সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বিতর্ক বেশ তুঙ্গে। এক পক্ষ বলছেন, "পুরুষ হওয়ার জন্য পুরুষের প্রতিদিন ক্ষমা চাওয়া উচিত।" এই কথাটি শুনে অবধারিতভাবেই সাধারণ পুরুষদের মধ্যে একটি তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। পাল্টা জবাব হিসেবে উঠে এসেছে ড্রেন বা ম্যানহোলে কাজ করা কোনো শ্রমিকের ছবি, যা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে - যে পুরুষটি সমাজের সবচেয়ে কষ্টের কাজগুলো করে নিজের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে, সে কেন ক্ষমা চাইবে? আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এই দুটি পক্ষ একে অপরের ঘোর বিরোধী। কিন্তু আমরা যদি একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করি, তবে দেখব এই দুই পক্ষ আসলে একই শোষণের গল্প বলছে, যার নাম ‘পুরুষতন্ত্র’ বা প্যাট্রিয়ার্কি।
এখানে প্রথম পক্ষ যখন "পুরুষ" শব্দটি ব্যবহার করেন, তখন তিনি রক্ত-মাংসের কোনো ব্যক্তি বা আপনার পরিচিত কোনো নিরপরাধ মানুষকে নির্দেশ করেন না। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে ‘পুরুষ’ একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো বা ‘সিস্টেম’। এই সিস্টেমটি হাজার বছর ধরে ক্ষমতার এমন এক সমীকরণ তৈরি করেছে যেখানে আধিপত্য, শক্তিমত্তা এবং আবেগহীনতাকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থায় কেবল পুরুষরাই সুবিধা পায় তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে অনেক নারীও এই পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ করে সমাজকে শাসন করেন। তাই যখন একজন ফেমিনিস্ট পুরুষের সমালোচনা করেন, তিনি আসলে সেই ব্যক্তির পুরুষাঙ্গকে আক্রমণ করেন না, বরং আক্রমণ করেন সেই আধিপত্যকামী ‘জেন্ডার আইডেন্টিটি’ বা মনস্তাত্ত্বিক পরিচয়কে, যা পৃথিবীকে কেবল শাসন আর শোষণের নজরে দেখতে শেখায়।
অন্যদিকে, যারা পাল্টা যুক্তিতে ম্যানহোলে নামা শ্রমিকের ছবি দিচ্ছেন, তারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও পুরুষতন্ত্রের আরেকটি অন্ধকার দিকই উন্মোচন করছেন। এই যে পুরুষকে আমরা ‘ডিসপোজেবল’ বা ত্যাজ্য মনে করি। বিপজ্জনক কাজে তাকেই নামতে হবে, যুদ্ধে তাকেই মরতে হবে, পরিবারের জন্য নিজের শরীর নিংড়ে হাড়ভাঙা খাটুনি দিতে হবে। এই নিয়মগুলো কার তৈরি? এগুলোও কিন্তু এই পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোরই অংশ। এই সিস্টেমই ঠিক করে দিয়েছে যে পুরুষের মূল্য কেবল তার ‘ইউটিলিটি’ বা উপযোগিতার ওপর। যতক্ষণ সে উৎপাদন করতে পারছে বা ঝুঁকি নিতে পারছে, ততক্ষণই তার দাম। এই নির্মম ব্যবস্থায় মুষ্টিমেয় কিছু ক্ষমতাশালী পুরুষ হয়তো বেনিফিট পায়, কিন্তু বৃহত্তর সাধারণ পুরুষ সমাজ আসলে এর শিকার। অর্থাৎ, ড্রেনে কাজ করা ওই মানুষটি পুরুষতন্ত্রের দ্বারা উপকৃত নন, বরং তিনি এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের একজন।
আসল ট্র্যাজেডি হলো, আমরা যখন একে অপরের সাথে তর্কে লিপ্ত হই, তখন আমরা বুঝতে পারি না যে প্রথম পোস্টের ‘ক্ষমা চাওয়া’ এবং দ্বিতীয় পোস্টের ‘শ্রমিকের আর্তনাদ’ আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। প্রথম পক্ষ চাইছে সেই ক্ষমতার কাঠামোর অবসান যেখানে পুরুষ মানেই আধিপত্য। আর দ্বিতীয় চিত্রটি প্রমাণ করছে যে, এই আধিপত্যের সংস্কৃতি পুরুষকেও আসলে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেয় না, দেয় যন্ত্র হিসেবে। তাই যখন কোনো সিস্টেমের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়, সেটি ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। বরং এটি সেই শেকল ভাঙার আহ্বান, যে শেকল একই সাথে একজন নারীকে নিরাপত্তাহীন করে রাখে আর একজন পুরুষকে ড্রেনের ভেতরে নামতে বাধ্য করে।
আমাদের বুঝতে হবে, পুরুষতন্ত্র সবার জন্য নয়; এটি কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে। আমরা যদি এই জেন্ডার আইডেন্টিটির উর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখতাম, তবে হয়তো ওই শ্রমিককে ড্রেনে নামতে হতো না, আর কাউকে তার পরিচয়ের জন্য অপরাধবোধেও ভুগতে হতো না। দিনশেষে আমরা সবাই একই ভাঙা নৌকার যাত্রী, কেবল একেকজন একেক দিক থেকে জল সেঁচে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।
সুতরাং আমাদের এমন একটা সমাজ ব্যবস্থা দরকার যেখানে কেউ কাউকে শোষণ করবে না। সবাই মানুষ হিসেবে পরিচিত হবে। লিঙ্গ ভিত্তিক কোনো বৈষম্য থাকবে না। আর এমন সমাজব্যবস্থার কথাই বলে ফেমিনিজম।
About the Author
Shakib Mahamud
Student
Shakib Mahamud is an International Relations researcher at the University of Dhaka and a development sector worker. Grounded in Marxist critique and labor solidarity, his work focuses on grassroots socio-economic structures, workers' rights, and systemic struggles for equity. He is dedicated to advancing inclusion, dismantling patriarchal systems, and leveraging social research to amplify the visibility of the working class.
প্রোফাইল দেখুন
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন