সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

কেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ফেল করছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কেবল ক্ষমতা দখলের যন্ত্রে পরিণত হওয়ায় প্রকৃত জনসেবা ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে, প্রথাগত দলগুলো তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্পূর্ণ অযোগ্য।

রিমন : Rimon
পড়তে 6 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 53 বার পড়েছে
 কেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ফেল করছে

একটি আদর্শ রাজনৈতিক দল কেবল ক্ষমতা দখলের যন্ত্র নয়, বরং এটি হওয়া উচিত প্রজন্মের সুসংগঠিত মেলবন্ধন। এখানে বিশেষজ্ঞ ও পেশাদারদের দূরদর্শিতার সমন্বয় ঘটার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের চাহিদা পূরণ ও একটি নিরবচ্ছিন্ন নেতৃত্ব কাঠামো তৈরি হওয়ার কথা। রাজনৈতিক দলগুলোর থাকা উচিত এমন একটি সুসংগঠিত পদ্ধতি, যেখানে আইনবিদ বা ইতিহাসবিদদের প্রথা, নজির ও নীতিগত প্রজ্ঞা এবং ব্যবসায়ী মহলের দূরদর্শী চিন্তার সমন্বয় ঘটে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো নিজস্ব আদর্শ ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ চাহিদাকে একীভূত করে একটি নিরবচ্ছিন্ন নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তোলা। এখানে সামাজিক কর্মী ও বিশ্লেষকরা (অ্যাক্টিভিস্ট ও জার্নালিস্ট) শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করার দায়িত্ব পালন করা উচিৎ।

কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, দলগুলো এই প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটার পরও, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গঠনমূলক পরিবর্তনের লক্ষণ স্পষ্ট নয়। বরং ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।

স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিব্ল্যাটের ‘How Democracies Die’ বই অনুসারে, রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো “গণতন্ত্রের দ্বাররক্ষক” (democracy’s gatekeepers) হিসেবে কাজ করা। এর অর্থ হলো চরমপন্থী, অযোগ্য বা জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের ছাঁকনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে রাখা। বাংলাদেশের দলগুলো এই ‘ফিল্টারিং’ বা ছাঁকনি প্রক্রিয়ায় ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলে সুযোগসন্ধানী ও অযোগ্য ব্যক্তিরা নেতৃত্বের স্তরে জায়গা করে নিচ্ছে। জেমস সিজার একে বর্ণনা করেছেন দলগুলোর ‘পরিশোধন’ বা filtration করার সক্ষমতা হারানো হিসেবে, যা শেষ পর্যন্ত পুরো গণতন্ত্রকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। ২০২৪-এর আন্দোলনে যে তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমে এসেছিল, তাদের অনেকেই প্রধান দলগুলোতে যোগ্য স্থান পায়নি; বরং পুরনো অনুগত্যের ভিত্তিতে নেতৃত্ব চলছে।

অ্যান্ড্রু হেউডের ‘Politics’ বইটিতে আধুনিক যুগের সফল দলগুলোর একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে—সেগুলো সাধারণত ‘ক্যাচ-অল’ (catch-all) প্রকৃতির হয়। এই দলগুলো “বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর কাছে আবেদন তৈরি করতে নিজেদের আদর্শিক বোঝা কমিয়ে আনে”। বাংলাদেশের অনেক দল, বিশেষ করে বামপন্থী দলগুলো, আজও এমন কঠোর তাত্ত্বিক অবস্থানে আটকে আছে যা সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক চাহিদা—যেমন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে খাপ খায় না। ফলে তারা জনগণের ‘আশা ও স্বপ্নের’ প্রতিফলন ঘটাতে না পেরে কেবল ‘পণ্যের’ মতো সস্তা নীতি বিক্রির চেষ্টা করছে, যা ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়।

জোয়েল ওয়াটসনের ‘ইন্ট্রোডাকশন অফ গেম থিওরি’ বইটিতে “মিডিয়ান ভোটার থিওরি” উল্লেখ করা হয়েছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সেই দলই জয়ী হয় যারা রাজনৈতিক বর্ণালীর কেন্দ্রে অবস্থান করে অধিকাংশ সাধারণ ভোটারের মন জয় করতে পারে। বাংলাদেশের দলগুলো প্রায়ই এমন মেরুকরণের রাজনীতি বেছে নেয় যা তাদের চরম অবস্থানে ঠেলে দেয়। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে কেন্দ্রীয়করণ এবং বিএনপির মতো দলের পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব এই মেরুকরণকে আরও তীব্র করেছে। গেম থিওরি অনুযায়ী, যখন দলগুলো কৌশলগতভাবে মধ্যপন্থার ভোটারদের ধরতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা বৃহত্তর সমর্থন হারিয়ে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। ২০২৪-এর পরবর্তী সময়ে নতুন ছাত্র-সংগঠন যেমন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) উঠে আসায় এই ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

ব্রুস বুয়েনো ডি মেসকুইটা এবং অ্যালাস্টেয়ার স্মিথের ‘The Dictator's Handbook’ অনুযায়ী, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে সহযোগীদের কতটুকু সন্তুষ্ট রাখা যাচ্ছে তার ওপর। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘প্যাট্রোনেজ’ বা পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রবল। দলগুলো যখন জনসাধারণের জন্য ‘পাবলিক গুডস’ (যেমন সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন) নিশ্চিত করার চেয়ে কর্মীদের তুষ্ট রাখতে বা বৈষয়িক সুবিধা দিতে বেশি ব্যস্ত থাকে, তখন সাধারণ মানুষের আস্থা হারায়। এতে করে যোগ্য উত্তরসূরি তৈরির পরিবর্তে কেবল অনুগত সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হয়।

অ্যান্ড্রু হেউডের ‘Politics’ বইয়ে রবার্ট মিশেলসের “অল্পতন্ত্রের লৌহবিধি” (iron law of oligarchy) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। এই তত্ত্ব অনুসারে, যেকোনো সংস্থায় ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত গুটিকয়েক নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। বাংলাদেশে রাজনীতির এই “ব্যক্তিগতকরণ” এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দলের ইমেজের চেয়ে নেতার ব্যক্তি ইমেজের ওপর সব নির্ভর করে। আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনা এবং বিএনপিতে খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব এর স্পষ্ট উদাহরণ। গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশের প্রধান দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র অত্যন্ত দুর্বল—নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী মনোনয়ন সবই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা দলকে ভেতর থেকে দুর্বল করে ফেলছে।

একটি দলের প্রাণশক্তি হলো তার নীতিগত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। অ্যান্ড্রু হেউডের মতে, রাজনৈতিক দলের অন্যতম প্রধান কাজ হলো “রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ” (political socialization)। কিন্তু বাংলাদেশে সাংবাদিক ও বিশ্লেষকদের যেখানে নীতিগত প্রশিক্ষণের পথপ্রদর্শক হওয়ার কথা, সেখানে তারা অনেক সময় দলীয় প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে পড়ছেন। ২০২৪-এর পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও দলগুলো সংস্কারের চেয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা থেকে উত্তরণের পথ হলো একটি প্রজ্ঞাসম্পন্ন সুসংগঠিত কাঠামোতে ফিরে আসা। দলগুলোকে কেবল ক্ষমতা দখলের মাধ্যম না হয়ে যোগ্য উত্তরসূরি তৈরির ‘অ্যাকাডেমি’ হিসেবে কাজ করতে হবে। যেখানে আইনবিদের প্রজ্ঞা, ব্যবসায়ীদের দূরদর্শিতা এবং তরুণ প্রজন্মের চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে, কেবল তখনই তারা একটি সফল রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারবে।

এই সংকটের সমাধানে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চালু, যোগ্যতাভিত্তিক নেতৃত্ব নির্বাচন, পারিবারিক আধিপত্য হ্রাস এবং নীতিগত বিতর্কের মাধ্যমে মধ্যপন্থী অবস্থান গ্রহণ অপরিহার্য। না হলে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো শুধু নিজেরাই নয়, পুরো জাতির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকেও আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।

#বাংলাদেশের_রাজনৈতিক_দল #রাজনৈতিক_সংস্কার #গণতন্ত্র #বাংলাদেশ_রাজনীতি #নেতৃত্ব #সুশাসন #রাজনৈতিক_বিশ্লেষণ #ছাত্র_আন্দোলন
রিমন : Rimon

About the Author

রিমন : Rimon

একজন হারিয়ে যাওয়া আত্মা , যে খুঁজছে কেন এই জন্ম , কেন এই রাষ্ট্র ব্যাবস্তা , কি সম্পর্ক মানুষে মানুষে ...

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast