হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি ইদানিং ধুয়ো তুলছে যে কার্ল মার্কস নাকি ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সমর্থক ছিলেন। যদিও মার্কস-বিরোধীদের তরফ থেকে এই অভিযোগ বেশ পুরোনো। এই অপপ্রচারের মূলে রয়েছে New York Daily Tribune পত্রিকায় ১৮৫৩ সালে প্রকাশিত মার্কসের 'British Rule in India' শীর্ষক একটি প্রবন্ধ। এতে মার্কস ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতীয় জনজীবনে যে পরিবর্তন এসেছিল তাকে একটি 'মৌলিক সামাজিক বিপ্লব' বলে অভিহিত করেছিলেন। প্রথমেই বলা দরকার, মার্কস কখনও ভারতে আসেননি। ভারত সম্বন্ধে তিনি পড়াশুনো করেছিলেন লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে বসে। স্বাভাবিকভাবেই যে সমস্ত সোর্স থেকে মার্কস ভারত সম্বন্ধে জেনেছিলেন সেগুলি ছিল অপর্যাপ্ত, অসম্পূর্ণ এবং পুরোপুরি ব্রিটিশ কলোনিয়াল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লিখিত। ফলে প্রথমদিকে মার্কস সেই দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মার্কস যখন ভারত সম্বন্ধে আরও ডিটেলে স্টাডি করা শুরু করলেন, তখন থেকেই আমরা ভারত প্রসঙ্গে মার্কসের চিন্তার বিবর্তন লক্ষ্য করতে পারি। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের কোনো ইতিবাচক ফলাফল থাকতে পারে - এই বক্তব্য থেকে তিনি সরে এলেন। ১৮৫৭ সালে মার্কসই সর্বপ্রথম সিপাহী বিদ্রোহকে 'প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ' বলে উল্লেখ করলেন, এবং সেটা সাভারকারের অনেক আগেই।
কিন্তু মার্কস কি সত্যিই আলোচ্য প্রবন্ধটিতে ব্রিটিশ শাসনকে সমর্থন করেছিলেন? গোড়াতেই মার্কস সেখানে লিখেছেন, "ব্রিটিশরা হিন্দুস্থানের ওপর যে দুর্দশা ছাপিয়েছে তা হিন্দুস্থানের আগের সমস্ত দুর্দশার চাইতে মূলগতভাবে পৃথক এবং অনেক বেশি তীব্র।" ওই একই সালে একই পত্রিকায় প্রকাশিত 'ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ ফলাফল' শীর্ষক অপর একটি প্রবন্ধে মার্কস বলেন, "স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোকে ভেঙে দিয়ে, স্থানীয় শিল্পকে উম্মূলিত করে এবং স্থানীয় সমাজে যা কিছু মহৎ ও উন্নত ছিল তাকে সমতল করে দিয়ে ব্রিটিশরা ভারতীয় সভ্যতাকে চূর্ণ করেছে।" তিনি আরও বলেন, "ইংরেজ বুর্জোয়ারা হয়তো বা বাধ্য হয়েই যা কিছুই করুক, তাকে ব্যাপক ভারতীয় জনগণের মুক্তি অথবা সামাজিক অবস্থার বাস্তব সংশোধন ঘটবে না।"
'British Rule in India' প্রবন্ধে মার্কস আসলে যা বলতে চেয়েছিলেন তা ঐতিহাসিক বিচারে সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কস সেখানে দেখিয়েছেন, অতীতে শক, হুন, দল, পাঠান, মোঘল ইত্যাদি নানান শক্তির আক্রমণে ভারত নানাবিধ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে। কিন্তু ভারতের নিচুতলার গ্রামসমাজে তার কোনো আঁচ বা প্রভাব সরাসরি পড়েনি। মোড়ল, মুখিয়া, আচার, রিচ্যুয়াল, ধর্মবিশ্বাস ইত্যাদির ওপর নির্ভর করেই ভারতীয় গ্রামসমাজ বছরের পর বছর একই রকম, অপরিবর্তনশীল থেকে গেছে। এই স্থবিরতা বা জড়তাই আলেকজান্ডার থেকে ব্রিটিশ - যুগে যুগে বিদেশী আক্রমণকারীদের অন্যতম সহায়ক হয়ে উঠেছে। 'ভারতীয় সৈন্যবাহিনীতে বিদ্রোহ' শীর্ষক প্রবন্ধে মার্কস বলেছেন, "বিভিন্ন জাতি, উপজাতি, বর্ণাশ্রম, ধর্মবিশ্বাস ও সার্বভৌমদের যে যোগফল থেকে গড়ে উঠেছে ভারত নামের ভৌগোলিক ঐক্য - তাদের পরস্পর বৈরিতাই ব্রিটিশ প্রাধান্যের মূল নীতি হয়ে এসেছে।" কেন এই স্থবিরতা? পূর্বোক্ত 'ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ ফলাফল' প্রবন্ধে মার্কস বলেছেন, "গ্রামগুলির বিচ্ছিন্নতার কারণ ভারতে পথঘাটের অভাব এবং পথঘাটের অভাবের ফলে গ্রামগুলোর বিচ্ছিন্নতা হয়েছে চিরস্থায়ী। নিম্নতম মাত্রার সুযোগসুবিধার ওপর, গ্রাম গ্রামান্তরের সঙ্গে প্রায় কোনো যোগাযোগ ছাড়াই এবং সামাজিক অগ্রগতির জন্যে যা অপরিহার্য তেমন আকাঙ্ক্ষা ও প্রচেষ্টা ব্যতিরেকেই এক একটি গোষ্ঠী বেঁচে এসেছে একই ছকের ওপর।" মার্কস দেখিয়েছেন, এই অসাধারণ জাড্য প্রথম ভেঙেছিল ভারতে রেলপথ স্থাপনের মধ্য দিয়ে। যদিও রেলপথ স্থাপনের জন্য যেভাবে মাটি উঁচু করতে হয়েছিল তার দৌলতে মাটির স্বাভাবিক নিকাশি ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছিল। ফলে জল জমে বিভিন্ন জলবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল যা অচিরেই গ্রামে-গঞ্জে দীর্ঘস্থায়ী মহামারীর চেহারা নিয়েছিল। এ সম্বন্ধেও মার্কস সচেতন ছিলেন।
ট্রিবিউন-পর্বে মার্কসের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ 'লর্ড ক্যানিংয়ের ঘোষণা ও ভারতে ভূমি বন্দোবস্ত'। ভারতীয় সামন্ততান্ত্রিক ভূমি ব্যবস্থা সম্বন্ধে মার্কসের চিন্তা এই প্রবন্ধটি থেকেই প্রথম জানা যায়। মার্কস এখানে স্পষ্ট ভাষার বলেছেন, "অন্য যেকোনো দেশের মতো ভারতেও জমি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন - সরকারের তথাকথিত মালিকানার অর্থ সার্বভৌমের কাছ থেকে পাট্টা পাওয়ার বেশি কিছু নয় এবং তা তত্ত্বগতভাবে স্বীকৃত, তার মূলবিধি সামন্ত আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত।" মার্কস নির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন তুলেছেন, "কিন্তু যদি মেনেও নিই যে ভারতের জমি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন, অন্য যে কোনো জায়গার জমির মতোই তা জোরদার পাকা পাট্টা বলে অধিকৃত, তাহলেও প্রকৃত মালিক বলে গণ্য করা হবে কাকে? আসলে জমিদার বা তালুকদার বলে যে শ্রেণীটি পরিচিত, প্রকৃতপক্ষে তারাই জমির আসল মালিক। সরকারকে একটা খাজনা এদের দেয়, এবং মালিক হিসেবে এদের অধিকার আছে খুশী মতো কর্ষককে উচ্ছেদ করার, এবং এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে কর্ষকেরা নিতান্ত উটবন্দী প্রজারূপে গণ্য, জমিদার ন্যায্যজ্ঞানে যা ধার্য করবে তেমন যেকোনো টাকাই এরা খাজনা হিসেবে দিতে বাধ্য।" মার্কসের গুরুত্বপূর্ণ উচ্চারণ, "আদি হিন্দুপ্রথা মতে জমির মালিকানা ছিল গ্রাম পঞ্চায়েতে, বিভিন্ন ব্যক্তিকে জমি বিলি করার অধিকার ছিল তাদেরই, আর আদিতে জমিদার ও তালুকদারেরা মাত্র গ্রাম থেকে প্রাপ্য করের তদারকি, আদায় ও রাজার নিকট প্রত্যর্পণের জন্য নিযুক্ত সরকারি কর্মচারী বই কিছু ছিল না।" যদিও বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়ে মার্কস লিখেছেন, "তালুকদার ও জমিদাররা যে একক মালিকানা স্বত্ব দাবি করে তা কর্ষকের ওপর জবরদখল থেকে উৎপন্ন এবং জমির আসল কর্ষক ও দেশের সাধারণ উন্নতির স্কন্ধশায়ী প্রেতরূপে এদের সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া উচিত। কিন্তু এই মধ্যস্বত্ব ভোগীদের অধিকারের আদি যাই হোক, তাদের যেহেতু স্বীয় অনুকূলে দীর্ঘ দখলী স্বত্বের দাবি ছিল তাই সে দাবি যতই অসুবিধাজনক, স্বেচ্ছাচারী ও লোকপীড়ক হোক, কিছু পরিমাণে তাকে আইনসঙ্গত বলে না মানা অসম্ভব।" তবে এইটেই শেষ কথা নয়। মার্কস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, "ভূমিজ উৎপন্নের ভাগ সরকার যাদের মারফত পান সেই মধ্যস্থদের চেয়ে জমিতে কর্ষকদের বেশি মালিকানা স্বত্ব আছে।"
✒️ অন্বেষ
About the Author
অন্বেষ বন্দ্যোপাধ্যায়
মজদুরের নিয়মিত লেখকJob as a content writer in a media house
গবেষক। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। আগ্রহের বিষয় : বাংলা সাহিত্য আন্দোলন, মার্কসবাদ, চার্বাক ও লোকায়ত দর্শন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র দলীয় সদস্য। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ এবং পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদের আজীবন সদস্য।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন