Searching…

The Battle of Algiers: একটি জাতির মুক্তির লড়াই

কল্পনা করা যায়! এমন একটি সিনেমা যেটা দেখে খোদ মার্কিন প্রতি?...

Fazle Rabby Rashed
255 8 মিনিট লাগতে পারে পড়তে
The Battle of Algiers: একটি জাতির মুক্তির লড়াই

কল্পনা করা যায়! এমন একটি সিনেমা যেটা দেখে খোদ মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের কর্মকর্তারা যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি শিখেছেন। আবার স্ট্যানলি কুবরিক থেকে শুরু করে পল টমাস অ্যান্ডারসন, ক্রিস্টোফার নোলানের মতো বিশ্বের তাবড় তাবড় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের যদি পছন্দের সিনেমার একটি তালিকা করা হয়, তবে সেখানেও উপরের দিকে থাকবে। এটি এমন এক সিনেমা যাকে অনেকে 'আপনার প্রিয় পরিচালকের প্রিয় সিনেমা' বলে থাকে। বলছি ১৯৬৬ সালে ইতালিয়ান পরিচালক জিলো পন্তেকরভো’র হাত ধরে মুক্তি পাওয়া এবং সিনেমার সংজ্ঞাকে চিরতরে বদলে দেয়া কিছু সিনেমার মধ্যে অন্যতম সেরা সিনেমা 'দ্য ব্যাটল অফ আলজিয়ারস' এর কথা। ফ্রাঙ্কো সলিনাস এবং পন্তেকরভো দুজন মিলেই ইতালিয়ান-আলজেরিয়ান এই সিনেমার চিত্রনাট্যটি লিখেছেন। এটি সাদী ইয়াসেফ এর ‘স্যুভেনির দ্য লা ব্যাটল ডি’আলজি’ Souvenirs de la bataille d'Alger বইয়ের উপর ভিত্তি করে নির্মিত। যুদ্ধের নৃশংসতা, স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং গেরিলা সংগ্রামের এমন নিখুঁত বাস্তবসম্মত চিত্রায়ন বিশ্ব চলচ্চিত্রে খুব কমই দেখা গেছে। মুক্তির ছয় দশক পরেও এই সিনেমাটি কেবল আলজেরিয়ার যুদ্ধের গল্পই নয়, বরং আজও শোষণের বিরুদ্ধে শোষিতের লড়াইয়ের এক চিরন্তন বৈশ্বিক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সিনেমাটির মূল প্রেক্ষাপট ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত আলজিয়ার্স শহরকে কেন্দ্র করে। একদিকে আছে ফরাসি উপনিবেশিক বাহিনী, যারা যেকোনো মূল্যে তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চায়। অন্যদিকে আছে আলজেরীয় স্বাধীনতাকামী সংগঠন (FLN - Front de Libération Nationale)। সিনেমাটি শুরু হয় ১৯৫৭ সালে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং এই সিনেমার অন্যতম চরিত্র 'আলি লা পোয়ান’ (Ali La Pointe) কে ফরাসি বাহিনীর ঘিরে ফেলার দৃশ্য দিয়ে। যে কিনা একজন সাধারণ অপরাধী থেকে বিপ্লবীতে পরিণত হয়েছিলেন। তার পরপরই সিনেমাটি আবার তার অতীতে ফিরে যায়। যেখানে দেখানো হয় কীভাবে সাধারণ মানুষ গেরিলা যোদ্ধা হয়ে উঠলেন, কীভাবে একটি স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী সংগঠন FLN শহরের ভেতর তাদের নেটওয়ার্ক তৈরি করলেন, কীভাবে তারা ফরাসি সামরিক বাহিনীকে নাকানিচুবানি খাওয়ানোর মাধ্যমে কাসবাহ এলাকাকে কেন্দ্র করে ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে তুললেন। আবার বিপরীতে ফরাসি বাহিনীর কর্নেল ম্যাথিউর ঠান্ডা মাথার বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ, নৃশংস দমন-পীড়ন চলতে থাকে। দুই পক্ষের এই দ্বন্দ্বেই মূলত সিনেমার কাহিনী আগাতে থাকে।

১৯৫৬ সালে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন তুঙ্গে, তখন FLN সিদ্ধান্ত নেয় শহরকেন্দ্রিক গেরিলা হামলা চালানোর। FLN এর বিদ্রোহীরা ক্যাফে, চেকপোস্ট এবং ফরাসি সামরিক স্থাপনায় একের পর এক বোমা হামলা চালাতে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফরাসি সরকার কর্নেল জ্যাক ম্যাথিউর নেতৃত্বে ফরাসি প্যারাসুট রেজিমেন্টকে আলজিয়ার্সে মোতায়েন করে। তারা আলজিয়ার্সের পুরনো 'কাসবাহ' (Casbah) এলাকা অবরুদ্ধ করে ফেলে এবং বিদ্রোহীদের দমন করতে ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে। এই যুদ্ধের একটি অন্ধকার দিক ছিল ফরাসি বাহিনীর দ্বারা পরিচালিত ব্যাপক নির্যাতন। বিদ্রোহীদের কাছ থেকে তথ্য আদায় করার জন্য তারা অমানবিক পদ্ধতি অবলম্বন করতো। এতো কিছুর মধ্যেও অন্যতম সুন্দর একটি দৃশ্য লক্ষ্য করা যায়, যখন ফরাসি সামরিক বাহিনী মাইকিং করে বিপ্লবী এবং স্বাধীনতাকামী অনেক মানুষকে অনুৎসাহিত করে মনোবল ভেঙে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিল, ঠিক তার একটু পরপরই একটি ৭-৮ বছরের বাচ্চা চুপিচুপি সামরিক বাহিনীর সেই মাইক্রোফোনটি চুরি করে যুদ্ধের পক্ষে নিজের কণ্ঠেই মাইকিং করে মানুষকে উৎসাহ দিয়ে তাদের মনকে আরও দৃঢ় এবং শক্ত করে দিয়েছিল। ঠিক যেমন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেক মানুষ যে যেভাবে পেরেছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছিল।

চরিত্রায়নের ক্ষেত্রে পরিচালক এই সিনেমাতে কোন অতিমানবিক নায়ক তৈরি না করে বিপ্লবকে একটি সামষ্টিক লড়াই হিসেবে দেখিয়েছে। আলি লা পোয়ানে'র মতো সাধারণ এক অপরাধী থেকে বিপ্লবীতে রূপান্তরিত হওয়ার কাহিনীটি যেমন অনুপ্রেরণা দেয়, ঠিক তেমনি ফরাসি কর্নেল ম্যাথিউর বুদ্ধিবৃত্তিক আর নিষ্ঠুর রণকৌশল আবার যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরে। পরিচালক পক্ষপাতিত্ব না করে দেখিয়েছে কীভাবে একটি পক্ষ স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে এবং অন্য পক্ষ তাদের উপনিবেশিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অমানবিক নির্যাতনের আশ্রয় নেয়। পন্তেকরভো যখন এই সিনেমাটি নির্মাণ করেন, তখন তার উদ্দেশ্য কেবল একটি বাণিজ্যিক যুদ্ধ সিনেমা হিসেবে ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন ইতিহাসের একটি রক্তক্ষয়ী অধ্যায়কে জীবন্ত করে তুলতে। পুরো সিনেমাটা সাদা-কালো হওয়ায় এর বাস্তবতা অনেক বেশিই ফুটে উঠেছে। হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরার ব্যবহার হওয়ায় সিনেমাটি দেখলে মনে হয় না এগুলো কোনো সিনেমার দৃশ্য। মনেহয় যেন যুদ্ধের ময়দানে কোনো সাংবাদিকের ক্যামেরা থেকে ধারণ করা ফুটেজ। ক্যামেরার মুভমেন্টে কেউ এটাও মনে করবে যে সেও সেই মিছিলেরই একজন। এসবের সাথে কিংবদন্তি সাউন্ড কম্পোজার, দ্য গ্রেটেস্ট মায়েস্ত্রো, এননিও মোরিকোনের থমথমে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এই সিনেমার প্রতিটা দৃশ্যকে কয়েকশ গুণ বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে। তার সেই ড্রাম বিট আর থমথমে সুরগুলো প্রতিটি তল্লাশি বা বিস্ফোরণের দৃশ্যকে একদম জীবন্ত করে তুলেছে।

এই সিনেমায় যারা অভিনয় করেছেন তাদের প্রায় সবাই ছিলেন অপেশাদার। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, সিনেমার অনেক ভিড়ের দৃশ্যে বাস্তবের সেই মানুষগুলোই অংশ নিয়েছিলেন যারা সেই সময়ে ফরাসি শাসনের অত্যাচার সহ্য করেছিলেন। প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে কেবল কর্নেল ম্যাথিউর ভূমিকায় অভিনয় করা জঁ মার্টে পেশাদার অভিনেতা ছিলেন। শুধু পেশাদার অভিনেতাই না, বাস্তবে তিনি সামরিক বাহিনীরই লোক ছিলেন। জঁ মার্টিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি প্যারাসুট রেজিমেন্টে কাজ করেছেন। পরিচালক পন্তেকরভো চেয়েছিলেন সিনেমার একমাত্র পেশাদার চরিত্রটি এমন কেউ করুক যার মধ্যে সত্যিকারের সামরিক ব্যক্তিত্ব আছে। জঁ মার্টিনের হাঁটাচলা, কথা বলার ধরন এবং আদেশ দেওয়ার ভঙ্গি ছিল একদম নিখুঁত সামরিক অফিসারের মতো। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, পর্দায় তিনি ফরাসি উপনিবেশিক শক্তির হয়ে কঠোর চরিত্রে অভিনয় করলেও, বাস্তবে তিনি আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সমর্থক ছিলেন। তিনি আলজেরিয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি ইশতেহারে Manifesto of the 121 এ স্বাক্ষর করেছিলেন। যার কারণে ফ্রান্সে তাকে অনেক বছর বড় কোনো থিয়েটারে কাজ করতে দেয়া হয়নি। আরেক অন্যতম প্রধান চরিত্র 'জাফর' এর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বাস্তব জীবনের FLN নেতা সাদী ইয়াসেফ। সাদী ইয়াসেফ কেবল এই বইয়ের লেখকই ছিলেন না। তিনি যুদ্ধের সময় আলজিয়ার্সে FLN এর অন্যতম প্রধান সামরিক কমান্ডার ছিলেন। তাই তিনি যা লিখেছেন তা ছিল তার নিজের চোখে দেখা সত্য ঘটনা। সাদী ইয়াসেফ যখন ফরাসি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং কারাগারে বন্দি ছিলেন তখনই তিনি তার যুদ্ধের স্মৃতিগুলো লিখতে শুরু করেন। পরবর্তীতে সেই লেখাগুলোই বই আকারে প্রকাশিত হয়। পন্তেকরভো এই সিনেমাটি বানানোর জন্য সাদী ইয়াসেফের এই পাণ্ডুলিপিটিকেই মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যাতে সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য বাস্তবসম্মত হয়। আরেকটি কথা হলো, সাদী ইয়াসেফ এই সিনেমার অন্যতম প্রযোজকও ছিলেন।

সিনেমাটি দুই পক্ষকে খুবই নিরপেক্ষভাবে এবং ফ্রেঞ্চ সেনাবাহিনীর নির্যাতন অনেক সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছে বলে মনে হওয়ায় ফ্রান্সে এটি ৫ বছর নিষিদ্ধ ছিল। এই সিনেমাই আবার গেরিলা যুদ্ধ, শহুরে সন্ত্রাসবাদ এবং কাউন্টার ইনসার্জেন্সির একটি ক্লাসিক কেস স্টাডি হিসেবে বিশ্বে বেশ পরিচিত। ব্ল্যাক প্যান্থার বা আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি IRA এর মতো অনেক বিপ্লবী সংগঠন এই সিনেমাকে গেরিলা যুদ্ধের কৌশলের পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহার করতো। আরেক অদ্ভুত বিষয় হলো, ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (Pentagon) তাদের কর্মকর্তাদের এই সিনেমাটি দেখিয়েছিল যাতে তারা বুঝতে পারে একটি দখলদার বাহিনীকে কীভাবে শহরভিত্তিক গেরিলা প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। অনেক দেশের সামরিক বাহিনীর মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এই সিনেমা ট্রেনিংয়ের জন্য দেখিয়েছে। ১৯৫৭ সালের শেষ নাগাদ ফরাসি সামরিক বাহিনী আলজিয়ার্সে FLN এর সাংগঠনিক কাঠামো প্রায় ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয় এবং যুদ্ধে সাময়িকভাবে জয়লাভ করে। সামরিকভাবে ফরাসিরা এই যুদ্ধে জিতলেও নৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে তারা হেরে যায়। তারা আলজেরিয়ার সাধারণ মানুষের মন থেকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে মুছে ফেলতে ব্যর্থ হয়। আন্দোলন চলমান থাকে, আন্দোলন আরও দীর্ঘ হয়। ফরাসি সেনাদের নির্যাতনের খবর যখন ফ্রান্স এবং জাতিসংঘে পৌঁছায় তখন বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা শুরু হয়। অবশেষে এই জনমতের চাপ শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে আলজেরিয়ার স্বাধীনতার দাবি মেনে নিতে বাধ্য করে।

‘দ্য ব্যাটল অফ আলজিয়ার্স' একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখাবে যে কীভাবে মানুষ স্বাধীনতার জন্য চরম ত্যাগ স্বীকার করে। হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ এটাই প্রমাণ করে যে, কোনো বড় শক্তিই জনস্রোতকে চিরকাল দাবিয়ে রাখতে পারে না। কেউ যদি একটি জাতির জন্মযন্ত্রণা এবং যুদ্ধের মনস্তত্ত্ব বুঝতে চায় তবে এটি তার দেখা অন্যতম সেরা সিনেমা বলে বিবেচিত হবে। যারা পলিটিক্যাল থ্রিলার, ইতিহাস নির্ভর, বাস্তবধর্মী সিনেমা পছন্দ করেন এই সিনেমা তাদের মন জয় করবেই। আর আমাদের মতো যারা একসময় পরাধীন ছিল তাদের কাছে এই সিনেমার আবেদন বরাবরই অন্যরকম থাকবে।


Fazle Rabby Rashed

About the Author

Fazle Rabby Rashed

Others

ব্যক্তিগতভাবে আমি একজন শিল্প-সংস্কৃতিমনা, প্রগতিশীল, উদারপন্থী ও মুক্তচিন্তার মানুষ। আমি বিশ্বাস করি শিল্প-সংস্কৃতিই মানুষের আসল পরিচয়। রাজনীতি, সমাজ, শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আড্ডা আর কাটাছেঁড়া করতে ভালো লাগে। তবে চলচ্চিত্রের দুনিয়াটা আমার একটু বেশিই প্রিয়। তাই সিনেমা নিয়ে লেখালেখি, আলোচনা আর সমালোচনা করতেই সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

প্রোফাইল দেখুন

আলোচনায় অংশ নিন

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

সাইন ইন করুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast