সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

The Train: মানুষ নাকি শিল্পকর্মের মূল্য বেশি?

সিনেমার গল্পটি মূলত ফরাসি প্রতিরোধ যোদ্ধা রোজ ভ্যাল্যান্ডের বই ‘Le Front de l'Art’ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ সময়ের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। ১৯৪৪ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত প্যারিস মুক্তির মাত্র কয়েকদিন আগের ঘটনা। যুদ্ধে পরাজয় জেনেও শেষমেশ জার্মান কর্নেল ভন ওয়াল্ডহেইম একটা কাজ সেরে যেতে চান। সে ফ্রান্সের মিউজিয়াম ‘জিউ ডি পমে’ থেকে বিপুল পরিমাণ অমূল্য ফরাসি চিত্রকর্ম যেমনঃ পিকাসো, ক্লদ মনে, ভ্যান গগ, রেনোয়ার মতো বিখ্যাত শিল্পীদের অসংখ্য চিত্রকর্ম জার্মানিতে পাচারের পরিকল্পনা করেন।

Fazle Rabby Rashed
Fazle Rabby Rashed মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 7 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 95 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 1 জন পাঠক পড়েছেন
The Train: মানুষ নাকি শিল্পকর্মের মূল্য বেশি?

মানুষের জীবনের মূল্য বেশি নাকি কোন দেশের সংস্কৃতির প্রতীক কোন অমূল্য শিল্পকর্মের মূল্য বেশি? এই জটিল নৈতিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে জন ফ্রাঙ্কেনহাইমার পরিচালিত ১৯৬৪ সালের যুদ্ধভিত্তিক কালজয়ী ‘The Train’ সিনেমা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই সিনেমাটি মূলত মানবসভ্যতার ইতিহাসে শিল্প ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষার এক মহাকাব্যিক লড়াই ছিল। সাদা-কালো এই সিনেমাটি আজও মানুষের আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবোধের এক নান্দনিক দলিল হয়ে আছে। সিনেমার পরতে পরতে পরিচালক এমন এক বাস্তব পরিবেশ তৈরি করেছে যা দর্শককে এক শ্বাসরুদ্ধকর যাত্রায় নিয়ে যায়। তারপর শেষ পর্যন্ত এক গভীর জীবনবোধের মুখোমুখিও দাঁড় করায়।

সিনেমার গল্পটি মূলত ফরাসি প্রতিরোধ যোদ্ধা রোজ ভ্যাল্যান্ডের বই ‘Le Front de l'Art’ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ সময়ের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। ১৯৪৪ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত প্যারিস মুক্তির মাত্র কয়েকদিন আগের ঘটনা। যুদ্ধে পরাজয় জেনেও শেষমেশ জার্মান কর্নেল ভন ওয়াল্ডহেইম একটা কাজ সেরে যেতে চান। সে ফ্রান্সের মিউজিয়াম ‘জিউ ডি পমে’ থেকে বিপুল পরিমাণ অমূল্য ফরাসি চিত্রকর্ম যেমনঃ পিকাসো, ক্লদ মনে, ভ্যান গগ, রেনোয়ার মতো বিখ্যাত শিল্পীদের অসংখ্য চিত্রকর্ম জার্মানিতে পাচারের পরিকল্পনা করেন। অন্যদিকে রেলওয়ে ইন্সপেক্টর ল্যাবিশ এবং ফরাসি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় যেকোনো উপায়ে ট্রেনটিকে ফ্রান্সের সীমানার ভেতরে আটকে রাখা। কিন্তু সমস্যা হয় তারা ট্রেন ধ্বংস করতে পারবে না, কারণ ট্রেন ধ্বংস করলে তার ভেতরে থাকা চিত্রকর্মগুলোই ধ্বংস হয়ে যাবে। এভাবেই এক অসম্ভব সমীকরণকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে স্বদেশে ধরে রাখতে ল্যাবিশ সহ অসংখ্য ফরাসি রেলওয়ে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের জীবন বাজি রাখার গল্পই ফুটে উঠেছে পুরো সিনেমা জুড়ে।

রেলওয়ে ইন্সপেক্টর ল্যাবিশ চরিত্রে বার্ট ল্যাঙ্কাস্টার ছিলেন এককথায় অনবদ্য। পেশাদার অভিনেতা হওয়ার আগে তিনি সার্কাস এক্রোব্যাট ছিলেন। এই সিনেমায় তিনি তার দক্ষতা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন। ইঞ্জিনের যান্ত্রিক কাজ, চলন্ত ট্রেনে চড়ে বসা কিংবা খাড়া পাহাড় থেকে নেমে আসার মতো প্রতিটি কঠিন স্টান্ট তিনি নিজে করেছেন। অনেকের জন্য বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে যাবে যে তিনি সেগুলো কোনরকম ডামি ছাড়াই করেছিলেন। এমনকি একবার শুটিং এর বাইরে গলফ খেলতে গিয়ে তার পায়ে চোট লাগে, যা স্ক্রিপ্টে ছিল না। পরিচালক তখন গল্পে কিছুটা পরিবর্তন এনে তার চরিত্রে পায়ে গুলি লাগার একটি দৃশ্য যোগ করেন, যাতে তার ল্যাংচানোটা স্বাভাবিক মনে হয়। বিপরীতে, জার্মান কর্নেল ভন ওয়াল্ডহেইম চরিত্রে পল স্কোফিল্ডের অভিনয় ছিল ঠান্ডা, কঠোর এবং তীব্র হাড়হিম করা। শিল্পের প্রতি অদ্ভুত আসক্তি এবং যেকোনো মূল্যে তা নিজের দখলে রাখার নাৎসি অহংকারকে তিনি নিখুঁতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এছাড়া মিউজিয়াম কিউরেটর মাদমোয়াজেল ভিলার্ড চরিত্রে সুজান ফ্লোনের সংক্ষিপ্ত অথচ দৃঢ় উপস্থিতি বাস্তবের রোজ ভ্যাল্যান্ডের অকুতোভয় রূপটিকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।

বর্তমান সময়ের মতো সেই সময় সিজিআই না থাকায় পরিচালক ফ্রাঙ্কেনহাইমার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি কোনো ক্ষুদ্রাকৃতি মডেল ব্যবহার করবেন না। সেই কারণে এই সিনেমায় ট্রেনের যে সংঘর্ষগুলো দেখা যায় সেগুলো ছিল সত্যিকারের ট্রেনেরই সংঘর্ষ। এমনকি একটি দৃশ্যে মিত্রশক্তির বিমান হামলার ফলে রেল ইয়ার্ড ধ্বংস হওয়ার যে দৃশ্য আছে সেখানে ফরাসি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে একটি আস্ত ইয়ার্ডে সত্যিকারের ডিনামাইট বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। আর এটি করার জন্য মাত্র একটি সুযোগ ছিল, কারণ স্পেশাল এফেক্টস টিম একাধিক ক্যামেরা দিয়ে পুরো দৃশ্যটি ধারণ করেছিল। এমনকি সিনেমার আরেকটি ট্রেন ক্র্যাশের দৃশ্যে ট্রেনটি এত গতিতেই এসে ধাক্কা মেরেছিল যে, সেটি নির্ধারিত সীমানা পেরিয়ে মূল ক্যামেরাগুলোর একটিকে ধ্বংস করে দেয় এবং ক্রুরা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। এভাবে নিখুঁত মেকিং আর দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি সিনেমাটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সিনেমাটোগ্রাফিতে ট্রেনের ইঞ্জিনের যান্ত্রিক রূপ আর ধোঁয়ার যেই অদ্ভুত নান্দনিকতা তৈরি হয়েছে তাতে যেকোনো দর্শক সরাসরি সেই ১৯৪৪ সালের যুদ্ধকালীন ফ্রান্সে চলে যাবে।

এই সিনেমায় পরিচালক বদলানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। সিনেমাটির শুটিং বিখ্যাত পরিচালক আর্থার পেন শুরু করলেও বার্ট ল্যাঙ্কাস্টার চাচ্ছিলেন সিনেমাটিতে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার চেয়ে যুদ্ধভিত্তিক অ্যাকশন ও রিয়েলিজম বেশি থাকুক। এই মতবিরোধের কারণে শুটিং শুরুর মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় আর্থার পেনকে বাদ দিয়ে জন ফ্রাঙ্কেনহাইমারকে এই সিনেমার জন্য নিয়ে আসা হয়। নাৎসিদের লুট করা যে পিকাসো বা রেনোয়ার মাস্টারপিস পেইন্টিংগুলো এখানে দেখানো হয়েছে সেগুলো আসলে এঁকেছিলেন ফরাসি শিল্পী জঁ ফ্লাকো। যিনি পেশায় ছিলেন একজন নামকরা আর্ট ফরজার বা জালিয়াত। এই সিনেমাটির জন্য তিনি হুবহু আসল পেইন্টিংগুলোর কপি তৈরি করেছিলেন। সিনেমায় সুজান ফ্লোন অভিনীত মাদমোয়াজেল ভিলার্ড চরিত্রটি আসলে বাস্তবের রোজ ভ্যাল্যান্ডের উপর ভিত্তি করেই তৈরি। বাস্তবে রোজ ভ্যাল্যান্ড প্যারিসের 'জ্য দ্য পোম' মিউজিয়ামের একজন কিউরেটর ছিলেন। তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে নাৎসিদের অজান্তেই খেরোখাতায় লিখে রাখতেন নাৎসিরা কোন কোন ছবি, কোন ট্রেনে করে কোথায় পাচার করার চেষ্টা করছে। তার সেই গোপন নোট এবং তথ্য সহায়তা না থাকলে যুদ্ধশেষে হয়তো ফ্রান্সের এই অমূল্য সম্পদগুলো চিরতরেই হারিয়ে যেতো।

অমূল্য শিল্পকর্ম রক্ষার মতো অসামান্য কৃতিত্বটা বেশি ছিল ফরাসি রেলওয়ে কর্মচারীদের। তারা সিনেমার মতোই জার্মানদের চোখ ফাঁকি দিতে নানা রকম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করা, ট্রেনের শিডিউল ও কাগজপত্র ওলটপালট করা এবং ছোটখাটো যান্ত্রিক ত্রুটি বা Sabotage করার মাধ্যমে ট্রেনের যাত্রা বিলম্বিত করেছিলেন। আর্ট কিংবা পেইন্টিংয়ের মতো শিল্পগুলো আসলে কি! আর এগুলোর গুরুত্বই বা কতোটুকু, তাও বুঝতে না পারা রেলের এক বৃদ্ধ ইঞ্জিনিয়ারও যখন জানতে পারে তার দেশের সম্পদ পাচার করার পরিকল্পনা হচ্ছে তখন সেও তার পকেটে থাকা ফ্রেঞ্চ কয়েন দিয়ে ট্রেনকে বিকল করে শিল্পকর্ম পাচার রোধ করার চেষ্টা চালায়। আর এটি করতে গিয়ে তার নিজের জীবনও বিসর্জন দিতে হয়। চার বছরের জার্মান দখলদারিত্বের সময়ে নাৎসিদের ট্রেন চলাচলে বাধা দেওয়া এবং প্রতিরোধে অংশ নেওয়ার অপরাধে ১,৬০০ জনেরও বেশি ফরাসি রেলওয়ে কর্মী নাৎসিদের হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ফরাসিরা নিজেদের দেশের এই রেল শ্রমিকদের ‘Cheminots Morts pour la France’ (ফ্রান্সের জন্য জীবন উৎসর্গকারী রেলওয়ে কর্মী) বা শহীদ হিসেবে গণ্য করে।

শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি শুধু নাৎসিদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়ে সম্পদ উদ্ধারের গল্পেই সীমাবদ্ধ থাকে না। রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ধূলিময় রেলওয়ের রাস্তার পাশে যখন শত শত ফরাসি জিম্মির লাশের পাশে সেই কাঙ্ক্ষিত শিল্পের বাক্সগুলো পড়ে থাকে, তখন এক চরম নৈতিক প্রশ্ন সামনে চলে আসে। মানুষের মূল্যের চেয়ে কি শিল্পের মূল্য বেশি? নাকি এই অমূল্য শিল্পই মানুষের বেঁচে থাকার এবং লড়াই করার একটা প্রেরণা? ‘দ্য ট্রেন’ শুধু একটি ট্রেনের যাত্রা থামানোর গল্পই নয়। এটি মানুষের আত্মমর্যাদা এবং সংস্কৃতির অবিনশ্বরতার এক অনন্য দলিল, যা দেখার পর দর্শককে দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ করে রাখে।


Fazle Rabby Rashed

About the Author

Fazle Rabby Rashed

মজদুরের নিয়মিত লেখক

Activist

ব্যক্তিগতভাবে আমি একজন শিল্প-সংস্কৃতিমনা, প্রগতিশীল, উদারপন্থী ও মুক্তচিন্তার মানুষ। আমি বিশ্বাস করি শিল্প-সংস্কৃতিই মানুষের আসল পরিচয়। রাজনীতি, সমাজ, শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আড্ডা আর কাটাছেঁড়া করতে ভালো লাগে। তবে চলচ্চিত্রের দুনিয়াটা আমার একটু বেশিই প্রিয়। তাই চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি, আলোচনা-সমালোচনা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast