সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

দারিদ্রতা আর সমাজবাদ

বর্তমান সময়ের চরম সামাজিক দারিদ্রতার সংকটের একমাত্র সমাধান হচ্ছে সাম্যবাদ ও সমাজবাদ

SHORIF HOSSAIN QADERI
পড়তে 11 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 41 বার পড়েছে
দারিদ্রতা আর সমাজবাদ

আজকের  দারিদ্রতা আর সমাজবাদ

লেখা: শরিফ হোসেন (ক্বাদেরী)

·       দারিদ্র্যতা

দারিদ্র্যতা হচ্ছে মানুষের জীবন যাপনের জন্য পর্যাপ্ত মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের অক্ষমতার অবস্থা। আর বর্তমান সমাজের সবচেয়ে বড় সামাজিক সমস্যা হচ্ছে এই দারিদ্র্যতা। সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে দারিদ্রতাকে সংজ্ঞায়ন এবং বর্ণনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের শতকরা ৩০% এর অধিক মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্রতার নিম্ন সীমায় বাস করে। তবে দারিদ্র্যতার মুলে থাকে ৬টা মৌলিক মানবিক চাহিদা:-

খাদ্য
বস্ত্র
বাসস্থান
স্বাস্থ্য
শিক্ষা
বিনোদন


একজন মানুষ যখন তার এবং তার পরিবারের বা উভয়ের অবশ্য পূরনীয় চাহিদা পূরনে ব্যর্থ হয়, তখন সে দরিদ্র। এসব চাহিদার মধ্যে সবচে বেশি আবশ্যিক চাহিদা হচ্ছে খাদ্য যা মানুষের জৈবিক বৃদ্ধি, শক্তি ও কর্মসম্পাদনের বাহক। খাদ্যের গুনগত মানের উপরও জৈবিক বৃদ্ধির প্রভাব আছে।

তবে আজকের বাংলাদেশে মাত্র ২৫% থেকে ৩০% মানুষ পুষ্টির গুনগত মান বজায রেখে খাদ্য গ্রহন করতে পারছে (BBS HIES report-22)। এর কারণ কি আমাদের এখনকার আধুনিক সমাজে? এখানকার মুল কারণ হচ্ছে দারিদ্র্যতা। আর বাংলাদেশের শতকরা ৪০% মানুষ বছরে নতুন পোশাক কেনা এবং পরিধানের সক্ষমতা রাখে।

বাসস্থানহীনতা বা গৃহহীনতা, বাংলাদেশের জন্য বিশাল একটি দরিদ্র সমস্যার প্রতিফলন। পাকা বাড়ি দেশের মোট আবাসন কাঠামোর প্রায় ২২.৫% পাকা। তবে মহানগর ও শহরাঞ্চলে পাকা বাড়ির হার ৫০% এর বেশি। আধাপাকা বাড়ি দেশের প্রায় ২৮.৫% বাড়ি আধাপাকা (ইটের দেয়াল ও টিনের ছাদ)। কাঁচা বাড়ি: দেশের ৪৭%  থেকে ৪৮% বাড়ি এখনো কাঁচা (বাঁশ, মাটি বা ছনের তৈরি)। ঝুপড়ি : দেশের প্রায় ১% থেকে ১.৫% মানুষ অস্থায়ী ঝুপড়িতে বসবাস করেন।

বাংলাদেশের চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য সমস্যা দারিদ্রতার অন্যতম বড় প্রতিফলন। বাংলাদেশে সার্বজনীন চিকিৎসা না পাওয়ার প্রধান কারণ টাকার অভাব বা দারিদ্রতা। আমাদের দেশে মোট চিকিৎসা খরচের প্রায় ৬৭% (দুই-তৃতীয়াংশ) রোগী ও তার পরিবারকে নিজেদের পকেট থেকে সরাসরি বহন করতে হয়, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম।  ( UNFPA Bangladesh report 2025 )

 সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ভিড় ও আধুনিক সুবিধার অভাবে বাধ্য হয়ে মানুষকে বেশি খরচে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা নিতে হয়। ফলে খরচের বোঝা টানতে না পেরে প্রতি বছর দেশের প্রায় ৬% থেকে ৮% মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায় এবং বিপুল সংখ্যক দরিদ্র পরিবার প্রয়োজনীয় ঔষধ কেনা বা বড় কোনো রোগের চিকিৎসা করানো থেকে একেবারেই বঞ্চিত থাকে।

বাংলাদেশের শিক্ষায় সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে দারিদ্রতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে দেশে ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭৭.৯%। তবে সাক্ষরতার হার বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান এবং দারিদ্র্যের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান। বাংলাদেশ সরকারের তথ্যমতে সরকারি হিসাবে দারিদ্র্যের হার ১৯.২% হলেও, অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান PPRC ও বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির কারণে তা ২১% থেকে ২৭.৯% পর্যন্ত ঠেকেছে। দারিদ্র্যের কারণে দরিদ্র পরিবারগুলো সন্তানদের মানসম্মত উচ্চশিক্ষা বা কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারে না, যার ফলে তারা পরবর্তীতে কম আয়ের অদক্ষ শ্রমভিত্তিক কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে বাধ্য হয়। এই স্বল্প আয় পরিবারগুলোকে পুনরায় দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে রাখে। শিক্ষার প্রসার ও উপযুক্ত কর্মমুখী দক্ষতা বৃদ্ধিই এই দুষ্টচক্র ভেঙে দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।

আর বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি । বাংলাদেশের মতো সভ্য সামাজিক সমাজবিনোদন বা চিত্ত বিনোদন কে অনেক সময়ই অশ্লীল এবং বেহায়াপনা হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। এতো শিশুসহ সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মানসিক বিকাশে এবং সামাজিক সচেতনতায় বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ  বিনোদন বা চিত্ত বিনোদন প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত।

 

এগুলো শুধু সংখ্যা বা শতাংশের ভাগ নয়, বাস্তবের সাথে এগুলো দেখতে গেলে বা মাঠ পর্যায়ে জরিপ করলে বাস্তবের অবস্থা পরিলক্ষিত করা যাবে।

 

·       দারিদ্র্যতার কারণ

সমাজের দারিদ্র্যতা দুই ধরনের কারনে হয়, প্রথম সমাজের অর্থননৈতিক ব্যবস্থা আর দ্বিতীয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

·       সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা:-

উৎপাদন উপায়ের ব্যক্তিগত মালিকানা: পুঁজিবাদী সমাজে জমি, কলকারখানা, প্রযুক্তি ও মূলধনের মতো সব উৎপাদন উপায়ের মালিক থাকেন গুটিকয়েক ধনী ব্যক্তি। সাধারণ মানুষ জীবনধারণের জন্য নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়।

শ্রম শোষণ ও উদ্বৃত্ত মূল্য: কারখানা বা প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা যে পরিমাণ মূল্যের পণ্য বা সেবা তৈরি করেন, মালিক পক্ষ তার একটা সামান্য অংশ মজুরি হিসেবে শ্রমিককে দেন। বাকি সিংহভাগ উদ্বৃত্ত অর্থ (মুনাফা) মালিক নিজে রেখে দেন। কার্ল মার্ক্সের মতে, শ্রমের এই চরম শোষণই ধনীদের আরও ধনী এবং শ্রমিকদের দরিদ্র বানিয়ে রাখে।

ধনের অসম বণ্টন ও বৈষম্য: পুঁজিবাদে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য থাকে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন করা, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা নয়। ফলে সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয় এবং সমাজে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমেই বাড়তে থাকে।

সম্পদহীনতার চক্র: শ্রমিক শ্রেণি তাদের শ্রমের পূর্ণাঙ্গ মূল্য না পাওয়ায় কখনো নিজেদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে না। তারা বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ জোগাতেই নিঃশেষ হয়ে যায়, যা বংশপরম্পরায় দারিদ্র্যকে টিকিয়ে রাখে।

·       দারিদ্রতার প্রাকৃতিক কারণ

 

প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবস্থান মানবসমাজের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে, যা অনেক সময় সরাসরি দারিদ্র্যের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে প্রতিকূল জলবায়ু ও বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি খরা, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ও তীব্র বন্যা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে। এর পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প কিংবা নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধারাবাহিক আঘাত বিশেষ করে উপকূলীয় ও নদী তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি, জমিজমা ও সম্বল সম্পূর্ণ কেড়ে নেয়; ফলে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার কোনো সঞ্চয় গড়ে তুলতে না পেরে স্থায়ীভাবে দারিদ্র্যের জালে আটকে পড়ে।

তাছাড়া, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গঠিত পাহাড়ি, মরুভূমি কিংবা বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চলের অনুপযোগী ভূপ্রকৃতি যাতায়াত ও বাণিজ্যিক যোগাযোগকে কঠিন করে তোলে, যা ওই অঞ্চলের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করে। একই সাথে মাটিতে উর্বরতার অভাব, অতিরিক্ত লবণাক্ততা কিংবা খনিজ তেল, গ্যাস ও বনাঞ্চলের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের অপ্রতুলতা কোনো এলাকার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে রাখে। এসব ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি ক্রান্তীয় বা স্যাঁতসেঁতে জলবায়ুর কারণে সৃষ্ট মশাবাহিত ও সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব মানুষের কর্মক্ষমতা কমায় এবং চিকিৎসার খরচ বাড়িয়ে পরিবারগুলোকে নিঃস্ব করে তোলে। মূলত প্রাকৃতিক এই প্রতিকূলতাগুলো সম্মিলিতভাবে উৎপাদন, আয় ও জীবনযাত্রার মান হ্রাস করে চরম দারিদ্র্য সৃষ্টিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।

প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের ঝুঁকি অত্যন্ত প্রবল, যা এদেশের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বাস্তবতায় সরাসরি পরিলক্ষিত হয়। পলিগঠিত ও নিচু সমভূমির দেশ হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছরই নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে মৌসুমি খরা ও নদীভাঙন এবং উপকূলীয় জেলাগুলোতে (যেমন: সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা) ধারাবাহিক ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রের পানি বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট লবণাক্ততা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ধ্বংস করে। নদীভাঙনের ফলে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে এক রাতেই গৃহহীন ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে, যা তাদেরকে স্থায়ী দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়।

​তাছাড়া, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চলে প্রতিবছর বৈশাখ মাসে আগাম পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যা একমাত্র প্রধান ফসল 'বোরো ধান' পুরোপুরি ভাসিয়ে নিয়ে যায়, যা ঐ অঞ্চলের কৃষকদের চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় ফেলে। একইভাবে, পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে (যেমন: বান্দরবান, রাঙ্গামাটি) দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শিল্পায়ন গড়ে ওঠা কঠিন, যা স্থানীয়দের আয়ের সুযোগকে সীমিত করে রাখে। এর সাথে যুক্ত হয় ক্রান্তীয় জলবায়ুর প্রভাবে বর্ষাকালে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া বা পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব, যা দরিদ্র পরিবারগুলোর চিকিৎসাব্যয় বাড়িয়ে সঞ্চয় শূন্য করে দেয়। ভৌগোলিক পরিবেশের এই ক্রমাগত আঘাত ও প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা গ্রামীণ কর্মসংস্থান নষ্ট করে এবং মানুষকে জীবনধারণের তাগিদে মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত করে চরম দারিদ্র্যের জালে আবদ্ধ রাখে।

 

·       সমাজবাদ

সমাজবাদ (Socialism) হলো এমন একটি অর্থনৈতিক মতাদর্শ, যা উৎপাদনের উপায়গুলোর (যেমন: জমি, কলকারখানা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মূলধন) ওপর ব্যক্তিমালিকানার বদলে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক মালিকানা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন প্রতিষ্ঠার কথা বলে।

·       দারিদ্রতা নিরসনের সমাজবাদ

অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক—এই উভয় ধরনের দারিদ্র্য নিরসনে সমাজবাদ ব্যক্তিকেন্দ্রিক বাজারের ওপর নির্ভর না করে রাষ্ট্রীয় যৌথ কাঠামো ও সুপরিকল্পিত বণ্টনের মাধ্যমে কাজ করে। অর্থনৈতিক দারিদ্র্য নিরসনে সমাজতন্ত্র মূলত সম্পদের বৈষম্য, শ্রেণিভিত্তিক শোষণ ও বেকারত্ব দূরীকরণে মনোযোগ দেয়। উৎপাদনের প্রধান উপায়গুলোর (যেমন: কলকারখানা, খনি ও জমি) ওপর ব্যক্তিমালিকানার বদলে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার ফলে শ্রমিকের উদ্বৃত্ত মূল্য পুঁজিপতির হাতে পুঞ্জীভূত হওয়ার সুযোগ থাকে না। একই সাথে, বাজারের অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিটি যোগ্য নাগরিকের জন্য সর্বজনীন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়। তাছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদাগুলোকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত না করে নাগরিক অধিকার হিসেবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হয়, যা মানুষকে অর্থাভাবজনিত বৈষম্য থেকে স্থায়ী মুক্তি দেয়।

​অন্যদিকে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভৌগোলিক দুর্গমতা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দারিদ্র্য মোকাবিলায় সমাজবাদ কোনো লাভ-ক্ষতির হিসাব না করে সর্বজনীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে। বন্যা, খরা বা নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া পরিবারগুলোকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মতো কেবল ব্যক্তিসঞ্চয় বা ঋণের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয় না; বরং রাষ্ট্র শতভাগ দায়িত্ব নিয়ে তাদের দ্রুত পুনর্বাসন, কৃষিসামগ্রী ও খাদ্য সহায়তা প্রদান করে। এছাড়া, ভৌগোলিকভাবে পিছিয়ে পড়া বা দুর্গম এলাকাগুলোতে—যেখানে ব্যক্তিগত পুঁজিপতিরা মুনাফা না থাকায় বিনিয়োগ করতে চায় না—রাষ্ট্র জাতীয় তহবিল থেকে সরাসরি অর্থ বরাদ্দ করে যাতায়াত, বিদ্যুৎ ও শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলে। একই সাথে মুনাফাকেন্দ্রিক চিন্তা না করে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও দুর্যোগ ঝুঁকির স্থায়ী নিরসনে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিশাল বাঁধ নির্মাণ বা বনায়নের মতো দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়, যা প্রাকৃতিক কারণে মানুষকে চরম দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়া থেকে রক্ষা করে।

 

·       সময়ের ডাক সমাজবাদ

একবিংশ শতাব্দীর অনিয়ন্ত্রিত মুক্তবাজার অর্থনীতি, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও জলবায়ু সংকটের যুগে মানবিক সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে সমাজবাদের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মূলধন অল্প কিছু ধনকুবেরের হাতে পুঞ্জীভূত হওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বিপজ্জনক মাত্রা ছুঁয়েছে। এই মুনাফাকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো সাধারণ পণ্যে পরিণত হয়ে দরিদ্রের নাগালের বাইরে চলে গেছে, যেখানে সমাজবাদ এগুলোকে বাণিজ্যিক লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে তুলে নাগরিকের সর্বজনীন অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা বলে। উপরন্তু, করপোরেট স্বার্থে পরিবেশ ধ্বংসের যে মহোৎসব চলছে, তা রোধে সমাজবাদের 'প্রয়োজনভিত্তিক ও টেকসই পরিকল্পিত উৎপাদন' অত্যন্ত জরুরি।

 বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট; তীব্র আয়বৈষম্য, অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুল শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষার অভাব, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতির দুর্যোগে নিঃস্ব হওয়া মানুষের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করতে সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর কোনো বিকল্প নেই। কৃষিজমি রক্ষা, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ এবং দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে সার্বজনীন রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা বলয় তৈরিতে সমাজবাদের সমতাভিত্তিক সম্পদ বণ্টন ও রাষ্ট্রীয় মালিকানার নীতি বাংলাদেশের একটি শোষণহীন, টেকসই ও মানবিক ভবিষ্যৎ গঠনে অত্যন্ত সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

#সাম্যবাদ_কবিতা #শরিফ_হোসেন_ক্বাদেরী #বাংলা_কবিতা #পুঁজিবাদ #সামাজিক_বৈষম্য #সাহিত্য #বাস্তবতা #কবিতা
SHORIF HOSSAIN QADERI

About the Author

SHORIF HOSSAIN QADERI

বাস্তব যেন কেমন হয়ে গেছে, সত্য এখন নেই বললেই চলে। কবিতা তো অনেক লিখি, বাস্তবে যা কিছু দেখার সব দেখে বলা যায় যে বিকল্প একমাত্র সাম্যবাদ

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast