নারীর প্রতি সহিংসতা,নারীকে ধর্ষণ, প্রেম ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নারীর সাথে প্রতারণা,নারীদের প্রকাশ্যে হেনস্তা করা ও হেনস্তাকারীকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা, নারীকে অশ্লীল মন্তব্য করা-এই সমস্ত ঘটনায় আমরা সাধারণত ব্যক্তিকে দোষ দিয়ে থাকি।
অর্থাৎ কখনো অপরাধীকে দোষ দেই আবার কখনো বা ভিকটিমকেই দোষ দেই। অপরাধের দায় অবশ্যই অপরাধীরই। কিন্তু এর থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়।এ সকল অপরাধ সংগঠিত করার মতো এমন অসুস্থ মানসিকতা কোথায় উৎপাদন হয়?দড়ি দিয়ে সমস্যাগুলো বাঁধার পর যে অবশিষ্ট অতিরিক্ত দড়ি কেটে ফেলে দেওয়া হয়,প্রশ্নখানি ঠিক এই অতিরিক্ত দড়ির মতো করে বরাবরই আমাদের অগোচরে চলে যায়।
সমাজ, সংস্কৃতি,শিক্ষা,অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পরিবেশ মানুষের চেতনা গঠনের উপকরণ।কিন্তু আমাদের ধারণা মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা হয়তো আকাশ থেকে পড়ে অথবা গাছেই ধরে। সুতরাং এসব গুণগুলো অর্জন করার কিছু নেই।
কোনো সমাজে যদি নারীর প্রতি সহিংসতা বা অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপকভাবে দেখা যায়, তাহলে এর জন্য প্রশ্ন করতে হবে সেই সমাজের প্রচলিত সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
যখন কোনো ধর্মীয় বক্তা নারীকে ‘তেঁতুল' বা ‘খোসা ছাড়ানো কলা'র সঙ্গে তুলনা করেন,কিংবা কোনো ‘নারী হেনস্তাকারীকে' ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেয় তখন এর সামাজিক প্রভাব কোথায় গিয়ে আসলে দাঁড়ায় সেদিকে আমাদের দৃষ্টিপাত করা উচিত । এধরনের বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ড জনমনে নারীর ব্যক্তিত্ব, চিন্তা ও নারী সত্তাকে আড়াল করে তাকে একটি বস্তুতে পরিণত করে। একজন মানুষকে(নারীকে) যখন মানুষ হিসেবে নয়, বরং পুরুষের আকাঙ্ক্ষা জাগানোর বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন নারীর প্রতি সম্মান নয়, বরং তাকে ভোগের মনোভাব শক্তিশালী হয়।
একইভাবে পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থা নারীদেহকে পণ্য বিক্রির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে। বিজ্ঞাপন, বিনোদন,শিল্প ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি বড় অংশ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য নারীদেহকে ভোগ্যপণ্যের মতো উপস্থাপন করে। ফলে সমাজে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে নারীকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে নয়, বরং বাহ্যিক সৌন্দর্য বা শরীরের মাধ্যমে বিচার করা স্বাভাবিক একটা ব্যপার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্ব এখানে অনিস্বীকার্য। একটি প্রজন্ম কিভাবে গড়ে উঠবে তা নির্ভর করে সেই সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। সেই শিক্ষা ব্যবস্থায় তারা শুধু পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করবে নাকি মানবিক মূল্যবোধও শিখবে এটা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সমাজের নতুন প্রজন্ম যদি বিদ্যাসাগরের মানবতা, বেগম রোকেয়ার মুক্তচিন্তা, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতা বোধ, নজরুলের সাম্যবাদী চেতনা, মাদাম কুরির অধ্যবসায়, ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগ, সূর্য সেনের সংগ্রাম ও প্রীতিলতার সাহসিকতার সঙ্গে পরিচিত না হয়, তবে তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানুষের প্রতি সম্মানবোধ কীভাবে বিকশিত হবে সেই প্রশ্নটিও থেকেই যায়।বড়জোর এই মহান মানুষদের নাম আমরা মুখস্থ করাতে দেখি, কিন্তু ইতিহাসের এই মহান মানুষদের জীবন কীভাবে চর্চা করতে হবে সে পথ যদি না দেখানো হয় তাহলে সমাজবোধ, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ শেখার পথ রুদ্ধ হয়ে যায় । যখন শিক্ষা কেবল চাকরির প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন মানবিক চরিত্র গঠনের ক্ষেত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।
খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল চর্চার ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়াও একটি বিরাট সমস্যা। শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ কমে যাচ্ছে, পাঠাগার কমছে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করার কী অপচেষ্টা চলছে সেটিও আমরা দেখছি। ফলে অনেক তরুণ-তরুণীই সুস্থ সামাজিক বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মানুষ শুধু বই পড়ে নয়, সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েও মানবিকতা শেখে।
বিনোদন মাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। সিনেমা বা নাটক বিনোদনের একটি বৃহৎ মাধ্যম।নায়ক একটি মহৎ চরিত্র।সবাই মনে মনে একজন নায়ক হতে চায়।কিন্তু যখন দেখে নায়ক মানে সুন্দরী মেয়ের পেছনে ঘুরে তাকে প্রথমে ডিসটার্ব করা,তারপর প্রেমে ফেলা,আবার ভিলেনদের সাথে ফাইট করা,কুপিয়ে জখম করে মেরে ফেলা তখন কিন্তু তার মনে এই নায়কটি হবার বাসনাই প্রতিপলিত হয়।কাজেই একজন নায়ক সমাজে সুপ্রভাব ও কুপ্রভাব উভয়ই দারুণভাবে ফেলে। শিল্প সমাজকে একা বদলে দিতে পারে না। কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের প্রশ্ন উত্থাপন করতে শেখায়, মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করতে পারে। এটাও মনে রাখতে হবে যে, কোনো সিনেমা, বিজ্ঞাপন বা বক্তৃতাই কেবল কাউকে নারী বিদ্বেষী বা ধর্ষক বানায় না। ধর্ষণের দায় অবশ্যই ধর্ষকেরই নিতে হবে সেই সাথে সমাজকেও নিতে হবে।
তাই ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে যে লড়াই এটি কেবল আইনের লড়াই নয়।
একটি সমাজ যদি বারবার নারীকে অবমাননা করে, মানুষকে মানবিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে, সহমর্মিতার বদলে ভোগবাদকে উৎসাহিত করে, অসুস্থ মানসিকতা বিকাশের জন্য একটি উর্বর পরিবেশ তৈরি করে দেয় তাহলে সেখানে আইনের লড়াই স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারবে না।
জুঁই
আনন্দ মোহন কলেজ শিক্ষার্থী
juiislam5698@gmail.com
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন