সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় 'বনলতা এক্সপ্রেস' সিনেমার প্রদর্শনীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে প্রচারণা চালানোর পর কোনো অবস্থাতেই সিনেমাটি প্রদর্শন করতে না দেওয়ার বিষয়ে কওমি শিক্ষার্থীদের ঘোষণার পর বিশৃঙ্খলা এড়াতে সিনেমাটির প্রদর্শন স্থগিত করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি।
মূলত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমা প্রদর্শনীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে প্রচারণা চালায় কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। এরপরই বিষয়টি নিয়ে বির্তক শুরু হয়।
"বনলতা এক্সপ্রেস" চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাকে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। বিষয়টি কেবল একটি সিনেমা নিয়ে নয়, বিষয়টি হলো আমাদের সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং আইনের শাসনের বাস্তব অবস্থা নিয়ে।
কোনো চলচ্চিত্র, বই বা শিল্পকর্ম সবার ভালো লাগবে না এটাই স্বাভাবিক। কেউ আপত্তি জানাতে পারেন, সমালোচনা করতে পারেন, বয়কটের ডাক দিতে পারেন। এগুলো গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু যখন কোনো গোষ্ঠী চাপ সৃষ্টি করে, ভয়ভীতি দেখায় বা প্রদর্শনী বন্ধ করার পরিবেশ তৈরি করে, তখন সেটি আর মতপ্রকাশ নয় , সেটি অন্যের অধিকার সীমিত করার চেষ্টা।
আমার কাছে আরও হতাশাজনক লাগে তখন, যখন প্রশাসন ও রাষ্ট্র দৃশ্যমানভাবে দৃঢ় অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়। অনেক সময় মনে হয়, আইন প্রয়োগের বদলে সংঘাত এড়ানোই যেন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি বৈধভাবে অনুমোদিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা চলচ্চিত্র প্রদর্শনী নিরাপত্তা না পায়, তাহলে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কাছে কী ধরনের সুরক্ষা আশা করবে?
ইতিহাস বলে, যখনই উগ্রতা বা অসহিষ্ণুতার সামনে রাষ্ট্র নীরব থেকেছে, তখন সেই নীরবতা নতুন নতুন দাবি ও চাপের জন্ম দিয়েছে। আজ একটি সিনেমা, কাল একটি বই, পরশু একটি নাটক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এভাবে ধীরে ধীরে স্বাধীন চিন্তার পরিসর সংকুচিত হতে থাকে।
আমি বিশ্বাস করি, ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা দুটোই একসঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। কিন্তু সেই ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কোনো পক্ষের চাপে নতি স্বীকার করা নয়, বরং আইনের ভিত্তিতে সবার অধিকার নিশ্চিত করাই একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাজ।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মতের অমিল থাকবে কিন্তু ভয় থাকবে না সমালোচনা থাকবে কিন্তু সহিংসতার আশঙ্কা থাকবে না, ধর্মীয় চর্চা থাকবে, পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির স্বাধীন বিকাশও থাকবে।
একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাকে তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের সমাজের সহনশীলতা, প্রশাসনের দৃঢ়তা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা একটাই আইন সবার জন্য সমান হোক, আর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন ভয় দেখিয়ে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ না পায়। স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন আমি যেমন আমার মত প্রকাশ করতে পারব, তেমনি আমার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারী মানুষও নিরাপদে তার মত প্রকাশ করতে পারবেন।
মন্তব্য মুছবেন?
এটা বাতিল করা যাবে না।
আলোচনায় অংশ নিন
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন
সাইন ইন করুন