অক্ষয় মালবেরির শুরুতে ‘মনীন্দ্র গুপ্ত’ লিখেছিলেন, “শত শরদ মানুষের আয়ু। কিন্তু দুঃখী-সুখী-ভ্রষ্টচারী ততদিন বাঁচে না। মরণের আগে বোকাচোখে তাকিয়ে দেখে: সমস্তই অসম্পূর্ণ, তার রাকাশশী অসংলগ্ন বালি হয়ে উড়ে যায়। তবু এইটুকু জীবনের মধ্যে কত কি যে ঘটেছিল; কত মুগ্ধতা, সন্তাপ, উল্লাস, দ্রবণ! ভোলা যায় না।” অন্যদিকে চির নির্জনতম কবি জীবনানন্দ লিখেছেন, “মরণের পরপারে বড়ো অন্ধকার।”
মৃত্যু নিয়ে বাংলা সাহিত্যে মাতম অথবা মাতামাতি নেহাত কম হয়নি। বাংলা সাহিত্যের পরিসরে মৃত্যুর ছায়া বেশ গভীর। যারা কলমে এঁকেছেন প্রেম, প্রকৃতি, মানবজীবনের সূক্ষ্মতম অনুভব—তাঁদের নিজেদের জীবনেই হানা দিয়েছে রোগ-শোক, জরা, ব্যাধি কিংবা অতিমারির নির্মমতা। মৃত্যু তখন ফুটে উঠেছে তাদের লেখায়। সাহিত্য তখন কেবল সৃজনের আশ্রয় থাকেনি, হয়ে উঠেছে শোক ধারণের এক নীরব পাত্র; শব্দের আড়ালে জমে থাকা হারানোর দীর্ঘ অনুরণন।
সাহিত্যের এই রোগশয্যার তালিকাটি দীর্ঘ এবং ভয়াবহ। শুরুটা করা যাক ‘মেঘনাদবদ’ মহাকাব্যের মহাকবিকে দিয়ে। এখানে ‘মেঘনাদ’ যেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত নিজেই। নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে কাপুরুষ লক্ষ্মণের অনাহুত প্রবেশের মতোই ‘অমিত্রাক্ষরের জনকে’র জীবনেও কাপুরুষের মতো হানা দিয়েছে জরা, ব্যধি। ১৮৭৩ সালে যখন আলিপুর জেনারেল হাসপাতালের জীর্ণ শয্যায় শুয়ে লিভার সিরোসিসের যন্ত্রণায় রক্তবমি করছেন, তাঁর সেই হাহাকার যেন এক পরাজিত বীরের ট্র্যাজিক মঞ্চ। মৃত্যুর মাত্র তিন দিন আগে যকৃৎ পীড়ায় মারা গেছেন স্ত্রী হেনরিয়েটা ও। দাক্ষিণাত্যের সেই বীর তখন নিঃস্ব, একা—ঠিক যেন এক যবনিকাপাতহীন নাটকের নটবর।
আবার, ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি পেয়েছিলেন অনেকে, কিন্তু বাঙালি মাথায় করে রাখল একজনকেই। পাঠক মাত্রই বুঝতে পারছেন, আর কেউ নন বরঞ্চ ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’র জনকের কথা বলছি। ১৮৯১ সালে ‘বাংলা গদ্যের জনক’ সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও লিভার ক্যানসারের জেদি যন্ত্রণার কাছে নতিস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে ১৮৯৪ সালে বঙ্কিমচন্দ্র যখন বহুমূত্রের তীব্র তৃষ্ণায় কাতর হয়ে এক পরম শূন্যতায় বিলীন হচ্ছেন; তখন বোঝা যায় যে এই রেনেসাঁর নায়কদের শরীরী কাঠামো ঠিক কতটা বিপন্ন ছিল। ১৯৩৮ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের যকৃৎ ও পাকস্থলীর ক্যানসার, এমনকি তাঁর স্ত্রী শান্তি দেবী এবং শিশুপুত্র উভয়েরই প্লেগ রোগে মৃত্যু, জীবনের অসহায়তার করুণ চিত্রকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে।
উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরুকে বলা হয় ‘বাংলা সাহিত্যের স্বর্নযুগ’। একদিকে বাংলার নবজাগরণের সোনালি আভা, মহাকাব্যের চরণে চরণে আধুনিকতার জন্ম, আর অন্যপাশে এক নিঃশব্দ হাহাকার। সেই হাহাকার কোনো যুদ্ধের নয়, বরং অন্দরমহলের দরজায় ওত পেতে থাকা অদৃশ্য ঘাতকের। সে ঘাতকের নাম কোথাও 'ওলাউঠা', কোথাও 'রাজরোগ', আবার কোথাও বা পরিচয়হীন এক নিস্প্রাণ নীল জ্বর। আমাদের সাহিত্যের বরপুত্ররা যখন কলম দিয়ে জগৎ জয় করছেন, তখন তাঁদেরই রক্তের উত্তরসূরিরা এক এক করে বিলীন হয়ে যাচ্ছিলেন এই মরণ-ব্যাধির অতল গহ্বরে। কখনো বা স্বয়ং তাঁরা নিজেরা ও।
১৮৫৮ থেকে ১৯৪৭—এই সময়কালটা যেন এক অদ্ভুত ‘প্যারাডক্স’। একদিকে বাঙালির মসী-যুদ্ধ, অন্যদিকে ওলাউঠা আর রাজরোগের এক অলিখিত ধ্বংসযজ্ঞ। যে হাত দিয়ে রচিত হচ্ছিল মহাকাব্য, সেই হাতই আবার কাঁপছিল প্রিয়জনের জ্বরাক্রান্ত কপালে জলপট্টি দিতে দিতে। যেন এক জটিল রসায়ন, যেখানে মেধা আর মড়ক হাত ধরাধরি করে হেঁটেছে দীর্ঘ এক শতাব্দী।
সবথেকে করুণ ন্যারেশনটি বোধকরি রচিত হয়েছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি তখন বাংলা সংস্কৃতির সূর্য। কিন্তু সেই সূর্যের আলোতেও ঘন কুয়াশার মতো জেঁকে বসেছিল মৃত্যু। ১৯০২ থেকে ১৯০৭—মাত্র পাঁচটি বছর। এই পাঁচটি বছর যেন ঠাকুরবাড়ির অন্দরে এক বিরামহীন শোকগাথা। রবীন্দ্রনাথের জীবন থেকে এই ক’টি বছর যেন এক একটি দীর্ঘশ্বাস। তিনি যখন বিশ্বকবির সিংহাসনের দিকে এগোচ্ছেন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত আকাশটা বারবার কালো মেঘে ঢেকে দিচ্ছিল মহামারি। ১৯০২-এর সেই নিস্তব্ধ রাতে যখন মৃণালিনী দেবী এক রহস্যময় যন্ত্রণায় বিদায় নিলেন, কবি তখন শোককে বানালেন শিল্পের কাঁচামাল। বেদনাভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে রচনা করেন ক্ষীণকায় কাব্য 'স্মরণ'। কিন্তু নিয়তি ছিল আরও নিষ্ঠুর। ১৯০৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ‘রাজরোগ’ যক্ষ্মার কবলে পড়ল মেজো মেয়ে রেণুকা। যক্ষ্মা তখন কেবল রোগ নয়, এক সামাজিক অভিশাপ—এক ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্বের মহাকাব্য। রেণুকার সেই ভাঙা গলার কাশি আজও যেন শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলায় এক প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার তৈরি করে। পত্নী-বিয়োগের অব্যবহিত পরে সন্তানের মৃত্যু, একের পর এক মৃত্যুঝড় যেন কবির মনন উপত্যকাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। নিষ্পাপ শিশু, যে জানে না মরণের সংজ্ঞা, অথচ তার সন্নিকটেই ছিল আসন্ন মৃত্যু। এরূপ নির্দয় মৃত্যুর ক্রমিক আঘাতে ক্ষতবিক্ষত কবিমন উপনীত হয়েছিল বাস্তব উপলব্ধির আঙিনায়। তবে ট্র্যাজেডির যবনিকাপাত তখনও হয়নি। চূড়ান্ত অঙ্ক বুঝি তখনও বাকি। ১৯০৭ সালের এক অভিশপ্ত বিকেলে মুঙ্গেরে থাকাকালীন 'ওলাউঠা' বা কলেরার করাল গ্রাসে মাত্র ১১ বছর বয়সে না-ফেরার দেশে চলে গেল কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ ও। যে রবীন্দ্রনাথ "প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে" গান বেঁধেছিলেন, তাঁরই অন্দরমহল তখন এক অর্থহীন শূন্যতার ব্ল্যাকহোল। শমীর সেই 'বাবার জন্য জল চাওয়া'র হাহাকার যেন আজও ইতিহাসের পাতায় এক নিরেট নিহিলিস্টিক যাতনা হয়ে টিকে আছে।
রবীন্দ্রনাথের অন্দরমহল সেদিন ভেঙে পড়েছিল এক অর্থহীন শূন্যতায়, যেখানে যুক্তি পরাস্ত আর ঈশ্বর মৌন।
ঠাকুরবাড়ির অন্দর ভাঙার এই নোনা স্বাদের রেশ যখন মিলিয়ে যায়নি, তখনই এর সমান্তরালে উত্তর কলকাতার রায়চৌধুরী বাড়িতেও জমেছিল বিষাদের নীল মেঘ। ১৯১৫ সালে কিডনির জটিলতা আর বহুমূত্রের কাছে হার মানলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। সেই শোককে শক্তিতে রূপ দিয়ে বাংলা সাহিত্যে নতুন রসায়ন যোগ করলেন সুকুমার রায়। কিন্তু বড় ট্র্যাজেডিটি ওত পেতে ছিল সুকুমার রায়ের জন্য। নিয়তির কী নিষ্ঠুর প্রহসন! যিনি হাসির পসরা সাজিয়েছিলেন, তাঁরই শরীরের কোষে কোষে বাসা বেঁধেছিল 'কালাজ্বর'। ১৯২৩ সালের সেই নিঝুম দুপুরে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে যখন তিনি বিদায় নিচ্ছেন, তখন বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি হারাল এক অনন্য জাদুকরকে। যিনি ‘আবোল-তা্বোল’ দিয়ে হাসির জোয়ার বইয়েছিলেন, তাঁরই শরীরের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলেছে ‘কালাজ্বর’। যে কালাজ্বরের কোনো প্রতিষেধক তখন নাগালে ছিল না। হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই বিষণ্ণতা যেন সুকুমারের কলমে এক ‘অ্যাবসার্ড’ বাস্তবের জন্ম দিয়েছিল। কালাজ্বরের সেই ধীর লয়ের বিষাদ রায়চৌধুরীদের অন্দরমহলকে কেবল ফাঁকাই করেনি, বরং সৃজনের এক নীল জ্যামিতিকে অসম্পূর্ণ রেখে দিয়েছিল।
সাহিত্য-সংস্কৃতির যে পরিসর একসময় ছিল সুর, শব্দ আর সৃষ্টির উর্বর ভূমি, সেই পরিসরেই হঠাৎ নেমে আসা এ এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। কলম থেমে যায় না, কিন্তু তার কালিতে মিশে যেতে থাকে শোকের অদৃশ্য দাগ। অন্দরমহলের জানালাগুলো, যেখান দিয়ে একসময় আলো ঢুকতো, সেখান দিয়েই যেন প্রবেশ করতে থাকে মৃত্যুর দীর্ঘ ছায়া।
ব্যক্তিগত ডায়েরি কিংবা হলুদ হয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপির ভাঁজে এই মৃত্যুগুলো কেবল ক্লিনিক্যাল রিপোর্ট নয়; এ যেন এক অলিখিত যুদ্ধের খতিয়ান। তেমনিভাবে ‘তিমির হননের কবি’ বরিশালের জীবনানন্দ দাশের পিতা সত্যানন্দ দাশ ১৯৪২ সালে যখন আমাশয়ের মতো সামান্য এক রোগে শয্যাশায়ী হয়ে বিদায় নিলেন, সেই নির্জনতা জীবনানন্দের কবিতায় যোগ করলো নিহিলিস্টিক অ্যাবসার্ডিটি। ব্যক্তিগত দুঃখবোধ ‘শুদ্ধতম কবিকে’ আরো দ্রবীভূত করলো। মৃত্যু তখন আর কেবল শারীরবৃত্তীয় ঘটনা রইলো না, জীবনানন্দকাব্যে হয়ে উঠলো এক পরাবাস্তব বিচ্ছিন্নতার জ্যামিতি। এক দীর্ঘ 'নৈঃশব্দ্যের সংলাপ'।
১৮৫৮ থেকে ১৯৪৭—এই কালপর্বে বাঙালির কলম থেকে ঝরেছে অমৃত, আর শরীর থেকে ঝরেছে নীল বিষ। ওলাউঠা, বসন্ত, যক্ষ্মা কিংবা ক্যানসার—ব্যাধির এই নামগুলো আমাদের সাহিত্যিকদের কাছে ছিল অনিবার্য ছায়ার মতো এক একটি অমোঘ গন্তব্য। ঠাকুরবাড়ি থেকে রায়চৌধুরী বাড়ি, বঙ্কিম থেকে শরৎচন্দ্র—সবাই যেন এক অনিবার্য ধ্বংসের দিকে হেঁটে গিয়েছেন সৃজনের প্রদীপ হাতে। সেই অসংখ্য ব্যক্তিগত শোকের পলিমাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের আজকের এই সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য।
যবনিকাপাতে এসে তাই মনে হয়, এই মৃত্যুগুলো কেবল রোগের পরিনতি নয়, বরং ইতিহাসের এক জটিল দ্বৈপায়ন। যেখানে মেধা আর মড়ক হাত ধরাধরি করে হেঁটেছে দীর্ঘ এক শতাব্দী। মড়কের ছায়ায় দাঁড়িয়েও মসীজীবীরা বুনেছিলেন স্বপ্নের এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্য। এই অকাল মৃত্যুগুলোই হয়তো আমাদের সাহিত্যকে দিয়েছে এক অদ্ভুত বিষাদময় পূর্ণতা, যা আজও আমাদের বর্তমানের আয়না হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে কেউ কথা রাখেনি, কেবল ব্যাধি তার কথা রেখে গিয়েছে অক্ষরে অক্ষরে।
About the Author
Saker Hossain Efaz (সাকির হোসেন ইফাজ)
Research Assistance, Public Hosting, Public Speaking
সাকির ইফাজ; উপস্থাপক, বাংলাদেশ বেতার। শিক্ষার্থী ও গবেষক, ইতিহাস বিভাগ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। Intern, Applied Democracy Lab; Dhaka University
প্রোফাইল দেখুন
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন