Searching…

যারা জনপ্রিয়, তারা নোবেলহীন: কাফকা হতে পারা কি আজও এ পুরস্কারের পূর্বশর্ত?

ফ্রানৎস কাফকা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাননি, কিন্তু তাঁর প্রেতাত্মা সুইডিশ একাডেমির করিডোরে ঘুরে বেড়ায়। তাঁর সৃষ্ট জগৎ—যেখানে যুক্তি পরাস্ত, আমলাতন্ত্র সর্বগ্রাসী এবং অস্তিত্ব এক অর্থহীন দুঃস্বপ্ন—বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যকে এতটাই গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে যে, বহু নোবেলজয়ীর লেখায় তাঁর ছায়া খুঁজে পাওয়া এক অবশ্যম্ভাবী অন্বেষা।

Saker Hossain Efaz (সাকির হোসেন ইফাজ)
157 10 মিনিট লাগতে পারে পড়তে
যারা জনপ্রিয়, তারা নোবেলহীন: কাফকা হতে পারা কি আজও এ পুরস্কারের পূর্বশর্ত?

মাত্র ৪০ বছরের জীবন। মৃত্যু আজ থেকে ১০০’র ও বেশি বছর আগে; অথচ তাঁর আত্মা যেন আজও ঘুরে বেড়ায় স্টকহোমের করিডরে। জীবদ্দশায় পুরস্কার তো দূর, এত সামান্য লিখে এবং একটিও উপন্যাস প্রকাশ না করে (আরো স্পষ্টভাবে বললে ‘সম্পূর্ণ’ না করে। তাঁর যেসব লেখাকে তিনি ‘সম্পূর্ণ’ দাবি করে গেছেন, তাঁর সর্বমোট সংখ্যা ৪০, যার মধ্যে কেবল ৯ টি কে আমরা ‘গল্প’ বলতে পারি। এছাড়াও আছে তিনটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস এবং প্রচুর ডায়েরি, এন্ট্রি এবং খন্ড সাহিত্যকর্ম। যা তিনি পুড়িয়ে ফেলতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন। মাত্র সাতটি রচনা বই আকারে প্রকাশ করে গিয়েছিলেন। -ফ্রানৎস কাফকা গল্পসমগ্র, মাসরুর আরেফিন) একজন মানুষ শতবর্ষব্যাপী বিশ্বের তাবড় তাবড় সব সাহিত্যিকদের মাথার ওপর সিন্দাবাদের ভূত হয়ে সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, ভাবা যায়?

হ্যাঁ পাঠক, ভাবা না গেলেও ভাবতে বাধ্য হতে হয়। কারণ নামটা ফ্রানৎস কাফকা। চমকে ওঠার মতো তথ্য হলো; ১৯০১ থেকে শুরু করে ২০১২ পর্যন্ত সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া ১০৯ জন লেখকের মধ্যে ৩২ জন তাঁর লেখায় কাফকার সরাসরি প্রভাব আছে বলে স্বীকার করেছেন। (- ‘Solving A Literary Mystery’, Kafka Project, San Diego State University, 2012)। শুধু তা-ই নয়, ২০১৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিজয়ীদের মধ্যে ও অন্তত ৫ জন সরাসরি কাফকা প্রভাবিত।


এই তালিকার নামগুলো ও চমকে ওঠার মতো। কাফকার উত্তরাধিকার বহন করা নোবেলবিজয়ীদের মধ্যে আছেন আলব্যের কাম্যু, জাঁ পল সাত্রে, কেনজাবুরো ওয়ে, গ্রাবিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, স্যামুয়েল বেকেট, উইলিয়াম ফকনার, এলিয়াস কানেততি থেকে শুরু করে হাল আমলের কাজুয়া ইশিগুরো, মিলান কুন্ডেরা কিংবা জন ফসে’রা। যে তালিকার সর্বশেষ সংযোজন লাসলো ক্রাসনাহোরকাই।

এই লেখকেরা কাফকার রেখে যাওয়া দর্শনের ভিন্ন ভিন্ন দিককে আত্মস্থ করেছেন—কামু নিয়েছেন অযৌক্তিকতা, সাত্র নিয়েছেন স্বাধীনতার সংকট, মার্কেস নিয়েছেন পরাবাস্তবতা এবং ওয়ে নিয়েছেন বিচ্ছিন্নতাবোধ। কিন্তু তাঁদের সকলের কেন্দ্রেই রয়েছে কাফকার সেই মৌলিক প্রশ্ন: এক অর্থহীন জগতে মানুষের অস্তিত্বের স্বরূপ কী?


ফ্রানৎস কাফকা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাননি, কিন্তু তাঁর প্রেতাত্মা সুইডিশ একাডেমির করিডোরে ঘুরে বেড়ায়। তাঁর সৃষ্ট জগৎ—যেখানে যুক্তি পরাস্ত, আমলাতন্ত্র সর্বগ্রাসী এবং অস্তিত্ব এক অর্থহীন দুঃস্বপ্ন—বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যকে এতটাই গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে যে, বহু নোবেলজয়ীর লেখায় তাঁর ছায়া খুঁজে পাওয়া এক অবশ্যম্ভাবী অন্বেষা। এই দীর্ঘ ছায়ারই আধুনিকতম এবং সম্ভবত অন্ধকারতম প্রতিরূপ হলেন হাঙ্গেরিয়ান কথাসাহিত্যিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই, যাঁর সাহিত্যিক মহত্ত্ব কাফকার দর্শনের এক নতুন ও সর্বনাশা ভাষ্য রচনা করে।


 ২০২৫ সালের অক্টোবরের এক বিকেলে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের ঘোষণাটি যখন এলো, বিশ্বের সাহিত্য-মহল কিছুটা স্তম্ভিত, কিন্তু গভীরভাবে আন্দোলিত হলো। সুইডিশ অ্যাকাডেমি পুরস্কারের জন্য বেছে নিলো এই হাঙ্গেরিয়ান লেখককে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের কিছু জল্পনার অবসান ঘটলো, আবার নতুন বিতর্কের দ্বারও উন্মোচিত হলো। হারুকি মুরাকামি, সালমান রুশদী, স্টিফেন কিং বা ড্যান ব্রাউনের মতো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় লেখকদের নাম আবারও দর্শকের সারিতেই রয়ে গেল। এই ঘটনাটি নোবেল কমিটির নান্দনিক বিচার এবং সাহিত্যিক যোগ্যতার মাপকাঠি নিয়ে পুরোনো প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।


 প্রকৃতপক্ষে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার দেওয়ার নির্দিষ্ট, স্বচ্ছ বা সর্বজনগ্রাহ্য কোনো মানদণ্ড নেই।

অর্থাৎ কীসের ভিত্তিতে লেখককে বেছে নেওয়া হয়—সাহিত্যগুণ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ভাষার রাজনৈতিক তাৎপর্য, না কি বিশেষ কোনো দার্শনিক অবস্থান?—তা প্রায়শই অস্পষ্ট।

অনেক বিখ্যাত, জনপ্রিয়, সাহিত্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ লেখক নোবেল পান না, অথচ তুলনামূলকভাবে অপরিচিত কেউ পুরস্কার পান। আবার সাহিত্যিককে ছেড়ে গায়ক ও হয়ে যান বিজয়ী। নোবেলের এই ছলনাময়ী তীব্র প্রহেলিকার কিছু সম্ভাব্য ব্যাখা আমরা এভাবে ভাবতে পারি, যা হয়তো বিদগ্ধ পাঠক্কূলের আহত মনের কিঞ্চিৎ শুশ্রুষায় ভূমিকা রাখতে পারে।


তারকা লেখক ও নোবেলের অমিল: এক অনিবার্য সংঘাত

প্রত্যেক বছর নোবেলের সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকা নিয়ে যে আলোচনা হয়, সেখানে কয়েকটি নাম প্রায় ধ্রুবকের মতো উপস্থিত থাকে। জাপানের হারুকি মুরাকামি তাদের মধ্যে প্রধান। পরাবাস্তব জগৎ, নিঃসঙ্গ চরিত্র এবং পপ-সংস্কৃতির অনুষঙ্গ মিলিয়ে তিনি এক নিজস্ব ঘরানা তৈরি করেছেন যা বিশ্বজুড়ে কোটি পাঠককে সম্মোহিত করে রেখেছে। কিন্তু সুইডিশ অ্যাকাডেমির কাছে এই বিপুল জনপ্রিয়তাকেই হয়তো তাঁর দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। নোবেল কমিটি প্রায়শই এমন সাহিত্যিকদের সন্ধান করে, যাঁদের কাজ প্রচলিত ধারার বাইরে, যাঁরা ভাষার শরীর নিয়ে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং মানব অস্তিত্বের গভীরতর সংকটকে উন্মোচন করেন। মুরাকামির সাহিত্যে পুনরাবৃত্তির অভিযোগ এবং তাঁর বিশ্ববীক্ষার গভীরতা নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হয়, তা হয়তো তাঁর নোবেল না পাওয়ার অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে, সালমান রুশদীর বিষয়টি আরও জটিল। 'Midnight's Children' দিয়ে তিনি বিশ্বসাহিত্যে যে আসন পেয়েছেন, তা অবিসংবাদিত। তাঁর লেখনীর ভাষা, ইতিহাস এবং জাদুবাস্তবতার এক অসাধারণ মিশ্রণ। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং ‘Satanic Verses’ এর মতো বহুল আলোচিত, সমালোচিত লেখনীর দরুণ বিতর্কিত ভাবমূর্তি হয়তো সুইডিশ অ্যাকাডেমির জন্য এক অস্বস্তিকর কাঁটা। নোবেল কমিটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধা বোধ করে, যদিও তাদের অনেক পুরস্কারই পরোক্ষে রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।

স্টিফেন কিং বা ড্যান ব্রাউনের মতো লেখকদের নোবেল না পাওয়া অনেক বেশি অনুমেয়। তাঁরা নিঃসন্দেহে নিজ নিজ জনরার (Genre) শ্রেষ্ঠ কারিগর, কিন্তু তাঁদের কাজকে 'বিশুদ্ধ সাহিত্য' বা 'High Literature' হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। অ্যাকাডেমি এমন সাহিত্যিককে পুরস্কৃত করতে চায়, যাঁর কাজ শুধুমাত্র একটি প্লট বা গল্পের চেয়েও বেশি কিছু; যাঁর লেখায় একটি স্বতন্ত্র দর্শন, ভাষার নান্দনিক উৎকর্ষ এবং শৈলীগত নতুনত্বের ছাপ থাকে। কিং বা ব্রাউনের সাহিত্য মূলত বিনোদনধর্মী এবং বাণিজ্যিক সফলতার নিরিখে বিচার্য, যা নোবেলের আদর্শ—আলফ্রেড নোবেলের ভাষায়, "an ideal direction"—থেকে অনেকটাই দূরে।


 সাম্প্রতিক নোবেলের গতিপ্রকৃতির দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি যে লাসলোর এই বিজয়কে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা ভুল। ২০১৬ সালে বব ডিলানের নাটকীয় জয় ছিল এর প্রথম সংকেত। ডিলানকে পুরস্কার দিয়ে অ্যাকাডেমি 'সাহিত্য' শব্দটির প্রচলিত সংজ্ঞাকে প্রসারিত কোরে আমেরিকান সংগীত ঐতিহ্যের মধ্যে কাব্যিকতাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এটি ছিল একটি সাহসী এবং বিতর্কিত পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করে যে অ্যাকাডেমি ‘প্রতিষ্ঠিত সংজ্ঞা’র বাইরে যেতে প্রস্তুত।

এর পরের বছরগুলোতেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে। ২০১৭ তে

কাজুও ইশিগুরোর ক্ষেত্রে স্মৃতি, আত্ম-প্রবঞ্চনা এবং মানবীয় সম্পর্কের ভঙ্গুরতা নিয়ে তাঁর শান্ত, অন্তর্মুখী গদ্য অ্যাকাডেমির ধ্রুপদী পছন্দের পরিচায়ক। আবার পরের বছরই

আলগা তোকারচুকের ক্ষেত্রে তাঁর পৌরাণিক কথা, খণ্ডিত আখ্যান এবং সীমানা অতিক্রমের দর্শন তাঁর লেখাকে বিশিষ্ট করেছে।

পিটার হান্ডকে (২০১৯) নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড় উঠলেও, ভাষার দার্শনিক ব্যবহার এবং উপলব্ধির জগৎ নির্মাণে তাঁর দক্ষতা ছিল পুরস্কারের ভিত্তি। অন্যদিকে

লুইস গ্লিক (২০২০) কঠোর, সংক্ষিপ্ত এবং ধ্রুপদী রূপে ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে সার্বজনীন করার জন্য পুরস্কৃত হন।

আব্দুলরাজাক গুরনাহ (২০২১) ঔপনিবেশিকতার প্রভাব এবং শরণার্থীতের ছিন্নমূল জীবনের বয়ানের জন্য এ সম্মাননা পান।

অ্যানি আরনো’'র (২০২২) ক্ষেত্রে, তিনি আত্মজীবনী ও সমাজতত্ত্বের মিশ্রণে 'অটোফিকশন'-কে এক নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বীকৃতি পান। আবার, পরেরবার ইয়োন ফসে (২০২৩), তাঁর minimalist বা স্বল্পাক্ষর গদ্য এবং নাটকের মাধ্যমে 'যা বলা যায় না' (the unsayable), তাকে ভাষারূপ দেওয়ার জন্য পুরস্কৃত হন।


এই তালিকা থেকে স্পষ্ট যে, সুইডিশ অ্যাকাডেমি সাম্প্রতিককালে বাণিজ্যিক সফলতার চেয়ে শৈলীগত উদ্ভাবন, প্রান্তিক স্বর এবং মানব অস্তিত্বের গভীর দার্শনিক সংকটকে তুলে ধরার ওপরই বেশি জোর দিয়েছে। তারা এমন লেখকদের বেছে নিয়েছে, যাঁদের কাজ আরামদায়ক নয়, বরং পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে, ভাবতে বাধ্য করে।

এই পথ ধরেই লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের আগমন। তিনি কোনো একটি নির্দিষ্ট সংকট—যেমন ঔপনিবেশিকতা বা ব্যক্তিগত স্মৃতি—নিয়ে লেখেন না। তাঁর ক্যানভাস আরও বড়, আরও ভীতিকর। তিনি মানব সভ্যতার ভিত্তি এবং অস্তিত্বের অর্থ নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত বিপর্যয় এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, তখন লাসলোর সর্বনাশা কিন্তু সম্মোহনী গদ্য আমাদের সময়ের সবচেয়ে জরুরি কণ্ঠস্বর হিসেবেই প্রতিধ্বনিত হয়। তাঁর নোবেল প্রাপ্তি তাই কেবল একজন লেখকের সম্মাননা নয়, এটি আমাদের বর্তমান সময়কে চেনার এক নির্মম কিন্তু সৎ সাহিত্যিক আয়নার স্বীকৃতি।

তবুও প্রশ্ন থেকেই যায় যে কাফকা ঘোর থেকে কেনো সাহিত্যের নোবেল বের হতে পারে না?


কাফকার অনস্বীকার্য প্রভাব: নোবেলজয়ী প্রজন্মের মনোলিথ


কাফকার লেখনী নোবেলজয়ীদের মধ্যে একটি অদৃশ্য অন্তঃস্রোতের মতো কাজ করেছে। তাঁর প্রভাব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, কিন্তু তার অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। কাফকা কেবল একজন লেখক নন, তিনি একটি দর্শন। তাঁর সৃষ্ট জগৎ হলো আমলাতান্ত্রিক দুঃস্বপ্ন, অস্তিত্বের বিচ্ছিন্নতাবোধ, অর্থহীনতা এবং অদৃশ্য শক্তির হাতে বন্দি মানুষের অসহায়ত্বের এক ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি। এই 'কাফকায়েস্ক' (Kafkaesque) বিশ্ববীক্ষা পরবর্তী প্রজন্মের বহু লেখককে প্রভাবিত করেছে, এবং লাসলো সেই ধারারই অন্যতম শক্তিশালী আধুনিক রূপকার।

লাসলোর সাহিত্যিক পথরেখা নির্মাণ করলে দেখা যায়, তিনি কাফকার রেখে যাওয়া বীজকে এক নতুন, আরও বিষণ্ণ এবং সর্বগ্রাসী মহীরুহে পরিণত করেছেন। তাঁর প্রথম দিকের কাজ, যেমন 'Satantango' (১৯৮৫), সমাজতান্ত্রিক হাঙ্গেরির ক্ষয়িষ্ণু, নিরালোক প্রান্তরের ছবি আঁকে। এই উপন্যাসের দীর্ঘ, সর্পিল এবং প্রায় অন্তহীন বাক্যগুলো যেন চরিত্রদের অন্তহীন অপেক্ষা ও নিষ্ফলতার ভাষাগত রূপ।


তাঁর পরবর্তী কাজগুলোতে, যেমন 'The Melancholy of Resistance' (১৯৮৯) বা 'War & War' (১৯৯৯), এই ক্ষয়িষ্ণুতার প্রেক্ষাপট আরও বিস্তৃত হয়। এটি আর কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থার পচন নয়, বরং সভ্যতারই অনিবার্য ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক মহাকাব্যিক গাথা। সুজান সোনট্যাগ তাঁকে "the Hungarian master of the apocalypse" বলে অভিহিত করেছিলেন, যা যথার্থ। তাঁর উপন্যাসের জগৎ প্রায়শই রহস্যময়, বিপর্যয়কর ঘটনার মুখোমুখি হয়—একটি মৃত তিমিকে বহনকারী সার্কাস, এক অতীন্দ্রিয় শক্তির আগমন—যা প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।

লাসলো কাফকার দর্শনকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। কাফকার চরিত্ররা একটি অদৃশ্য কিন্তু সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার (The Court, The Castle) বিরুদ্ধে লড়াই করে পরাজিত হয়। কিন্তু লাসলোর জগতে সেই ব্যবস্থাটিও ভেঙে পড়েছে; এখানে নিয়মকানুন নেই, আছে কেবল বিশৃঙ্খলা এবং অর্থহীনতার এক ঠান্ডা, মহাজাগতিক শূন্যতা। তাঁর গদ্য—যেখানে একটি দাঁড়ি খুঁজতে কয়েক পৃষ্ঠা অপেক্ষা করতে হয়; যা পাঠককে সেই শ্বাসরুদ্ধকর, ক্লোস্টোফোবিক অভিজ্ঞতার অংশ করে তোলে। সুইডিশ অ্যাকাডেমি সম্ভবত তাঁর এই আপোষহীন শৈলী এবং মানব অস্তিত্বের অন্ধকারতম দিককে নির্ভীকভাবে উন্মোচন করার জন্যই তাঁকে বেছে নিয়েছে। তারা এমন এক লেখককে সম্মান জানাল, যিনি সান্ত্বনা দেন না, বরং আমাদের সময়ের চূড়ান্ত সংকটকে তার সমস্ত নগ্নতা দিয়ে প্রত্যক্ষ করান।

Saker Hossain Efaz (সাকির হোসেন ইফাজ)

About the Author

Saker Hossain Efaz (সাকির হোসেন ইফাজ)

Research Assistance, Public Hosting, Public Speaking

সাকির ইফাজ; উপস্থাপক, বাংলাদেশ বেতার। শিক্ষার্থী ও গবেষক, ইতিহাস বিভাগ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। Intern, Applied Democracy Lab; Dhaka University

প্রোফাইল দেখুন

আলোচনায় অংশ নিন

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

সাইন ইন করুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast