ে পথ চলাই দায় হয়ে উঠেছে। বললাম, ‘বুড়িমা, ঐ ছাগল মুরগির মায়া ত্যাগ করে গাড়িতে উঠে এসে। বুড়ি কিছুতেই গাড়িতে উঠতে রাজি হলো না। .... দেখলাম অদূরের বটগাছের আশেপাশেও বহু পরিবার বসে আছে। ওখানেই একটি হিন্দু পরিবারের দুটি যুবতী মেয়েকে দেখলাম মুখ ঢেকে অঝোর ধারায় কাঁদতে। জিগ্যেস করে জানলাম এখানকারই দুটো ছেলে আসার পথে জোর করে পাটের খেতে নিয়ে গিয়ে ওদের সম্ভ্রম লুটেছে। শুনে আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেলো। প্রতিরোধ বাহিনীর দুজন বন্দুকঅলা ছেলেকে দেখলাম, লোকজনের তদারকিতে ব্যস্ত। ওদের ডেকে জানালাম ঘটনাটা। তখুনি ছেলে দুটোকে খুঁজে বের করলো বন্দুকঅলারা। খালের ধারে বসে ছিলো ব্যাটারা। বললাম, ‘দেশের বিপদের সময় অসহায় নারীদের ওপর যারা পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছে, তারা এদেশের শত্রু ছাড়া আর কিছু নয়। ওদের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দাও, তবে এমন কান্ড আরো ঘটবে।’ বন্দুকঅলা ছেলে দুজনও দেখলাম ওদের কঠিন শাস্তি দিতেই আগ্রহী। ছেলে দুজনকে সামনে দাঁড় করিয়ে ওদের পা লক্ষ্য করে গুলি চালালো। চিরজীবনের মতো পঙ্গু করে দিলো মা বোনের ইজ্জত হরণকারী দুই পশুকে। পরে শুনেছিলাম, যুদ্ধের ন’মাস জুড়ে ওই রাস্তাটিই ছিলো শরণার্থীদের পারাপারের সবচাইতে নিরাপদ জায়গা।..”

১৪ বছর বয়সে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়া এই বিপ্লবীর, বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে, পাকিস্তান, যুদ্ধকালীন সময়, যুদ্ধপরবর্তী দিনগুলোর নানা ঘটনা, আন্দোলনের খন্ড খন্ড সমষ্টি এই সংগ্রামী স্মৃতিকথা ‘জীবনের রেলগাড়ি’ বইটি। ছোট্ট এই বইটিতে তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। ছোট ছোট কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন, পারিবারিক-সাংসারিক জীবনের। বইটির শেষদিকে এসে তিনি লিখছেন- “সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষ প্রান্তে এসে জীবনের পাওয়া-না-পাওয়ার হিসেব মেলাতে গিয়ে দেখি, পাওয়ার পাল্লাটি শূণ্য। বঞ্চনার পাল্লাটি ভারি হয়ে আছে বেশি। তবুও হতাশ হতে মন চায় না। এ যেনো এক কঠিন নেশা, সুতীব্র আকর্ষণ, যা উপেক্ষা করে থাকা কখনো সম্ভব নয়। তাইতো অনাচার-অত্যাচারের প্রতিবাদে এই বয়সেও ছুটি মিছিলে, ঝাঁপিয়ে পড়ি আন্দোলনে। বক্তৃতার ঝড় তুলি সভামঞ্চে। আর যে ক’টা দিন বেঁচে আছি (২ অক্টোবর ২০১৭, তিনি মৃত্যুবরণ করেণ), যতোদিন অচল-অক্ষম না হয়ে পড়ি, ততোদিন অক্ষুন্ন থাকবে জীবনের এই ধারা।”

Md. Belal Hosain Bidda

About the Author

Md. Belal Hosain Bidda

মজদুরের নিয়মিত লেখক

Lawyer

“জীবন যেখানে দ্রোহের প্রতিশব্দ, মৃত্যুই সেখানে শেষ কথা নয়।”

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast