সময়টা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস। আমি তখন সদ্য এইচএসসি পাস করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রস্তুতির জন্য সেসময় বগুড়া শহরে থাকি। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির তুমুল চাপ, অন্যদিকে নতুন কিছু জানার প্রবল কৌতূহল। শীতের এক সন্ধ্যায় আমি আর এক বড় ভাই হাঁটছিলাম বগুড়ার বিখ্যাত সাতমাথা হয়ে, কমিউনিস্ট পার্টির অফিসের সামনের রাস্তা দিয়ে। সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম এসব শব্দের সাথে আমার তখন সদ্যই পরিচয় ঘটতে শুরু করেছে। সেই বয়সের স্বাভাবিক রোমাঞ্চ নিয়ে আমি আর বড় ভাই তুমুল আড্ডায় মেতে আছি। আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু কখনো কিউবান বিপ্লব, কখনো মাও সে-তুং, আবার কখনো কার্ল মার্ক্সের প্রাথমিক তত্ত্বগুলো। নতুন এক আদর্শ আবিষ্কার করার উত্তেজনায় আমরা তখন চারপাশের কনকনে শীতকেও যেন ভুলে গিয়েছিলাম।
হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা দূরে এসেছি, হঠাৎ পেছন থেকে এক ভদ্রলোক আমাদের ডাক দিলেন। তিনি বসে ছিলেন রাস্তার পাশের একটি সাধারণ চায়ের দোকানে। বয়স আনুমানিক ৫০ থেকে ৫৫ বছরের কাছাকাছি। পরনে একদমই সাদামাটা পোশাক, চেহারায় বয়সের ছাপ, কিন্তু চোখেমুখে অদ্ভুত এক দীপ্তি। আমরা একটু অবাক হয়েই তার কাছে গেলাম। তিনি আমাদের আপাদমস্তক দেখলেন। তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা আমি আজও ভুলতে পারিনি। তিনি খুব শান্ত, অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
তোমরাই তো ওড়াবা বিপ্লবের লাল পতাকা।
আমি চমকে উঠলাম! একজন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ, যার সাথে আমাদের কোনো দিন দেখা হয়নি, তিনি আমাদের কয়েকটা কথা শুনেই এত বড় একটা স্বপ্নের কথা বলে ফেললেন! এরপর তিনি আরও কিছুক্ষণ কথা বললেন। খুব সাধারণ ভাষায় শোনালেন তার স্বপ্নের কথা, একটি বৈষম্যহীন সাম্যবাদী সমাজের কথা। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা শুনলাম। চা শেষ করে একসময় তিনি তার গন্তব্যে চলে গেলেন।
কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পর আমার মাথার ভেতর একগাদা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করল। এই লোকটার এই বয়সে এসে এসব করে লাভ কী? কীসের আশায় তিনি এখনো সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেন? তাও আবার এই বাংলাদেশের মতো একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে চারদিকে চরম লুটপাট আর পুঁজিবাদের জয়জয়কার! যেখানে প্রতিদিন সমাজতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা বাজানো হয়, সেখানে এই মধ্যবয়সী সাধারণ লোকটা কার জন্য এই লাল পতাকার স্বপ্ন বুকে আগলে রেখেছেন?
সেদিন এর উত্তর আমার কাছে ছিল না।
আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সাথে যুক্ত নই। কিন্তু আজ যখন আমি সমাজ, রাষ্ট্র আর ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে শিখেছি, তখন বগুড়ার সাতমাথার সেই চায়ের দোকানের প্রবীণ মানুষটির চোখের ভাষা আমি পড়তে পারি। সমাজতন্ত্র বা বিপ্লব আসলে কোনো লটারির টিকিট নয় যে রাতারাতি ড্র হবে আর সব বদলে যাবে। এটি মূলত একটি দীর্ঘ 'রিলে রেস'।
সেই প্রবীণ মানুষটি হয়তো খুব ভালো করেই জানতেন যে তার জীবদ্দশায় তিনি সাম্যবাদী সমাজ দেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু তাতে তার কোনো হতাশা ছিল না। তিনি জানতেন, তার কাজ কেবল স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখা। পুঁজিবাদ আমাদের শেখায় কেবল নিজের লাভের কথা ভাবতে "আমার কী লাভ?" কিন্তু ওই প্রবীণ মানুষটি আমাদের শিখিয়েছিলেন সামষ্টিক স্বপ্নের কথা। তিনি জানতেন, তার একার পক্ষে সমাজ বদলানো সম্ভব নয়, তাই তিনি তার জীবনের লালিত স্বপ্নটা অত্যন্ত পরম মমতায় আমাদের মতো সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণদের কাঁধে তুলে দিয়ে যাচ্ছিলেন।
সেদিন ডিসেম্বরের সেই সন্ধ্যায় আমি কেবল সমাজতন্ত্রের কোনো তাত্ত্বিক গল্প শুনিনি; আমি আসলে একটি প্রজন্মের হাত থেকে আরেকটি প্রজন্মের কাছে স্বপ্নের হস্তান্তর দেখেছিলাম। আমি দেখেছিলাম, শত প্রতিকূলতা আর ব্যর্থতার পরও মানুষের মুক্তির লড়াই কীভাবে নীরবে বেঁচে থাকে সাধারণ মানুষের চায়ের কাপে, ধুলোমাখা রাস্তায় আর নতুন প্রজন্মের চোখে।
লেখক: আতিকুর রহমান অন্তর, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
About the Author
আতিকুর রহমান অন্তর
মজদুরের নিয়মিত লেখকলেখক এবং ডিজিটাল মার্কেটিং প্রফেশনাল
আমি আতিকুর রহমান অন্তর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী। রাষ্ট্র, সমাজ, লোকসংস্কৃতি, ধর্ম ও সাহিত্য নিয়ে মুক্তালাপ করতে আমি ভালোবাসি। প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করাই আমার লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন