সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ একটি বৈপ্লবিক রূপান্তর যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে মেহনতি মানুষ। প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে এই নতুন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হবে শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যক্ষ অংশীদারিত্ব। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন গণপরিষদ বা কাউন্সিল গঠন করা হবে। এই কাউন্সিলগুলোর প্রতিনিধিরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হলে তাদের প্রত্যাহার করার অধিকার থাকবে। এটি কেবল মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির স্বার্থরক্ষা না করে সর্বসাধারণের মুক্তি নিশ্চিত করবে।
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন সোভিয়েত ইউনিয়ন বা অন্য সমাজতান্ত্রিক দেশের মতো এই রাষ্ট্রও ভেঙে পড়বে কিনা। এই ধারণাটি মূলত একপাক্ষিক পুঁজিবাদী প্রচারণার অংশ। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন কোনো সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বের ব্যর্থতা ছিল না, বরং তা ছিল পরবর্তী সময়ে আমলাতান্ত্রিক বিচ্যুতি এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শ থেকে সরে যাওয়ার ফল। বাংলাদেশ সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমলাতন্ত্রের বদলে কঠোরভাবে শ্রমিক শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। জনগণের বিপ্লবী চেতনাকে জাগ্রত রেখে এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই চালিয়ে এই ধস প্রতিরোধ করা সম্ভব। বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতায় সমাজতন্ত্র চর্চা হবে সম্পূর্ণ গতিশীল এবং গণমুখী।
এই নতুন রাষ্ট্রের অর্থনীতি পরিচালিত হবে মুনাফার জন্য নয়, বরং মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে। সমস্ত প্রধান উৎপাদন মাধ্যম, কলকারখানা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ জনগণের যৌথ মালিকানায় থাকবে। পরিকল্পিত উপায়ে কৃষি ও শিল্পের বিকাশ ঘটানো হবে যাতে বেকারত্ব সম্পূর্ণ দূর হয় এবং সবার বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত হয়। আইন ও বিচার ব্যবস্থা আমূল বদলে যাবে। বর্তমানের পুঁজিবাদী আদালত যেখানে অর্থ ও প্রতিপত্তির ওপর নির্ভর করে, সমাজতান্ত্রিক বিচার ব্যবস্থা সেখানে হবে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য, দ্রুত ও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত আইনগুলো বাতিল করে মানুষের জানমাল ও সামাজিক সাম্য রক্ষার জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।
বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ পারস্পরিক সম্মান ও সমতার নীতি অনুসরণ করবে। সাম্রাজ্যবাদী শোষণমূলক চুক্তি পরিহার করে অন্যান্য প্রগতিশীল ও বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য চালানো হবে। অনেকেই মনে করেন পুঁজিবাদী বিশ্ব বাণিজ্য বন্ধ করে দিলে দেশ অচল হয়ে যাবে, কিন্তু এই ধারণাটি সঠিক নয়। যেসব বিলাসদ্রব্য বা শোষণের ওপর ভিত্তি করে বাণিজ্য চলে, তা বন্ধ হলে দেশের কোনো ক্ষতি হবে না। বাংলাদেশ যদি নিজের কৃষি, পোশাক খাত এবং ওষুধ শিল্পকে জনগণের কল্যাণে স্বনির্ভর করতে পারে, তবে সাম্রাজ্যবাদী অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারবে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সঠিক ব্যবস্থাপনাই হবে বাণিজ্যের মূল ভিত্তি।
ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতার বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কোনো বৈষম্য করবে না। রাষ্ট্র ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার বন্ধ করবে, কিন্তু প্রতিটি নাগরিকের নিজস্ব ধর্ম পালন বা বিশ্বাস না রাখার পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের ওপর অন্য ধর্মের প্রাধান্য চাপিয়ে দেওয়া হবে না। একই সাথে নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নারীদের যে পণ্য হিসেবে দেখা হয়, তার অবসান ঘটবে। কর্মসংস্থান, মজুরি এবং সামাজিক মর্যাদায় নারী ও পুরুষ সম্পূর্ণ সমান সুযোগ পাবেন। জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত থাকবে এবং যেকোনো ধরণের সংখ্যাগুরু শ্রেষ্ঠত্ববাদী মানসিকতা কঠোরভাবে দমন করে সকলের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।
পরিশেষে, সমাজতন্ত্র নিয়ে প্রচলিত প্রোপাগান্ডা যেমন এটি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেয় বা দারিদ্র্য ডেকে আনে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। প্রকৃতপক্ষে পুঁজিবাদই মানুষকে দারিদ্র্য ও দাসত্বের শিকলে বেঁধে রাখে। সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ হবে এমন এক মানবিক সমাজ যেখানে প্রতিটি মানুষের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হবে এবং মেধা বিকাশের অবারিত সুযোগ থাকবে। সমাজতন্ত্রকে কোনো কাল্পনিক স্বপ্ন হিসেবে ভাবা একদমই ভুল, বরং শোষিত মানুষের বাঁচার একমাত্র বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পথ।
About the Author
চিত্রণ ভট্টাচার্য আদি
মজদুরের নিয়মিত লেখকছাত্রনেতা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট
সাধারণ সম্পাদক - সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, ময়মনসিংহ জেলা শাখা।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন