রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন রচিত স্ত্রীজাতির অবনতি কেবল একটি প্রবন্ধ নয়, বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নারীবাদী ইশতেহার। এই প্রবন্ধ নারীজাতির শৃঙ্খল মোচনের এক মহাকাব্য।
বিশ শতকের শুরুতে বাঙালি মুসলমান সমাজ যখন অন্ধ সংস্কার, কঠোর পর্দাপ্রথা এবং অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তখন একাই দাঁড়িয়েছিলেন এক বিশাল পাহাড়ের বিপক্ষে। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত এই প্রবন্ধ ছিলো তৎকালীণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মূলে এক কুঠারাঘাত। রোকেয়া রচিত এই প্রবন্ধে কেবল নারীদের দাবিগুলোকেই ফুটিয়ে তোলা হয়নি, বরং নারী কেন পিছিয়ে আছে তার মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক এবং সমাজতাত্ত্বিক কারণগুলোও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই প্রবন্ধটি সিমন দ্যা বোভোয়ারের দ্যা সেকেন্ড সেক্স (১৯৪৯) এর অনেক আগেই নারীর অধস্তনতাকে একটি ‘সামজিক নির্মান’ হিসেবে প্রমাণ করেছেন।
প্রবন্ধের শুরুতেই রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন চিহ্নিত করছেন নারীজাতি পুরুষজাতির ‘সহচরী’ কিংবা ‘সহধর্ম্মিনী’ না হয়ে দাসী হয়ে পড়েছে। এর কারণকে তিনি বিশ্লেষণ করছেন সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায়। সভ্যতার শুরুতে পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা নারীরা কীভাবে সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় পিছিয়ে পড়েছে সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। সভ্যতার ধারায় তাকালে আমরা দেখতে পাই নারীর হাতে সূচনা হওয়া কৃষিও নারীর কাছ থেকে হাতছাড়া হয়ে যায় কৃষিতে ভারী যন্ত্রের ব্যবহার শুরুর সাথে সাথে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা রূপান্তরিত হলো পিতৃতান্ত্রিক সমাজে, নারী হয়ে পড়লো ক্ষমতাহীন। নারী ক্ষমতাহীন হওয়ার সাথে সাথে পুরুষ ধীরে ধীরে ভূস্বামী, গৃহস্বামী থেকে হয়ে উঠলো স্বামী এবং নারীজাতি হয়ে উঠলো তাদের দাসী (‘একজনকে স্বামী, প্রভু কিংবা ঈশ্বর বলিলে অপরকে দাসী না বলিয়া কি বলিতে পারেন?’) কিংবা পুরুষের গৃহপালিত পশুপাখি বা মূল্যবান সম্পত্তির সমান।
পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাই রোকেয়া অলঙ্কার নিয়ে করেছেন এক অনন্য বিশ্লেষণ। অলঙ্কারের ব্যবহারকে তিনি যেভাবে চিহ্নিত করছেন তা ছিল সময়ের সাপেক্ষে অভিনব। সাধারণত সমাজ অলঙ্কারকে দেখে নারীর শ্রী বা মর্যাদার নিদর্শন হিসেবে। কিন্তু রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এগুলোকে চিহ্নিত করেছেন দাসত্বের নিদর্শন হিসেবে। তিনি দেখিয়েছেন যেভাবে কয়েদিদের পায়ে লৌহনির্মিত বেড়ী পড়ানো হয়, একইভাবে ঐশ্বর্যের নাম করে নারীদের পায়ে পড়ানো হয় স্বর্ণ-রৌপ্য নির্মিত মল, কুকুরের গলাবন্ধের অনুকরণে নারীদের জন্য নির্মিত হয়েছে জড়োয়া চিক, হার। গো-স্বামী যেভাবে বলদের নাক বিদ্ধ করে ‘নাকদড়ি’ পড়ায় একইভাবে ‘স্বামী'র অস্তিত্বের নিদর্শন (সধবা) হিসেবে নারীদের নাকে পড়ানো হয়েছে স্বর্ণ-রৌপ্য নির্মিত নোলক। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন লোহার বেড়ি যদি দাসত্বের প্রতীক হয় তাহলে স্বর্ণের বেড়ী কেন ঐশ্বর্যের প্রতীক হবে।
এই দাসত্ব দৈনন্দিন অভ্যাসের সাথে এমনভাবে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে যে দাসত্বসূচক এই গহনাকে আজ ঐশ্বর্য-আভিযাত্যের প্রতীক ছাড়া কিছু মনে হয় না৷ নারীবাদী তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘নিপীড়নের আত্মস্থকরণ’ (Internalized oppression)। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন দেখিয়েছেন, শোষক পুরুষতন্ত্র নারীদের মাথায় এমনভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছে যে অলঙ্কারই তাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যার ফলে নিজেরাই তাদের শৃঙ্খলকে ভালোবাসতে শুরু করেছে।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের মতে নারীর সবধরনের অবনতির মূলে রয়েছে তার অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা। তিনি বলছেন, বোধহয় নারীজাতি প্রথমে শারীরিক শ্রমে অক্ষম হয়ে পরের উপার্জিত ধনভোগে বাধ্য হয় এবং সেজন্য তাকে মাথা নিচু করে থাকতে হয়৷ কিন্তু এটাকে প্রতিনিয়ত চর্চার মাধ্যমে এমনভাবে আত্মস্থ করিয়ে নেয়া হয়েছে যে এখন তাদের মন পর্যন্ত দাস (enslaved) হয়ে গিয়েছে। নারী অর্থ উপার্জন করে পতি-পুত্র প্রতিপালন করলে সেখানেও ওই অকর্মন্য পুরুষ-ই ‘স্বামী’(প্রভু) থাকে।
এই দাসত্ব থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন অর্থনৈতিক মুক্তি লাভের ব্যাপারটিকেই। পুরুষের সমকক্ষতা অর্জনের জন্য তিনি স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জনের কথা বলছেন। এরপরেই তিনি দিয়েছেন সময়ের সাপেক্ষে এক বৈপ্লবিক প্রস্তাব, তিনি বলছেন প্রয়োজন হলে নারীরা ‘লেডি কেরানি’ থেকে শুরু করে ‘লেডি ম্যাজিস্ট্রেট’, ‘লেডি ব্যরিস্টার’, ‘লেডি জজ’ হবে৷ এমনকি তিনি পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের ভেতর এদেশ থেকে নারী ভাইসরয় হওয়ার স্বপ্নও দেখিয়েছেন।
এই প্রবন্ধে রোকেয়া শ্রমের লৈঙ্গিক বৈষম্যের দিকেও আলোকপাত করেছেন। নারী ও পুরুষ একই কাজ করলেও দেখা যায় নারীর পারিশ্রমিক অনেক কম। এই অর্থনৈতিক শোষনই নারীকে করে রেখেছে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।
রোকেয়া তৎকালীন সমাজের পবিত্রতম স্তম্ভগুলোতে হাত দিতেও দ্বিধা করেননি। আমরা দেখতে পাই, তিনি স্বামী শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন৷ স্বামী শব্দের অর্থ প্রভু বা মালিক। একই রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে একজন কীভাবে অন্যজনের মালিক হয়! বৈবাহিক সম্পর্ক হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের, প্রভু-দাসের নয়।
এই প্রবন্ধে নারী জাতিকে তিনি সমাজের অর্ধঅঙ্গ বলে চিহ্নিত করেছেন, যার ব্যবহার আজকাল প্রচুর দেখা যায়। তিনি বলেছেন নারী ও পুরুষ একই সমাজের দুটি অঙ্গ, যদি একটি অঙ্গকে বেঁধে বা পঙ্গু করে রাখা হয় সেই দেহ বা সমাজ কখনোই দৌঁড়াতে পারবে না৷
এই প্রবন্ধে রোকেয়া নারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক অনগ্রসরতার জন্য তাদের মেধার অভাবকে দায়ী করেননি, দায়ী করেছেন চর্চার অভাবকে। কোনো যন্ত্র যেমন ব্যবহার না করলে তাতে জং ধরে যায়, নারীর মস্তিষ্কও পুরুষতান্ত্রিক বিধিনিষেধের খাঁচায় বন্দী থাকতে থাকতে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।
নারী কেন তেলাপোকা দেখে ভয় পায় এ বিষয়ক আলাপও তুলেছেন রোকেয়া। এটা কোন জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়৷ সমাজ ও পরিবার শৈশব থেকে এই ধরনের ভয় নারীর মনে ঢুকিয়ে দেয়, যাতে সে চিরকাল অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে৷ এই নির্ভরশীলতাকেই আবার প্রচার করা হয়েছে ‘লজ্জা’ বা ‘নারীসুলভ গুন’ হিসেবে।
আঙ্গিকগত দিক থেকে এই প্রবন্ধের সাহিত্যমান অত্যন্ত উন্নত৷ এই প্রবন্ধের গদ্যভাষা শাণিত এবং যুক্তিনির্ভর। এছাড়া এখানে দেখা যায় নানান ব্যাঙ্গের ব্যবহার। এসব ব্যবহার করে পাঠকের মনে অস্বস্তি তৈরি করা, পাঠককে চমকে দেয়াই ছিল তার লক্ষ্য। এছাড়াও আমরা দেখতে পাই, এখানে তিনি সরাসরি হুঙ্কার ছেড়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘অতএব জাগ, জাগ গো ভগিনী’। তার এই হুঙ্কার ছিলো বাংলার নারী আন্দোলনে রণধ্বনির মতো।
রোকেয়া বুঝাতে চেয়েছিলেন যে নারী হিসেবে জন্ম নেয়াটা জৈবিক কিন্তু ‘অবলা’ বা ‘দাসী’ হয়ে থাকাটা সামাজিক। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন সমগ্র পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে।
সমগ্র আলোচনা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটকে আমরা মেলালে দেখতে পাই স্ত্রীজাতির অবনতি কেবল একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, ১২২ বছর পরেও এই প্রবন্ধের সমস্ত আলাপই এখনো প্রাসঙ্গিক। এখনো আমরা কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য দেখতে পাই, গৃহশ্রমের অস্বীকৃতি কিংবা সাইবার জগতে নারীর প্রতি অবমাননাকর নানান বক্তব্য, এমনকি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধিদের দ্বারা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতি অবমাননাকর, কুরুচিপূর্ণ নানান বক্তব্য দেখতে পাই তখন এই প্রবন্ধের রোকেয়ার বক্তব্যগুলো বারবার প্রসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন