১৮৮০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রমিক আন্দোলনের বিপ্লবী মার্কসবাদী নেতা এবং রোজা লুক্সেমবার্গের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ক্লারা জেটকিন ১৯১৯ সালে নবগঠিত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের অংশ হন। ১৯২১ সালে তিনি ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন ও লিয়ঁ ত্রৎস্কির সঙ্গে কমিন্টার্নের মধ্যে পুঁজিবাদী বর্বরতার বিরুদ্ধে যৌথ সংগ্রামে শ্রমজীবী মানুষ এবং তাদের সংগঠনগুলিকে একত্রিত করার প্রচেষ্টার কৌশলকে জয়যুক্ত করেন। এই কৌশলই পরে "যুক্ত ফ্রন্ট" নামে পরিচিত হয়।
দুই বছর পরে, এই জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী কমিন্টার্ন কর্তৃক গৃহীত একটি প্রতিবেদনে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যের প্রশ্নে এই নীতির প্রয়োগ করেন। কিন্তু ১৯২৪ সাল থেকে জেটকিন যে নীতির জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম করেছিলেন, তা ক্রমে পরিত্যক্ত হয়। জীবনের শেষ দশকটি তিনি একজন সম্মানিত কিন্তু কার্যত স্তব্ধ ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে কাটান, কারণ সেই সময়ে কমিন্টার্ন স্তালিনবাদী অধঃপতনের ফলে ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছিল।
১৯২৮ সালে কমিন্টার্ন একটি সংকীর্ণতাবাদী অবস্থান গ্রহণ করে, যার ফলে শ্রমিক আন্দোলনে সমাজ-গণতন্ত্রী এবং অন্যান্য অ-কমিউনিস্ট ধারার সঙ্গে যে কোনও ধরনের ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যের নীতিগত বিরোধিতা করা হয়। এদের "সোশ্যাল ফ্যাসিস্ট" বলে আখ্যায়িত করা হয়। এই নীতি, এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এসপিডি) বিশ্বাসঘাতক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে যুক্ত ফ্রন্ট গঠনের অনুরূপ প্রত্যাখ্যান, মিলিতভাবে ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে জার্মানিতে হিটলারের ক্ষমতায় আরোহনের পথ প্রশস্ত করে।
অসুস্থতা ও ক্রমশ দৃষ্টিশক্তি হারানোর কারণে জেটকিন এই সময়ে ক্রমেই শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তবু তিনি কমিন্টার্নের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব তাঁকে প্রকাশ্যে ফ্যাসিবাদ ও যুক্ত ফ্রন্ট সম্পর্কে তাঁর মত প্রকাশ করতে বাধা দিত। তা সত্ত্বেও, ১৯৩২ সালের আগস্টে জার্মান রাইখস্ট্যাগে (সংসদে) প্রদত্ত এক বক্তৃতায় তিনি ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে তাঁর ১৯২৩ সালের প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য তুলে ধরতে সক্ষম হন। এক বছর পরে, ৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুর আগে অবধ্ তিনি কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সেই অল্প কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বের একজন ছিলেন, যাঁরা তখনও লেনিনের কমিন্টার্নকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
১৯২৫ ও ১৯২৬ সালে কমিউনিস্ট উইমেনস মুভমেন্ট এবং তার পত্রিকা ডাই কমিউনিস্টিশে ফ্রাউয়েনইন্টারন্যাশনালে (দ্য কমিউনিস্ট উইমেনস ইন্টারন্যাশনাল) বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই দুই উদ্যোগেরই চালিকাশক্তি ছিলেন জেটকিন।
এই সময়ে জেটকিন রাজনৈতিকভাবে কমিন্টার্নের তৎকালীন সভাপতি নিকোলাই বুখারিনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ইউনাইটেড অপোজিশনের বিরুদ্ধে বুখারিন ও স্তালিনের কঠোর প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপকে তিনি সমর্থন করেছিলেন। ১৯২৭ সালের নভেম্বরে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে ত্রৎস্কির বহিষ্কারকেও তিনি সমর্থন করেন। বিরোধীদের গণগ্রেফতার এবং সাইবেরিয়ায় নির্বাসনের বিরুদ্ধেও তিনি প্রতিবাদ করেননি। এর ফলে তিনি সেই আমলাতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন, যারা অচিরেই বুখারিনের বিরুদ্ধেই ঘুরে দাঁড়ায় এবং স্তালিনের নিরঙ্কুশ শাসনকে আরও সুদৃঢ় করে।
কিন্তু পরে, যখন বুখারিনের দক্ষিণপন্থী বিরোধীপক্ষও পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হয়, তখন ব্যক্তিগত স্তরে জেটকিন কমিন্টার্নের এই রূপান্তর সম্পর্কে তিক্ত ভাষায় লেখেন যে, "একদিক দিয়ে রুশ ভাষার নির্দেশিকাগুলিকে শুষে নিয়ে সেগুলিকে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে তীব্র বেগে উদ্গার করা হচ্ছে অপর দিক দিয়ে।"
১৯২৯ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৩০ সালের মার্চের মধ্যে জেটকিন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহী কমিটিকে উদ্দেশ করে জার্মান পার্টির সংকট নিয়ে একটি বিস্তৃত স্মারকলিপি রচনা করেন। এই স্মারকলিপিতে তিনি কমিন্টার্নে সোভিয়েত পার্টির ধ্বংসাত্মক ভূমিকাকে নিন্দা করেন। তাঁর ভাষায়, সোভিয়েত পার্টি আর "নেতৃত্ব" দিচ্ছিল না, কেবল "নির্দেশ" জারি করছিল। এবং জীবনে প্রথম ও একমাত্রবারের মতো তিনি সোভিয়েত পার্টি ও রাষ্ট্রের এই বিকাশ সম্পর্কে "বিস্তৃত ডকুমেন্টারি উপাদান" দাবি করে সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্তালিনের নেতৃত্বের নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানান। তিনি বলেন, কমিন্টার্নভুক্ত দলগুলির "রুশ পার্টির সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সংহতির অবস্থান থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমস্যা সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়ার অধিকার ও দায়িত্ব" রয়েছে।
জেটকিন তাঁর পুত্র ম্যাক্সিমের কাছে তীব্র সেন্সরশিপ এবং তাঁর লেখাপত্র বারবার দমন করার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। এমনকি, তিনি বলেন, তাঁর নাম পর্যন্ত আর উল্লেখ করা যাচ্ছে না। ১৯২৯-৩০ সালের সেই স্মারকলিপিতে তিনি লিখেছিলেন, "আমি পার্টি শৃঙ্খলা ভঙ্গ করব তিনবার, চারবার, যদি তা বিপ্লবের স্বার্থে প্রয়োজন হয়।"
বিশ্ব শ্রমিক আন্দোলনের এই স্মরণীয় নেত্রী রাইখস্ট্যাগে প্রদত্ত তাঁর শেষ বক্তৃতা শুরু করেছিলেন এই কথায়: "আমাদের সবচেয়ে জরুরি কাজ হল ফ্যাসিবাদকে ধ্বংস করার জন্য সকল শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠন করা। রাজনৈতিক, ট্রেড-ইউনিয়নগত, ধর্মীয় বা মতাদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির যে বিরোধ আমাদের বিভক্ত করে রাখে, সেই সমস্ত পার্থক্যকে অবশ্যই এই ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তার সামনে পথ ছেড়ে দিতে হবে।" [এর অর্থ অবশ্য পারস্পরিক রাজনৈতিক সমালোচনাগুলিকে ভুলিয়ে দেওয়া নয়, বরং সেগুলিকে সাথে নিয়েই লড়াইয়ের ময়দানে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।]
উপরের লেখাগুলি নেওয়া হয়েছে ক্লারা জেটকিন, ফাইটিং ফ্যাসিজম: হাউ টু স্ট্রাগল অ্যান্ড হাউ টু উইন, মাইক ট্যাবার ও জন রিডেল, হেমার্কেট বুকস, ২০১৭ থেকে।
প্রথম প্রকাশিত: নয়া দিশা পত্রিকা'র ফেসবুক পেজে
About the Author
Sankalpa
মজদুরের নিয়মিত লেখকশিক্ষার্থী
বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন