আজ ২৩ জুন। ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর আমবাগানে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, এই বাক্যটি আমরা স্কুলের ইতিহাস বইয়ে অসংখ্যবার পড়েছি। আমাদের শেখানো হয়েছে, মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই আমরা স্বাধীনতা হারিয়েছিলাম।
কিন্তু পলাশীর যুদ্ধ কেবল একজন সেনাপতির বেইমানির গল্প নয়; এটি ছিল বিশ্বের ইতিহাসে একটি বহুজাতিক কর্পোরেশন (Multinational Corporation) কর্তৃক আস্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দখলের প্রথম সফল প্রজেক্ট।
১. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি: ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর কর্পোরেশন
আমরা অনেক সময় ভুলে যাই যে, পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাবের প্রতিপক্ষ ব্রিটিশ সরকার বা ব্রিটেনের রানি ছিলেন না; নবাবের প্রতিপক্ষ ছিল 'ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি' নামের একটি জয়েন্ট স্টক কর্পোরেশন।
তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই ব-দ্বীপের সম্পদ লুণ্ঠন এবং একচেটিয়া বাণিজ্য নিশ্চিত করা। নবাব সিরাজউদ্দৌলা যখন তাদের এই অবাধ ও বেআইনি কর্পোরেট লুটের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন, তখনই তারা নবাবকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে। রবার্ট ক্লাইভ মূলত কোনো সামরিক সেনাপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ধূর্ত কর্পোরেট নেগোশিয়েটর। পলাশী কোনো সামরিক যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল পুঁজির জোরে কেনা একটি সাজানো নাটক।
২. জগৎ শেঠ ও উমিচাঁদ: দেশীয় দালাল পুঁজির (Comprador Bourgeoisie) উত্থান
পলাশীর ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে বড় কুশীলব মীরজাফর একাই ছিলেন না। এর পেছনে কলকাঠি নেড়েছিল তৎকালীন বাংলার বিলিয়নিয়ার বা অলিগার্করা (Oligarchs), যেমন জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফ এবং রায় দুর্লভরা।
মার্ক্সীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলা হয় 'মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি' বা Comprador Bourgeoisie। এই দেশীয় বণিক ও পুঁজিপতিদের কাছে দেশপ্রেমের চেয়ে নিজেদের মুনাফা বড় ছিল। সিরাজউদ্দৌলা তাদের একচেটিয়া দুর্নীতিতে বাধা দিচ্ছিলেন বলে তারা বিদেশি কর্পোরেট পুঁজির (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি) সাথে হাত মেলায়। দেশীয় অভিজাত শ্রেণি ও পুঁজিপতিরা যখন বিদেশি বেনিয়াদের সাথে আঁতাত করে, তখন রাষ্ট্র কীভাবে ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে যায়, পলাশী তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
৩. সাধারণ মানুষের বিচ্ছিন্নতা (Alienation of the Masses)
পলাশীর যুদ্ধের আরেকটি বড় ট্র্যাজেডি হলো সাধারণ মানুষের নীরবতা। সিরাজউদ্দৌলার পতন যখন ঘটছিল, তখন বাংলার সাধারণ কৃষক ও মেহনতি মানুষ ছিল সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক ও জমিদারি শোষণের জাঁতাকলে সাধারণ মানুষ এতটাই পিষ্ট ছিল যে, কে ক্ষমতায় বসল আর কে ক্ষমতা ছাড়ল, তা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না।
রাষ্ট্রের সাথে সাধারণ মানুষের এই যে মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা (Alienation), এটিই ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সবচেয়ে বড় সুবিধা। যে রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের কোনো অধিকার থাকে না, সে রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সাধারণ মানুষ তা রক্ষার জন্য এগিয়ে আসে না।
৪. আধুনিক পলাশী এবং নব্য উপনিবেশবাদ
২৩ জুন কেবল একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, এটি আমাদের বর্তমানের আয়না। আজ হয়তো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নেই, কিন্তু বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা বিশাল বিশাল বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো ঠিক একইভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর পলিসি বা নীতি নিয়ন্ত্রণ করছে।
আজও আমাদের সমাজে আধুনিক 'জগৎ শেঠ' বা 'উমিচাঁদ'রা আছেন, যারা মেহনতি মানুষের ঘামে অর্জিত হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করছেন। আজও নব্য উপনিবেশবাদ (Neo-colonialism) তার নিজস্ব দালালদের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
শেষকথা
পলাশী আমাদের শেখায় যে, কেবল বাইরের শত্রু দিয়ে কখনো একটি রাষ্ট্র ধ্বংস করা যায় না। রাষ্ট্র ধ্বংস হয় তখন, যখন রাষ্ট্রের ভেতরের সুবিধাভোগী, পুঁজিপতি এবং আমলারা নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থের জন্য বিদেশি শক্তির কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়। তাই ২৩ জুনের ইতিহাস পাঠ কেবল মীরজাফরকে গালমন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; আমাদের চিনতে হবে আজকের দিনের নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং তাদের এদেশীয় দালালদের।
লেখক: আতিকুর রহমান | শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ | রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
About the Author
আতিকুর রহমান অন্তর
মজদুরের নিয়মিত লেখকলেখক এবং ডিজিটাল মার্কেটিং প্রফেশনাল
আমি আতিকুর রহমান অন্তর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী। রাষ্ট্র, সমাজ, লোকসংস্কৃতি, ধর্ম ও সাহিত্য নিয়ে মুক্তালাপ করতে আমি ভালোবাসি। প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করাই আমার লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন